আমিরা হায়দার
স্বতন্ত্র স্থপতি
বাংলাদেশের নগর ব্যবস্থাপনা বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। দেশের শহরাঞ্চলে প্রতিদিন ২৩ হাজার ৬৮৮ টনের বেশি পৌর কঠিন বর্জ্য উৎপন্ন হচ্ছে। গত তিন দশকে প্রতি ১৫ বছর অন্তর বর্জ্যের পরিমাণ দ্বিগুণ হয়েছে। ফলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে আর অবহেলিত কোনো পার্শ্ববর্তী বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
বাংলাদেশে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তির বিবর্তনের গল্প মূলত উন্মুক্ত স্থানে বর্জ্য ফেলা থেকে শুরু করে ধীরে ধীরে পুনর্ব্যবহার, কম্পোস্টিং এবং বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদনের দিকে অগ্রসর হওয়ার গল্প। তবে এই যাত্রা এখনো অসম্পূর্ণ। সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরও জরুরি হয়ে উঠেছে। এই নিবন্ধের উদ্দেশ্য হলো সরকার ও নীতিনির্ধারকদের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে ভাবতে উৎসাহিত করা।
উন্মুক্ত বর্জ্য ফেলা থেকে নীতিগত উদ্যোগ
১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে কার্যত কোনো কাঠামোবদ্ধ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা ছিল না। বর্জ্য সংগ্রহ করা হতো মূলত হাতে এবং পরিবেশগত সুরক্ষার কোনো ব্যবস্থা ছাড়াই উন্মুক্ত স্থানে ফেলে রাখা হতো। ১৯৮৩ সালের ঢাকা সিটি করপোরেশন অধ্যাদেশ নগর বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনার প্রথম আইনগত উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে এর কার্যকারিতা মূলত কাগজে সীমাবদ্ধ ছিল।
২০০০ সালের পর সরকার ঢাকার পৌর কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য পরিকল্পনা গ্রহণ শুরু করে। ২০০৮ সালে উন্মুক্ত বর্জ্য ফেলার পুরোনো পদ্ধতি থেকে স্যানিটারি ল্যান্ডফিল ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়, যা ছিল একটি সীমিত হলেও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন।
২০১০ সালের জাতীয় ৩আর (Reduce, Reuse, Recycle) কৌশল বা কমানো, পুনর্ব্যবহার এবং পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণের নীতি এখন পর্যন্ত সবচেয়ে সুসংগঠিত নীতিগত উদ্যোগগুলোর একটি। সাম্প্রতিক সময়ে ২০২৪ সালে এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক বাংলাদেশ ইন্টিগ্রেটেড সলিড ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট ইমপ্রুভমেন্ট প্রকল্প অনুমোদন করেছে। এই প্রকল্পের লক্ষ্য হলো বর্জ্য সংগ্রহ, পরিবহন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, নিষ্পত্তি অবকাঠামো নির্মাণ এবং পুরোনো ডাম্পিং সাইট পুনর্বাসনের ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
২০১৮ সালে একটি দেশীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কার্যক্রম ডিজিটালাইজ ও সংগঠিত করার উদ্যোগ নেওয়ার মাধ্যমে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের নতুন অধ্যায় শুরু করে। তবে এসব অগ্রগতির পরও বাস্তব পরিস্থিতি এখনো নানা সমস্যায় জর্জরিত।
কেন কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ
কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব শুধু শহরের পরিচ্ছন্নতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশে উৎপন্ন পৌর কঠিন বর্জ্যের প্রায় ৭০ শতাংশই জৈব বর্জ্য। উন্মুক্ত স্থানে এসব বর্জ্য ফেলার ফলে মিথেন গ্যাস উৎপন্ন হয়, ভূগর্ভস্থ পানি দূষিত হয় এবং বায়ুর মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রায় ৮২ শতাংশ পরিবার কোনো ধরনের বর্জ্য পৃথকীকরণ ছাড়াই মিশ্র বর্জ্য ফেলে। ফলে পুনর্ব্যবহারযোগ্য ও ক্ষতিকর উপাদান একই সঙ্গে মাটির নিচে চাপা পড়ে অথবা রাস্তাঘাট ও নালায় ছড়িয়ে পড়ে।
বর্জ্য ফেলার স্থানগুলোর আশপাশের মানুষের মধ্যে ডায়রিয়া, হাঁপানি, ব্রঙ্কাইটিস এবং নিউমোনিয়ার মতো রোগের ঝুঁকি বেশি দেখা যায়। এর পাশাপাশি অর্থনৈতিক ক্ষতিও উল্লেখযোগ্য। অনানুষ্ঠানিক বর্জ্য সংগ্রহকারীরা ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করে পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপাদানের মাত্র ১৫ থেকে ২০ শতাংশ সংগ্রহ করতে সক্ষম হন।
প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকলেও এই খাত এখনো নিরাপত্তা মান, আনুষ্ঠানিক চুক্তি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য পৌর বাজেটের বরাদ্দ এখনো ১ শতাংশের নিচে। একই সঙ্গে ৭০ শতাংশের বেশি বর্জ্য সংগ্রহকারী যানবাহন পুরোনো ও অকার্যকর। দেশে বর্জ্য সংগ্রহের গড় সক্ষমতা মাত্র ৫৬ শতাংশ। অর্থাৎ শহরে উৎপন্ন প্রায় অর্ধেক বর্জ্য কোনো আনুষ্ঠানিক নিষ্পত্তি ব্যবস্থায় পৌঁছায় না। শুধু ঢাকাতেই ২০২৫ সালের মধ্যে দৈনিক বর্জ্য উৎপাদনের পরিমাণ ৪৭ হাজার ৬৬৫ টনে পৌঁছানোর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, যা বর্তমান ব্যবস্থাপনা সক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশি।
প্রয়োজনীয় সংস্কার
বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার হলো উৎস পর্যায়ে বর্জ্য পৃথকীকরণ বাধ্যতামূলক করা। জৈব, পুনর্ব্যবহারযোগ্য এবং ক্ষতিকর বর্জ্য আলাদা না করলে সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং নিষ্পত্তির প্রতিটি ধাপই বাধাগ্রস্ত হয়।
সিটি করপোরেশনগুলোকে আইনগত কাঠামোর মাধ্যমে বর্জ্য পৃথকীকরণ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি জনসচেতনতা কার্যক্রম এবং পরিবারভিত্তিক প্রণোদনা কর্মসূচি চালু করা জরুরি। দ্বিতীয়ত, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য আর্থিক বরাদ্দ বর্তমান ১ শতাংশের নিচের স্তর থেকে বাড়িয়ে পৌর বাজেটের অন্তত ৩ থেকে ৫ শতাংশে উন্নীত করা প্রয়োজন। আধুনিক বর্জ্য সংগ্রহ ব্যবস্থা, স্থানান্তর কেন্দ্র এবং প্রক্রিয়াজাতকরণ প্ল্যান্ট নির্মাণের জন্য পর্যাপ্ত বিনিয়োগ অপরিহার্য।
তৃতীয়ত, বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদন প্রযুক্তিকে পরীক্ষামূলক পর্যায় থেকে জাতীয় পর্যায়ে সম্প্রসারণ করতে হবে। গবেষণায় দেখা গেছে, ২০৫০ সালের মধ্যে ঢাকা ও চট্টগ্রামে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প বছরে ৭৫১ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিক্রি ও কার্বন ক্রেডিট থেকে আয় করতে পারে।
ইনসিনারেশন, পাইরোলাইসিস এবং গ্যাসিফিকেশন প্রযুক্তি কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। বাংলাদেশের বর্জ্যে জৈব উপাদানের পরিমাণ বেশি হওয়ায় অ্যানারোবিক ডাইজেশন এবং বায়োগ্যাস উৎপাদনের জন্যও এটি উপযোগী। ২০১১ সালে গাইবান্ধায় পরিচালিত সফল পাইলট প্রকল্প এর সম্ভাবনা দেখিয়েছে।
চতুর্থত, অনানুষ্ঠানিক বর্জ্য সংগ্রহকারীদের আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনা কাঠামোর অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তাদের জন্য নিরাপত্তা সরঞ্জাম, আইনগত স্বীকৃতি, ন্যায্য মজুরি এবং স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এর মাধ্যমে একটি ঝুঁকিপূর্ণ পেশাকে একটি সংগঠিত ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মক্ষেত্রে রূপান্তর করা সম্ভব।
পঞ্চমত, সুশাসন ও প্রশাসনিক সংস্কার অপরিহার্য। মন্ত্রণালয়, পৌরসভা এবং বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে দীর্ঘদিনের সমন্বয়হীনতার কারণে জবাবদিহিতা দুর্বল হয়েছে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার নীতি প্রণয়ন, বাস্তবায়ন ও পর্যবেক্ষণের জন্য স্পষ্ট ক্ষমতাসম্পন্ন একটি জাতীয় কর্তৃপক্ষ গঠন করা প্রয়োজন। ষষ্ঠত, কার্যকারিতা বৃদ্ধি ও ব্যয় কমাতে ইন্টারনেট অব থিংস (IoT) সেন্সর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক বর্জ্য পৃথকীকরণ প্রযুক্তি এবং স্মার্ট ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে।
সবশেষে, সরকারি বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি এবং ব্যবস্থাপনা দক্ষতা যুক্ত করতে হবে। বর্তমান বাস্তবতায় শুধু সরকারের পক্ষে এই খাতের প্রয়োজনীয় উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
বর্জ্য সংকট থেকে বর্জ্য অর্থনীতির সম্ভাবনা
বাংলাদেশের জনসংখ্যাগত শক্তি এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতি বর্জ্য সংকটকে একটি সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক খাতে রূপান্তরের সুযোগ তৈরি করেছে। প্রযুক্তি বিদ্যমান, নীতিগত কাঠামো তৈরি হয়েছে এবং আর্থিক সম্ভাবনার হিসাবও সামনে এসেছে।
এখন প্রয়োজন বিদ্যমান আইন কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন, পর্যাপ্ত অবকাঠামোতে বিনিয়োগ এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়। দীর্ঘদিনের বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ বাংলাদেশকে উন্মুক্ত বর্জ্য ফেলার চক্রে আটকে রেখেছে। নিষ্ক্রিয়তার মূল্য দিতে হচ্ছে রোগ, দূষণ এবং হারানো অর্থনৈতিক সম্ভাবনার মাধ্যমে। আর সংস্কারের মূল্য হলো বিনিয়োগ, সমন্বয় এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতি। এখন আর আংশিক উদ্যোগের সময় নেই। কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য সুসংগঠিত পদক্ষেপ গ্রহণের সময় এসেছে।
