আরিফ রেশাদ
ইউনিভার্সিটি অব এসেক্স, যুক্তরাজ্য
২০২৬ সালে জাতীয় সংসদের বিতর্কে বাংলাদেশের গ্যাস সংকট বারবার আলোচনায় এসেছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপস্থাপিত বিভিন্ন পরিসংখ্যান এবং তার বিপরীতে বিরোধী দলের প্রস্তাবগুলো তাই আরও গভীরভাবে, বিশেষ করে কারিগরি দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। এই লেখায় সংশ্লিষ্ট প্রস্তাব ও তথ্যের যথার্থতা নিয়ে একটি কারিগরি মূল্যায়ন তুলে ধরা হয়েছে।
সরকারের দেওয়া হিসাব
সরকারের বক্তব্য, বিশেষ করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রীর মাধ্যমে সংসদে উপস্থাপিত তথ্যগুলো নির্দিষ্ট এবং যাচাইযোগ্য। বর্তমানে দেশের আবিষ্কৃত ৩০টি গ্যাসক্ষেত্রের মধ্যে ২০টি থেকে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ৬৩০ মিলিয়ন ঘনফুট প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন হচ্ছে।
উৎপাদন বাড়াতে মন্ত্রণালয় ১৫০টি কূপ খনন ও সংস্কারের কর্মসূচি নিয়েছে। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের শুরু পর্যন্ত এর মধ্যে ৩০টি কূপের কাজ শেষ হয়েছে। এসব কূপ থেকে জাতীয় গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রতিদিন প্রায় ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যুক্ত হয়েছে। আরও সাতটি কূপের কাজ শেষ হলে প্রতিদিন অতিরিক্ত ৮৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়ার আশা করা হচ্ছে।
সমুদ্রাঞ্চলেও অনুসন্ধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০২৬ সালের মে মাসে ২৬টি ব্লক নিয়ে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৫টি গভীর সমুদ্রের এবং ১১টি অগভীর সমুদ্রের ব্লক। দরপত্র গ্রহণের সময়সীমা নভেম্বর পর্যন্ত।
আমদানির ক্ষেত্রে মহেশখালীতে চীনের সহায়তায় একটি ভাসমান গ্যাস টার্মিনাল স্থাপনের অনুমোদন দিয়েছে সরকার। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৮ সালের ডিসেম্বর থেকে টার্মিনালটি পুনরায় গ্যাসে রূপান্তরিত এলএনজি সরবরাহ শুরু করতে পারে। দুই বছরের মধ্যে এর মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট অতিরিক্ত আমদানি সক্ষমতা যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
রাজনৈতিকভাবে সরকার যে সময়সূচি দিয়েছে, তাতে ২০২৭ সালে সংকটের কিছুটা উপশম, ২০২৮ সালে আরও উন্নতি এবং ২০৩০ সালের মধ্যে সংকটের অবসানের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সরকারের হিসাব কতটা বাস্তবসম্মত?
শুধু প্রকৌশল ও পরিকল্পনার দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে সরকারের দেওয়া পরিসংখ্যানগুলোর মধ্যে বড় কোনো অসামঞ্জস্য দেখা যায় না। রাষ্ট্রীয় অনুসন্ধান সংস্থার কার্যক্রমসংক্রান্ত প্রতিবেদনেও এসব তথ্যের বেশির ভাগের ভিত্তি পাওয়া যায়। এই ধরনের দাবির ক্ষেত্রে সরকারি অনুসন্ধান সংস্থার তথ্যকে একটি গ্রহণযোগ্য বৈজ্ঞানিক ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা যায়।
তবে দুটি বিষয় বিশেষভাবে বিবেচনায় রাখা দরকার।
প্রথমত, ১৫০টি কূপ খনন ও সংস্কারের পরিকল্পনার বিপরীতে ২০৩১ সালের মধ্যে কাজ শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা উল্লেখ করার সময় পর্যন্ত মাত্র ৩০টি কূপের কাজ শেষ হয়েছিল। একই গতিতে কাজ চলতে থাকলে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে পুরো কর্মসূচি শেষ করা কঠিন হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, গভীর ও অগভীর সমুদ্রের ব্লকে গ্যাস অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে আবিষ্কারের পর উৎপাদন শুরু করতে সাধারণত কয়েক বছর সময় লাগে। ফলে ২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে নেওয়া উদ্যোগ আশাবাদী পরিস্থিতিতেও ২০৩০ সালের আগে সরবরাহ ঘাটতি পূরণে বড় ভূমিকা রাখতে পারবে, এমনটা ধরে নেওয়া কঠিন।
মহেশখালীর টার্মিনাল মূলত দেশীয় উৎপাদন বাড়াবে না, বরং আমদানির সক্ষমতা বাড়াবে। এর অর্থনৈতিক হিসাবও সাম্প্রতিক সংকটের মতো আন্তর্জাতিক বাজারের ধাক্কার ঝুঁকির বাইরে নয়। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে খোলা বাজারে এলএনজির দাম বেড়ে যাওয়ায় দেশের ওপর আনুমানিক ১৫ হাজার ৩৫০ কোটি টাকার অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ তৈরি হয়েছে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার তথ্য কী বলছে
স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থার তথ্য বিশ্লেষণ করলে পরিস্থিতির আরেকটি দিক সামনে আসে। জ্বালানি নিয়ন্ত্রক সংস্থার হিসাবে দেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ঘনফুট। বিপরীতে সরবরাহ ওঠানামা করছে ২ দশমিক ৭ থেকে ২ দশমিক ৯ বিলিয়ন ঘনফুটের মধ্যে।
অর্থাৎ প্রতিদিন প্রায় ১ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে। এই সরবরাহের হিসাবে এলএনজি আমদানিও অন্তর্ভুক্ত। ফলে শুধু দেশীয় উৎপাদনের পরিমাণের সঙ্গে তুলনা করলে ঘাটতির চিত্র আরও বড় মনে হতে পারে।
দুই ধরনের তথ্যের মধ্যে আসলে সরাসরি কোনো বিরোধ নেই। কারণ একদিকে রয়েছে ‘দেশীয় উৎপাদন’, অন্যদিকে রয়েছে ‘আমদানিসহ মোট সরবরাহ’। তবে সংসদে মন্ত্রণালয়ের বক্তব্যে দুই ধরনের হিসাবের পার্থক্য সব সময় স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয় না। ফলে সরাসরি ভুল তথ্যের চেয়ে বিভ্রান্তির সুযোগই বেশি তৈরি হচ্ছে।
বিরোধী দলের অবস্থান
প্রধান বিরোধী দলের সংসদীয় বক্তব্যে বিকল্প উৎপাদন পরিকল্পনা বা গ্যাসের মজুত নিয়ে নতুন কোনো হিসাবের চেয়ে প্রক্রিয়াগত প্রস্তাবই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।
এর মধ্যে সংকট মোকাবিলায় রাজনৈতিক দল ও কারিগরি বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব রয়েছে। পরে সরকার চাইলে নিজেদের কারিগরি বিশেষজ্ঞ দলকে কাজে লাগাতে পারবে বলেও বিরোধী দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। দলের নেতৃত্ব এমনও জানিয়েছে, সংকটের সমাধান হলে তার পুরো কৃতিত্ব সরকার নিলেও তাদের আপত্তি থাকবে না।
বিরোধী দলের সমালোচনার মূল জায়গা তাই ভূতাত্ত্বিক বা গ্যাস অনুসন্ধানের নির্দিষ্ট হিসাব নয়, বরং জবাবদিহি। তথাকথিত ভুয়া বিল বা ‘ঘোস্ট বিলিং’, মিটার ভাড়া পুরোপুরি তুলে দিলে আনুমানিক ২৯ হাজার কোটি টাকার ব্যয় এবং মিটার ও চাহিদা-ভিত্তিক চার্জ নিয়ে সংসদে দেওয়া আগের বিভিন্ন আশ্বাস পুরোপুরি বাস্তবায়িত না হওয়ার মতো বিষয়গুলো তারা সামনে এনেছে।
দুই অবস্থানের অসম তুলনা
ন্যায্য তুলনার ক্ষেত্রে এই পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। সরকার এমন একটি উৎপাদন ও আমদানি পরিকল্পনা দিয়েছে, যার বিভিন্ন অংশ অনিশ্চিত হলেও কূপ খননের অগ্রগতি এবং আন্তর্জাতিক দরপত্রের ফলাফলের মাধ্যমে যাচাই করা সম্ভব।
অন্যদিকে বিরোধী দল এখন পর্যন্ত বিকল্প কোনো গ্যাসের হিসাব, অনুসন্ধান পরিকল্পনা বা সময়সূচি প্রকাশ করেনি। ফলে দুই পক্ষের মধ্যে প্রকৃত অর্থে কারিগরি পূর্বাভাসের সংঘাত নেই। বরং একদিকে রয়েছে বাস্তবায়নভিত্তিক পরিকল্পনা, অন্যদিকে রয়েছে শাসন ও জবাবদিহির সমালোচনা।
বাস্তব পরিস্থিতিতে সরকারের স্বল্পমেয়াদি উদ্যোগ, বিশেষ করে কূপ সংস্কার ও খনন এবং সরবরাহ ব্যবস্থার অপচয় কমানোর পদক্ষেপ, নতুন সমুদ্রাঞ্চলীয় গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের তুলনায় কম ব্যয়বহুল এবং দ্রুত ফল দিতে পারে। ২০২৮ সালের আগেই সংকট কিছুটা কমাতে তাই এসব উদ্যোগই বেশি বাস্তবসম্মত পথ। বিরোধী দলের প্রস্তাবিত যৌথ সেল বা সমন্বিত উদ্যোগ সিদ্ধান্ত গ্রহণে সমন্বয় ও স্বচ্ছতা বাড়াতে পারে। তবে সেই উদ্যোগ নিজে থেকে জাতীয় গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় নতুন গ্যাস যুক্ত করবে না।
সামগ্রিক মূল্যায়ন
সব দিক বিবেচনায় সরকারের দেওয়া পরিসংখ্যানের মধ্যে বড় ধরনের অভ্যন্তরীণ অসামঞ্জস্য দেখা যায় না। তবে ২০৩০ সালের মধ্যে সংকট সমাধানের লক্ষ্য নির্ভর করছে কূপ খননের গতি এবং সমুদ্রাঞ্চলে গ্যাস অনুসন্ধানের সফলতার ওপর। সাম্প্রতিক অগ্রগতির ভিত্তিতে সেই অনুমান এখনো পুরোপুরি শক্ত ভিত্তি পায়নি।
অন্যদিকে বিরোধী দলের অবস্থানকে মন্ত্রণালয়ের পূর্বাভাসের সঙ্গে সরাসরি বৈজ্ঞানিক তুলনা করা সম্ভব নয়। কারণ তাদের অবস্থান মূলত তদারকি ও জবাবদিহিকেন্দ্রিক, তথ্যভিত্তিক উৎপাদন পরিকল্পনাকেন্দ্রিক নয়।
সংসদে গ্যাস সংকট নিয়ে চলমান বিতর্কের বড় দুর্বলতাও সম্ভবত এখানেই। সরকার যেখানে উৎপাদন ও আমদানির হিসাব দিয়ে সমাধানের পথ দেখাচ্ছে, বিরোধী দল সেখানে জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার প্রশ্ন তুলছে। কিন্তু সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য দুই দিককেই একসঙ্গে গুরুত্ব দিতে হবে, নির্ভুল তথ্য, বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা, কার্যকর বাস্তবায়ন এবং জবাবদিহি।
তথ্যসূত্র:
