নিশিতা শুক্লা
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়
বাংলাদেশের নিটওয়্যার খাত নিয়ে বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির সাম্প্রতিক এক জরিপে উদ্বেগজনক কিছু তথ্য উঠে এসেছে। জরিপে অংশ নেওয়া কারখানাগুলোর প্রায় ৫৫ শতাংশ জানিয়েছে, চলমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা তাদের অর্ডার বাতিল করেছে অথবা কমিয়ে দিয়েছে। একই জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৬০ শতাংশ কারখানাকে ক্রেতা ধরে রাখতে পণ্যের দাম কমাতে হয়েছে, ৭৮ শতাংশ কারখানায় উৎপাদন আংশিকভাবে বন্ধ ছিল, ৮৭ শতাংশ কারখানা পণ্য পাঠাতে দেরির মুখে পড়েছে এবং উল্লেখযোগ্য ৯২ শতাংশ কারখানাকে বিকল্প জ্বালানি সংগ্রহে অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হয়েছে।
প্রায় ১০টির মধ্যে ৬টি কারখানা এখন ব্যাংকঋণের কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে এবং প্রায় ৭ শতাংশ কারখানা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। সব তথ্য একসঙ্গে দেখলে বোঝা যায়, সংকটটি সাময়িক কোনো পরিচালনাগত সমস্যার চেয়ে অনেক গভীর। বরং এই পরিস্থিতি বিশ্বব্যাপী পোশাক সরবরাহ শৃঙ্খলে বাংলাদেশের অবস্থান ধরে রাখা এবং প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান নিশ্চিত করার কাঠামোগত দুর্বলতাকে সামনে নিয়ে এসেছে।
বিদেশি অর্ডারে প্রভাব
বাংলাদেশ থেকে পণ্য সংগ্রহকারী আন্তর্জাতিক খুচরা বিক্রেতারা ঋতুভিত্তিক ফ্যাশন চক্রের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অত্যন্ত নির্দিষ্ট সময়সূচি অনুযায়ী উৎপাদন পরিকল্পনা করে। ফলে নির্ধারিত সময়ে পণ্য পাঠাতে ব্যর্থ হওয়ার প্রভাব শুধু বিলম্বিত আয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। কোনো একটি মৌসুম পেরিয়ে গেলে পুরো চালানই বাণিজ্যিকভাবে মূল্যহীন হয়ে পড়তে পারে।
নির্ভরযোগ্যভাবে পণ্য সরবরাহ করতে না পারলে ক্রেতারা সাধারণত পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার অপেক্ষায় থাকে না। বরং তারা সরবরাহের উৎসে বৈচিত্র্য আনে এবং ভবিষ্যতের কিছু অর্ডার ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া বা ভারতের মতো বিকল্প উৎপাদন কেন্দ্রের দিকে সরিয়ে নেয়, যেখানে জ্বালানি সরবরাহ তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল।
জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় ৯০ শতাংশ কারখানা ক্রেতাদের আস্থা কমে যাওয়ার ঝুঁকির কথা জানিয়েছে। এই তথ্য সেই পরিবর্তনেরই ইঙ্গিত দেয়, যা ইতোমধ্যে শিল্পে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। একবার ক্রেতার আস্থা দুর্বল হয়ে গেলে মূল সংকটের সমাধান হওয়ার পরও আগের পরিমাণের অর্ডার ফিরে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ সাধারণ নিটওয়্যারের মতো পণ্যনির্ভর, মূল্য সংবেদনশীল শিল্পে ক্রেতাদের জন্য সরবরাহকারী পরিবর্তনের ব্যয় তুলনামূলকভাবে কম।
স্থানীয় শিল্পে প্রভাব
দেশের অভ্যন্তরে এই সংকট এমন একটি ব্যবসায়িক কাঠামোর ওপর আরও চাপ তৈরি করছে, যা আগে থেকেই খুব কম মুনাফার ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশের নিটওয়্যার খাত দীর্ঘদিন ধরে নকশায় নতুনত্ব বা পণ্যের স্বাতন্ত্র্যের চেয়ে মূলত কম খরচের ওপর ভিত্তি করে প্রতিযোগিতা করে আসছে। ফলে উৎপাদন সচল রাখতে যখন কারখানাগুলোকে ডিজেলচালিত জেনারেটর বা বিকল্প জ্বালানির জন্য বেশি দাম দিতে হচ্ছে, তখন তাদের সীমিত ব্যয়ের সুবিধাটিও আরও সংকুচিত হচ্ছে।
জরিপে পণ্যের বিক্রয়মূল্য কমানো, উৎপাদন উপকরণের ব্যয় বৃদ্ধি এবং শ্রমঘণ্টা নষ্ট হওয়ার যে সমন্বিত চিত্র পাওয়া গেছে, তা কারখানাগুলোর নগদ অর্থপ্রবাহের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। এমন সময়ে এই চাপ তৈরি হচ্ছে, যখন অর্ডার সময়মতো সরবরাহ করতে কারখানাগুলোর হাতে পর্যাপ্ত চলতি মূলধন থাকা সবচেয়ে জরুরি। ফলে জরুরি জ্বালানি ব্যয়ে কাঁচামাল কেনা বা শ্রমিকদের মজুরির জন্য বরাদ্দ চলতি মূলধন ব্যয় হয়ে যাচ্ছে। এ কারণেই জরিপে অংশ নেওয়া বড় একটি অংশের কারখানা এখন ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ার সম্ভাবনার মুখে পড়েছে।
প্রতিযোগিতা তত্ত্বের প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতকে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারের দৃষ্টিতে এক ধরনের একচেটিয়া প্রতিযোগিতামূলক বাজার কাঠামোর কাছাকাছি বলা যায়। তবে বৈশ্বিক পোশাক সরবরাহের বাজার সরবরাহকারী দেশগুলোর পর্যায়ে অনেকটা প্রতিযোগিতামূলক ও সহজে প্রবেশযোগ্য বাজারের মতো কাজ করে। ক্রেতারা তুলনামূলক সহজেই একই ধরনের মান ও প্রায় একই ধরনের পণ্য সরবরাহকারী বিভিন্ন উৎপাদন কেন্দ্রের মধ্যে অর্ডার পুনর্বণ্টন করতে পারেন।
এমন পরিস্থিতিতে সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা প্রতিযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু অনেক সময় অবমূল্যায়িত, উপাদান হয়ে ওঠে। একটি দেশ যদি কম শ্রম ব্যয়ের ওপর ভিত্তি করে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকে, কিন্তু ধারাবাহিক উৎপাদন নিশ্চিত করতে না পারে, তাহলে সেই সুবিধা দীর্ঘস্থায়ী করা কঠিন। কারণ সরবরাহে অনিশ্চয়তা থাকলে ক্রেতারা ওই দেশ থেকে পণ্য সংগ্রহের প্রকৃত ব্যয়কে বেশি বলে বিবেচনা করবেন, এমনকি প্রতি ইউনিট পণ্যের ঘোষিত দাম কম থাকলেও। এটি দেখায়, মূল্যের বাইরে থাকা বিভিন্ন উপাদান কীভাবে একটি বাজারের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান বদলে দিতে পারে, এমনকি সেই বাজারকে আপাতদৃষ্টিতে মূলত ব্যয়নির্ভর মনে হলেও।
প্রণোদনার অর্থনীতি
এই সংকট সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে প্রণোদনার অসামঞ্জস্যও স্পষ্ট করে তুলেছে। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহকারী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত সরবরাহ ব্যর্থতার কারণে রপ্তানি খাতে যে ক্ষতি হয়, তার সরাসরি আর্থিক প্রভাব বহন করে না। ফলে এমন এক ধরনের নৈতিক ঝুঁকি তৈরি হয়, যেখানে গুরুত্বপূর্ণ একটি উপকরণ নিয়ন্ত্রণকারী পক্ষ তার কার্যক্রমের ঘাটতির কারণে সৃষ্ট পরবর্তী পর্যায়ের ক্ষতির খুব সামান্য অংশ বহন করে।
অন্যদিকে কারখানা মালিকদের স্বল্পমেয়াদি প্রণোদনা হলো যত বেশি সম্ভব অর্ডার গ্রহণ করা এবং বাড়তি ব্যয় নিজেদের মধ্যে সামলে নেওয়া, যাতে কোনো ক্রেতাকে স্থায়ীভাবে হারাতে না হয়। এমনকি এই সিদ্ধান্তে তাদের নিজেদের আর্থিক সক্ষমতা ঝুঁকির মুখে পড়লেও তারা অর্ডার ধরে রাখার চেষ্টা করেন।
এর ফলে কারখানা মালিক ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার মধ্যে এক ধরনের প্রধান ও প্রতিনিধির সমস্যা তৈরি হয়। কারখানা মালিকরা সরাসরি ক্রেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখেন এবং সুনামের ঝুঁকি বহন করেন। অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার হাতে থাকে সেই জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহের নিয়ন্ত্রণ, যার ওপর নির্ভর করে ক্রেতাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবে পালন করা সম্ভব কি না।
এই দুই পক্ষের প্রণোদনার মধ্যে যথাযথ সমন্বয় না হলে কারখানা পর্যায়ে নির্ভরযোগ্য বিকল্প উৎপাদন সক্ষমতায় বিনিয়োগের আগ্রহও দুর্বল থাকবে। কারণ এই ধরনের বিনিয়োগ ব্যয়বহুল এবং এর সুফলের একটি অংশ সরাসরি ক্রেতারা পেলেও বিনিয়োগের পুরো সুফল কারখানা মালিক একা পান না।
এই পরিস্থিতির সমাধানে জ্বালানি সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতাকে শুধু অভ্যন্তরীণ পরিষেবা ব্যবস্থাপনার বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। এটিকে রপ্তানি প্রতিযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। কারণ বৈশ্বিক পোশাক সরবরাহের এমন একটি প্রতিযোগিতামূলক বাজারে প্রকৃত প্রতিযোগী পাশের কারখানাটি নয়, বরং অন্য সব দেশের নিরবচ্ছিন্নভাবে চলতে থাকা উৎপাদন ব্যবস্থা।
