ইফতেখার রহমান
ভারড্যান্ট গ্লোবাল
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও জটিল এক পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। এখন এই সম্পর্ককে আর কেবল প্রচলিত শুল্ক বিরোধ হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায় না। শুল্ক গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলেও, বর্তমান প্রতিযোগিতা বিস্তৃত হয়েছে প্রযুক্তি, শিল্প সক্ষমতা, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ, বিনিয়োগ যাচাই, ডিজিটাল ব্যবস্থা এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতে।
২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ আনুমানিক ৪১৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে।¹ এই সম্পর্কের ব্যাপকতা বিবেচনায় সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতা বাস্তবে অসম্ভব বলেই মনে হয়। ২০২৬ সালের মে মাসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেইজিং সফরের মাধ্যমে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পূর্বানুমানযোগ্যতা বাড়ানোর লক্ষ্যে কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এর মধ্যে ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ সংক্রান্ত বোর্ড গঠনের প্রস্তাব, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ নিয়ে প্রতিশ্রুতি, বোয়িংয়ের ২০০টি উড়োজাহাজের প্রাথমিক ক্রয় এবং ২০২৬ থেকে ২০২৮ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর অন্তত ১৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের মার্কিন কৃষিপণ্য চীনের ক্রয়ের প্রতিশ্রুতি।²
তবে এই বৈঠক গভীরতর কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার সমাধান করতে পারেনি। রয়টার্স এই সম্মেলনকে বৃহত্তর স্থিতিশীলতার দিকে ফিরে যাওয়ার একটি পদক্ষেপ হিসেবে মূল্যায়ন করেছে, তবে এটিকে কোনো বড় কৌশলগত অগ্রগতি হিসেবে দেখেনি। পরবর্তীতে চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ও ঘোষিত ব্যবস্থাগুলোকে প্রাথমিক পর্যায়ের বলে উল্লেখ করেছে।³ তাই বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে যথাযথ ব্যাখ্যা হলো, এটি একটি নিয়ন্ত্রিত প্রতিযোগিতা। নির্বাচিত কিছু ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে, তবে একই সঙ্গে উভয় দেশই কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ খাতে নিজেদের ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করবে। বাংলাদেশের জন্য এই পরিস্থিতি একই সঙ্গে সম্ভাবনা এবং ঝুঁকি তৈরি করছে।
বাংলাদেশের দ্বিমুখী নির্ভরতা
যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি বাজার। ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বাংলাদেশ থেকে পণ্য আমদানির পরিমাণ ৯ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে।⁴ তৈরি পোশাক খাত এখনো বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি চালিকাশক্তি, যা লাখ লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার পাশাপাশি উৎপাদক, সরবরাহকারী, ব্যাংক এবং লজিস্টিকস ব্যবস্থার একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্ককে সচল রাখে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির প্রায় ১৮ শতাংশ গেছে যুক্তরাষ্ট্রে, আর প্রায় ৪০ শতাংশ গেছে ইউরোপীয় ইউনিয়নে।⁵
অন্যদিকে চীন বাংলাদেশের জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ, তবে ভিন্ন একটি দিক থেকে। ২০২৬ সালের মার্চ মাসের বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, পণ্য বাণিজ্যের ক্ষেত্রে চীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার ছিল। ওই মাসে বাংলাদেশের মোট পণ্য বাণিজ্যের ১৮ দশমিক ৪৯ শতাংশের সঙ্গে চীন যুক্ত ছিল। এরপর ভারতের অবস্থান ৯ দশমিক ৫৫ শতাংশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ৮ দশমিক ৭০ শতাংশ।⁶ চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক দেশের শিল্প কাঠামোর গভীরে যুক্ত। বিশেষ করে কাপড়, যন্ত্রপাতি, মধ্যবর্তী কাঁচামাল এবং বিনিয়োগের ক্ষেত্রে চীনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই দ্বিমুখী নির্ভরতার কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিযোগিতাকে বাংলাদেশ কোনো দূরবর্তী ভূরাজনৈতিক ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করতে পারে না। এটি ইতোমধ্যেই বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও প্রতিযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন বাণিজ্য কাঠামো
২০২৬ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি (Agreement on Reciprocal Trade) নীতিগত পরিবেশে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে। এই চুক্তির আওতায় নির্দিষ্ট শর্ত পূরণকারী বাংলাদেশি পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্র অতিরিক্ত পারস্পরিক শুল্ক আরোপ করবে না। অন্য সব বাংলাদেশি পণ্যের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত শুল্ক সর্বোচ্চ ১৯ শতাংশের বেশি হবে না, যা যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যমান সর্বাধিক সুবিধাপ্রাপ্ত দেশ (Most Favoured Nation) শুল্কের পাশাপাশি কার্যকর হবে।⁷
হোয়াইট হাউসের যৌথ বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশ থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ পোশাক ও বস্ত্র রপ্তানির ক্ষেত্রে শূন্য পারস্পরিক শুল্ক সুবিধা পাওয়ার একটি ব্যবস্থা থাকবে, যদি বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা যুক্তরাষ্ট্র থেকে উৎপাদিত তুলা এবং কৃত্রিম তন্তুর বস্ত্র উপকরণ নির্দিষ্ট পরিমাণে আমদানি করে।⁸ এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ, তবে একে কোনো সর্বজনীন শুল্কমুক্ত সুবিধা হিসেবে দেখা উচিত নয়। বাণিজ্যিক সুবিধা নির্ভর করবে পণ্যের যোগ্যতা, উৎপত্তির নিয়ম, সরবরাহকারীর নথিপত্র, কাস্টমস ব্যবস্থার স্বচ্ছতা এবং বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার ওপর। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, দুই পক্ষ তাদের নিজ নিজ আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার বিষয়টি লিখিতভাবে নিশ্চিত করার পর ৬০ দিন অতিবাহিত হলে চুক্তিটি কার্যকর হবে, যদি না তারা অন্য কোনো তারিখ নির্ধারণ করে।⁹ তাই বাস্তবায়নের ধাপ ও সময়সূচি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই কাঠামো শুধু শুল্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর আওতায় ডিজিটাল বাণিজ্য, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, শ্রম ও পরিবেশগত মান, দুর্নীতিবিরোধী ব্যবস্থা, রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ এবং কৌশলগতভাবে সংবেদনশীল কিছু খাতের ব্যবস্থাপনাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।¹⁰ যদি বাংলাদেশ এমন কোনো অ-বাজারভিত্তিক দেশের সঙ্গে নতুন দ্বিপাক্ষিক মুক্ত বাণিজ্য বা অগ্রাধিকারমূলক অর্থনৈতিক চুক্তিতে যায়, যা যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের বিদ্যমান চুক্তির স্বার্থ ক্ষুণ্ন করে, তাহলে আলোচনার পর যুক্তরাষ্ট্র এই চুক্তি বাতিল করে প্রযোজ্য পারস্পরিক শুল্ক পুনরায় কার্যকর করতে পারে।¹¹
তবে এসব শর্ত বাংলাদেশের জন্য চীনের সঙ্গে গঠনমূলক বাণিজ্য, বিনিয়োগ বা উন্নয়ন সম্পর্ক বজায় রাখার পথে বাধা নয়। একইভাবে এর অর্থও এই নয় যে বাংলাদেশকে কোনো একটি বড় শক্তির পক্ষ বেছে নিতে হবে। এটি অবশ্যই দাবি করে যে বাংলাদেশের নীতি গ্রহণ ও বাস্তবায়নে আরও সুসংগঠিত, ভারসাম্যপূর্ণ এবং কৌশলগত সমন্বয় থাকতে হবে।
সুযোগ বাস্তব, তবে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে অর্জিত হবে না
বিশ্বব্যাপী ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো যখন তাদের উৎপাদন ব্যবস্থাকে আরও বৈচিত্র্যময় করার চেষ্টা করছে, তখন বাংলাদেশ অতিরিক্ত রপ্তানি আদেশ ও বিনিয়োগ আকর্ষণের একটি বাস্তব সুযোগের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তবে চীনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানোর বৈশ্বিক প্রবণতার অর্থ এই নয় যে নতুন ব্যবসা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাংলাদেশের দিকে চলে আসবে। আন্তর্জাতিক ক্রেতারা এখন শুধু উৎপাদন খরচ বিবেচনা করে না। তারা মূল্যায়ন করে পণ্যের দাম, সরবরাহের সময়, উৎপাদন সক্ষমতা, জ্বালানি সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা, কাস্টমস ব্যবস্থার দক্ষতা, শ্রম পরিবেশ, পরিবেশগত মান এবং সরবরাহ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা। তাই বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা শুধু কম মজুরির ওপর নির্ভর করলে চলবে না, বরং দক্ষ বাস্তবায়ন সক্ষমতার ওপরও নির্ভর করতে হবে।
বাংলাদেশ ইতোমধ্যে একটি শক্তিশালী শিল্পভিত্তি তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক অর্থায়ন সংস্থা (IFC) এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বাংলাদেশ ছিল বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ, চীনের পরেই। ওই বছর বৈশ্বিক তৈরি পোশাক বাজারে বাংলাদেশের অংশ ছিল ৭ দশমিক ৪ শতাংশ। এই খাতে চার মিলিয়নেরও বেশি মানুষ কর্মরত ছিল এবং ২০২৩ অর্থবছরে দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৫ শতাংশ এসেছে এই খাত থেকে।¹²
তবে বাংলাদেশকে কেবল কম খরচের বিকল্প উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করা উচিত নয়। প্রতিযোগিতার পরবর্তী পর্যায়ে টিকে থাকতে হলে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, আরও নির্ভরযোগ্য অবকাঠামো, উন্নত ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার এবং পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দিতে হবে। IFC উল্লেখ করেছে, কৃত্রিম তন্তুভিত্তিক পণ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সম্প্রসারণের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে তৈরি পোশাক খাতের প্রায় দুই তৃতীয়াংশ উৎপাদন এখনো তুলাভিত্তিক পোশাকে কেন্দ্রীভূত।¹³
সুতরাং কৌশলগত সুযোগ শুধু বাণিজ্য অন্য দেশে স্থানান্তরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত আরও স্থিতিশীল, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন এবং প্রযুক্তিগতভাবে সক্ষম একটি উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়া।
সম্ভাব্য চীন সফরের গুরুত্ব
এই সময়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীন সফরের জন্য আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ পেয়েছেন। সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সফর ২০২৬ সালের জুন মাসের শেষ সপ্তাহে অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।¹⁴ এই সম্ভাব্য সফরের আগে ২০২৬ সালের মে মাসে বাংলাদেশ ও চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। দুই দেশের যৌথ বিবৃতিতে বেল্ট অ্যান্ড রোড সহযোগিতা, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিল্প সহযোগিতা, ডিজিটাল অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা, রোহিঙ্গা সংকট এবং হরমুজ প্রণালির নৌ চলাচলের নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলো উঠে আসে। বাংলাদেশ তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে চীনের সম্পৃক্ততা ও সহায়তাও আনুষ্ঠানিকভাবে চেয়েছে।¹⁵
এই সফর অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্প বিনিয়োগ, বাণিজ্য ঘাটতি হ্রাস এবং বৃহত্তর অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে কতগুলো সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হলো তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো চুক্তিগুলোর বাস্তব মান। প্রতিটি অঙ্গীকারকে বাণিজ্যিক যৌক্তিকতা, আর্থিক সক্ষমতা এবং বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করতে হবে। ভারতের বিষয়টিও সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। তিস্তা সংশ্লিষ্ট বন্যা, নদীভাঙন এবং পানি ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশের স্বাভাবিকভাবেই স্বার্থ রয়েছে। একই সঙ্গে ভৌগোলিক অবস্থান, বাণিজ্য, ট্রানজিট, জ্বালানি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার কারণে ভারত গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। সবচেয়ে কার্যকর পথ হবে না সংঘাত কিংবা এড়িয়ে যাওয়া, বরং সংশ্লিষ্ট সব অংশীদারের সঙ্গে স্বচ্ছ ও বাস্তবভিত্তিক যোগাযোগ বজায় রাখা।
বৃহত্তর কৌশলগত প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশের নীতিগত সিদ্ধান্তগুলো শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে দেখা উচিত নয়। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় গন্তব্য এখনো ইউরোপীয় ইউনিয়ন। এছাড়া বাংলাদেশ ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর স্বল্পোন্নত দেশের (LDC) তালিকা থেকে উত্তরণের পর্যায়ে রয়েছে।¹⁶ এই উত্তরণ একটি গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন অর্জন হলেও, এটি সংস্কার কার্যক্রমকে আরও জরুরি করে তুলছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এমন একটি পরিবর্তনকালীন সুযোগ তৈরি করেছে, যার আওতায় বাংলাদেশ আরও তিন বছর, অর্থাৎ অন্তত ২০২৯ সালের শেষ পর্যন্ত, এভরিথিং বাট আর্মস (Everything But Arms) সুবিধা পেতে পারে এবং একই সঙ্গে জিএসপি প্লাস (GSP+) সুবিধার জন্য আবেদন করার সুযোগও থাকবে।¹⁷
এই সময়কে কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে হবে। এটি কোনো অনির্দিষ্ট নিরাপত্তা বলয় নয়। বাংলাদেশকে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে, শ্রম ও পরিবেশগত মান উন্নত করতে হবে, দেশের অভ্যন্তরীণ মূল্য সংযোজন বৃদ্ধি করতে হবে এবং আরও কঠোর উৎপত্তি নিয়মের জন্য রপ্তানিকারকদের প্রস্তুত করতে হবে।
শক্তিশালী বহুপাক্ষিক অবস্থান
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের বহুপাক্ষিক অবস্থানও আরও দৃশ্যমান হয়েছে। ২০২৬ সালের ২ জুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন।¹⁸ এই পদকে কোনো দ্বিপাক্ষিক আলোচনার ক্ষমতা হিসেবে দেখা উচিত নয়। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে তাকে নিরপেক্ষভাবে ১৯৩ সদস্যের এই সংস্থার কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। এই নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করেছে। এটি বাংলাদেশের জন্য উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশগুলোর একটি গঠনমূলক ও বিশ্বাসযোগ্য কণ্ঠস্বর হিসেবে নিজেদের তুলে ধরার সুযোগ তৈরি করেছে এবং একই সঙ্গে বিভক্ত হয়ে পড়া বৈশ্বিক ব্যবস্থায় বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করার সুযোগ দিচ্ছে।
জাতীয় স্বার্থভিত্তিক কৌশলের প্রয়োজন
বাংলাদেশের জন্য ওয়াশিংটন, বেইজিং বা নয়াদিল্লির সঙ্গে নিঃশর্তভাবে কোনো এক পক্ষের সঙ্গে অবস্থান নেওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং শক্তিশালী পথ হলো জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ কৌশল গ্রহণ করা। এই কৌশলের মাধ্যমে বাজার সুবিধা রক্ষা, উৎপাদনশীল বিনিয়োগ আকর্ষণ, নির্ভরতার বৈচিত্র্য তৈরি এবং সব গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারের সঙ্গে গঠনমূলক সম্পর্ক বজায় রাখা সম্ভব। বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার পুনর্গঠনে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে তারা, যারা শুধু কম মজুরি দিতে পারে এমন দেশ নয়, বরং যারা বাণিজ্যিক সক্ষমতার সঙ্গে নির্ভরযোগ্যতা, আন্তর্জাতিক মান, অবকাঠামো এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতা একত্র করতে পারে।
তথ্যসূত্র
- Office of the United States Trade Representative, ‘The People’s Republic of China’, accessed 13 June 2026.
- The White House, ‘Fact Sheet. President Donald J. Trump Secures Historic Deals with China, Delivering for American Workers, Farmers, and Industry’, 17 May 2026.
- Michael Martina, David Brunnstrom, David Lawder and Mei Mei Chu, ‘Trump Returns from China with Stability and a Stalemate’, Reuters, 16 May 2026; ‘China Says Trump Visit Deals Are “Preliminary”’, Reuters, 16 May 2026.
- Office of the United States Trade Representative, ‘Bangladesh’, accessed 13 June 2026.
- World Trade Organization, ‘Bangladesh. Working towards a Sustainable Export Future’, accessed 13 June 2026.
- Bangladesh Bureau of Statistics, Foreign Trade Statistics. March 2026, advance release (Dhaka: BBS, June 2026), p. vii.
- Office of the United States Trade Representative, Agreement between the United States of America and the People’s Republic of Bangladesh on Reciprocal Trade, signed 9 February 2026, Annex I, Schedule 2.
- The White House, ‘Joint Statement on United States-Bangladesh Agreement on Reciprocal Trade’, 9 February 2026.
- Office of the United States Trade Representative, Agreement between the United States of America and the People’s Republic of Bangladesh on Reciprocal Trade, signed 9 February 2026, art. 6.6.
- Ibid., arts 2.8-2.11, 3.1-3.4 and 4.1-4.3.
- Ibid., art. 4.3(4).
- International Finance Corporation, Bangladesh. Country Private Sector Diagnostic (Washington, DC: IFC, 2025), pp. 23-24.
- Ibid., pp. 23-24.
- Bangladesh Sangbad Sangstha, ‘Chinese Envoy Invites PM to Visit China’, 23 February 2026; Bangladesh Sangbad Sangstha, ‘Kayser Seeks Chinese Investment in Kunming-Chattogram Road Link’, 12 June 2026.
- Bangladesh Sangbad Sangstha, ‘Bangladesh Seeks China Support for Teesta Project’, 6 May 2026.
- United Nations, ‘Bangladesh Graduation Status’, LDC Portal, accessed 13 June 2026.
- European Commission, ‘Questions and Answers on the New EU Generalised Scheme of Preferences’, 28 April 2026.
- United Nations, ‘General Assembly Elects Khalilur Rahman of Bangladesh President of Eighty-First Session’, 2 June 2026; Bangladesh Sangbad Sangstha, ‘Khalilur Elected President of 81st UNGA Session’, 2 June 2026.
