হাসান হামিদ
সি ইউ ই টি
বাংলাদেশের সংবিধানে ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম। একই সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতাকেও রাষ্ট্রের চার মূলনীতির একটি হিসেবে রাখা হয়েছে। এই দ্বৈত অবস্থান নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক বিতর্ক আছে। কিন্তু সংবিধানের ভাষার বাইরে বাংলাদেশের দৈনন্দিন সামাজিক জীবন অনেক বেশি বৈচিত্র্যময়। বিভিন্ন ধর্মের মানুষ পাশাপাশি বসবাস করেন, একে অন্যের উৎসবে অংশ নেন এবং বহু ক্ষেত্রে ধর্মীয় পরিচয়ের সীমা পেরিয়ে সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তোলেন।
এই লেখায় সেই নীরব ধর্মনিরপেক্ষতার দিকটি দেখা হয়েছে, যা কোনো আইন বা রাষ্ট্রীয় ঘোষণার ওপর পুরোপুরি নির্ভর করে না। কোথায় ধর্মীয় সহাবস্থান বাস্তবে কাজ করছে, কোন পরিস্থিতিতে সেই সম্পর্ক ভেঙে পড়ছে এবং এই সামাজিক সম্প্রীতিকে আরও স্থায়ী করতে রাষ্ট্র ও সমাজ কী করতে পারে, সেই প্রশ্নগুলোই এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
সংবিধানের দ্বৈত অবস্থান
বাংলাদেশে ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম হলেও ধর্মনিরপেক্ষতা রাষ্ট্রের অন্যতম মূলনীতি। কাগজে এই দুই অবস্থানকে পরস্পরবিরোধী মনে হতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতা আরও জটিল। দেশের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মুসলমান। একই সঙ্গে বাংলাদেশে রয়েছে বিশ্বের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম বৃহৎ হিন্দু জনগোষ্ঠী। পার্বত্য চট্টগ্রামে রয়েছে উল্লেখযোগ্য বৌদ্ধ জনগোষ্ঠী। ঢাকা, ময়মনসিংহসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মানুষও বসবাস করেন।
তাই বাংলাদেশের ধর্মীয় বাস্তবতা বুঝতে শুধু সংবিধানের শব্দচয়ন যথেষ্ট নয়। মানুষের প্রতিদিনের আচরণ, সামাজিক সম্পর্ক এবং বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের পারস্পরিক যোগাযোগের দিকে তাকালেই দেশের বহুত্ববাদী চরিত্রটি বেশি স্পষ্ট হয়।
উৎসবের ভেতরেই সহাবস্থানের চিত্র
ধর্মীয় সম্প্রীতির সবচেয়ে দৃশ্যমান উদাহরণ পাওয়া যায় উৎসবের সময়। দুর্গাপূজা শুধু হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অনুষ্ঠান হয়ে থাকে না। প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন শহরে পূজামণ্ডপে মুসলিম দর্শনার্থীদেরও ভিড় দেখা যায়। অনেকে যান মণ্ডপের শিল্পকর্ম দেখতে, কেউ যান বন্ধু বা পরিচিতদের সঙ্গে। স্থানীয় প্রশাসনও বড় আয়োজনে নিরাপত্তা ও জনশৃঙ্খলার বিষয়টি নাগরিক জীবনের অংশ হিসেবেই দেখে।
খ্রিস্টান জনগোষ্ঠী সংখ্যায় ছোট হলেও বড়দিনের সময় শহরগুলোতে নানা আয়োজন ও আলোকসজ্জা দেখা যায়। জাতীয় ছুটির দিন হওয়ায় বিভিন্ন ধর্মের মানুষও এই দিনটিকে সামাজিকভাবে ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ পান।
ঈদ আবার আরও বড় পরিসরে মানুষকে একত্র করে। অনেক মুসলিম পরিবার তাদের অমুসলিম প্রতিবেশী ও বন্ধুদের খাবারে আমন্ত্রণ জানায়। অন্য ধর্মের উৎসবেও অনেকে শুভেচ্ছা জানাতে বা অংশ নিতে যান। এমন ছোট ছোট সামাজিক যোগাযোগই বছরের পর বছর ধরে পারস্পরিক আস্থার ভিত্তি তৈরি করে। ফলে ধর্মীয় উৎসবগুলো কেবল উপাসনা বা ধর্মীয় আচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বাংলাদেশের সামাজিক জীবনে এগুলো বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের দেখা হওয়া, সম্পর্ক তৈরি করা এবং পারস্পরিক সৌহার্দ্য প্রকাশের নিয়মিত উপলক্ষ হয়ে ওঠে।
সম্প্রীতি কোথায় ভেঙে পড়ে
তবে এই সামাজিক ভারসাম্যকে স্থায়ী বা স্বয়ংক্রিয় ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। ২০১২ সালের রামুর ঘটনা তার বড় উদাহরণ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোরআন অবমাননার একটি মিথ্যা অভিযোগ ছড়িয়ে পড়ার পর বৌদ্ধ মন্দির ও বসতবাড়িতে হামলা হয়। দীর্ঘদিনের সামাজিক সম্পর্ক ও আস্থা কত দ্রুত গুজবের চাপে ভেঙে পড়তে পারে, রামুর ঘটনা তা দেখিয়েছে।
২০২১ সালে কুমিল্লায় পূজামণ্ডপে কোরআন রাখার অভিযোগকে কেন্দ্র করে আবারও হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা ও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় এই ঘটনা আরও বড় উত্তেজনা তৈরি করে। এই ঘটনাগুলোকে শুধু সাধারণ মানুষের ধর্মীয় বিদ্বেষ দিয়ে ব্যাখ্যা করলে পুরো চিত্র পাওয়া যায় না। গুজব, জমি নিয়ে বিরোধ এবং ধর্মীয় পরিচয়কে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করার মতো বিষয়ও বিভিন্ন ঘটনায় সামনে এসেছে। ফলে বাংলাদেশের ধর্মীয় সম্প্রীতি বাস্তব হলেও তা ভঙ্গুর। সংগঠিত গুজব বা স্বার্থান্বেষী তৎপরতা সেই সম্পর্ককে দ্রুত আঘাত করতে পারে।
পার্বত্য চট্টগ্রামে চাপের ধরন আলাদা
ধর্মীয় সম্প্রীতি নিয়ে আলোচনায় পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জনগোষ্ঠীগুলোর বিষয়টি প্রায়ই আড়ালে থেকে যায়। চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরাসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মানুষের মধ্যে বৌদ্ধ, খ্রিস্টান এবং স্থানীয় আধ্যাত্মিক বিশ্বাসের চর্চা রয়েছে। এসব ঐতিহ্যের অনেকগুলোই এই অঞ্চলে ইসলাম বা প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মপ্রচারের আগের। তাদের সমস্যার ধরনও অন্যরকম। এখানে ধর্মীয় মতবিরোধের চেয়ে ভূমির অধিকার, বসতি স্থাপনের ফলে জনসংখ্যাগত চাপ এবং সাংস্কৃতিক ক্ষয় বড় উদ্বেগের বিষয়।
বাইরের বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠীর প্রচার, ইসলামী দাওয়াতি সংগঠন কিংবা খ্রিস্টান ধর্মপ্রচারক মিশন, কখনও কখনও স্থানীয় ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক চর্চার সঙ্গে টানাপোড়েন তৈরি করেছে। ফলে প্রশ্নটা শুধু ধর্মীয় সহিংসতার নয়। স্থানীয় ভাষা, সংস্কৃতি ও দীর্ঘদিনের আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য কতটা টিকে থাকবে, সেই প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এই জনগোষ্ঠীগুলোর সংকটের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নও জড়িত। মূলধারার বাইরে থাকা পরিচয়গুলোর সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক এখনও অনেক ক্ষেত্রে অসম্পূর্ণ।
সম্প্রীতি টিকিয়ে রাখার নীরব কাজ
ধর্মীয় সম্প্রীতি শুধু বড় রাজনৈতিক বক্তব্যের ওপর দাঁড়িয়ে নেই। স্থানীয় পর্যায়ের সামাজিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাও এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সংখ্যালঘু ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সরকারি সহায়তা, বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের মতো দুর্যোগে ধর্মীয় পরিচয় না দেখে যৌথভাবে ত্রাণ দেওয়া এবং বড় উৎসবের সময় স্থানীয় পর্যায়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানুষের মধ্যে আস্থা ধরে রাখতে সাহায্য করে।
নাগরিক সমাজ, আন্তধর্মীয় তরুণদের সংগঠন এবং স্থানীয় ধর্মীয় নেতারাও সংকটের সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। রামুর মতো ঘটনার পর স্থানীয় ইমাম ও পুরোহিতদের প্রকাশ্যে সহিংসতার বিরোধিতা করার ঘটনা উত্তেজনা কমাতে সহায়ক হয়েছে। সংকটের পর মানুষের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনতেও এই সামাজিক উদ্যোগগুলোর ভূমিকা রয়েছে।
সম্প্রীতি শক্ত করতে কী করা দরকার
এই নীরব সামাজিক সম্প্রীতিকে আরও স্থায়ী করতে হলে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের পাশাপাশি সামাজিক পরিবর্তনও প্রয়োজন। সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনায় দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। অপরাধের বিচার না হলে সহিংসতার পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি বাড়ে এবং ভুক্তভোগী সম্প্রদায়ের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়।
শিক্ষাব্যবস্থাতেও পরিবর্তনের সুযোগ রয়েছে। বাংলার ইতিহাস ও সংস্কৃতির বিকাশে বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের অবদান পাঠ্যক্রমে যথাযথভাবে তুলে ধরা গেলে তরুণদের মধ্যে দেশের বহুত্ববাদী ঐতিহ্য সম্পর্কে ধারণা আরও শক্ত হতে পারে। ধর্মীয় পরিচয়কে ঘিরে সন্দেহ বা ভুল ধারণা তৈরির সুযোগও কমবে। পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমির অধিকার ও সাংস্কৃতিক স্বীকৃতির বিষয়েও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। সমস্যার প্রকাশ্য লক্ষণ সামলানোর পাশাপাশি যে সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কারণগুলো দীর্ঘদিন ধরে তাদের চাপের মধ্যে রেখেছে, সেগুলো নিয়েও কাজ করতে হবে।
রাষ্ট্রধর্ম এবং ধর্মনিরপেক্ষতার সম্পর্ক নিয়েও জনপরিসরে আরও পরিষ্কার আলোচনা প্রয়োজন। রাষ্ট্রধর্মের সাংবিধানিক অবস্থান এবং সব নাগরিকের সমান অধিকার ও সমান আচরণের রাষ্ট্রীয় নীতি কীভাবে পাশাপাশি থাকতে পারে, সেই বিষয়টি স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা গেলে এ নিয়ে বিভ্রান্তি কমতে পারে।
যে সম্প্রীতি প্রতিদিন তৈরি হয়
বাংলাদেশের সাংবিধানিক কাঠামোর ভেতরে ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে বিতর্ক সহজে শেষ হওয়ার নয়। কিন্তু দেশের সামাজিক বাস্তবতায় বিভিন্ন ধর্মের মানুষের যে সহাবস্থান বহু বছর ধরে গড়ে উঠেছে, তার গুরুত্ব অস্বীকার করারও সুযোগ নেই।
এই সম্প্রীতি কোনো একক প্রতিষ্ঠান তৈরি করেনি। পরিবার, প্রতিবেশী, ধর্মীয় নেতা, স্থানীয় প্রশাসন, নাগরিক সংগঠন এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন আচরণ মিলেই তা তৈরি হয়েছে। তাই ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক বা স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভাজন যারা উসকে দিতে চায়, তাদের তৎপরতা ঠেকানোর পাশাপাশি এই সামাজিক সম্পর্কগুলোকে সুরক্ষা দেওয়াও জরুরি। আর পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো অঞ্চলে ধর্মীয় বহুত্ববাদের আলোচনা তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন সেখানকার আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি, ভূমির অধিকার ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যকেও জাতীয় আলোচনার যথাযথ অংশ করা হবে।
বাংলাদেশের ধর্মীয় সম্প্রীতি কেবল উৎসবের দিনের দৃশ্য নয়। প্রতিবেশীর বাড়িতে যাওয়া, একসঙ্গে খাবার ভাগ করে নেওয়া, বিপদের সময়ে পাশে দাঁড়ানো এবং অন্যের ধর্মীয় পরিচয়ের প্রতি সম্মান দেখানোর মতো প্রতিদিনের আচরণেই তার সবচেয়ে বাস্তব প্রকাশ। সেই নীরব সামাজিক শক্তিকে ধরে রাখাই সামনে বড় কাজ।
