ডেস্ক রিপোর্ট
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পদত্যাগের পরিপ্রেক্ষিতে ২০ আগস্ট ২০২৬ নির্ধারিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এক পরিচিত দৃশ্যেরই পুনরাবৃত্তি ঘটাচ্ছে। নির্বাচন কমিশন তফসিল ঘোষণা করেছে, মনোনয়ন জমা দেওয়ার সময়সীমা নির্ধারিত হয়েছে এবং জাতীয় সংসদ অধিবেশন কক্ষে ভোট অনুষ্ঠিত হবে। সবকিছুই সংবিধানসম্মত বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু মূল প্রশ্নটি অনুচ্চারিতই থেকে যাচ্ছে: আসলে এটি কি গণতান্ত্রিক কোনো নির্বাচন, নাকি সাংবিধানিক আবরণের ভেতরে সম্পন্ন হতে যাওয়া একটি আনুষ্ঠানিকতা?
সাংবিধানিক কাঠামো: বৈধ, কিন্তু কতটা যথেষ্ট?
সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন সংসদ সদস্যদের ভোটে, সাধারণ জনগণের সরাসরি ভোটে নয়। এই পরোক্ষ পদ্ধতি নিজে অস্বাভাবিক নয়। বেশ কয়েকটি সংসদীয় গণতন্ত্রে রাষ্ট্রের মূলত আনুষ্ঠানিক প্রধানকে একই ধরনের ব্যবস্থায় নির্বাচিত করা হয়।
বাংলাদেশে ১৯৯১ সালে রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার সময় এই বিধান গ্রহণ করা হয়। এর পেছনে যুক্তি ছিল, জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত সংসদই আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করবে।
সে সময় যুক্তিটির নিজস্ব সামঞ্জস্য ছিল। কিন্তু গভীরতর সমস্যাটি সংবিধানের বিধানে নয়, বরং গত তিন দশকের রাজনৈতিক চর্চায়। এমন একটি নির্বাচনী কাঠামো, যার ভিত্তি ছিল প্রতিযোগিতামূলক ও বহুদলীয় সংসদ, বাস্তবে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে কাজ করে যখন একটি দল দীর্ঘস্থায়ীভাবে সংসদে নিরঙ্কুশ বা প্রভাবশালী সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখে। ১৯৯১ সালে সংবিধান প্রণয়নকারীরা এমন পরিস্থিতির পূর্ণ মাত্রা হয়তো অনুমান করতে পারেননি।
প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীনতার ধারা: পছন্দহীনতার গণতন্ত্র
১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্রে ফিরে আসার পর বাংলাদেশে একাধিক রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। কেবল একবারই একাধিক প্রার্থী মনোনয়ন পেয়েছেন এবং সংসদে প্রকৃত ভোটের প্রয়োজন হয়েছে। অন্য সব ক্ষেত্রেই একই পরিণতি দেখা গেছে: ক্ষমতাসীন দলের মনোনীত প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। ভোট হয়নি, বিতর্ক হয়নি, এমনকি সংসদীয় মতামতের অর্থবহ প্রকাশও ঘটেনি।
সংবিধান যাকে নির্বাচন বলে, বাস্তবে তা অনেক ক্ষেত্রেই নিয়োগের রূপ নিয়েছে। জনগণের প্রতিনিধিরাই যখন কোনো পছন্দের সুযোগ পান না, তখন জনগণের সার্বভৌমত্ব থেকে রাষ্ট্রপতির বৈধতার দিকে যে গণতান্ত্রিক সংযোগ তৈরি হওয়ার কথা, সেটিই কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
আসন্ন নির্বাচনও পরিচিত সেই ধারার পুনরাবৃত্তি ঘটাতে পারে বলে মনে হচ্ছে। তবে একই সঙ্গে বর্তমান সময়কে স্পষ্ট রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার একটি পর্যায় হিসেবেও দেখা যায়। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনের পর ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ও তাদের মিত্ররা সংসদের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন ধরে রেখেছে। ফলে সরকার দৃঢ় জনসমর্থনের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও শাসন পরিচালনার শক্ত অবস্থানে রয়েছে।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট সংসদে উল্লেখযোগ্য সংখ্যালঘু উপস্থিতি নিয়ে রয়েছে, ফলে সংসদে বিরোধী মতের প্রতিনিধিত্বও অব্যাহত রয়েছে। এখন পর্যন্ত কোনো বিরোধী দল রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী দেওয়ার ঘোষণা দেয়নি। রাজনৈতিক ইতিহাসও বলছে, ক্ষমতাসীন জোটের প্রার্থী শেষ পর্যন্ত বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হতে পারেন।
তবে এখানেই একটি সুযোগ রয়েছে। ভবিষ্যতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন প্রক্রিয়াকে আরও প্রতিযোগিতামূলক ও অর্থবহ করে তুলতে পারলে বাংলাদেশের বহুত্ববাদী রাজনৈতিক বাস্তবতার আরও ভালো প্রতিফলন ঘটানো সম্ভব। দীর্ঘমেয়াদে এমন পরিবর্তন দেশের গণতান্ত্রিক পরিপক্বতাকেও আরও শক্তিশালী করতে পারে।
রাজনৈতিক পরিবেশ: বর্জনের মধ্য দিয়ে গঠিত সংসদ
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের গণতান্ত্রিক বৈধতা শুধু ভোট কীভাবে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, তার ওপর নির্ভর করে না। যে সংসদ রাষ্ট্রপতিকে নির্বাচিত করছে, সেই সংসদ নিজেই কতটা গণতান্ত্রিকভাবে গঠিত, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রায় ৫৯ শতাংশ ভোটার ভোট দিয়েছেন এবং নির্বাচনে একাধিক রাজনৈতিক দলের মধ্যে প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল। প্রায় দুই দশকের মধ্যে এই নির্বাচনকে সবচেয়ে প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনগুলোর একটি হিসেবে ব্যাপকভাবে বিবেচনা করা হয়েছে।
তবে এই নির্বাচনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতাও ছিল। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতার অবসান ঘটার আগে দলটি টানা ১৫ বছর বাংলাদেশ শাসন করেছে। কোনো বড় রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনী প্রক্রিয়া থেকে বাদ দেওয়া হলে, তার কারণ বা যুক্তি যাই হোক না কেন, সেই নির্বাচন থেকে গঠিত সংসদ দেশের রাজনৈতিক মতামতের পূর্ণ বৈচিত্র্যকে প্রতিনিধিত্ব করতে পারে না। আর যখন কোনো গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ধারার প্রতিনিধিত্ব সংসদে অনুপস্থিত থাকে, তখন সেই সংসদের সিদ্ধান্তও পূর্ণ গণতান্ত্রিক বৈধতা দাবি করতে পারে না। রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাচন তার মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত।
আনুষ্ঠানিকতা বনাম গণতান্ত্রিক চর্চা
আনুষ্ঠানিকতা এবং প্রকৃত গণতান্ত্রিক চর্চার মধ্যে পার্থক্য নির্ভর করে একটি প্রক্রিয়ায় সত্যিকারের আলোচনা ও পছন্দের সুযোগ রয়েছে কি না, তার ওপর। আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া নির্ধারিত নিয়ম মেনে চলে। মনোনয়ন জমা পড়ে, যাচাই হয় এবং ফল ঘোষণা করা হয়। কিন্তু গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য আরও কিছু প্রয়োজন। ফলাফল আগে থেকেই নির্ধারিত হতে পারে না, ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ থাকতে হবে, প্রার্থীদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকতে হবে এবং ভোটের ফল হতে হবে সম্মিলিত রাজনৈতিক বিবেচনার প্রতিফলন, পূর্বনির্ধারিত সিদ্ধান্তের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন নয়।
এই মানদণ্ডে বিচার করলে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনব্যবস্থা তার অস্তিত্বের প্রায় পুরো সময়জুড়েই মূলত একটি আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া হিসেবে পরিচালিত হয়েছে। সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে, কিন্তু গণতান্ত্রিক বিষয়বস্তু অনেকাংশেই অনুপস্থিত থেকেছে। রাষ্ট্রের প্রধানকে সংসদে প্রকৃত আলোচনা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্য দিয়ে নির্বাচিত করার পরিবর্তে ক্ষমতাসীন দলের নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত আগে থেকেই নির্ধারিত হয়েছে, আর সংসদ পরে সেই সিদ্ধান্তে আনুষ্ঠানিক সিলমোহর দিয়েছে।
গণতান্ত্রিক শুদ্ধতার জন্য যা প্রয়োজন
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে সত্যিকার অর্থে গণতান্ত্রিক করে তুলতে হলে কাঠামোগত পরিবর্তন প্রয়োজন। বিরোধী প্রার্থীদের অংশগ্রহণ বাধাগ্রস্ত করার রাজনৈতিক চর্চার অবসান ঘটাতে হবে। সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার সুযোগ ব্যবহার করে ক্ষমতাসীন দলকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ফল নিশ্চিত করার পথ থেকে সরে আসতে হবে। সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থী দেওয়ার সুযোগ ও রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যাতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কেবল সমর্থন ঘোষণায় সীমাবদ্ধ না থেকে প্রকৃত ভোটের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।
এর পাশাপাশি সংসদ নির্বাচনে সব বৈধ রাজনৈতিক শক্তির পূর্ণ অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করাও জরুরি। কারণ রাষ্ট্রপতির গণতান্ত্রিক বৈধতার ভিত্তি শেষ পর্যন্ত সেই সংসদ, যে সংসদ তাকে নির্বাচিত করে।সরাসরি জনগণের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সম্ভাবনা নিয়েও জাতীয় পর্যায়ে নতুন করে আলোচনা শুরু করার সময় এসেছে। বর্তমান পরোক্ষ নির্বাচনব্যবস্থা একটি ভিন্ন রাজনৈতিক সময়ের বাস্তবতা থেকে তৈরি হয়েছিল। তিন দশকের অভিজ্ঞতার আলোকে এখন সেই ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা ও কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে সাংবিধানিক পর্যালোচনা করা যেতে পারে।
রাষ্ট্রপতির পদ আনুষ্ঠানিক হলেও তাকে নির্বাচনের পদ্ধতি দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থারই একটি প্রতিচ্ছবি। আর বর্তমানে সেই প্রতিচ্ছবিতে গণতন্ত্রের চেয়ে আনুষ্ঠানিকতার ছাপই বেশি স্পষ্ট।
