নাঈমা অনামিকা
কমিশনিং সম্পাদক, অনিকেত বুলেটিন
বাংলাদেশে ইংলিশ মিডিয়াম শিক্ষা গত তিন দশকে দ্রুত সম্প্রসারিত হয়ে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা, বৈশ্বিক কর্মসংস্থান এবং উচ্চশিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করার ক্ষেত্রে এই শিক্ষাধারা উল্লেখযোগ্য অবদান রাখলেও এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে জাতীয় মানবসম্পদ উন্নয়ন, মেধাপাচার, ভাষা-সংস্কৃতির সংরক্ষণ এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দক্ষ জনশক্তির অংশগ্রহণ নিয়ে নানা প্রশ্ন।
মূলত এই প্রতিবেদনের উদ্দেশ্য হলো ইংলিশ মিডিয়াম শিক্ষাব্যবস্থার ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিকসমূহ বিশ্লেষণ করা, বাংলাদেশের শিক্ষা ও উন্নয়ন কাঠামোর ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব মূল্যায়ন করা এবং এমন কিছু নীতিগত সুপারিশ উপস্থাপন করা, যা আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা ও জাতীয় স্বার্থের মধ্যে একটি কার্যকর ভারসাম্য প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হতে পারে।
বাংলাদেশে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের সংখ্যা ও জনপ্রিয়তা ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। আন্তর্জাতিক কারিকুলাম, দক্ষ শিক্ষক, আধুনিক শিক্ষণপদ্ধতি এবং বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ এই শিক্ষাধারাকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় ও বৈশ্বিক চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হচ্ছে। তবে এই সাফল্যের পাশাপাশি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জও সামনে এসেছে। ইংলিশ মিডিয়াম শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও স্থায়ী কর্মসংস্থানের দিকে ঝুঁকে পড়ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের জন্য মেধাপাচারের ঝুঁকি সৃষ্টি করছে।
একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা ও সরকারি সেবায় তাদের অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে সীমিত। এছাড়া বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও জাতীয় ইতিহাস সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান না থাকলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সাংস্কৃতিক সংযোগ দুর্বল হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। অতএব, ইংলিশ মিডিয়াম শিক্ষা বাংলাদেশের জন্য সমস্যা নয়; বরং প্রয়োজন এমন একটি নীতিকাঠামো, যা আন্তর্জাতিক সক্ষমতা অর্জনের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের জাতীয় উন্নয়ন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের সঙ্গে আরও দৃঢ়ভাবে সম্পৃক্ত করবে।
ইংলিশ মিডিয়াম শিক্ষার দ্রুত বিস্তার
একসময় ইংলিশ মিডিয়াম শিক্ষা শুধুমাত্র ঢাকার কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় শহর ও জেলা পর্যায়েও এই শিক্ষাব্যবস্থা বিস্তৃত হয়েছে। মধ্যবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবারের মধ্যে আন্তর্জাতিক শিক্ষার প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি, বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ এবং বৈশ্বিক চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান অর্জনের আকাঙ্ক্ষা এই সম্প্রসারণের প্রধান কারণ।
আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা ও একাডেমিক সাফল্য
ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোর সবচেয়ে বড় শক্তি হলো আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন শিক্ষাক্রম। কেমব্রিজ ও এডএক্সেল কারিকুলামের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বিশ্লেষণধর্মী চিন্তা, গবেষণামূলক শিক্ষা, সমস্যা সমাধান এবং যোগাযোগ দক্ষতা অর্জন করে। ও-লেভেল ও এ-লেভেল পরীক্ষায় ধারাবাহিক সাফল্য, বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি এবং আন্তর্জাতিক বৃত্তি অর্জনের ক্ষেত্রে এসব শিক্ষার্থীর উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি এই শিক্ষাব্যবস্থার কার্যকারিতা প্রমাণ করে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ইংলিশ মিডিয়াম শিক্ষার্থীদের ভূমিকা
বেসরকারি খাতে বিশেষ করে বহুজাতিক কোম্পানি, ব্যাংকিং, তথ্যপ্রযুক্তি, টেলিযোগাযোগ, উন্নয়ন সংস্থা এবং রপ্তানিমুখী শিল্পে ইংলিশ মিডিয়াম শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ ক্রমেই বাড়ছে। আন্তর্জাতিক ব্যবসা পরিচালনা, বিদেশি অংশীদারের সঙ্গে যোগাযোগ এবং বৈশ্বিক মানসম্পন্ন কর্মপরিবেশে কাজ করার ক্ষেত্রে তাদের ভাষাগত দক্ষতা বিশেষ সুবিধা সৃষ্টি করে। এ কারণে বাংলাদেশের বেসরকারি অর্থনীতির আন্তর্জাতিকীকরণে এই শিক্ষাধারার অবদান ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
রাষ্ট্রীয় প্রশাসনে সীমিত অংশগ্রহণ
বাংলাদেশের সরকারি প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা এবং নীতিনির্ধারণী প্রতিষ্ঠানে ইংলিশ মিডিয়াম শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি এখনও তুলনামূলকভাবে কম। বাংলা ভাষাভিত্তিক প্রশাসনিক কাঠামো, সরকারি নিয়োগ পরীক্ষার ধরন এবং জাতীয় আইন ও প্রশাসনিক পরিভাষার সঙ্গে সীমিত পরিচিতি তাদের অংশগ্রহণকে প্রভাবিত করে। ফলে আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষিত একটি জনগোষ্ঠী দেশের গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে যথেষ্ট অবদান রাখতে পারছে না।
মেধাপাচার: ক্রমবর্ধমান জাতীয় উদ্বেগ
ইংলিশ মিডিয়াম শিক্ষার অন্যতম আলোচিত বিষয় হলো বিদেশমুখী প্রবণতা। অনেক শিক্ষার্থী বিদেশে উচ্চশিক্ষার পর সেখানেই স্থায়ীভাবে কর্মজীবন গড়ে তুলতে আগ্রহী। ফলে পরিবার ও সমাজের বিনিয়োগে গড়ে ওঠা উচ্চমানের মানবসম্পদের একটি অংশ দেশের উন্নয়নে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখার পরিবর্তে বিদেশি অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করছে। যদিও বৈশ্বিক অভিবাসন আধুনিক বিশ্বের একটি স্বাভাবিক বাস্তবতা, তবুও দীর্ঘমেয়াদে দক্ষ জনশক্তির এই বহির্গমন বাংলাদেশের জন্য নীতিগত উদ্বেগের বিষয়।
ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতীয় পরিচয়ের প্রশ্ন
বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের সঙ্গে বাংলা ভাষা অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। সমালোচকদের মতে, অনেক ইংলিশ মিডিয়াম প্রতিষ্ঠানে বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও ইতিহাসের চর্চা পর্যাপ্ত গুরুত্ব পায় না। এর ফলে কিছু শিক্ষার্থীর মধ্যে জাতীয় ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে অনেক শিক্ষা বিশেষজ্ঞের মতে, ইংরেজি শেখা এবং বাংলা সংস্কৃতিকে ধারণ করা, দুটিই একসঙ্গে সম্ভব। সেজন্য প্রয়োজন একটি শক্তিশালী দ্বিভাষিক শিক্ষানীতি।
সামাজিক বৈষম্য ও শিক্ষাগত বিভাজন
ইংলিশ মিডিয়াম শিক্ষা এখনও সমাজে উচ্চ মর্যাদার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। এর ফলে বাংলা মাধ্যম ও ইংলিশ মিডিয়াম শিক্ষার্থীদের মধ্যে সামাজিক ও মানসিক বিভাজন তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। অথচ শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত দক্ষ নাগরিক তৈরি করা; শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তিতে সামাজিক মর্যাদার বিভাজন তৈরি করা নয়।
নীতিগত ভাবে করণীয়
বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের স্বার্থে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বিবেচনা করা যেতে পারে-
- ইংলিশ মিডিয়াম শিক্ষাক্রমে বাংলা ভাষা, সাহিত্য, মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশের ইতিহাসের মানসম্মত শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা।
- সরকারি প্রশাসন ও নীতিনির্ধারণী প্রতিষ্ঠানে ইংলিশ মিডিয়াম শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের সুযোগ বৃদ্ধি করা।
- বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণকারী মেধাবীদের দেশে ফিরে কাজ করতে উৎসাহিত করার জন্য প্রণোদনা ও ক্যারিয়ার সুবিধা তৈরি করা।
- বাংলা মাধ্যম, ইংলিশ ভার্সন ও ইংলিশ মিডিয়াম শিক্ষার মধ্যে দক্ষতাভিত্তিক সমন্বয় গড়ে তোলা।
- জাতীয় শিক্ষানীতির সঙ্গে আন্তর্জাতিক কারিকুলামের আরও কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করা।
উপসংহার
বাংলাদেশে ইংলিশ মিডিয়াম শিক্ষা নিঃসন্দেহে আন্তর্জাতিক মানের মানবসম্পদ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তবে এই অর্জনের পূর্ণ সুফল তখনই পাওয়া সম্ভব হবে, যখন এই শিক্ষিত জনগোষ্ঠী দেশের প্রশাসন, গবেষণা, উদ্ভাবন, শিল্প ও জনসেবার সঙ্গে আরও সক্রিয়ভাবে যুক্ত হবে।
জাতীয় উন্নয়ন ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা, দুটি লক্ষ্যই সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই প্রয়োজন এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ শিক্ষানীতি, যেখানে ইংরেজি ভাষার দক্ষতা আন্তর্জাতিক সুযোগের দ্বার খুলে দেবে, আর বাংলা ভাষা, ইতিহাস ও সংস্কৃতির প্রতি দায়বদ্ধতা গড়ে তুলবে দায়িত্বশীল, দেশপ্রেমিক এবং বৈশ্বিক মানের নাগরিক।

Comment on “বাংলাদেশে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল: অর্জন, জনপ্রিয়তা ও জাতীয় বাস্তবতা”