সুমাইয়া হাসি
অনিকেত রিসার্চ গ্রুপ
বাংলাদেশের মানচিত্রে কুমিল্লা (তথা ঐতিহ্যবাহী কুমিল্লা) কেবল একটি অঞ্চল নয়, বরং এটি হাজার বছরের প্রাচীন শিল্প সংস্কৃতির এক জীবন্ত জাদুঘর। এই জনপদের সৃজনশীলতার গল্প যেমন জড়িয়ে আছে লালমাইয়ের খনিজ সমৃদ্ধ লাল মাটির সাথে, তেমনই তা মিশে আছে চান্দিনার তাঁতিদের খটখট শব্দের সুতোয়। মূলত মাটি, সুতা আর হাজার বছরের ঐতিহ্য, এই তিনের সমন্বয়েই গড়ে উঠেছে কুমিল্লার অনন্য কারুশিল্পের উত্তরাধিকার।
হাজার বছরের প্রাচীন মাটির শিল্প: টেরাকোটা থেকে বিজয়পুর
কুমিল্লার মাটির শিল্পের ইতিহাস আজ থেকে প্রায় এক হাজার বছর বা তারও বেশি সময় আগের। ময়নামতি পাহাড়ের প্রত্নতাত্ত্বিক খনন থেকে প্রাপ্ত সপ্তম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর বৌদ্ধ বিহারের পোড়ামাটির ফলক, মূর্তি এবং আলংকারিক প্লেটগুলো এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ। গবেষকদের মতে, সেই প্রাচীন আমলেও মৃৎশিল্প কেবল রান্নার পাত্র তৈরিতে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা ছিল একটি পরিশীলিত শিল্প মাধ্যম। সেখানে গ্রামীণ জীবন, প্রকৃতি এবং ধর্মীয় বিশ্বাসকে মাটির ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলা হতো অত্যন্ত নিপুণভাবে।
প্রাচীন ময়নামতির সেই ঐতিহ্যকে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বাঁচিয়ে রেখেছেন বিজয়পুর অঞ্চলের পাল সম্প্রদায়ের মৃৎশিল্পীরা। স্থানীয় খনিজ সমৃদ্ধ লাল মাটি দিয়ে তারা তৈরি করেন চমৎকার সব মাটির পাত্র, কলসি, আলংকারিক ফুলদানী ও খেলনা। ১৯৬১ সালে প্রখ্যাত সমাজসেবক ড. আখতার হামিদ খানের উদ্যোগে গঠিত ‘বিজয়পুর রুদ্রপাল মৃৎশিল্প সমবায় সমিতি’ এই শিল্পকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর তাণ্ডবে এখানকার কারখানা ধ্বংস হলেও, উদ্যমী কারিগররা দমে যাননি। আজ এই বিজয়পুরের তৈরি হাজারেরও বেশি ধরনের নান্দনিক মাটির তৈজসপত্র ও শোপিস ইউরোপ এবং জাপানের বাজারে রপ্তানি হচ্ছে, যা বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের প্রাচীন ঐতিহ্যকে তুলে ধরছে।
খাদি: স্বনির্ভরতা ও ফ্যাশনের সমাদৃত সুতা
মাটি যদি কুমিল্লার প্রাচীনতম সম্পদ হয়, তবে খাদি কাপড় হচ্ছে এই অঞ্চলের আত্মপরিচয়ের প্রতীক। মোগল আমলে শুরু হওয়া এই বয়নশিল্পের বিস্তৃতি কতটা ছিল, তার প্রমাণ মেলে ১৮৯০ সালের ‘ত্রিপুরা গেজেটিয়ার’-এ। সে সময় ময়নামতি ও চান্দিনাসহ আশেপাশের গ্রামে প্রায় ১৫ হাজার নারী-পুরুষ এই শিল্পের সাথে জড়িত ছিলেন। পরবর্তীতে ১৯২১ সালে মহাত্মা গান্ধীর চান্দিনা আগমন এই শিল্পে নতুন গতি আনে। সাধারণ তাঁতিরা চরকায় কাটা এই খাদি কাপড়কে কেবল জীবিকা নয়, বরং ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের স্বনির্ভরতার প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করেন। দেশভাগের পর যখন এই শিল্পটি প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছিল, তখন আবারও ত্রাতা হিসেবে এগিয়ে আসেন ড. আখতার হামিদ খান। তার প্রতিষ্ঠিত ‘খাদি ও কুটির শিল্প সমিতি’ এবং চান্দিনার শৈলেন গুহর (খাদিবাবু) মতো দূরদর্শী মানুষদের অক্লান্ত পরিশ্রমে খাদি শিল্প পুনরুজ্জীবিত হয়। গ্রাম থেকে সুতা সংগ্রহ করে তৈরি করা সেই খাদি একসময় কলকাতার বাজার পর্যন্ত পৌঁছে যায়। আধুনিক সময়ে বিবি রাসেলের মতো বিশ্বখ্যাত ডিজাইনার ও দেশের শীর্ষস্থানীয় উদ্যোক্তাদের ছোঁয়ায় খাদি তার গ্রামীণ সরলতার খোলস ছেড়ে আজ অভিজাত ফ্যাশনের অন্যতম অনুষঙ্গে পরিণত হয়েছে। তরুণ প্রজন্ম থেকে শুরু করে সব বয়সী মানুষের কাছেই কুমিল্লার খাদি এখন দারুণ জনপ্রিয়।
উপসংহার
ময়নামতির প্রাচীন টেরাকোটা, বিজয়পুরের মাটির পুতুল আর চান্দিনার খাদি কাপড়, আলাদা মনে হলেও এরা আসলে একই সুতোয় গাঁথা। এই তিনটি ধারা মিলেমিশে কুমিল্লাকে পরিণত করেছে বাংলাদেশের কারুশিল্পের অন্যতম এক প্রধান ও জীবন্ত ভাণ্ডারে। অতীত এবং বর্তমানের এই মেলবন্ধনই কুমিল্লার কারুশিল্পকে যুগ যুগ ধরে টিকিয়ে রেখেছে এবং সামনের দিনগুলোতেও এই ঐতিহ্য আমাদের সংস্কৃতির গৌরব হয়ে থাকবে।
