রুকসানা আখতার
ফ্রিল্যান্স আর্কিটেক্ট
বাংলাদেশের নগরাঞ্চল এমন এক গতিতে সম্প্রসারিত হচ্ছে, যা রাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থার সক্ষমতার ওপর ক্রমশ চাপ সৃষ্টি করছে। বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ শহর ঢাকা, পাশাপাশি চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনা ও রাজশাহী দ্রুত এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে অনিয়ন্ত্রিত ভৌত সম্প্রসারণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই প্রবৃদ্ধির ফলাফল হিসেবে অবকাঠামোর অবক্ষয়, জলাশয় দখল, আবাসিক এলাকায় জলাবদ্ধতা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বাস্তুচ্যুতি স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এসব মিলিয়ে এটি নগর শাসনব্যবস্থা ও ভূমি অধিকারের বাস্তবায়নে একটি কাঠামোগত ব্যর্থতার দিকেই ইঙ্গিত করে। এর প্রভাব নগর জীবনের স্থায়িত্বের ওপর সরাসরি এবং ক্রমবর্ধমান হুমকি সৃষ্টি করছে।
বিল্ডিং কোডের বাস্তবতা
বাংলাদেশে নিরাপদ নির্মাণের জন্য আইনগত কাঠামো বিদ্যমান। বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড, যা প্রথম ১৯৯৩ সালে প্রণয়ন করা হয় এবং পরে বিস্তৃতভাবে সংশোধন করে বাংলাদেশ জাতীয় বিল্ডিং কোড ২০২০ হিসেবে প্রকাশ করা হয়, সেখানে কাঠামোগত নকশা, অগ্নিনিরাপত্তা, ভূমিকম্প সহনশীলতা, সেটব্যাক নিয়ম এবং অনুমোদিত ফ্লোর এরিয়া রেশিওসহ বিভিন্ন মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে। ঢাকার প্রধান নিয়ন্ত্রক সংস্থা রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ রাজউক । চট্টগ্রামসহ অন্যান্য নগর এলাকায় সংশ্লিষ্ট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এসব বিধান বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছে।
তবে BNBC( বাংলাদেশ জাতীয় বিল্ডিং কোড)২০২০ গেজেট হওয়ার পাঁচ বছর পরও এর বাস্তব প্রয়োগ অত্যন্ত দুর্বল। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরে অসংখ্য ভবন ফ্লোর এরিয়া রেশিও, সেটব্যাক বিধি এবং কাঠামোগত মানদণ্ড লঙ্ঘন করে নির্মিত হয়েছে। এসব ভবনের একটি বড় অংশই অনুমোদন পেয়েছে দুর্নীতিগ্রস্ত একটি ব্যবস্থার মাধ্যমে। রাজউক এর পরিকল্পনা অনুমোদন প্রক্রিয়া নিয়ে বিভিন্ন গবেষণায় জমি ব্যবহার ছাড়পত্র ও বিল্ডিং পারমিশন প্রদানে পদ্ধতিগত অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এসব ক্ষেত্রে অনুমোদন প্রকৌশলগত মানের ভিত্তিতে নয়, বরং দরকষাকষির মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। ফলে নগর পরিবেশ এমন এক কাঠামোয় রূপ নেয় যেখানে ঘনত্ব অনুমোদিত সীমা ছাড়িয়ে যায়, অগ্নিনির্গমন পথ উপেক্ষিত থাকে এবং এমন জমিতে নির্মাণ হয় যার ব্যবহারিক অনুমোদনই আইনগতভাবে স্পষ্ট নয়।
২০১৩ সালের রানা প্লাজা ধস, যেখানে এক হাজারেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারান, বিল্ডিং কোড ব্যর্থতার সবচেয়ে ভয়াবহ উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে উল্লেখ্য, এই ভবনটি রাজউক নয়, সাভার পৌরসভার অধীনে ছিল। এই ঘটনার পর আন্তর্জাতিক নজরদারি বাড়লেও দেশের প্রধান শহরগুলোতে অনিয়মের সংস্কৃতি খুব বেশি পরিবর্তিত হয়নি। আজও হাজারো ভবনে একই ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি বিদ্যমান।
ভূমি অধিকার ও নগর সম্পত্তি শাসন
বাংলাদেশের নগর এলাকায় ভূমি অধিকারের পরিস্থিতি জটিল ও বিরোধপূর্ণ। ভুয়া রেজিস্ট্রেশন, বিতর্কিত মালিকানা এবং সরকারি ও ব্যক্তিগত জমি দখলের ঘটনা নিয়মিতভাবে দেখা যায়। সংবিধানের ৪২ অনুচ্ছেদে সম্পত্তির অধিকারের কথা বলা হলেও বাস্তবে এটি বহু ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিকভাবে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর কার্যকলাপে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এসব গোষ্ঠী ঘুষ, প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার অপব্যবহার এবং শারীরিক চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে জমির জোরপূর্বক হস্তান্তর ঘটায়। ফলে নগর ভূমি দখলের এই প্রক্রিয়াকে কেবল “অনানুষ্ঠানিক” বলা যায় না। এটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ কাঠামোর সঙ্গেই যুক্ত হয়ে পড়েছে, যা একে অপসারণ করা কঠিন করে তুলেছে। ঢাকা ও অন্যান্য শহরের প্রান্তিক এলাকায় সরকারি খাস জমি, জলাভূমি এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণ অঞ্চল ব্যাপকভাবে দখল হয়ে গেছে। এসব এলাকায় গড়ে ওঠা নির্মাণ প্রকল্পগুলো আশপাশের এলাকাগুলোর জলাবদ্ধতা আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
অন্যদিকে নদী, রেলওয়ে জমি এবং বাঁধ এলাকায় গড়ে ওঠা বস্তি অঞ্চলে লক্ষ লক্ষ নগর দরিদ্র মানুষ বসবাস করে। তাদের বসবাসের অধিকার আইনগতভাবে অত্যন্ত অনিরাপদ, ফলে যেকোনো সময় উচ্ছেদের ঝুঁকিতে তারা থাকে। এছাড়া ভূমি রেকর্ড ব্যবস্থা এখনো অনেক জায়গায় কাগজনির্ভর। ডিজিটালাইজেশনের উদ্যোগ থাকলেও বহু ক্ষেত্রে একই জমির জন্য একাধিক রেকর্ড, জাল দলিল এবং বিরোধপূর্ণ দাবি দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান থাকে। বিচারব্যবস্থার জটিলতা ও দুর্নীতির কারণে এসব সমস্যা বছরের পর বছর অমীমাংসিত থেকে যায়।
টেকসই নগর জীবনের জন্য নীতিগত সংস্কার
এই বহুমাত্রিক সংকট মোকাবিলায় সমন্বিত, একে অপরের সঙ্গে যুক্ত এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত সংস্কার প্রয়োজন।
প্রথমত, ভূমি রেকর্ডের পূর্ণাঙ্গ ডিজিটালাইজেশন জরুরি। জরিপ মানচিত্র, নামজারি এবং রেজিস্ট্রেশন তথ্য একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল ডাটাবেসে আনা এবং জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা উচিত। এতে মধ্যস্বত্বভোগী নির্ভরতা কমবে এবং নাগরিকরা সহজেই মালিকানা যাচাই করতে পারবেন।
একই সঙ্গে বিদ্যমান ভুয়া দলিল চিহ্নিত ও সংশোধনের জন্য পৃথক ভূমি ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে হবে, যেগুলো নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে মামলা নিষ্পত্তি করবে।
দ্বিতীয়ত, ভবন অনুমোদন ও পরিদর্শন প্রক্রিয়াকে রাজউক বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের একক নিয়ন্ত্রণ থেকে বের করে একটি স্বাধীন পরিদর্শন কাঠামোর অধীনে আনতে হবে। এই ব্যবস্থায় পেশাদার প্রকৌশলীরা একটি আইনগত সংস্থার অধীনে সার্টিফিকেশন দেবেন এবং র্যান্ডম অডিট ও আইনগত দায়বদ্ধতার আওতায় থাকবেন।
তৃতীয়ত, সব বড় নগর এলাকায় কঠোর এবং স্বচ্ছ জোনিং বাস্তবায়ন অপরিহার্য। স্যাটেলাইট ও ড্রোনভিত্তিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার মাধ্যমে নির্মাণ কাজ শুরু থেকেই নজরদারিতে রাখতে হবে, যাতে অবৈধ নির্মাণ সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই শনাক্ত করা যায়।
নিয়মবহির্ভূত স্থাপনা রাজনৈতিক প্রভাব ছাড়াই নিয়মিতভাবে ভেঙে ফেলতে হবে। তবে একই সঙ্গে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন ব্যবস্থা থাকতে হবে, যেখানে প্রয়োজন।
চতুর্থত, নগর বস্তিবাসীদের জন্য নিরাপদ বসবাসের অধিকার নিশ্চিত করতে ধাপে ধাপে টাইটেল প্রদান বা ইনক্রিমেন্টাল টাইটলিং ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। এতে দীর্ঘমেয়াদি বসবাসকে স্বীকৃতি দেওয়া হবে, তবে তাৎক্ষণিক পূর্ণ মালিকানা না দিয়েও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
এতে করে মানুষ নিজেদের বাসস্থানে বিনিয়োগ করতে উৎসাহিত হবে এবং বারবার উচ্ছেদের ঝুঁকি থেকে মুক্ত থাকবে। বাংলাদেশে টেকসই নগর জীবন শুরু হয় তখনই, যখন নাগরিক নিশ্চিতভাবে জানে যে তার ঘরের নিচের জমিটিই তার দাঁড়ানোর জায়গা।
