ডা. শারমীন ভূঁইয়া
সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়
প্রচলিত প্রবাদ বলে, স্বাস্থ্যই সম্পদ। অর্থাৎ একজন মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার সুস্থতা। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতা যেন উল্টো কথা বলে। এখানে সুস্বাস্থ্যের জন্য সম্পদ অনেক সময় পূর্বশর্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থের অভাবে মানুষকে অপর্যাপ্ত চিকিৎসা, রোগ নির্ণয়ে বিলম্ব এবং এড়ানো সম্ভব এমন দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে যেতে হয়।
প্রশ্নটি শুধু কথার কথা নয়। দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার বাস্তব চিত্রের সঙ্গে এর গভীর সম্পর্ক রয়েছে। চিকিৎসার মান অনেকাংশে নির্ভর করে রোগীর আর্থিক সক্ষমতার ওপর। অবহেলায় সরকারি স্বাস্থ্যসেবা দুর্বল হয়ে পড়ছে, আর স্বাস্থ্যবিমার সীমিত সুযোগের কারণে একটি বড় চিকিৎসা ব্যয়ই অনেক পরিবারকে আর্থিক সংকটের মুখে ঠেলে দিতে পারে। এই বাস্তবতা নিয়ে আরও গভীর ও কার্যকর আলোচনা প্রয়োজন।
মাথাপিছু আয়ের সঙ্গে বেসরকারি চিকিৎসার ব্যয়ের হিসাব
বাংলাদেশে মাথাপিছু আয় প্রায় ৩ হাজার ২০ মার্কিন ডলার। এই হিসাব দেশকে নিম্নমধ্যম আয়ের পর্যায়ে রাখলেও এর ভেতরে থাকা বিশাল আয় বৈষম্যকে পুরোপুরি তুলে ধরে না। এই আয়ের তুলনায় ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে খরচ হতে পারে ১ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকা। রক্ত পরীক্ষা, বিভিন্ন ধরনের স্ক্যান ও রোগ নির্ণয়ের অন্যান্য পরীক্ষা মিলিয়ে সাধারণ একটি পরীক্ষা নিরীক্ষার খরচ ১০ হাজার টাকার বেশি হতে পারে।
আর বেসরকারি হাসপাতালে একটি সাধারণ অস্ত্রোপচারের ব্যয় সহজেই ১ লাখ টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। মধ্যম আয়ের একটি পরিবারের জন্য গুরুতর কোনো অসুস্থতা মানে কয়েক মাসের পুরো আয় চিকিৎসার পেছনে ব্যয় হয়ে যাওয়া। বাংলাদেশে মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় ৭৪ শতাংশই মানুষকে নিজ পকেট থেকে বহন করতে হয়।
বিশ্বের অন্যতম উচ্চ এই হার স্বাস্থ্যব্যয়ের ক্ষেত্রে বড় ধরনের আর্থিক ঝুঁকি তৈরি করে। প্রতি ১০০ টাকা স্বাস্থ্যসেবায় ব্যয়ের মধ্যে ৭৪ টাকা আসে সরাসরি নাগরিকের পকেট থেকে। বিপরীতে রুয়ান্ডায় এই হার প্রায় ১২ শতাংশ এবং কার্যকর আগাম অর্থায়ন ব্যবস্থা থাকা দেশগুলোতে তা প্রায় ৩৬ শতাংশ।এটি কোনো টেকসই অর্থায়ন ব্যবস্থা নয়। বরং এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে অসুস্থ হওয়ার আর্থিক মূল্যও রোগীকেই দিতে হয়।
স্বাস্থ্য নির্ধারণে আয় বৈষম্যের প্রভাব
বাংলাদেশের সর্বনিম্ন আয়ের এক-পঞ্চমাংশ মানুষ সর্বোচ্চ আয়ের এক-পঞ্চমাংশ মানুষের তুলনায় প্রায় ০.২২ গুণ স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করে। গত এক দশকে গিনি সহগের হিসাবে আয় বৈষম্যও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
এই বৈষম্যের প্রতিফলন স্বাস্থ্যসেবাতেও স্পষ্ট। উচ্চ আয়ের মানুষ বিশেষায়িত চিকিৎসক, উন্নত রোগ নির্ণয় প্রযুক্তি এবং আধুনিক অস্ত্রোপচার সুবিধাসম্পন্ন বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে পারেন। অন্যদিকে দরিদ্র মানুষকে ভিড়ে ঠাসা সরকারি হাসপাতালে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। সেখানে চিকিৎসকদের ওপর অতিরিক্ত চাপ, প্রয়োজনীয় সামগ্রীর অনিয়মিত সরবরাহ এবং প্রায়ই অচল রোগ নির্ণয় যন্ত্রের সংকট দেখা যায়।
দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক ও নার্সের দীর্ঘস্থায়ী সংকট রয়েছে। অনেক জায়গায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পদ বছরের পর বছর শূন্য পড়ে থাকে। ফলে স্বাস্থ্যব্যবস্থা শুধু অসম চিকিৎসা দিচ্ছে না, বরং একই দেশের মানুষের জন্য দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন চিকিৎসাবাস্তবতা তৈরি করছে। সেই দুই বাস্তবতার মাঝখানে পার্থক্য গড়ে দিচ্ছে মূলত মানুষের আর্থিক সামর্থ্য।
সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবার মানের বড় ব্যবধান
বিশ্বের বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবার মান সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ৮৮তম। এই অবস্থান এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থার চিত্র তুলে ধরে, যেখানে চিকিৎসকের অনুপস্থিতি, সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সেবার প্রতি মানুষের নেতিবাচক ধারণা এবং ব্যাপক অনাস্থা রয়েছে।
বেসরকারি হাসপাতালগুলো সাধারণত তুলনামূলক দ্রুত সাড়া দেয় এবং আধুনিক যন্ত্রপাতির দিক থেকেও এগিয়ে। তবে এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারি অনেক ক্ষেত্রেই সীমিত এবং মুনাফাকেন্দ্রিক প্রবণতাও স্পষ্ট।
বাংলাদেশের বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবার বাণিজ্যিকীকরণের সঙ্গে কমিশনভিত্তিক রোগী পাঠানোর ব্যবস্থা, অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা এবং অতিরিক্ত বিল করার অভিযোগও জড়িত। চিকিৎসক ও রোগীর মধ্যে তথ্যের অসমতার সুযোগ নিয়ে এসব অনিয়ম ঘটতে পারে।
ধরা যাক, বুকে ব্যথা নিয়ে একজন রোগী বেসরকারি হাসপাতালে গেলেন। তার ক্ষেত্রে একাধিক পরীক্ষা করা হতে পারে, যার কিছু চিকিৎসাগতভাবে অপরিহার্য নাও হতে পারে। কারণ প্রতিটি পরীক্ষার মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠানের আয় বাড়ে।
সমস্যাটি কেবল ব্যক্তিগত অনিয়মের নয়, বরং কাঠামোগত। স্বাস্থ্যসেবা যখন জনকল্যাণের পরিবর্তে আয়ের অন্যতম উৎস হয়ে ওঠে, তখন রোগী একজন মানুষ হিসেবে নয়, সম্ভাব্য আয়ের উৎস হিসেবে বিবেচিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েন।
স্বাস্থ্যবিমার বড় শূন্যতা
স্বাস্থ্যবিমার প্রায় অনুপস্থিতি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার অন্যান্য সংকটকে আরও গভীর করছে। বাংলাদেশে এখনো সার্বজনীন জাতীয় স্বাস্থ্যবিমা ব্যবস্থা নেই। বেসরকারি স্বাস্থ্যবিমার সুযোগও সীমিত ও বিচ্ছিন্ন এবং জনসংখ্যার খুব সামান্য অংশ এর আওতায় রয়েছে।
ফলে কোনো পরিবারে হঠাৎ বড় ধরনের চিকিৎসা ব্যয় দেখা দিলে সঞ্চয় ভাঙা, সম্পদ বিক্রি করা অথবা ঋণ নেওয়াই হয়ে ওঠে প্রধান ভরসা। এসব উপায়ও যখন শেষ হয়ে যায়, তখন অনেক পরিবার চিকিৎসা নেওয়াই বন্ধ করে দেয়।
পরিবারের মোট ভোগব্যয়ের ১০ শতাংশের বেশি চিকিৎসার পেছনে নিজস্ব অর্থ থেকে ব্যয় হলে তাকে বিপর্যয়কর স্বাস্থ্যব্যয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। প্রতি বছর এমন চিকিৎসা ব্যয় লাখ লাখ মানুষকে দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দেয়। বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন বিশ্লেষণেও দেখা গেছে, নিজ পকেট থেকে চিকিৎসা ব্যয় করার কারণে আগে থেকেই ঝুঁকিতে থাকা অনেক পরিবার আরও দরিদ্র হয়ে পড়ে। আগাম অর্থ প্রদান ও ঝুঁকি ভাগাভাগির কার্যকর ব্যবস্থা ছাড়া কোনো দেশই সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে পারেনি। বাংলাদেশও এখনো এই কাঠামো গড়ে তোলার ক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে।
আঞ্চলিক চিকিৎসা ভ্রমণ ও সম্পদের প্রভাব
বাংলাদেশে সম্পদ ও স্বাস্থ্যের সম্পর্কের সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ সম্ভবত দেশের সচ্ছল মানুষের বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়া। ধারণা করা হয়, প্রতিবছর প্রায় ১ লাখ থেকে দেড় লাখ বাংলাদেশি চিকিৎসার জন্য বিদেশে যান। কলকাতা, চেন্নাই, ব্যাংকক ও সিঙ্গাপুরের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসার পেছনে তারা বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করেন।
ব্যাংককের কোনো হাসপাতালে হৃদযন্ত্রের অস্ত্রোপচারের খরচ ঢাকার তুলনায় অনেক বেশি হতে পারে। তবু উন্নত চিকিৎসার মান, পরিচ্ছন্নতা ও অস্ত্রোপচারের পরবর্তী সেবার ওপর আস্থার কারণে সামর্থ্যবান মানুষ অতিরিক্ত খরচ করতেও প্রস্তুত থাকেন।
চেন্নাইয়ের অ্যাপোলো ও ফোর্টিস হাসপাতাল, ব্যাংককের বামরুনগ্রাদ এবং সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশি রোগীদের কাছ থেকে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক রোগী পাচ্ছে।
এই অর্থের বহিঃপ্রবাহ দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার মান নিয়ে একটি কঠিন প্রশ্ন সামনে আনে। একটি দেশের সচ্ছল মানুষ যদি নিজেদের দেশের হাসপাতালের ওপর আস্থা রাখতে না পারেন, তাহলে সমস্যাটি শুধু দরিদ্র মানুষের চিকিৎসা পাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। প্রশ্ন ওঠে পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থার মান ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েই।
জনস্বাস্থ্যই হতে পারে একমাত্র কার্যকর সমাধান
বাংলাদেশে স্বাস্থ্য ও সম্পদের এই উল্টো সম্পর্ক বদলাতে হলে অন্তত দুটি কাঠামোগত পরিবর্তন জরুরি।
প্রথমত, পর্যাপ্ত বিনিয়োগের মাধ্যমে সরকারি স্বাস্থ্যসেবাকে শক্তিশালী করতে হবে। বর্তমানে সরকার স্বাস্থ্য খাতে মোট দেশজ উৎপাদনের ১ শতাংশেরও কম ব্যয় করে। স্বল্পোন্নত দেশগুলোর মধ্যে এই হার অন্যতম সর্বনিম্ন এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ করা ৫ শতাংশের তুলনায় অনেক কম।
আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে স্বাস্থ্য খাতে সরকারি ব্যয় অন্তত ৩ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নেওয়া যেতে পারে। এই অর্থ জেলা হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়ানো, আধুনিক রোগ নির্ণয় সরঞ্জাম স্থাপন, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিয়োগ এবং প্রয়োজনীয় ওষুধের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে ব্যয় করা প্রয়োজন।
দ্বিতীয়ত, মুনাফাকেন্দ্রিক বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবার ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ও বাধ্যতামূলক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এর মধ্যে মানসম্মত ও স্বচ্ছ মূল্য নির্ধারণ, কমিশনভিত্তিক রোগী পাঠানোর ব্যবস্থা নিষিদ্ধ করা, রোগ নির্ণয়ের পরীক্ষাগুলোর প্রয়োজনীয়তা নিয়মিত যাচাই এবং স্বচ্ছ বিল প্রদানের বাধ্যবাধকতা থাকতে হবে।
এর পাশাপাশি সামাজিক স্বাস্থ্যবিমার একটি কার্যকর ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। শুরুতে আনুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত ব্যক্তিদের আওতায় এনে ধীরে ধীরে এর পরিধি বাড়ানো যেতে পারে। এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি ভাগাভাগি করার একটি কাঠামো তৈরি হবে এবং হঠাৎ চিকিৎসা ব্যয়ের পুরো চাপ একটি পরিবারের ওপর পড়বে না। সরকারি স্বাস্থ্যসেবা বিশ্বাসযোগ্য না হওয়া পর্যন্ত এবং বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবায় অনিয়ম ও অতিরিক্ত মুনাফার জন্য কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত মূল প্রশ্নটির উত্তরও বদলাবে না। বাংলাদেশে সম্পদই যেন স্বাস্থ্য। আর সম্পদ ছাড়া স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া এমন এক ঝুঁকির খেলা, যার মূল্য বহন করার সামর্থ্য অধিকাংশ মানুষের নেই।
Reference:
