রিমশা সিথি
নটিংহাম ট্রেন্ট ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাজ্য
কাগজে কলমে পর্নোগ্রাফি বিষয়ে বাংলাদেশের আইনি অবস্থান স্পষ্ট। ২০১২ সালের পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন পর্নোগ্রাফি তৈরি, বিতরণ ও সংরক্ষণকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করেছে। জননৈতিকতা ও পারিবারিক মূল্যবোধের বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে এসব কর্মকাণ্ডকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইন এবং পরবর্তী সাইবার নিরাপত্তা আইনও ডিজিটাল পরিসরে এই নিষেধাজ্ঞা বিস্তৃত করেছে। অনলাইনে অশ্লীল উপাদান ছড়ানোকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিভিন্ন ওয়েবসাইট বন্ধ করার ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ফাঁক রয়েছে। ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক, বিকল্প ওয়েবসাইট এবং এনক্রিপ্টেড প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি পর্নোগ্রাফিক কনটেন্টে প্রবেশ করছেন। ফলে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ওয়েবসাইট বন্ধ করার উদ্যোগ নিয়মিতভাবেই নানা প্রযুক্তিগত পথে পাশ কাটানো সম্ভব হচ্ছে। মানুষের মুঠোফোনে যা ঘটছে আর আইনে যা বলা আছে, দুইয়ের মধ্যে সেই পুরোনো ব্যবধানই রয়ে গেছে।
মানসিক স্বাস্থ্য ও ডিজিটাল ঘনিষ্ঠতার বৃহত্তর চিত্র
এই ব্যবধানকে বিচ্ছিন্ন কোনো সমস্যা হিসেবে দেখলে পুরো চিত্র ধরা পড়বে না। বাংলাদেশে অবৈধ অনলাইন সম্পর্ক নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে যেমন দেখা গেছে, পরিচয় গোপন রাখার সুযোগ, গোপনীয়তা এবং বাস্তব জীবন থেকে মানসিকভাবে কিছুটা দূরে সরে যাওয়ার প্রবণতা মানুষকে যেমন লুকানো ডিজিটাল সম্পর্কে জড়ায়, পর্নোগ্রাফি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও অনেক সময় একই মানসিক বাস্তবতা কাজ করে।
মানুষ সাধারণত কেবল কৌতূহল থেকে গোপন অনলাইন আচরণের দিকে যায় না। একাকিত্ব, দাম্পত্য জীবনে অসন্তুষ্টি, আবেগগত অবহেলা এবং নিজের জীবনের মধ্যেই নিজেকে অদৃশ্য মনে হওয়ার অনুভূতি অনেক সময় সেই প্রবণতার পেছনে কাজ করে।
পর্নোগ্রাফিতে প্রবেশের ক্ষেত্রেও একই ধরনের আবেগগত যুক্তি কাজ করতে পারে। গোপনে, বিনা বিচারে এবং ব্যক্তিগত পরিসরে যৌন উদ্দীপনা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয় এমন এক সমাজে, যেখানে যৌনতা ও ঘনিষ্ঠতা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা এখনো লজ্জা বা নিষেধের বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়।
পরিবার বা সামাজিক পরিসরে এসব প্রয়োজন ও অনুভূতি নিয়ে কথা বলার সুযোগ না থাকলে মানুষ অনেক সময় পরিচয় গোপন রাখা যায় এমন ডিজিটাল জগতে আশ্রয় নেয়। ফলে সমস্যার মূল কারণ দূর হওয়ার বদলে গোপনীয়তা আরও গভীর হয়।
এর পরিণতিতে অপরাধবোধ, উদ্বেগ, অতিরিক্ত বা নিয়ন্ত্রণহীন ব্যবহারের প্রবণতা এবং ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের টানাপোড়েন দেখা দিতে পারে। গোপন অনলাইন সম্পর্কের ক্ষেত্রে যে মানসিক চাপের কথা বিভিন্ন গবেষণা ও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, পর্নোগ্রাফি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও তার কিছু মিল দেখা যায়। ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়, দীর্ঘস্থায়ী উদ্বেগ এবং মানসিক অস্থিরতা কখনো কখনো বিষণ্নতা কিংবা নিজের ক্ষতি করার প্রবণতার দিকেও ঠেলে দিতে পারে, বিশেষ করে যখন ব্যক্তিগত তথ্য বা অনলাইন কর্মকাণ্ড প্রকাশ্যে চলে আসে।
শুধু নিষেধাজ্ঞা কেন নতুন সমস্যার জন্ম দেয়
বাংলাদেশের নিষেধাজ্ঞানির্ভর নীতিতে একটি কাঠামোগত দুর্বলতা রয়েছে, যা নীতিনির্ধারকেরা খুব কমই প্রকাশ্যে স্বীকার করেন। মানুষের চাহিদা থাকলে শুধু বৈধ প্রবেশের পথ পুরোপুরি বন্ধ করে দিলেই সেই চাহিদা বিলীন হয়ে যায় না। বরং বাজারটি গোপন পথে চলে যায়।
নিয়ন্ত্রণ ছাড়া শুধু নিষেধাজ্ঞা একটি অনিয়ন্ত্রিত অবৈধ কনটেন্ট শিল্পের জন্য সুযোগ তৈরি করে। কোনো আইনি তদারকি না থাকায় সেখানে সম্মতি ছাড়া ভিডিও ধারণ, জবরদস্তি এবং ব্যক্তিগত ছবি অনুমতি ছাড়া ছড়িয়ে দেওয়ার মতো গুরুতর অপরাধের ঝুঁকি বাড়ে। অথচ অন্য অনেক দেশে নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর অন্যতম উদ্দেশ্য হলো এই ধরনের নির্যাতন ও শোষণ প্রতিরোধ করা।
গোপনে পরিচালিত উৎপাদন ও বিতরণ নেটওয়ার্ক নজরদারি করা কঠিন, আইনের আওতায় আনা কঠিন এবং সেখানে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের শিকার হওয়ার সম্ভাবনাও বেশি। বিশেষ করে নারী ও অপ্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও গুরুতর।
এই অর্থে, শুধু নিষেধাজ্ঞা এমন কিছু ক্ষতি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে, যা ঠেকানোর লক্ষ্যেই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল। ব্ল্যাকমেইল, চাঁদাবাজি এবং ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও অনুমতি ছাড়া ছড়িয়ে দেওয়ার মতো কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে একটি গোপন অর্থনীতি তৈরি হতে পারে। বাংলাদেশের সাইবার অপরাধের বাস্তবতায় এসব সমস্যা ইতিমধ্যেই উদ্বেগের কারণ।
নীতির দ্বিধা: প্রবেশাধিকার, নিষেধাজ্ঞা ও সামাজিক সম্প্রীতি
ফলে বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের সামনে বিষয়টি শুধু নৈতিকতার সরল প্রশ্ন নয়। বরং এখানে একটি বাস্তব নীতিগত দ্বিধা রয়েছে।
অবাধ প্রবেশাধিকার দিলে এমন কনটেন্টকে স্বাভাবিক করে তোলার ঝুঁকি থাকে, যাকে রক্ষণশীল ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ পারিবারিক স্থিতিশীলতা এবং সামাজিক সম্প্রীতির জন্য ক্ষতিকর বলে মনে করে। পাশাপাশি দাম্পত্য সম্পর্কে পারস্পরিক আস্থার ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বাংলাদেশের ডিজিটাল ঘনিষ্ঠতা নিয়ে আলোচনায় এই বিষয়টি ইতিমধ্যেই গুরুত্ব পাচ্ছে।
অন্যদিকে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞাও কার্যকরভাবে সমস্যার সমাধান করতে পারছে না। ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে সহজেই নিষেধাজ্ঞা পাশ কাটানো সম্ভব হওয়ায় লাখ লাখ মানুষের প্রবেশ ঠেকানো কঠিন। বরং আচরণ আরও গোপনীয় হয়ে ওঠে, সামাজিক লজ্জা বাড়ে এবং মানুষ সম্ভাব্য অপরাধের ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।
বয়স যাচাই, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের জবাবদিহি এবং একই সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্য ও ডিজিটাল সচেতনতার ওপর বিনিয়োগসহ সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত একটি কাঠামো সমস্যার আবেগগত ও সামাজিক কারণগুলো মোকাবিলায় শুধু ওয়েবসাইট বন্ধের নির্দেশনার চেয়ে বেশি কার্যকর হতে পারে।
তবে এমন ব্যবস্থা চালু করতে হলে যৌনতা, সম্পর্ক ও ঘনিষ্ঠতা নিয়ে বাংলাদেশে যে ধরনের খোলামেলা সামাজিক আলোচনা এতদিন এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে, তার প্রয়োজন হবে। রাজনৈতিক ও ধর্মীয় পরিসরে সেই আলোচনা শুরু করাই বড় চ্যালেঞ্জ।
মধ্যপ্রাচ্যের মতো সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার জন্য বাংলাদেশ কি প্রস্তুত?
সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলো পর্নোগ্রাফিক কনটেন্টের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করে। শক্তিশালী ইন্টারনেট ফিল্টারিং, ধর্মীয় মূল্যবোধের ব্যাপক সামাজিক সমর্থন এবং কঠোর আইনি শাস্তির মাধ্যমে সেখানে নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়। কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত ডিজিটাল পরিবেশে এসব আইনের বাস্তব প্রতিরোধক্ষমতাও রয়েছে।
বাংলাদেশের প্রযুক্তিগত অবকাঠামো, আইন প্রয়োগের সক্ষমতা এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক ঐকমত্য সেই মডেল হুবহু অনুসরণ করার মতো অবস্থায় নেই।
কার্যকর প্রয়োগের সক্ষমতা না বাড়িয়ে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলে তার বড় অংশ গিয়ে পড়তে পারে সাধারণ মানুষের ওপর। নিয়মিতভাবে ভিপিএন ব্যবহারকারী লাখ লাখ আইন মেনে চলা মানুষও তখন এমন এক ধূসর আইনি অঞ্চলে পড়ে যেতে পারেন, যেখানে দৈনন্দিন অনলাইন আচরণই নিম্নমাত্রার অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করবে। অথচ বাস্তবে পর্নোগ্রাফি ব্যবহারের মাত্রা কমানোর ক্ষেত্রে এমন নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা সীমিতই থাকতে পারে।
এর সঙ্গে আরও একটি আইনি জটিলতা তৈরি হয়। কোনো আইন যদি সমাজের একটি বড় অংশ নিয়মিতভাবে অমান্য করে, তাহলে সেই আইনের প্রতি সামগ্রিক শ্রদ্ধাবোধও দুর্বল হতে পারে। সাধারণ ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে বাছাই করে আইন প্রয়োগ করা হলে সত্যিকারের নৈতিক সুরক্ষার বদলে হয়রানি কিংবা চাঁদাবাজির হাতিয়ার হয়ে ওঠার ঝুঁকিও থাকে।
বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও ধর্মীয় সংবেদনশীলতা নীতিগতভাবে কিছু ধরনের নিষেধাজ্ঞাকে সমর্থন করতে পারে। কিন্তু সেই নীতির সঙ্গে আইন প্রয়োগের সক্ষমতা, মানসিক স্বাস্থ্য অবকাঠামো এবং সম্পর্ক ও ঘনিষ্ঠতা নিয়ে সৎ ও দায়িত্বশীল সামাজিক আলোচনা একই গতিতে এগোতে না পারলে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা কিংবা অবাধ প্রবেশাধিকার, কোনোটিই সামাজিক সম্প্রীতির জন্য সর্বোত্তম সমাধান হবে না।
বাংলাদেশের জন্য তাই প্রয়োজন হতে পারে বাস্তবতা বিবেচনায় একটি মধ্যপন্থী ও সুনির্দিষ্ট নীতিকাঠামো। যেখানে অপ্রাপ্তবয়স্কদের সুরক্ষা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, সম্মতির অধিকার, অনলাইন অপরাধ দমন এবং মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়গুলোকে একসঙ্গে বিবেচনা করা হবে। শুধু নিষেধাজ্ঞা দিয়ে সমস্যাকে আড়াল না করে সমস্যার সামাজিক ও মানসিক কারণগুলো নিয়েও কথা বলতে হবে।
তথ্যসূত্র:
