নাজমা জেহির
সাবেক ইউনিসেফ কর্মকর্তা
কূটনৈতিক অঙ্গনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (UNGA) ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে ড. খলিলুর রহমানের নির্বাচিত হওয়া আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার একটি সংবেদনশীল সময়ে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। পদটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রক্রিয়াগত হলেও বাস্তবে এর প্রভাব যথেষ্ট বিস্তৃত। এর ফলে বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় ভূমিকা রাখার এবং পররাষ্ট্রনীতিকে জাতীয় উন্নয়ন, মানবিক দায়বদ্ধতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের সঙ্গে সংযুক্ত করার একটি বিরল সুযোগ হতে পারে।
এই মুহূর্তের কূটনীতিবিদ
ড. খলিলুর রহমান এই দায়িত্ব পালনের জন্য সমৃদ্ধ প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতা নিয়ে এসেছেন। ১৯৭৯ সালে তিনি বাংলাদেশের কূটনৈতিক সেবায় যোগ দেন এবং পরবর্তীকালে জাতিসংঘ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। বিশেষ করে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর (LDC) অগ্রাধিকার এবং জাতিসংঘ বাণিজ্য ও উন্নয়ন সম্মেলন (UNCTAD) সংশ্লিষ্ট উন্নয়ন ইস্যুতে তিনি কাজ করেছেন। পরবর্তীতে তিনি জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং রোহিঙ্গা বিষয়ক প্রধান প্রতিনিধির দায়িত্ব পালন করেন।
২০২৬-এর নির্বাচিত সরকারের মন্ত্রীসভায় তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ফলে তাঁর কর্মজীবনে কূটনীতি, উন্নয়ন অর্থনীতি এবং সংকট ব্যবস্থাপনার একটি শক্তিশালী সমন্বয় দেখা যায়। তাঁর এই অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বাংলাদেশের সামনে তৈরি হওয়া এই সুযোগকে কেবল প্রতীকী স্বীকৃতি হিসেবে দেখলে চলবে না। এটিকে অবশ্যই সুপরিকল্পিত নীতিগত প্রভাব ও কূটনৈতিক সুবিধায় রূপান্তর করতে হবে।
রোহিঙ্গা সংকট: সবচেয়ে বড় পরীক্ষা
রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের কূটনৈতিক অগ্রাধিকারের তালিকায় সর্বোচ্চ স্থানে থাকা উচিত। কারণ, কক্সবাজার ও ভাসানচরে বাংলাদেশ এখনো বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং ক্ষতিগ্রস্ত স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে। ২০২৬ সালের যৌথ সাড়া পরিকল্পনা (Joint Response Plan) অনুযায়ী, প্রায় ১৬ লাখ মানুষের কাছে সহায়তা পৌঁছাতে ৭১০ দশমিক ৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রয়োজন। আর এই আবেদন নিজেই একটি সীমিত ও অগ্রাধিকারভিত্তিক মানবিক সহায়তা পরিকল্পনার রূপ নিতে পারে।এই পরিকল্পনা মূল সমস্যাটিকেই স্পষ্ট করে। মানবিক সহায়তা মানুষের কষ্ট লাঘব করতে পারে, কিন্তু স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধানের বিকল্প হতে পারে না।
ড. খলিলুর রহমান ইতোমধ্যে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভের সঙ্গে আলোচনায় রোহিঙ্গা সংকট উত্থাপন করেছেন এবং নিরাপদ, সুরক্ষিত ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। ২০২৬ সালের জুনে প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য চীন সফরেও বাংলাদেশের একই সুসংহত বার্তা বহন করা উচিত। বেইজিংয়ের ওপর চাপ সৃষ্টির প্রচেষ্টা হিসেবে নয়, বরং গঠনমূলক সহযোগিতার আহ্বান হিসেবে উপস্থাপন করা প্রয়োজন। চীনের সঙ্গে মিয়ানমারের এমন যোগাযোগ রয়েছে, যা অনেক পশ্চিমা দেশের নেই। তাই বাংলাদেশকে ধাপে ধাপে, বিশ্বাসযোগ্য এবং অধিকারভিত্তিক প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার জন্য চীনের সহায়তা কামনা করতে হবে। একই সঙ্গে প্রত্যাবর্তন অবশ্যই স্বেচ্ছায়, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ হতে হবে, এই নীতিতে অটল থাকতে হবে।
উন্নয়ন কূটনীতির অংশ হিসেবে দক্ষতা উন্নয়ন
দ্বিতীয় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত দক্ষতা উন্নয়ন। বাংলাদেশের জনমিতিক সুবিধা দীর্ঘস্থায়ী হবে না, যদি তরুণ জনগোষ্ঠী শিক্ষা থেকে উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানে সফলভাবে প্রবেশ করতে না পারে। বিশ্বব্যাংক ইতোমধ্যে নিম্ন আয়ের তরুণ উদ্যোক্তা ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং আয় বৃদ্ধিতে সহায়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। বিশেষভাবে নারী এবং জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের উচিত তার সম্প্রসারিত কূটনৈতিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে গন্তব্য দেশ, উন্নয়ন সহযোগী, নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠান এবং প্রশিক্ষণ সংস্থাগুলোর সঙ্গে একটি আন্তর্জাতিক দক্ষতা কূটনীতি প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা। এক্ষেত্রে ডিজিটাল সেবা, পরিচর্যা খাত, নার্সিং, লজিস্টিকস, নির্মাণ প্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জাহাজ নির্মাণ এবং জলবায়ু সহনশীল জীবিকার মতো ক্ষেত্রগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে। একটি শ্রম রপ্তানিনির্ভর দেশের জন্য উন্নত দক্ষতা শুধু রেমিট্যান্সের গুণগত মান বাড়ায় না, বরং অভিবাসী শ্রমিকদের ঝুঁকি কমায় এবং শ্রম গ্রহণকারী দেশগুলোর সঙ্গে দরকষাকষির সক্ষমতাও বৃদ্ধি করে।
কিশোর বিচারব্যবস্থা ও রাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতা
তৃতীয় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত কিশোর বিচারব্যবস্থার উন্নয়ন। যে দেশ আন্তর্জাতিক নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থায় আরও শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে চায়, তাকে একই সঙ্গে প্রমাণ করতে হবে যে দেশের ভেতরে বিচারব্যবস্থা শিশুদের সুরক্ষা দেয় এবং তাদের পুনর্বাসনের সুযোগ সৃষ্টি করে। ইউনিসেফ বাংলাদেশের পৃথক শিশু আদালত প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে এবং এটিকে ২০১৩ সালের শিশু আইন ও আন্তর্জাতিক শিশু অধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি শিশুবান্ধব বিচারব্যবস্থার দিকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
এই সংস্কারকে বৃহত্তর সুশাসন কর্মসূচির অংশ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। আইনের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়া শিশুদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা, আইনি সহায়তা, প্রশিক্ষিত বিচারক, সামাজিক সেবা, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা এবং সমাজে পুনঃএকীভূত হওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। কিশোর বিচারব্যবস্থা কোনো প্রান্তিক কল্যাণমূলক বিষয় নয়; একে রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক পরিপক্বতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে দেখা হয়।
প্রতীকী অর্জন থেকে কৌশলগত সাফল্যের পথে
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতিত্বকে শুধুমাত্র একটি প্রতীকী অর্জন হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়, তা অবশ্যই বাস্তব কৌশলগত সাফল্যে রূপান্তর করতে হবে। রোহিঙ্গা কূটনীতি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং কিশোর বিচারব্যবস্থা প্রথম দৃষ্টিতে ভিন্ন নীতিক্ষেত্রের বিষয় মনে হলেও, প্রকৃতপক্ষে এগুলো একটি মৌলিক প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত। বাংলাদেশ কি রাষ্ট্রের সক্ষমতা বৃদ্ধি করার পাশাপাশি মানবিক মর্যাদা রক্ষা করতে সক্ষম?
ড. খলিলুর রহমানের অভিজ্ঞতা ও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা এই প্রশ্নটিকে বৈশ্বিক পরিসরে তুলে ধরতে সহায়তা করতে পারে। এখন বাংলাদেশের দায়িত্ব হলো সুসংহত নীতি ও কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে সেই প্রশ্নের জবাব বাস্তবে প্রমাণ করা।
তথ্য:
- United Nations, ‘UN General Assembly elects Bangladesh’s Rahman as next president’, UN News, 2 June 2026, accessed 16 June 2026.
- Ministry of Foreign Affairs, Government of Bangladesh, ‘Curriculum Vitae of Dr Khalilur Rahman’, 27 February 2026, accessed 16 June 2026.
- Rohingya Response, ‘2025 to 2026 Joint Response Plan’, accessed 16 June 2026.
- Prothom Alo, ‘Dhaka seeks duty-free, quota-free access for Bangladeshi products in Russia’, 8 June 2026, accessed 16 June 2026.
- Channel NewsAsia, ‘Why Bangladesh chose Malaysia and China before India for PM Rahman’s debut tour’, 13 June 2026, accessed 16 June 2026.
- World Bank, ‘World Bank Helps Bangladesh Create Economic Opportunities for Low-Income Youth’, 18 December 2025, accessed 16 June 2026.
- UNICEF Bangladesh, ‘UNICEF welcomes the Interim Government’s decision to establish separate Children’s Courts in Bangladesh’, 24 March 2025, accessed 16 June 2026.
