ডেস্ক রিপোর্ট
অনিকেত ডেস্ক
অধিকাংশ বস্তুনিষ্ঠ পরিমাপ অনুযায়ী, ঢাকা বিশ্বের অন্যতম সর্বাধিক যানজটপূর্ণ এবং দূষিত শহরগুলোর একটি। রাজধানীতে গড় যান চলাচলের গতি এমন পর্যায়ে নেমে এসেছে যে, সারা শহরে অর্থবহ অর্থনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে। একই সঙ্গে বায়ুর মানও বিশ্বব্যাপী ধারাবাহিকভাবে সবচেয়ে খারাপের মধ্যে অবস্থান করছে, যা জনস্বাস্থ্য, উৎপাদনশীলতা এবং সামগ্রিক জীবনমানের ওপর বিশাল আর্থিক ও সামাজিক চাপ সৃষ্টি করছে।
এই প্রেক্ষাপটে, যানজট শুল্ক, অর্থাৎ নির্ধারিত শহুরে অঞ্চলে প্রবেশকারী যানবাহনের ওপর আরোপিত একটি ফি, যা লন্ডনের লো এমিশন জোন এবং আল্ট্রা লো এমিশন জোনের মডেল অনুসরণ করে একটি গুরুতর নীতিগত আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। প্রশ্নটি কেবল তাত্ত্বিকভাবে এমন একটি পরিকল্পনা কতটা কার্যকর তা নয়; বরং এটি ঢাকায় প্রতিষ্ঠানগতভাবে বাস্তবায়নযোগ্য কি না, সামাজিকভাবে ন্যায্য কি না, এবং বাস্তব পরিস্থিতিতে সত্যিই কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা সম্ভব কি না, সেটিই মূল বিবেচ্য।
যাতায়াত, পরিবেশ এবং রাজস্ব
যানজট একটি ক্লাসিক বাজার ব্যর্থতা, যেখানে ব্যক্তিগত চালকরা ব্যস্ত সড়ক নেটওয়ার্কে প্রবেশের সিদ্ধান্তের পূর্ণ সামাজিক খরচ বহন করেন না। তারা অন্য সড়ক ব্যবহারকারীদের জন্য বিলম্ব সৃষ্টি করেন, হাজার হাজার মানুষকে প্রভাবিতকারী বায়ু দূষণে অবদান রাখেন, এবং এই সুবিধার জন্য কোনো অর্থ প্রদান না করেই সরকারি সড়ক স্থান ব্যবহার করেন। একটি কনজেশন চার্জ মূলত এই বাজার ব্যর্থতাকেই সংশোধন করার চেষ্টা করে, সড়ক ব্যবহারের মূল্য নির্ধারণের মাধ্যমে। এর ফলে চালকরা অপ্রয়োজনীয় যাত্রা পুনর্বিবেচনা করতে, গণপরিবহনে স্থানান্তরিত হতে, কম ব্যস্ত সময়ে ভ্রমণ করতে, অথবা তুলনামূলক কম দূষণকারী যানবাহন ব্যবহার করতে উৎসাহিত হন।
লন্ডনের অভিজ্ঞতা এই যুক্তিটিকে বাস্তবে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করেছে। ২০০৩ সালে সেন্ট্রাল লন্ডনে কনজেশন চার্জ চালু করার পর প্রথম বছরের মধ্যেই চার্জিং জোনে যানবাহনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। পরবর্তীতে ULEZ, যা বেশি দূষণকারী যানবাহনের ওপর দৈনিক ফি আরোপ করে, শহরের বিস্তৃত এলাকায় বায়ুর গুণগত মানে দৃশ্যমান উন্নতি আনে, বিশেষ করে নাইট্রোজেন ডাইঅক্সাইড এবং কণিকা পদার্থের মাত্রা এমনভাবে কমে, যা সরাসরি শ্বাসপ্রশ্বাসজনিত রোগ এবং অকালমৃত্যুর ঝুঁকি হ্রাসে ভূমিকা রাখে।
এই ব্যবস্থার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো রাজস্বের পুনর্বিনিয়োগ। সংগ্রহিত অর্থ গণপরিবহন উন্নয়ন, সাইক্লিং অবকাঠামো এবং বাস বহর বৈদ্যুতিকরণে ব্যবহার করা হয়েছে, যা একটি ইতিবাচক চক্র তৈরি করেছে, যেখানে চার্জ একদিকে ক্ষতিকর যাতায়াত কমায়, অন্যদিকে বিকল্প ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার অর্থায়নও নিশ্চিত করে।
ঢাকার ক্ষেত্রে এই ধরনের হস্তক্ষেপের পরিবেশগত ও জনস্বাস্থ্যগত যুক্তি সম্ভবত লন্ডনের চেয়েও বেশি প্রাসঙ্গিক। যানবাহনের নির্গমন, শিল্প দূষণ এবং নির্মাণজনিত ধুলোর সম্মিলনে সারা বছরই বিপজ্জনক বায়ুমান তৈরি হয়। শহরের প্রান্তে অবস্থিত ইটভাটা, পুরনো দুই স্ট্রোক অটো রিকশা, ডিজেল বাস এবং খারাপভাবে রক্ষণাবেক্ষণকৃত ট্রাকের বহর, সব মিলিয়ে এমন এক নির্গমন পরিস্থিতি তৈরি করে যা নিরাপদ সীমার অনেক ওপরে অবস্থান করে। এই প্রেক্ষাপটে কেন্দ্রীয় ঢাকায় প্রবেশকারী সবচেয়ে বেশি দূষণকারী যানবাহন শ্রেণিকে লক্ষ্য করে সুপরিকল্পিত নির্গমন ভিত্তিক চার্জিং জোন কেবল যানবাহন বহর আধুনিকীকরণকে ত্বরান্বিত করতে পারে না, বরং পরিবহন অবকাঠামো বিনিয়োগের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য ও নিবেদিত রাজস্ব প্রবাহও তৈরি করতে পারে।
ঢাকা কেন লন্ডন নয়
তবুও, লন্ডনের মডেল ঢাকায় স্থানান্তর করার পথে কিছু গভীর কাঠামোগত বাধা রয়েছে, যেগুলোকে কেবল বাস্তবায়নের খুঁটিনাটি বলে উপেক্ষা করা যায় না। এগুলো মূলত মৌলিক পূর্বশর্ত, যা বর্তমান বাস্তবতায় এখনো অনুপস্থিত।
লন্ডনের জটলা শুল্ক আংশিকভাবে কার্যকর হয়েছে কারণ সেখানে একটি বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প বিদ্যমান। আন্ডারগ্রাউন্ড, বিস্তৃত বাস নেটওয়ার্ক, সাইক্লিং লেন এবং হাঁটার উপযোগী অবকাঠামো, সব মিলিয়ে চালকদের জন্য বাস্তব অর্থে একটি বিকল্প পথ তৈরি করে। ঢাকায়, বিপরীতে, জনসংখ্যার বড় অংশের জন্য গণপরিবহন এখনো মারাত্মকভাবে অপর্যাপ্ত। ঢাকা মেট্রো রেল, যদিও একটি গুরুত্বপূর্ণ ও স্বাগত উন্নয়ন, তবুও এটি এখনো সীমিত একটি করিডোরেই কেন্দ্রীভূত এবং দৈনিক যাত্রীদের খুব ছোট একটি অংশকে সেবা দিতে সক্ষম। বাস ব্যবস্থা অতিরিক্ত ভিড়, অনিয়মিত এবং কার্যত একটি সমন্বিত নেটওয়ার্ক কাঠামোর বাইরে রয়ে গেছে।
ফলে, কার্যকর বিকল্প তৈরি না করেই যদি জটলা শুল্ক আরোপ করা হয়, তাহলে তা বাস্তবে যাতায়াতের ধরনে পরিবর্তন আনবে না; বরং প্রয়োজনীয় চলাচলকে করের আওতায় নিয়ে আসবে। এর বোঝা সবচেয়ে বেশি পড়বে নিম্ন আয়ের কর্মীদের ওপর, যাদের জীবিকা নির্ভরই করে দৈনন্দিন চলাচলের ওপর এবং যাদের কাছে বিকল্পের সুযোগ খুবই সীমিত।
প্রয়োগের বিষয়টিও সমানভাবে বড় একটি চ্যালেঞ্জ। লন্ডনের ব্যবস্থাটি ঘন এবং নির্ভরযোগ্য স্বয়ংক্রিয় নম্বরপ্লেট শনাক্তকরণ ক্যামেরা, একটি কার্যকর যানবাহন নিবন্ধন ডাটাবেস, এবং এমন একটি আইনগত ও ব্যাংকিং কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে যা নির্বিঘ্ন অর্থপ্রদান ও জরিমানা আদায় নিশ্চিত করে। ঢাকায় পরিস্থিতি ভিন্ন, যানবাহন নিবন্ধন তথ্য অনেক ক্ষেত্রেই অসম্পূর্ণ, সড়কে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক যানবাহন বৈধ নথিপত্র ছাড়া চলাচল করে, এবং বৃহৎ পরিসরে স্বয়ংক্রিয় প্রয়োগের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এখনো সীমিত। এই অবস্থায় প্রয়োগ ছাড়া জটলা শুল্ক কার্যত নীতির চেয়ে একটি পরামর্শের বেশি কিছু হয়ে দাঁড়ায়।
সমতার প্রশ্নটিও যেকোনো মূল্যায়নের কেন্দ্রে থাকা জরুরি। ঢাকা গভীর অর্থনৈতিক বৈষম্যের একটি শহর। আয় বা ভ্রমণের উদ্দেশ্যের সঙ্গে যথাযথভাবে সামঞ্জস্য না করা একটি সমান দৈনিক ফি বাস্তবে পশ্চাদ্ধাবী করের মতো কাজ করার ঝুঁকি তৈরি করে, যেখানে তুলনামূলকভাবে ধনীরা এটি সামান্য অসুবিধা হিসেবে গ্রহণ করলেও, নিম্ন আয়ের যাত্রী, ছোট ব্যবসায়ী এবং জরুরি কর্মীদের ওপর এর বোঝা অনেক বেশি পড়ে। অতএব, এমন কোনো পরিকল্পনার রাজনৈতিক স্থায়িত্ব শেষ পর্যন্ত এর ন্যায়সংগত নকশার ওপরই নির্ভর করবে।
ঢাকায় কার্যকর হতে পারে এমন একটি ব্যবস্থা
এসব চ্যালেঞ্জ কোনোভাবেই ঢাকায় জটলা-চার্জ বাস্তবায়নকে অকার্যকর করে না, তবে এগুলো সেই শর্তগুলো স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করে যার অধীনে এটি বাস্তবসম্মতভাবে কার্যকর হতে পারে, এবং একই সঙ্গে এর প্রবর্তনের আগে যে ক্রমধারা অনুসরণ করা জরুরি, সেটিও নির্ধারণ করে। স্বল্পমেয়াদে ঢাকার জন্য সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হবে একটি ধাপে ধাপে, নির্গমন ভিত্তিক পৃথকীকৃত চার্জিং মডেল, কোনো সার্বজনীন প্রবেশ ফি নয়।
প্রথম পর্যায়ে, সবচেয়ে ভারী এবং সবচেয়ে দূষণকারী যানবাহন শ্রেণী, যেমন ডিজেল ট্রাক, দুই স্ট্রোক থ্রি-হুইলার এবং ন্যূনতম নির্গমন মানের নিচে পরিচালিত পুরনো বাস, নির্দিষ্ট কেন্দ্রীয় অঞ্চলে ব্যস্ত সময়ে প্রবেশে বিধিনিষেধ বা ধাপে ধাপে শুল্ক আরোপের আওতায় আনা উচিত। এতে একদিকে পরিসর সীমিত থাকে, অন্যদিকে প্রয়োগ তুলনামূলকভাবে সহজ হয় এবং শহরব্যাপী জটিল নীতিগত কাঠামো একসঙ্গে চাপ না নিয়ে প্রতিষ্ঠানগত সক্ষমতা ধীরে ধীরে গড়ে তোলা সম্ভব হয়।
এই ব্যবস্থায় সংগৃহীত রাজস্ব আইনগতভাবে সংরক্ষিত এবং সর্বজনীনভাবে জবাবদিহিতামূলক হতে হবে, যা একচেটিয়াভাবে বাস র্যাপিড ট্রানজিট সম্প্রসারণ, মেট্রো রেল সম্প্রসারণ ত্বরান্বিতকরণ এবং শেষ-মাইল সংযোগ উন্নয়নের অর্থায়নে ব্যয় হবে।
একই সঙ্গে একটি বাধ্যতামূলক যানবাহন পরিদর্শন ও নির্গমন সনদ প্রদান ব্যবস্থা চালু ও কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে, যা পরিচ্ছন্ন যানবাহনের একটি কার্যকর রেজিস্ট্রি তৈরি করবে, যার ওপর যেকোনো নির্গমন ভিত্তিক চার্জ নির্ভরশীল হবে। পাশাপাশি নগদ লেনদেনের বাধা ছাড়াই নির্বিঘ্ন চার্জ আদায়ের জন্য ডিজিটাল পেমেন্ট অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে, যা বাংলাদেশের দ্রুত বিস্তৃত মোবাইল আর্থিক সেবার ইকোসিস্টেমকে কার্যকরভাবে কাজে লাগাবে।
সবশেষে, সামাজিক ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে এবং তা কেবল নীতিগত ঘোষণায় সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব কাঠামোর অংশ করতে হলে, শুরু থেকেই নিম্ন আয়ের যাত্রীদের জন্য ছাড় বা ভর্তুকিপ্রাপ্ত ট্রানজিট পাস স্কিমকে এই ব্যবস্থার নকশার ভেতরেই অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
নীতিগত চ্যালেঞ্জ এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা
ঢাকায় জ্যাম-চার্জের সবচেয়ে বড় বাধা প্রযুক্তিগত নয় দুর্ভাগ্যবশত, এটি রাজনৈতিক। যানবাহন প্রবেশ সীমিতকরণ এবং সড়ক ব্যবহারের জন্য শুল্ক আরোপের মতো পদক্ষেপ স্বাভাবিকভাবেই বিভিন্ন পক্ষের প্রতিরোধের মুখে পড়বে: যানবাহন মালিক, পরিবহন অপারেটর, ব্যবসায়িক সংগঠন, এবং এমনকি সরকারি রাজস্ব উদ্যোগের প্রতি স্বাভাবিক সংশয়াপন্ন জনসাধারণও এতে অন্তর্ভুক্ত। বাংলাদেশে শহুরে পরিবহন সংস্কারের রাজনৈতিক অর্থনীতি ইতিহাসগতভাবে দেখিয়েছে যে, কঠিন কাঠামোগত পরিবর্তনের চেয়ে বিদ্যমান অকার্যকর অবস্থাকেই টিকিয়ে রাখা তুলনামূলকভাবে সহজ হিসেবে দেখা হয়েছে।
এই বাস্তবতা অতিক্রম করতে শুধুমাত্র প্রযুক্তিগত নকশা যথেষ্ট নয়; বরং প্রয়োজন টেকসই রাজনৈতিক নেতৃত্ব, স্বচ্ছ জনসংযোগ, রাজস্ব ব্যবহারের স্বাধীন ও দৃশ্যমান তদারকি, এবং প্রভাবিত সম্প্রদায়গুলোর সঙ্গে প্রকৃত ও ধারাবাহিক পরামর্শ প্রক্রিয়া।
জ্যাম-শুল্ক (কনজেশান চার্জ) ঢাকার জন্য কোনো “সিলভার বুলেট” নয়, অর্থাৎ কোনো তাত্ক্ষণিক সর্বসমাধানও নয়, আবার এটি কোনো অপ্রাসঙ্গিক বিদেশি ধারণাও নয়। এটি একটি প্রমাণিত কার্যকারিতা সম্পন্ন নীতিগত হাতিয়ার, যা সঠিকভাবে কাজ করার জন্য যথাযথ প্রতিষ্ঠানগত ভিত্তি, ধারাবাহিক বাস্তবায়ন এবং শক্ত রাজনৈতিক অঙ্গীকারের ওপর নির্ভর করে।
যদি এটিকে হঠাৎ করে ও বিস্তৃতভাবে প্রয়োগ করা হয়, তবে এটি একটি অন্যায্য এবং অকার্যকর বোঝায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। কিন্তু যদি এটি একটি সমন্বিত নগর গতিশীলতা কৌশলের অংশ হিসেবে ধীরে, সতর্কভাবে এবং পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা যায়, তাহলে এটি একসঙ্গে তিনটি লক্ষ্য অর্জনের সম্ভাবনা রাখে, ঢাকায় যানজট হ্রাস, বায়ুর মান উন্নতকরণ, এবং নাগরিকদের জন্য জরুরি গণপরিবহন রূপান্তরের অর্থায়ন নিশ্চিত করা।
