কামরুন নাহার মাহমুদ
অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
বাংলাদেশের সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৬ (সিএসএ ২০২৬) একটি বিস্তৃত নতুন আইন, যা ১০ এপ্রিল ২০২৬ সালে প্রণীত হয় এবং সাইবার নিরাপত্তা অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর স্থলাভিষিক্ত হয়। এই আইন সাইবার অপরাধ ও তার প্রয়োগসংক্রান্ত ক্ষমতার একটি ব্যাপক কাঠামো তৈরি করেছে।
আইনের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্যের মধ্যে রয়েছে অনলাইন হয়রানি, যেমন সম্মতি ছাড়া ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও প্রচার, প্রতিশোধমূলক পর্নোগ্রাফি, ব্ল্যাকমেইল, সাইবার চাঁদাবাজি, জালিয়াতি, সাইবার সন্ত্রাসবাদ এবং ডিজিটাল ব্যবস্থায় অননুমোদিত প্রবেশকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা।
এই আইনের মাধ্যমে একটি নতুন জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে (ধারা ৫ ও ৬)। পাশাপাশি বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে ক্ষতিকর বিবেচিত অনলাইন বিষয়বস্তু অপসারণ বা ব্লক করার ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে (ধারা ৮), যা পরবর্তীতে দ্রুত বিচারিক পর্যালোচনার আওতায় আসবে।
আইনটি ইন্টারনেট ব্যবহারের অধিকারকে একটি নাগরিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং এর বহির্ভৌগোলিক প্রয়োগও রয়েছে (ধারা ৪৮)। শাস্তির মাত্রাও অত্যন্ত কঠোর। উদাহরণস্বরূপ, সম্মতি ছাড়া ব্যক্তিগত বা অন্তরঙ্গ ছবি প্রচারের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদণ্ড এবং ভুক্তভোগী নারী বা শিশু হলে পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ও উচ্চ অঙ্কের জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। একইভাবে সাইবার চাঁদাবাজির জন্য সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড অথবা ৫০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে (ধারা ২২)। এছাড়া তদন্ত কার্যক্রম ৯০ দিনের মধ্যে সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতাও আরোপ করা হয়েছে।
তবে নাগরিক সমাজ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো সতর্ক করে বলেছে যে, আইনটি পূর্ববর্তী ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮ এবং সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩-এর বহু অস্পষ্ট ও বিস্তৃত বিধান বহাল রেখেছে, যা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি বা জনমনে আতঙ্ক ছড়ানোর মতো অভিযোগভিত্তিক অপরাধের ধারা কার্যত অপরিবর্তিত রয়েছে। এছাড়া ধারা ৩৫-এর মাধ্যমে ওয়ারেন্ট ছাড়া তল্লাশি ও গ্রেপ্তার এবং ধারা ৪৬-এর মাধ্যমে জনসমক্ষে ভীতি প্রদর্শনের সুযোগ থাকায় আইনটির অপব্যবহারের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
আইন প্রণয়নের ইতিহাস ও সংশ্লিষ্ট অংশীজন
সিএসএ ২০২৬-এর শিকড় দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
পূর্ববর্তী সরকারের আমলে প্রণীত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮ ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছিল ভিন্নমত দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার অভিযোগে। পরবর্তীতে ২০২৩ সালে সাইবার নিরাপত্তা আইন প্রণীত হলেও নাগরিক সমাজের মতে সেটি মূল আইনের প্রায় অবিকল পুনরাবৃত্তি ছিল।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের মে মাসে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ জারি করে। এতে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের সবচেয়ে বিতর্কিত নয়টি ধারা বাতিল করা হয় এবং পূর্ববর্তী মামলাগুলোর জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হয়। তবে সমালোচকদের মতে, সমস্যাজনক বহু বিধান তখনও বহাল ছিল।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে কোনো সংশোধনী গ্রহণ না করেই এক দিনের বৈঠকে কণ্ঠভোটের মাধ্যমে অধ্যাদেশটি সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৬ হিসেবে পাস করা হয়। বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী, সংসদে এ বিষয়ে কার্যত কোনো অর্থবহ আলোচনা হয়নি এবং নাগরিক সমাজের প্রস্তাবিত সংশোধনীগুলোর কোনোটিই গৃহীত হয়নি। ১০ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে রাষ্ট্রপতির সম্মতির মাধ্যমে আইনটি কার্যকর হয়।
সরকারের অবস্থান স্পষ্ট। তাদের মতে, জাতীয় নিরাপত্তা ও জনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য এই আইন অপরিহার্য। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা প্রকাশ্যে বলেছেন যে, অধ্যাদেশটি পর্যাপ্ত পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে গেছে এবং তাই অপরিবর্তিত অবস্থায় আইন হিসেবে পাস করা হয়েছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের কর্মকর্তারা বিভ্রান্তিকর তথ্য, অনলাইন অপব্যবহার ও ক্ষতিকর বিষয়বস্তু নিয়ন্ত্রণে ব্লকিং ক্ষমতার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন।
বিপরীতে বিরোধী রাজনৈতিক দল, নাগরিক জোট, সাংবাদিক সংগঠন, ইউনেস্কোসহ বিভিন্ন মানবাধিকার ও নাগরিক সমাজ সংগঠন আইনটিকে দমনমূলক আখ্যা দিয়েছে এবং এটিকে নির্বিচার গ্রেপ্তারের নতুন পথ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কিছু ভীতিকর শব্দচয়ন পূর্ববর্তী খসড়া থেকে কিছুটা শিথিল করা হলেও মৌলিক সমস্যাগুলো রয়ে গেছে। ফলে সরকার যেখানে এটিকে আধুনিক ও প্রয়োজনীয় সংস্কার হিসেবে উপস্থাপন করছে, সেখানে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দৃষ্টিতে এটি মূলত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ধারাবাহিকতাই বহন করছে।
গুরুত্বপূর্ণ বিধানসমূহের বিশ্লেষণ
সংজ্ঞা (ধারা ২)
আইনটিতে অত্যন্ত বিস্তারিত সংজ্ঞা প্রদান করা হয়েছে। এর মধ্যে যোগাযোগ সেবা প্রদানকারী, গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অবকাঠামো, সাইবার স্পেস, ডিজিটাল ফরেনসিক, ইন্টারনেটসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিগত পরিভাষার ব্যাখ্যা রয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অবকাঠামো (Critical Information Infrastructure বা CII):
যে কোনো যোগাযোগ বা তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থা, যার ক্ষতি বা বিপর্যয় জনশৃঙ্খলা, জাতীয় নিরাপত্তা কিংবা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি সৃষ্টি করতে পারে।
গ্লোবাল থ্রেট ইন্টেলিজেন্স:
সাইবার ঝুঁকি শনাক্ত, প্রতিরোধ ও মোকাবিলার উদ্দেশ্যে বৈশ্বিক সাইবার হুমকি সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের প্রক্রিয়া।
ডিজিটাল ডিভাইস:
যে কোনো ইলেকট্রনিক, ডিজিটাল, চৌম্বকীয়, অপটিক্যাল বা তথ্য প্রক্রিয়াকরণ সক্ষম ডিভাইস বা সিস্টেম, যার মধ্যে হার্ডওয়্যার, সফটওয়্যার, নেটওয়ার্ক, অ্যাপ্লিকেশন, ডাটাবেইস এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্লাউড কম্পিউটিং, ব্লকচেইন, মেশিন লার্নিং, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, বৃহৎ ভাষা মডেল, ইন্টারনেট অব থিংস এবং অন্যান্য উন্নত প্রযুক্তিও এর আওতাভুক্ত।
ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব:
জাতীয় আইন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও সাইবার নিরাপত্তা নীতিমালা অনুসরণকারী অনুমোদিত পরীক্ষাগার, যা আইনসম্মতভাবে ডিজিটাল প্রমাণ সংগ্রহ, সংরক্ষণ, যাচাই ও আদালতে উপস্থাপনের সক্ষমতা রাখে।
ডিজিটাল শিশু যৌন নির্যাতনসংক্রান্ত উপকরণ
এই আইনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হলো ডিজিটাল শিশু যৌন নির্যাতনসংক্রান্ত উপকরণের সংজ্ঞা নির্ধারণ।
এ ধরনের উপকরণের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হবে এমন যেকোনো ডিজিটাল বা ইলেকট্রনিক উপাদান, যা বাস্তব বা কল্পিত যৌন কর্মকাণ্ড, যৌন অঙ্গ, যৌন সরঞ্জাম, যৌন সেবা, ব্যক্তিগত যৌন যোগাযোগ বা সংশ্লিষ্ট অপরাধকে দৃশ্য, শব্দ, লেখা কিংবা অন্য কোনো মাধ্যমে উপস্থাপন, উৎসাহিত বা প্রচার করে।
সাইবার পরিসরে যৌন হয়রানি
সাইবার জগতে যৌন হয়রানি বলতে বোঝানো হয়েছে:
কর্তৃত্ব বা পেশাগত অবস্থানের অপব্যবহার করে বারবার নগ্ন ছবি চাওয়া বা অবৈধ শারীরিক সম্পর্কের প্রস্তাব দেওয়া;
কোনো ব্যক্তির সম্মতি ছাড়া তার যৌনাঙ্গের ছবি, যৌন উদ্দীপক উপকরণ বা পর্নোগ্রাফিক কনটেন্ট প্রেরণ করা;
প্রযুক্তির সাহায্যে কারও ছবি পরিবর্তন করে যৌন বা পর্নোগ্রাফিক উপাদানে রূপান্তর করা;
সম্পর্কের প্রস্তাবে সাড়া না দেওয়ায় কাউকে ভয়ভীতি, চাপ বা হুমকি প্রদান করা।
প্রতিশোধমূলক পর্নোগ্রাফি
কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত ছবি, ভিডিও বা অনুরূপ তথ্য তার অনুমতি ছাড়া ক্ষতির উদ্দেশ্যে প্রচার করাকে প্রতিশোধমূলক পর্নোগ্রাফি হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে।
সেক্সটরশন
কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও নিজের কাছে আছে বলে দাবি করে তা প্রকাশের হুমকি দিয়ে অর্থ, সুবিধা অথবা সম্পর্ক আদায়ের চেষ্টা করাকে সেক্সটরশন হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
বহির্ভৌগোলিক প্রয়োগ (ধারা ৪)
আইনটির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এর বহির্ভৌগোলিক প্রয়োগ। কোনো বাংলাদেশি নাগরিক দেশের বাইরে থেকে এই আইনের আওতাভুক্ত কোনো অপরাধ করলে তা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে সংঘটিত অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।
একইভাবে, দেশের বাইরে অবস্থান করে যদি কেউ কম্পিউটার, নেটওয়ার্ক বা ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করে বাংলাদেশের ভেতরে কোনো অপরাধ সংঘটিত করে, অথবা বাংলাদেশের ভেতরে থেকে কেউ দেশের বাইরে সাইবার অপরাধ করে, তবে আইনগতভাবে পুরো অপরাধটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরেই সংঘটিত হয়েছে বলে বিবেচিত হবে।
জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা (ধারা ৫ ও ৬)
আইনের মাধ্যমে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। সংস্থাটির প্রধান হবেন একজন মহাপরিচালক।
এই সংস্থার দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে সাইবার অপরাধ সংক্রান্ত অভিযোগ গ্রহণ, প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা সমন্বয়, জাতীয় সাইবার জরুরি প্রতিক্রিয়া দল (এন-সার্ট) পরিচালনা এবং একটি সিকিউরিটি অপারেশনস সেন্টার প্রতিষ্ঠা ও তদারকি করা। সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে কেন্দ্রীভূত ও পেশাদার করার সরকারি প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে বিশেষজ্ঞ নিয়োগেরও বিধান রাখা হয়েছে।
প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা (তৃতীয় অধ্যায়)
আইনের তৃতীয় অধ্যায়ে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার বিস্তারিত বিধান রয়েছে।
ধারা ৮ অনুযায়ী, সাইবার নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ বিবেচিত কোনো ডিজিটাল বিষয়বস্তু অপসারণ, ব্লক অথবা স্থানান্তরের নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতা মহাপরিচালককে প্রদান করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে তিনি বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের সহযোগিতা চাইতে পারবেন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যদি মনে করে কোনো বিষয়বস্তু জাতীয় নিরাপত্তা, জনশৃঙ্খলা, ধর্মীয় সম্প্রীতি বা সহিংসতার জন্য হুমকি সৃষ্টি করছে, তবে তারা মহাপরিচালক বা বিটিআরসির মাধ্যমে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে।
অনুরোধ বা ট্রাইব্যুনালের আদেশ পাওয়ার পর বিটিআরসি বা তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেবে এবং ব্লক করা বিষয়বস্তুর তথ্য প্রকাশ করবে।
তবে যে কোনো অপসারণ বা ব্লকিং আদেশকে তিন দিনের মধ্যে ট্রাইব্যুনালের অনুমোদন নিতে হবে। অন্যথায় সংশ্লিষ্ট বিষয়বস্তু পুনরুদ্ধার করতে হবে।
এই অধ্যায়ে কম্পিউটার ইমার্জেন্সি রেসপন্স টিম এবং ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাবের কার্যপরিধিও বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।
অপরাধ ও শাস্তি (ষষ্ঠ অধ্যায়)
আইনের ষষ্ঠ অধ্যায়ে বিভিন্ন ধরনের সাইবার অপরাধ এবং সংশ্লিষ্ট শাস্তির বিধান রয়েছে।
হ্যাকিং ও অননুমোদিত প্রবেশ (ধারা ১৭ ও ১৮)
ধারা ১৭ অনুযায়ী, গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অবকাঠামোতে অননুমোদিত প্রবেশ, হ্যাকিং, তথ্য চুরি, তথ্য পরিবর্তন, ধ্বংস অথবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় ক্ষতি সাধন একটি গুরুতর অপরাধ।
এই অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ পাঁচ থেকে সাত বছর কারাদণ্ড অথবা ৫০ লক্ষ থেকে এক কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ড প্রদান করা যেতে পারে।
ধারা ১৮ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো কম্পিউটার, ডিজিটাল ডিভাইস, কম্পিউটার সিস্টেম বা নেটওয়ার্কে অননুমোদিতভাবে প্রবেশ করলে অথবা অন্যকে সহায়তা করলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।
যদি এ ধরনের প্রবেশের উদ্দেশ্য অন্য কোনো অপরাধ সংঘটন হয় অথবা এর মাধ্যমে তথ্য চুরি, ধ্বংস, পরিবর্তন, মূল্যহ্রাস বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে ক্ষতিকর তথ্য তৈরি করা হয়, তবে শাস্তির মাত্রা আরও বৃদ্ধি পাবে।
অনলাইন জুয়া (ধারা ২০)
সাইবার পরিসরে জুয়া পরিচালনা, জুয়ায় অংশগ্রহণ, সহায়তা প্রদান কিংবা জুয়ার বিজ্ঞাপন প্রচার অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।
এই অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদণ্ড অথবা এক লক্ষ টাকা পর্যন্ত জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ড প্রদান করা যেতে পারে।
প্রতারণা ও জালিয়াতি (ধারা ২১ ও ২২)
সাইবার পরিসরে প্রতারণার মাধ্যমে কাউকে ক্ষতিগ্রস্ত করলে সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদণ্ড অথবা ২০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে।
সাইবার জালিয়াতির ক্ষেত্রে শাস্তি আরও কঠোর। এ ধরনের অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড অথবা ৫০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ড প্রদান করা যেতে পারে।
সাইবার সন্ত্রাসবাদ (ধারা ২৩)
আইনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধারা হলো ধারা ২৩, যেখানে সাইবার সন্ত্রাসবাদের সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়েছে।
রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা বা সার্বভৌমত্ব সম্পর্কে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি, গুরুত্বপূর্ণ সেবা ব্যাহত করা, বিদেশি রাষ্ট্রের স্বার্থে তথ্য অবকাঠামোতে অনুপ্রবেশ, পরিচয় গোপন করা, অন্যের পরিচয় ব্যবহার করা অথবা জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য ব্যবহার করে অপরাধ সংঘটনকে সাইবার সন্ত্রাসবাদ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
এই অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ড অথবা এক কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে।
সাইবার যৌন হয়রানি (ধারা ২৫)
ধারা ২৫ অনুযায়ী, যৌন হয়রানি, মানহানি, প্রতিশোধমূলক পর্নোগ্রাফি, ডিজিটাল শিশু যৌন নির্যাতনসংক্রান্ত উপকরণ অথবা সেক্সটরশন সম্পর্কিত তথ্য, ছবি, ভিডিও, অডিও বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্বারা তৈরি বা সম্পাদিত কনটেন্ট তৈরি, সংরক্ষণ, প্রচার বা প্রচারের হুমকি প্রদান অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে।
এই অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদণ্ড অথবা ১০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে।
ভুক্তভোগী যদি নারী বা ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু হয়, তবে শাস্তি বৃদ্ধি পেয়ে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড অথবা ২০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে।
ধর্মীয় বা জাতিগত বিদ্বেষ উসকে দেওয়া (ধারা ২৬)
ধর্মীয় বা জাতিগত বিদ্বেষ, ঘৃণা কিংবা সহিংসতা উসকে দেওয়ার উদ্দেশ্যে সাইবার পরিসরে কোনো বিষয়বস্তু প্রকাশ বা প্রচার করলে সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদণ্ড অথবা ১০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে।
এই অধ্যায়ে সহায়তাকারী অপরাধ, মিথ্যা অভিযোগ এবং প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সংঘটিত অপরাধ সম্পর্কেও বিধান রাখা হয়েছে।
তদন্ত ও বিচারিক ক্ষমতা (ধারা ৩১–৪৭)
ধারা ৩২ অনুযায়ী, সাইবার অপরাধের তদন্ত ৯০ দিনের মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে।
ধারা ৩৫ অনুযায়ী, জরুরি পরিস্থিতিতে পুলিশ ওয়ারেন্ট ছাড়াই তল্লাশি চালাতে, ডিজিটাল ডিভাইস জব্দ করতে এবং সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করতে পারবে।
ধারা ৩৬ অনুযায়ী, ইলেকট্রনিক প্রমাণ আদালতে গ্রহণযোগ্য হবে এবং প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান বা ইন্টারনেট সেবা প্রদানকারীদের তথ্য সরবরাহে বাধ্য করা যেতে পারে।
ধারা ৪৮ অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক চুক্তির ভিত্তিতে বাংলাদেশ অন্যান্য দেশের সঙ্গে পারস্পরিক আইনগত সহায়তা ও প্রত্যর্পণ কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে।
( চলবে…)
