সুমাইয়া হাসি
অনিকেত রিসার্চ গ্রুপ
মুসলিম উম্মাহর দোরগোড়ায় আবারও হাজির ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর পবিত্র ঈদুল আজহা। আত্মশুদ্ধি, আল্লাহর প্রতি অবিচল আনুগত্য এবং ভোগবাদের ঊর্ধ্বে উঠে ত্যাগের এক অনন্য দৃষ্টান্তের স্মারক এই উৎসব। কোরবানির এই আবহ কেবল একটি প্রচলিত ধর্মীয় রীতিনীতি বা আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে গভীর আধ্যাত্মিক তাৎপর্য, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং ইহকাল ও পরকালের অশেষ কল্যাণ।
ইসলামী চিন্তাবিদদের মতে, কোরবানির মূল শিক্ষা হলো আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের প্রিয় বস্তুকে উৎসর্গ করা। হজরত ইব্রাহিম (আ.) ও তাঁর পুত্র হজরত ইসমাইল (আ.)-এর সেই মহান আত্মত্যাগের ঐতিহাসিক ঘটনাকে স্মরণ করেই প্রতি বছর জিলহজ মাসের ১০ তারিখে মুসলমানরা পশু কোরবানি করে থাকেন। তবে কোরবানির ফজিলত কেবল পশু জবেহ করার রক্ত ও মাংসের মাঝে নিহিত নয়, বরং এর মূল ভিত্তি হলো তাকওয়া বা আল্লাহর ভীতি। পবিত্র কোরআনে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, আল্লাহর কাছে কোরবানির পশুর রক্ত বা মাংস পৌঁছায় না, বরং পৌঁছায় বান্দার অন্তরের তাকওয়া।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিস অনুযায়ী, কোরবানির পশুর প্রতিটি পশমের বিনিময়ে বান্দাকে একটি করে নেকি দান করা হয় এবং জবেহ করার সময় মাটিতে রক্ত পড়ার আগেই তা আল্লাহর দরবারে কবুল হয়ে যায়। এই ইবাদত বান্দাকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে এবং বিগত জীবনের গুনাহ মাফের উসিলা হয়।
তবে এই ফজিলত ও বরকত অর্জনের জন্য ঈদুল আজহার দিনগুলোতে কিছু সুনির্দিষ্ট আমল ও নিয়ম অনুসরণের তাগিদ দেয় ইসলাম। জিলহজ মাসের চাঁদ দেখার পর থেকে কোরবানি সম্পন্ন করা পর্যন্ত নখ ও চুল না কাটা এই সময়ের একটি অন্যতম সুন্নত আমল। ঈদের দিন সকালে খুব ভোরে ঘুম থেকে ওঠা, মিসওয়াক ও গোসল করে পবিত্র হওয়া এবং সামর্থ্য অনুযায়ী উত্তম পোশাক পরিধান করা সুন্নত। ঈদুল ফিতরের মতো এই ঈদে মিষ্টিমুখ করে ঈদগাহে যাওয়ার নিয়ম নেই; বরং নবীজি (সা.) ঈদের নামাজ শেষ করে নিজের কোরবানির মাংস দিয়ে প্রথম আহার করতেন। ঈদগাহে যাওয়া এবং আসার সময় উচ্চৈঃস্বরে তাকবিরে তাশরিক পাঠ করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ আমল। ৯ জিলহজের ফজর থেকে ১৩ জিলহজের আসর পর্যন্ত প্রত্যেক ফরয নামাজের পর এই তাকবির পাঠ করা ওয়াজিব।
ঈদের প্রধান আমলটি হলো ঈদের সালাত আদায় এবং এরপর সাধ্য অনুযায়ী সুস্থ ও নিখুঁত পশু কোরবানি করা। কোরবানি করার সময় নিয়তের বিশুদ্ধতা সবচেয়ে জরুরি। লোকদেখানো মানসিকতা বা সামাজিক আভিজাত্য প্রকাশের মোহে কোরবানি করলে তার কোনো আধ্যাত্মিক মূল্য থাকে না। পশু জবেহ করার পর আরেকটি বড় দায়িত্ব হলো এর মাংস বণ্টন। শরীয়তের নির্দেশনা অনুযায়ী কোরবানির মাংস তিন ভাগে ভাগ করে এক ভাগ নিজের জন্য, এক ভাগ আত্মীয়-স্বজনের জন্য এবং বাকি এক ভাগ সমাজ ও পাড়া-মহল্লার দরিদ্র-অসহায় মানুষের মাঝে বিলিয়ে দেওয়া উত্তম।
বর্তমান অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে কোরবানির এই সামাজিক আমলটি আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এটি সমাজের ধনী ও দরিদ্রের মধ্যকার বৈষম্য দূর করে এক চমৎকার সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করে। একই সাথে কোরবানির বর্জ্য দ্রুত অপসারণ করে পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখাও ঈমানি দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। মূলত, বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি অন্তরের অহংকার, হিংসা ও পশুবৃত্তিকে কোরবানি দেওয়াই হলো এই উৎসবের আসল সার্থকতা। ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত হয়ে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে খোদাভীতি ও মানবতার সেবা বজায় রাখাই হোক এই ঈদুল আজহার মূল অঙ্গীকার।
