ফারাহ জেহির
অনিকেত রিসার্চ গ্রুও
জাতীয় জরুরি বাস্তবতা: বয়সসীমাহীন এক সংকট
বাংলাদেশ বর্তমানে গভীর সামাজিক অস্থিরতার এক পর্যায়ের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। ২০২৬ সালের অর্থনৈতিক অগ্রগতি সত্ত্বেও দেশটি এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি, যাকে মানবাধিকার পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলো “যৌন সহিংসতার মহামারি” হিসেবে চিহ্নিত করছে। ২০২৬ সালের প্রথম দিককার তথ্য অনুযায়ী, ধর্ষণের রিপোর্টকৃত ঘটনার সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ ভুক্তভোগীই অপ্রাপ্তবয়স্ক।
তবে এই সংকট কেবল শিশু বা কিশোরীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সাম্প্রতিক গবেষণা ইঙ্গিত করে যে প্রবীণ নারীরাও ক্রমবর্ধমানভাবে শারীরিক, মানসিক এবং সামাজিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন, অনেক ক্ষেত্রেই নিজেদের পরিবার ও গৃহপরিসরের ভেতরে। যাঁদের একসময় পারিবারিক অভিভাবক ও মূল্যবোধের ধারক হিসেবে দেখা হতো, তাঁদেরই এখন অনেক পরিবার “অর্থনৈতিক বোঝা” হিসেবে বিবেচনা করছে। স্কুলপড়ুয়া শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধা নারী পর্যন্ত বিস্তৃত এই সামাজিক ভাঙন কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী ব্যবস্থার মাধ্যমে মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন জাতীয় মানসিকতার একটি মৌলিক পুনর্গঠন, যার সূচনা ঘটতে পারে শিক্ষাব্যবস্থার মধ্য দিয়েই।
কেন ‘যৌনশিক্ষা’ আসলে ‘নিরাপত্তা শিক্ষা‘
যৌন সহিংসতা অব্যাহত থাকার অন্যতম প্রধান কারণ হলো “তথ্যগত শূন্যতা”। নির্যাতনকারীরা প্রায়শই ভুক্তভোগীর নীরবতা ও অজ্ঞতাকেই অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। যখন শিশুদের শরীরের ব্যক্তিগত অধিকার, নিরাপদ ও অনিরাপদ স্পর্শ, কিংবা সম্মতির ধারণা সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়া হয় না, তখন তারা নির্যাতন শনাক্ত করার ভাষা ও সক্ষমতা থেকে বঞ্চিত থাকে। সমাজ এই অজ্ঞতাকে প্রায়ই “নিষ্পাপত্ব” হিসেবে আখ্যায়িত করে, অথচ বাস্তবে এটি ভয়াবহ ঝুঁকির ক্ষেত্র তৈরি করে।
একটি কার্যকর ও গভীরতাসম্পন্ন পাঠক্রম যৌন আচরণকে উৎসাহিত করার জন্য নয়; বরং এটি জাতীয় নিরাপত্তা ও মানবিক সুরক্ষার একটি কাঠামোগত রূপ। এই শিক্ষা শিশুদের নিরাপদ ও অনিরাপদ স্পর্শের পার্থক্য শেখায়, কিশোর-কিশোরীদের সুস্থ সম্পর্কের সীমারেখা বুঝতে সহায়তা করে এবং প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের আইনি অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে তোলে। “যৌনশিক্ষা” শব্দবন্ধের পরিবর্তে “শিশু সুরক্ষা ও সুস্থতা শিক্ষা” ধারণাটি ব্যবহার করা হলে রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিরোধ কমে আসতে পারে এবং আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসতে পারে মানুষের মৌলিক নিরাপত্তার অধিকার।
ধর্মীয় বিভাজন অতিক্রম: অন্তর্ভুক্তিমূলক কৌশলের প্রয়োজন
এই বিষয়কে ঘিরে যে নৈতিক আতঙ্ক তৈরি হয়, তার অন্যতম কারণ হলো এমন ধারণা যে এই ধরনের শিক্ষা ধর্মীয় মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। অথচ ইসলামী জ্ঞানচর্চার গভীরে তাকালে লজ্জাশীলতা (হায়া), মানবদেহের মর্যাদা এবং দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ মানুষকে সুরক্ষা দেওয়ার বাধ্যবাধকতার সুস্পষ্ট উপস্থিতি দেখা যায়। ২০২৬ সালের পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্তিমূলক কিছু বিষয়বস্তু স্থগিত হওয়ার পেছনেও মূলত এই ভুল বোঝাবুঝিই কাজ করেছে।
এই অচলাবস্থা থেকে বের হতে হলে শিক্ষা বিভাগকে ধর্মীয় নেতাদের “প্রতিবন্ধকতা” হিসেবে দেখা বন্ধ করে তাঁদের “সুরক্ষার অংশীদার” হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বস্ত ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের সম্পৃক্ত করে পাঠক্রম নির্মাণ করা গেলে নিরাপত্তাকে নৈতিক ও আধ্যাত্মিক দায়িত্ব হিসেবে উপস্থাপন করা সম্ভব হবে। যখন একজন স্থানীয় ইমাম এবং একজন শিক্ষক একইসঙ্গে একটি শিশুকে বলেন, “তোমার শরীর তোমার নিজস্ব, এবং তোমার অনুমতি ছাড়া কেউ তোমাকে স্পর্শ করার অধিকার রাখে না”, তখন নিষিদ্ধতার দেয়াল ভাঙতে শুরু করে এবং সমাজের চারপাশে একটি সুরক্ষাবলয় গড়ে ওঠে।
জাতীয় সচেতনতা ও অপরাধ প্রতিরোধে কৌশলগত অগ্রাধিকার
নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা প্রতিরোধে একটি চারস্তম্ভভিত্তিক কাঠামো বিবেচনা করা জরুরি:
১. শিক্ষকদের জন্য বাধ্যতামূলক রিপোর্টিং ব্যবস্থা
বিদ্যালয়কে কেবল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, বরং সুরক্ষামূলক নজরদারির ক্ষেত্র হিসেবেও গড়ে তুলতে হবে। সন্দেহভাজন নির্যাতনের ঘটনা দ্রুত রিপোর্ট করা শিক্ষকদের জন্য আইনগত বাধ্যবাধকতা হওয়া উচিত। একইসঙ্গে তথ্যদাতাদের সুরক্ষার জন্য আইনি নিরাপত্তা কাঠামোও প্রয়োজন।
২. “MenCare” সহযোগী মডেল
নারীর প্রতি সহিংসতার মূল উৎস প্রায়ই বিকৃত পুরুষতান্ত্রিক আচরণ ও ক্ষমতার ধারণা। তাই শিক্ষা ব্যবস্থাকে কিশোর ও তরুণ পুরুষদেরও লক্ষ্যবস্তু করতে হবে, যাতে “ক্ষমতা মানেই নিয়ন্ত্রণ”, এই ধারণা ভেঙে দেওয়া যায়। পুরুষদের সুরক্ষার অংশীদার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত না করলে সহিংসতার চক্র ভাঙা সম্ভব নয়।
৩. প্রবীণ নারীদের সুরক্ষা
প্রবীণ নারীদের অধিকারের প্রশ্নকে জাতীয় সচেতনতার অংশ করতে হবে। প্রবীণদের বিরুদ্ধে সংঘটিত বহু নির্যাতন “নীরব অপরাধ”, যা পরিবারেই ঘটে এবং আড়ালে থেকে যায়। প্রবীণ নারীদের আর্থিক সক্ষমতা, আইনি সহায়তা ও সামাজিক নিরাপত্তাকে শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে সংযুক্ত করা প্রয়োজন।
৪. সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদের পুনর্ব্যাখ্যা
বাংলাদেশের সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদ নাগরিকের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করে। এই অধিকারকে “স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা শিক্ষা” অন্তর্ভুক্ত করে পুনর্ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। এর ফলে পাঠ্যক্রমে নিরাপত্তা-সংক্রান্ত বিষয় বাদ পড়লে নাগরিক সমাজ সরকারকে জবাবদিহির আওতায় আনতে সক্ষম হবে।
নীরবতার মূল্য
বাংলাদেশ যখন স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পথে এগোচ্ছে, তখন দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে ভয় ও অনিরাপত্তার মধ্যে রেখে উন্নয়নের দাবি টেকসই হতে পারে না। আজ আমরা যে নীরবতা বজায় রাখছি, সেটিই আগামী দিনের অপরাধীদের জন্য সামাজিক অনুমোদনে পরিণত হচ্ছে। নিরাপত্তা কোনো “পশ্চিমা ধারণা” নয়; এটি মানুষের মৌলিক অস্তিত্বগত প্রয়োজন।এই শিক্ষাকে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসা মানে মূল্যবোধ হারিয়ে ফেলা নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে উচ্চারিত মানবিক ও নৈতিক মূল্যবোধকে বাস্তবে রূপ দেওয়া। শিক্ষা বিভাগের হাতে এমন সক্ষমতা রয়েছে, যা অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আগেই প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে। এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়, আমরা কি সামাজিক সংকোচকে অগ্রাধিকার দেব, নাকি আমাদের কন্যা, মা ও দাদিদের নিরাপত্তাকে?
