শাহরাজাদ রহমান
পরিকল্পনা ও কৌশল পরামর্শদাতা (যুক্তরাজ্য)
বাংলাদেশে মাতৃস্বাস্থ্যসেবার বর্তমান অবস্থা নিয়ে এই স্বাধীন পর্যালোচনায় একদিকে যেমন উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির চিত্র উঠে এসেছে, অন্যদিকে তেমনি স্পষ্ট হয়েছে দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতাগুলোও। ২০০০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে দেশে মাতৃমৃত্যুর হার ৭৯ শতাংশ কমেছে, যা নিঃসন্দেহে একটি বড় অর্জন। তবুও প্রতি এক লাখ জীবিত জন্মে মাতৃমৃত্যুর হার এখনো ১৯৬, যা ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অনুযায়ী নির্ধারিত ৭০-এর নিচে নামিয়ে আনার লক্ষ্য থেকে প্রায় তিনগুণ বেশি। এর থেকে বুঝা যায়, অর্জন সত্ত্বেও ব্যবস্থাগত সীমাবদ্ধতা এখনো কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জনের পথে বড় বাধা হয়ে রয়েছে।
তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের মাতৃস্বাস্থ্য খাতে একদিকে অগ্রগতি হয়েছে, অন্যদিকে বৈষম্যও রয়ে গেছে। প্রজননক্ষম বয়সী নারীদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ এখনো মাতৃমৃত্যু। প্রতিবছর প্রায় ৭ হাজার ৬৬০ জন নারী এমন কারণে প্রাণ হারান, যা যথাযথ চিকিৎসা ও সময়মতো সেবা পেলে প্রতিরোধ করা সম্ভব। মাতৃমৃত্যুর প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ (৩১ শতাংশ) এবং এক্ল্যাম্পসিয়া (২৩ শতাংশ)। চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এসব জটিলতা কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব। ফলে সমস্যার মূল কারণ চিকিৎসাগত সীমাবদ্ধতা নয়, বরং স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থার দুর্বলতা।
সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি হলো দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি। বর্তমানে মাতৃস্বাস্থ্যসেবার জন্য প্রয়োজনীয় জনবলের মাত্র ৪১ শতাংশ বিদ্যমান। এর ফলে নিরাপদ প্রসবসেবা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। বাস্তব চিত্র আরও উদ্বেগজনক। দেশে এখনো ৭১ শতাংশ প্রসব বাড়িতে সম্পন্ন হয় এবং এর মধ্যে মাত্র ৪ শতাংশ ক্ষেত্রে প্রশিক্ষিত সেবাদাতার উপস্থিতি থাকে। বিশেষ করে গ্রামীণ ও নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠী এখনো অনেকাংশে অনানুষ্ঠানিক ও অনিরাপদ সেবার ওপর নির্ভরশীল।
ভৌগোলিক ও আর্থসামাজিক বৈষম্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। গ্রামীণ এলাকায় প্রতি এক লাখ জীবিত জন্মে মাতৃমৃত্যুর হার ২০৪, যেখানে শহরে এই হার ১৪৭। একইভাবে দরিদ্র পরিবারের নারীরা ধনী পরিবারের নারীদের তুলনায় অনেক বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকেন। প্রসবপূর্ব সেবার ক্ষেত্রেও বৈষম্য স্পষ্ট। সবচেয়ে দরিদ্র নারীদের মধ্যে মাত্র ৭ শতাংশ প্রয়োজনীয় মানসম্পন্ন প্রসবপূর্ব সেবা পান, অথচ সবচেয়ে সচ্ছল নারীদের ক্ষেত্রে এই হার ৩৭ শতাংশ। উদ্বেগের বিষয় হলো, সময়ের সঙ্গে এই বৈষম্য আরও বাড়ছে, যা প্রমাণ করে যে উন্নয়নের সুফল সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছায়নি। জরুরি মাতৃসেবা ব্যবস্থার দুর্বলতাও একটি বড় সমস্যা। প্রায় অর্ধেক মাতৃমৃত্যু ঘটে সন্তান জন্মদানের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই। এর মধ্যে ১৯ শতাংশ মৃত্যু ঘটে বাড়িতে এবং আরও ১৯ শতাংশ মৃত্যু ঘটে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নেওয়ার পথে। এই বাস্তবতা জরুরি রেফারেল ব্যবস্থা, পরিবহন সুবিধা এবং স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রের প্রস্তুতির ঘাটতিকে স্পষ্টভাবে সামনে নিয়ে আসে।
পর্যালোচনায় আরও দেখা গেছে, দেশের এক শতাংশেরও কম স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান নিরাপদ প্রসবের জন্য প্রয়োজনীয় মানদণ্ড পূরণ করে। মাত্র ৫ শতাংশ প্রতিষ্ঠান পূর্ণাঙ্গ জরুরি প্রসূতি সেবা দিতে সক্ষম। এতে বোঝা যায়, নীতিগত অঙ্গীকার থাকলেও সেবার মান নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বাস্তব অগ্রগতি এখনো সীমিত। স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের মৌলিক অবকাঠামোতেও বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। মাত্র ৪ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে রক্ত সঞ্চালনের ব্যবস্থা আছে। আবার এক্ল্যাম্পসিয়া প্রতিরোধে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ম্যাগনেসিয়াম সালফেট ওষুধ পাওয়া যায় মাত্র ১৪ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে। ফলে অনেক নারী স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পৌঁছাতে পারলেও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হন।
সবকিছু বিবেচনায় বলা যায়, বাংলাদেশের মাতৃস্বাস্থ্যসেবার প্রধান সংকট জ্ঞানের অভাব নয়, বরং কার্যকর বাস্তবায়নের ঘাটতি। দক্ষ ধাত্রী ও স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা উন্নয়ন, কার্যকর রেফারেল ও পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং সামাজিক বৈষম্য কমানোর প্রয়োজনীয়তা বহুদিন ধরেই জানা। কিন্তু এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে ধারাবাহিকতা ও সমন্বয়ের অভাব রয়ে গেছে। এই কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো দ্রুত ও লক্ষ্যভিত্তিকভাবে মোকাবিলা করা না গেলে মাতৃমৃত্যু আরও কমিয়ে আনা এবং জাতীয় ও বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা বাংলাদেশের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে।
