সায়েমা নাজনীন
ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, সরকারি হাসপাতালগুলোতে দুপুরের পর বা সন্ধ্যায় অতিরিক্ত একটি শিফট চালুর কথা সরকার বিবেচনা করছে। বিষয়টি নিয়ে তিনি শিগগিরই প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করবেন বলেও জানিয়েছেন। বিশেষায়িত একটি নাক, কান ও গলা (ENT) ইনস্টিটিউটে এক অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। সেখানে সম্প্রসারণের মাধ্যমে শয্যাসংখ্যা ১৩৫ থেকে বাড়িয়ে ২৫০ করার পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে। হাসপাতালের বিদ্যমান সুযোগ সুবিধার পূর্ণ ব্যবহার এবং আরও বেশি রোগীকে চিকিৎসা দেওয়াই এই উদ্যোগের লক্ষ্য। তবে নতুন চিকিৎসক, নার্স ও টেকনোলজিস্ট নিয়োগ করা সম্ভব হলেই অতিরিক্ত শিফট চালু করা যাবে বলে মন্ত্রী জানিয়েছেন।
প্রস্তাবটির মূল যুক্তি যথেষ্ট পরিষ্কার। সরকারি হাসপাতালের বহির্বিভাগের সেবা সাধারণত দুপুরের মধ্যেই শেষ হয়ে যায়। ফলে কর্মজীবী মানুষ, দিনের বেলায় রোগীর দেখাশোনা করতে পারেন না এমন পরিবারের সদস্য এবং দূরবর্তী জেলা থেকে আসা রোগীরা অনেক সময় হাসপাতালে পৌঁছে দেখেন, সেবা নেওয়ার সুযোগ শেষ হয়ে গেছে।
অন্যদিকে, ব্যয়বহুল ভবন, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও পরীক্ষা নিরীক্ষার যন্ত্র দিনের বড় একটি সময় অব্যবহৃত পড়ে থাকে। বাধ্য হয়ে অনেক রোগী বেশি খরচের বেসরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতালে যান। বিদ্যমান অবকাঠামো ব্যবহার করেই সেবার সময় বাড়ানো সম্ভব বলে অতিরিক্ত শিফট চালু করা তুলনামূলক কম খরচে হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়ানোর একটি উপায় হতে পারে। সকালের দীর্ঘ অপেক্ষার চাপও কিছুটা কমতে পারে।
এই উদ্যোগের সবচেয়ে বড় যুক্তি হলো বিদ্যমান সম্পদের ভালো ব্যবহার। ইমেজিং যন্ত্র, ল্যাবরেটরি ও অপারেশন থিয়েটার আরও বেশি সময় চালু থাকলে এসব স্থাপনার খরচ বেশি সংখ্যক রোগীর মধ্যে ভাগ হয়ে যায়। সন্ধ্যার বহির্বিভাগ নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর জন্যও সহায়ক হতে পারে। এক দিনের মজুরি হারিয়ে চিকিৎসা নিতে যাওয়ার চাপ কমবে। পাশাপাশি অনানুষ্ঠানিক ও নিয়ন্ত্রণহীন চিকিৎসাসেবার ওপর কিছু রোগীর নির্ভরতা কমানো সম্ভব হতে পারে।
বাস্তব সমস্যাগুলো কোথায়
প্রস্তাবটির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা বাস্তবায়নের জায়গায়। সরকারি হাসপাতালে অতিরিক্ত শিফট চালুর কথা নতুন নয়। বছরের পর বছর ধরে এমন উদ্যোগের আলোচনা হয়েছে, কিন্তু বাস্তবে তা চালু হয়নি। আগের উদ্যোগগুলো কেন থেমে গেছে, সেই ব্যাখ্যাও বর্তমান ঘোষণায় নেই। বিষয়টিকে এখনো উচ্চপর্যায়ের আলোচনার অপেক্ষায় থাকা একটি পরিকল্পনা হিসেবে তুলে ধরায় মনে হয়, বাস্তবায়নের প্রস্তুতির চেয়ে ঘোষণাটিই সামনে চলে এসেছে।
প্রথম সমস্যা জনবল। সরকারি হাসপাতালগুলোতেই বর্তমানে অনেক পদ খালি, কর্মস্থলে অনুপস্থিতির সমস্যা আছে এবং গ্রাম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের তুলনায় শহরে চিকিৎসকদের উপস্থিতি বেশি। নতুন চিকিৎসক ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী তৈরি করতেও কয়েক বছর সময় লাগে। নতুন নিয়োগ ছাড়া সন্ধ্যার শিফট চালু করলে বিদ্যমান কর্মীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়বে। পারিশ্রমিকের প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি অনেক চিকিৎসকের আয়ের একটি বড় অংশ আসে বেসরকারি সন্ধ্যাকালীন চেম্বার থেকে। তাই কম পারিশ্রমিকের অতিরিক্ত শিফট কর্মীদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি নাও করতে পারে। আবার যথেষ্ট পারিশ্রমিক দিতে গেলে সরকারের ব্যয় বাড়বে।
শুধু চিকিৎসক থাকলেই হাসপাতাল চলে না। নার্স ও টেকনিশিয়ানের পর্যাপ্ত উপস্থিতি, বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ, জীবাণুমুক্তকরণ ব্যবস্থা এবং রাতে কর্মীদের নিরাপদে বাড়ি ফেরার ব্যবস্থাও সমান জরুরি। দীর্ঘ সময় হাসপাতাল খোলা রাখার পরও যদি প্রয়োজনীয় ওষুধ না থাকে, রোগীকে শেষ পর্যন্ত বাইরে থেকেই তা কিনতে হবে।
আরেকটি ঝুঁকি হলো শহরের হাসপাতালগুলো হয়তো দ্রুত এই ব্যবস্থা চালু করতে পারবে, অথচ গ্রামীণ হাসপাতালগুলো, যেখানে প্রয়োজন অনেক বেশি, পিছিয়ে থাকবে। ফলে বিদ্যমান বৈষম্য আরও বাড়তে পারে। দীর্ঘ সময় কাজ করা জুনিয়র চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মীরা যদি পর্যাপ্ত তদারকি ছাড়া সন্ধ্যার শিফটে দায়িত্ব পালন করেন, সেবার মান ও রোগীর নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে।
উদ্দেশ্য আর বাস্তবতার দূরত্ব
প্রস্তাবটির উদ্দেশ্য গুরুত্বপূর্ণ এবং এর যুক্তিও সহজবোধ্য। কিন্তু সফল করতে যে জনবল, অর্থ ও সহায়ক ব্যবস্থা দরকার, সেগুলো সরকার বাস্তবে কতটা নিশ্চিত করতে পারবে, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়। তাত্ত্বিকভাবে এই উদ্যোগের সুফল বড় হতে পারে। কিন্তু প্রস্তুতি ছাড়া শুধু নির্দেশ দিয়ে শিফট চালু করলে বাস্তব সুবিধা সীমিত হয়ে যেতে পারে। মন্ত্রীর শর্তসাপেক্ষ বক্তব্য বাস্তবতার দিক থেকে সৎ। একই সঙ্গে তা দেখিয়ে দেয়, প্রয়োজনীয় নিয়োগ ও প্রস্তুতি এখনো সম্পন্ন হয়নি।
সঙ্গে আরও কিছু সংস্কার দরকার
একসঙ্গে সব সরকারি হাসপাতালে এই ব্যবস্থা চালু না করে বিভিন্ন বিভাগের কয়েকটি হাসপাতাল দিয়ে শুরু করা যেতে পারে। সেখানে রোগীর সংখ্যা, কর্মীদের উপস্থিতি, সেবার মান এবং পরিচালন ব্যয় নিয়মিতভাবে হিসাব করতে হবে। কী কাজ করছে, কোথায় সমস্যা হচ্ছে, সেই তথ্যের ভিত্তিতেই পরবর্তী ধাপে হাসপাতালের সংখ্যা বাড়ানো উচিত।
অতিরিক্ত সময় কাজের জন্য স্বচ্ছ প্রণোদনা দরকার। ওভারটাইম ভাতা, পালাক্রমে দায়িত্ব এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত ছুটি, এসবের সমন্বয়ে এমন ব্যবস্থা করা দরকার যাতে কর্মীদের কাছে অতিরিক্ত শিফটটি ন্যায্য ও গ্রহণযোগ্য মনে হয়। এর পাশাপাশি মূল সমস্যাটিও সমাধান করতে হবে, আর তা হলো জনবল তৈরি। নার্স ও টেকনোলজিস্টের ঘাটতি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তাই নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ বাড়ানোর পাশাপাশি প্রত্যন্ত এলাকায় যোগ্য স্বাস্থ্যকর্মীদের ধরে রাখার জন্য কার্যকর পদায়ন ও কর্মস্থলে থাকার নীতি প্রয়োজন। শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক জনবল দিয়ে দেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার চাপ সামলানো সম্ভব নয়।
সেবার সময় বাড়িয়েও যদি রোগী প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না পান, তাহলে উদ্যোগের উদ্দেশ্য পূরণ হবে না। তাই ওষুধ ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সামগ্রীর সরবরাহ ব্যবস্থাও শক্তিশালী করতে হবে। ডিজিটাল স্টক ব্যবস্থাপনা চালু করা গেলে কোথাও সরবরাহ কমে যাওয়ার আগেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সতর্ক হতে পারে। সন্ধ্যার সেবাকে কার্যকর করতে আগাম অ্যাপয়েন্টমেন্ট এবং রোগীর অপেক্ষার সময় নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাও দরকার। বহির্বিভাগে যে ভিড় এখন নিয়মিত দৃশ্য, পরিকল্পিত কিউ ম্যানেজমেন্ট ব্যবস্থা তা কমাতে পারে।
রাতের দিকে সেবা চালুর সঙ্গে নিরাপত্তার প্রশ্নও জড়িত, বিশেষ করে নারী স্বাস্থ্যকর্মীদের ক্ষেত্রে। নিরাপদ কর্মপরিবেশ, সুরক্ষিত হাসপাতাল প্রাঙ্গণ এবং রাতে বাড়ি ফেরার নির্ভরযোগ্য পরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
সরকারি দায়িত্ব এবং বেসরকারি চর্চার সম্পর্ক নিয়েও স্পষ্ট নীতি দরকার। সরকারি চিকিৎসকদের বেসরকারি চেম্বারে কাজ করার বিষয়টি দীর্ঘদিনের বাস্তবতা। তাই এমন নিয়ম করা দরকার, যাতে সরকারি হাসপাতালের সন্ধ্যার সেবা বেসরকারি চেম্বারের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে না গিয়ে পরস্পরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চলে। পাশাপাশি জবাবদিহির ব্যবস্থাও থাকতে হবে। নিয়মিতভাবে রোগীর সংখ্যা, সেবার সময়, কর্মীদের উপস্থিতি ও অন্যান্য কার্যসম্পাদনের তথ্য প্রকাশ করা হলে মানুষ নিজেরাই বুঝতে পারবেন সন্ধ্যার শিফট বাস্তবে কতটা পরিবর্তন আনছে।
উপসংহার
সরকারি হাসপাতালে সন্ধ্যার শিফট চালুর ধারণা বাস্তবসম্মত এবং মানুষের জন্য উপকারী হতে পারে। কিন্তু শুধু হাসপাতালের দরজা কয়েক ঘণ্টা বেশি খোলা রাখলেই চিকিৎসাসেবা বাড়ে না। জনবল, পারিশ্রমিক, ওষুধ ও সরঞ্জামের সরবরাহ, নিরাপত্তা এবং জবাবদিহি একসঙ্গে পরিকল্পনা ও অর্থায়ন করতে হবে। সেই প্রস্তুতি ছাড়া উদ্যোগটি আরেকটি ভালো ঘোষণায় পরিণত হতে পারে, যা আলোচনার টেবিল পেরিয়ে বাস্তবে পৌঁছাতে পারে না।
