ফারজানা নূপুর
স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটি
ধাননির্ভর একক কৃষি ব্যবস্থা থেকে বহুমুখীকরণ, জলবায়ু সহনশীল কৃষি, ভূমির মালিকানা ও ব্যবহারব্যবস্থায় সংস্কার এবং শক্তিশালী বাজার অবকাঠামো গড়ে তোলাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের বর্তমান টেকসই কৃষি পরিকল্পনা প্রণীত হয়েছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে। তাই প্রশ্ন উঠতেই পারে, ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ক্ষমতায় থাকা বিএনপির কৃষিনীতি ও বাস্তব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে বর্তমান পরিকল্পনার কতটা মিল বা অমিল রয়েছে।
দুই সময়ের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা এক নয়। তারপরও এই তুলনা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, একই রাজনৈতিক দলের কৃষিনীতি দুই দশকে কতটা বদলেছে এবং কৃষি উন্নয়ন নিয়ে তাদের ভাবনার পরিধি কতটা বিস্তৃত হয়েছে, সেই চিত্র এই তুলনার মাধ্যমে স্পষ্ট হয়।
কৃষির প্রবৃদ্ধি: তখন ও এখন
২০০১ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতি বছরে গড়ে প্রায় ৩ শতাংশ হারে বেড়েছিল। এই প্রবৃদ্ধি ছিল ধারাবাহিক, তবে বড় ধরনের পরিবর্তন আনার মতো দ্রুত নয়। মূলত ধানের উৎপাদনশীলতা ধীরে ধীরে বাড়ানোর ওপর নির্ভর করেই এই প্রবৃদ্ধি এসেছিল। সেচ অবকাঠামোর সম্প্রসারণ এবং আগের কৃষি সংস্কারের ধারায় উচ্চফলনশীল জাতের ব্যবহার বৃদ্ধিও এতে ভূমিকা রাখে।
এই অগ্রগতি বাস্তব হলেও এর পরিধি ছিল সীমিত। নীতি ও বিনিয়োগের বড় অংশই শস্য উৎপাদনকে ঘিরে ছিল। ফলে উচ্চমূল্যের ফসল, মৎস্যচাষ কিংবা কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ খাত গ্রামীণ আয় ও রপ্তানি আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে তেমনভাবে বিকশিত হওয়ার সুযোগ পায়নি। অর্থাৎ, ওই সময়ের কৃষি প্রবৃদ্ধির মূল ভিত্তি ছিল বহুমুখীকরণের বদলে বিদ্যমান ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা। ধান ও অন্যান্য শস্যকেন্দ্রিক কৃষি ব্যবস্থার উৎপাদনশীলতা বাড়ানোই ছিল প্রধান লক্ষ্য, কৃষির ভেতরে নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার পথ তৈরি করা নয়।
বর্তমান পরিকল্পনা সেই কাঠামো থেকে লক্ষ্য ও কাঠামো দুদিক থেকেই ভিন্ন। খাদ্যশস্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতাকে চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসেবে না দেখে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর জন্য কৃষির ভিত্তিকে আরও বিস্তৃত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ডাল, তেলবীজ, সবজি, ফল এবং মৎস্যচাষকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নির্ভুল কৃষি ব্যবস্থাপনা ও সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার মতো পদ্ধতি গ্রহণের কথা বলা হয়েছে, যা আগের কৃষিনীতি কাঠামোয় খুব বেশি গুরুত্ব পায়নি।
নতুন ফসল যুক্ত করার মধ্যেই পরিবর্তনের পুরো চিত্র সীমাবদ্ধ নয়। নির্ভুল কৃষি ব্যবস্থাপনা বলতে তথ্যভিত্তিকভাবে সার, পানি ও অন্যান্য কৃষি উপকরণ ব্যবহার এবং জমির ধরন অনুযায়ী চাষাবাদের দিকে এগিয়ে যাওয়াকে বোঝায়। অন্যদিকে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা নির্বিচারে রাসায়নিক ব্যবহার কমিয়ে পরিবেশ ও কৃষির ভারসাম্য বিবেচনায় রেখে প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর জোর দেয়।
পরিকল্পনার নকশা অনুযায়ী বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে এই পরিবর্তন ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের কৃষি ব্যবস্থার তুলনায় একটি কাঠামোগত পরিবর্তন আনতে পারে। আগের সময়ে একই ধরনের ফসলের উৎপাদন বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। বর্তমান পরিকল্পনা সেখানে একটি বহুমুখী কৃষি অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্য সামনে এনেছে। ফলে পরিবর্তনটা শুধু ধাপে ধাপে অগ্রগতির নয়, বরং কৃষি উন্নয়নের দৃষ্টিভঙ্গিতেও বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
| সূচক | ২০০১ থেকে ২০০৬, বিএনপি ও খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে | বর্তমান পরিকল্পনা, প্রস্তাবিত লক্ষ্য |
| কৃষি খাতের গড় প্রবৃদ্ধি | বছরে প্রায় ৩ শতাংশ | খাদ্যশস্যনির্ভর প্রবৃদ্ধির চেয়ে বেশি বহুমুখী প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য |
| ফসলের ভিত্তি | ধাননির্ভর | ধান, ডাল, তেলবীজ, ফল ও মৎস্যচাষ |
| কৃষি উপকরণ নীতি | সার সরবরাহকেন্দ্রিক ভর্তুকি | উৎপাদনশীলতা ও পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ভর্তুকি সংস্কার |
| জলবায়ু মোকাবিলা | অনেকাংশে পরিস্থিতিনির্ভর | জলবায়ু সহনশীল কৃষিকে নিয়মিত চর্চায় পরিণত করার লক্ষ্য |
কৃষি উপকরণে ভর্তুকি ও সারের সংকট
দুই সময়ের কৃষিনীতি তুলনা করলে সবচেয়ে বড় পার্থক্য দেখা যায় সার ও কৃষি উপকরণ ব্যবস্থাপনায়। ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে ভর্তুকিযুক্ত কৃষি উপকরণ বিতরণ ব্যবস্থা শেষ দিকে বড় ধরনের চাপে পড়ে। ২০০৬ সালে কানসাট, শেরপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় কৃষকদের প্রাণঘাতী বিক্ষোভ সেই ব্যবস্থার দুর্বলতার কঠিন বাস্তবতা সামনে নিয়ে আসে। কৃষি উপকরণের চাহিদা বাড়লেও পুরোনো সরবরাহব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় সংস্কার না হওয়ায় সংকট আরও গভীর হয়।
বর্তমান পরিকল্পনায় সবার জন্য একই ধরনের সার সরবরাহের পরিবর্তে উৎপাদনশীলতা ও পরিবেশগত লক্ষ্য অর্জনের সঙ্গে ভর্তুকিকে যুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে। ধান ছাড়া অন্যান্য ফসলের জন্য মানসম্মত বীজব্যবস্থায়ও উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগের কথা বলা হয়েছে।
তবে সংস্কারের প্রস্তাব কাগজে থাকা আর বাস্তবে কার্যকর হওয়া এক বিষয় নয়। পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে তবেই বোঝা যাবে, কৃষি খাত আগের সময়ের মতো সরবরাহ সংকটের পুনরাবৃত্তি এড়াতে পারছে কি না।
জমি, পানি ও জলবায়ু সহনশীলতা
বিএনপির আগের মেয়াদে জমির খণ্ডীকরণ ও পানির ওপর বাড়তে থাকা চাপ ছিল বাস্তব সমস্যা। তবে কৃষিনীতি নির্ধারণে এসব বিষয় মূল আলোচনার কেন্দ্রে ছিল না। সেচ সম্প্রসারণকে মূলত কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর উপায় হিসেবে দেখা হতো, প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনার বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে নয়।
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিও তখন কৃষি পরিকল্পনায় কাঠামোবদ্ধভাবে খুব বেশি গুরুত্ব পায়নি। বন্যা বা খরার মতো দুর্যোগ দেখা দিলে তার প্রতিক্রিয়া জানানোই ছিল প্রধান প্রবণতা। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে অভিযোজন ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ তুলনামূলকভাবে সীমিত ছিল।
বর্তমান পরিকল্পনায় ভূমির মালিকানা ও ব্যবহারব্যবস্থায় সংস্কার, স্বেচ্ছাভিত্তিক ইজারা ব্যবস্থা এবং কৃষিযন্ত্র ব্যবহারের জন্য ভাড়াভিত্তিক সেবা কেন্দ্রকে কৃষির পরিসর বাড়ানোর গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
পাশাপাশি জলবায়ু সহনশীল কৃষিকে নিয়মিত কৃষিচর্চার অংশ করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। লবণাক্ততা সহনশীল জাত, পালাক্রমে জমি ভেজানো ও শুকানোর পদ্ধতি এবং ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ ব্যবস্থার মতো উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে।
গত দুই দশকে জলবায়ু বিজ্ঞান, বন্যা, খরা ও লবণাক্ততার অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের কৃষিনীতি বদলে দিয়েছে। বর্তমান পরিকল্পনায় সেই বাস্তবতার প্রতিফলন স্পষ্ট।
প্রাতিষ্ঠানিক ও বাজার অবকাঠামো
২০০১ থেকে ২০০৬ সালের সময়ে ফসল কাটার পর সংরক্ষণ ব্যবস্থা, শীতল সংরক্ষণ ও পরিবহনব্যবস্থা এবং কৃষকদের সম্মিলিতভাবে বাজারে প্রবেশের সুযোগ ছিল তুলনামূলকভাবে দুর্বল। কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সরবরাহ ব্যবস্থায় সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগও সীমিত ছিল।
বর্তমান পরিকল্পনায় এসব বিষয়কে কৃষি উন্নয়নের মূল কর্মসূচির মধ্যে রাখা হয়েছে। ডিজিটাল কৃষি পরামর্শ, আধুনিক বাজার তথ্যব্যবস্থা, ক্ষুদ্র কৃষক ও নারী কৃষকদের জন্য ঋণ সুবিধা এবং ফসল বিমার সুযোগ সম্প্রসারণের কথাও বলা হয়েছে।
২০০১ থেকে ২০০৬ সালের কৃষিনীতি আলোচনায় এসব বিষয় খুব বেশি গুরুত্ব পায়নি। ফলে কৃষি উৎপাদনের পাশাপাশি কৃষককে বাজার, অর্থায়ন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করার ক্ষেত্রে বর্তমান পরিকল্পনা তুলনামূলকভাবে অনেক বিস্তৃত।
উপসংহার
বিএনপির আগের মেয়াদের কৃষিনীতি ও বর্তমান টেকসই কৃষি পরিকল্পনা পাশাপাশি রাখলে উচ্চাকাঙ্ক্ষার পরিধির বড় ধরনের পরিবর্তন চোখে পড়ে। আগের সময়ে কৃষি উন্নয়নের মূল ভিত্তি ছিল খাদ্যশস্যকেন্দ্রিক উৎপাদন বৃদ্ধি এবং ভর্তুকিনির্ভর কৃষি উপকরণ সরবরাহ। সেই ব্যবস্থাই শেষ পর্যন্ত ২০০৬ সালের সার সংকটে বড় ধরনের চাপে পড়ে।
বর্তমান পরিকল্পনা সেখানে কৃষির বহুমুখীকরণ, জলবায়ু সহনশীলতা, ভূমি ব্যবস্থাপনা, বাজার অবকাঠামো এবং প্রাতিষ্ঠানিক আধুনিকায়নের দিকে এগিয়ে যেতে চায়।
তবে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন পরিকল্পনাটি কাগজে কতটা আধুনিক বা আকর্ষণীয়, তা নয়। প্রশ্ন হলো, সেই উচ্চাকাঙ্ক্ষার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাস্তবায়নের সক্ষমতা কতটা বেড়েছে।
২০০৬ সালের সার সংকট একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। নীতির লক্ষ্য যত উচ্চই হোক, বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় সরবরাহব্যবস্থা, প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনিক সক্ষমতা তৈরি না হলে সেই নীতি কাঙ্ক্ষিত ফলের বদলে উল্টো সংকট তৈরি করতে পারে।
তথ্যসূত্র:
