শেখ সেলিম
অনিকেত রিসার্চ গ্রুপ
বাংলাদেশ দ্রুত নগরায়ণের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। প্রতিবছর প্রায় ৩ দশমিক ৩ শতাংশ হারে নগর সম্প্রসারণ ঘটছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার দ্রুততম নগরায়ণ প্রবণতার একটি। এই নগর বৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হলো গ্রাম থেকে শহরমুখী মানুষের স্থানান্তর, যা মোট নগরায়ণের প্রায় দুই তৃতীয়াংশের জন্য দায়ী।
প্রতিবছর প্রায় ৮০ হাজার হেক্টর আবাদি জমি নির্মাণকাজ, শিল্পাঞ্চল, ইটভাটা এবং আবাসন প্রকল্পের দখলে চলে যাচ্ছে। ২০০০ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশ মোট ৮ দশমিক ৮২ মিলিয়ন হেক্টর কৃষিজমির মধ্যে প্রায় ১৬ লাখ হেক্টর আবাদি জমি হারিয়েছে। অর্থাৎ প্রতিবছর দেশের কৃষিজমির প্রায় ১ শতাংশ বিলীন হয়ে যাচ্ছে। (তথ্যের উৎস: বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো)
ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা ও সিলেটের আশপাশে ধান ও পাটের ক্ষেতের জায়গা দখল করে নিচ্ছে ইট ও কংক্রিটের বিস্তার। এই পরিসংখ্যান শুধু ভূদৃশ্যের পরিবর্তন নয়, বরং ১৭ কোটি মানুষের খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদের ক্ষয়।
নগরায়ণ ও শিল্পায়নের চাপে হারিয়ে যাচ্ছে কৃষিজমি
রূপান্তরিত কৃষিজমির সবচেয়ে বড় অংশ যাচ্ছে বেসরকারি আবাসন ও রিয়েল এস্টেট প্রকল্পের দখলে। যেখানে একসময় ধান, সবজি ও ফসল উৎপাদন হতো, সেখানে এখন দেখা যাচ্ছে ইট, বালু এবং নির্মাণসামগ্রীর স্তূপ। এরপর আসে সড়ক, সরকারি স্থাপনা এবং বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প। পরিকল্পিত ও অপরিকল্পিত উভয় ধরনের শিল্পাঞ্চলও দ্রুত কৃষিজমি দখল করছে।
বড় শহরের আশপাশের এলাকাগুলোতে একসময়ের উৎপাদনশীল কৃষিজমি এখন বহুতল ভবন, বিপণিবিতান এবং প্রশস্ত সড়কে রূপান্তরিত হচ্ছে। ভূমি ব্যবসায়ী ও আবাসন প্রতিষ্ঠানগুলো কৃষকদের এমন এককালীন অর্থের প্রস্তাব দিচ্ছে, যা অনেক সময় কৃষিকাজ থেকে পাওয়া বার্ষিক আয়ের চেয়ে বেশি। ফলে তা কৃষকদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। দারিদ্র্য, সচেতনতার অভাব এবং নতুন প্রজন্মের কৃষিকাজের প্রতি আগ্রহ কমে যাওয়া জমি বিক্রির প্রবণতাকে আরও ত্বরান্বিত করছে।
২০১১ সালের কৃষিজমি সুরক্ষা ও ভূমি ব্যবহার নীতির লক্ষ্য ছিল এই ধরনের রূপান্তর রোধ করা। কিন্তু বাস্তবে এর কার্যকর প্রয়োগ এখনো সীমিত। কোন অঞ্চল কৃষির জন্য সংরক্ষিত থাকবে, কোথায় আবাসন হবে এবং কোথায় শিল্প স্থাপিত হবে, তা নির্ধারণের জন্য এখনো একটি পূর্ণাঙ্গ ও সমন্বিত পরিকল্পনার অভাব রয়েছে। যেখানে কিছু মাস্টারপ্ল্যান রয়েছে, সেখানেও বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় গতি ও সমন্বয়ের ঘাটতি দেখা যায়।
মানবসম্পদ ও গ্রামীণ জীবিকার ওপর প্রভাব
কৃষিজমি হারানোর প্রভাব শুধু মাটির ক্ষয়ক্ষতিতে সীমাবদ্ধ নয়। এর গভীর অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব রয়েছে। যেসব পরিবার কৃষিজমির ওপর নির্ভর করে জীবন ধারণ করে, জমি হারানোর পর তারা বিকল্প দক্ষতা বা পর্যাপ্ত শিক্ষা না থাকায় শহরে চলে আসে এবং অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজারে যুক্ত হয়। অনেকে রিকশাচালক, নির্মাণ শ্রমিক বা পথব্যবসায়ী হিসেবে কাজ শুরু করে। তাদের আয় অনিশ্চিত এবং অনেক ক্ষেত্রেই কৃষিকাজ থেকে পাওয়া আয়ের তুলনায় কম। শহরের আশপাশে বসবাসকারী অনেক পরিবারের ক্ষেত্রে দেখা যায়, দূরবর্তী গ্রামীণ এলাকার পরিবারের তুলনায় খাদ্য, স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় তাদের ব্যয় কমে যায়। অর্থাৎ নগরায়ণ সব সময় জীবনমান উন্নয়নের নিশ্চয়তা দেয় না।
বর্তমানে বাংলাদেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৪৪ শতাংশ কৃষির সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু কৃষিতে প্রশিক্ষিত ও দক্ষ মানবসম্পদের সংখ্যা দ্রুত কমছে। তরুণ প্রজন্ম এমন একটি পেশায় ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছে না, যেখানে জমি কমছে এবং আয় অনিশ্চিত। ফলে তারা শহরমুখী হচ্ছে। এর ফলে খাদ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় শ্রমশক্তি কমছে এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে কৃষি জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা স্থানান্তরের ধারাও দুর্বল হচ্ছে। নারী কৃষকরাও এই পরিবর্তনের শিকার হচ্ছেন। ফসল সংগ্রহ পরবর্তী প্রক্রিয়াজাতকরণ, বীজ সংরক্ষণ এবং কৃষিকাজের বিভিন্ন পর্যায়ে নারীদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান থাকলেও জমি বিক্রির সিদ্ধান্তে তাদের মতামত অনেক সময় উপেক্ষিত হয়।
প্রতিবছর প্রায় ৬০ লাখ টন খাদ্যশস্য আমদানি করে। কৃষিজমি হারানোর বর্তমান হার অব্যাহত থাকলে ২০৪০ সালের মধ্যে আমদানিনির্ভরতা দ্বিগুণ হতে পারে।এতে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়বে এবং বৈশ্বিক সরবরাহ সংকট, মূল্যবৃদ্ধি কিংবা আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক সংঘাতের কারণে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়বে।
সংকট মোকাবিলায় নীতিগত সংস্কার
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার সময় এসেছে। ভূমি জোনিং ও সুরক্ষা আইন ২০২৪ প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন জরুরি। ভূমি মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে এ সংক্রান্ত একটি খসড়া আইন তৈরি করেছে, যেখানে কৃষি, আবাসিক, শিল্প, জলাভূমি, বন এবং পাহাড়সহ ভূমিকে ১০টি শ্রেণিতে ভাগ করার প্রস্তাব রয়েছে। আইন ভঙ্গের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড এবং ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। এই আইন দ্রুত পাস করা এবং এর বাস্তবায়নের জন্য ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি বিশেষায়িত কার্যকরী ইউনিট গঠনকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
একই সঙ্গে ডিজিটাল ভূমি জোনিং মানচিত্র সম্পূর্ণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি জমির বৈজ্ঞানিক শ্রেণিবিন্যাস জনগণের জন্য উন্মুক্ত করা হলে অবৈধভাবে জমির শ্রেণি পরিবর্তনের সুযোগ কমবে এবং আইন প্রয়োগ আরও স্বচ্ছ হবে। বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণে কৃষক, নারী এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে জনসম্পৃক্ত কমিটি গঠন করা যেতে পারে। সরকারকে নগর উন্নয়নে উল্লম্ব সম্প্রসারণকে উৎসাহিত করতে হবে। উর্বর কৃষিজমি দখল করে শহর ছড়িয়ে দেওয়ার পরিবর্তে বহুতল ভবন নির্মাণ ও পরিকল্পিত ঘন নগরায়ণের মাধ্যমে শহরের সম্প্রসারণ ঘটাতে হবে।
কৃষিকে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক ও প্রতিযোগিতামূলক করতে বাজার ব্যবস্থাতেও সংস্কার প্রয়োজন। সহজ ঋণ, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ, আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতিতে ভর্তুকি এবং ফসল বীমা কৃষকদের জমি বিক্রির চাপ কমাতে পারে। দেশীয় বীজ, জৈব সার এবং ব্যয়সাশ্রয়ী পদ্ধতিনির্ভর কৃষি ব্যবস্থা মাটির স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধার করতে পারে এবং উৎপাদন ব্যয় কমাতে পারে।
জমি হারানোর আগে বিকল্প জীবিকার পথ তৈরি করতে হবে। শহরের আশপাশের এলাকায় কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, উদ্যানচাষ, মৎস্যচাষ এবং ডিজিটাল কৃষি বিষয়ে প্রশিক্ষণ বাড়াতে হবে, যাতে কৃষকরা অবশিষ্ট জমি থেকে আরও বেশি মূল্য তৈরি করতে পারেন। ভূমি দখল সংক্রান্ত মামলার জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনও জরুরি। সাধারণ আদালতে অনেক সময় শক্তিশালী আবাসন ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
তাই দ্রুত বিচার ব্যবস্থা এবং অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে বাধ্যতামূলক পরিবেশ পুনরুদ্ধার কার্যক্রম নিশ্চিত করতে হবে। এতে স্পষ্ট হবে যে কৃষিজমি রক্ষা কেবল একটি নীতি নয়, বরং রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি ও অপরিবর্তনীয় অঙ্গীকার। এই সংস্কারগুলো না হলে বাস্তবতা খুব কঠিন হবে: যে দেশ নিজের খাদ্য উৎপাদনের জমি কংক্রিটে ঢেকে ফেলে এবং পরে খাদ্যের জন্য অন্য দেশের ওপর নির্ভরশীল হয়, সে দেশ ধীরে ধীরে তার খাদ্য সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা দুটোই হারায়। ভবন হয়তো আরও উঁচু হবে, কিন্তু সেই কংক্রিটের নিচে চাপা পড়া উর্বর মাটি আর কখনো ফিরে আসবে না।
