নাঈমা অনামিকা
কমিশনিং সম্পাদক, অনিকেত বুলেটিন
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বৃহৎ অংশ হলো মাদ্রাসা শিক্ষা। দেশের লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থী, বিশেষ করে নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানরা, আলিয়া ও কওমি মাদ্রাসার মাধ্যমে শিক্ষা গ্রহণ করে থাকে। দীর্ঘদিন ধরে এই প্রতিষ্ঠানগুলো ধর্মীয় শিক্ষা বিস্তার, নৈতিক মূল্যবোধ গঠন এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। তবে বিশ্বায়ন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং পরিবর্তিত শ্রমবাজারের বাস্তবতায় মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থাকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। ফলে ধর্মীয় ঐতিহ্য অক্ষুণ্ণ রেখে আধুনিক জ্ঞান ও দক্ষতার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পরিচিত করানো এখন সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবি।
দ্বিমুখী মাদ্রাসা কাঠামো: বৈষম্যের বাস্তবতা
বাংলাদেশের মাদ্রাসা শিক্ষা মূলত দুই ধারায় পরিচালিত হয়, আলিয়া ও কওমি। আলিয়া মাদ্রাসাগুলো সরকারি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে পরিচালিত হয় এবং ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি কিছু সাধারণ বিষয়ও পাঠদান করা হয়। অন্যদিকে কওমি মাদ্রাসাগুলো মূলত স্বাধীনভাবে পরিচালিত হয় এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে দান ও ক্ষেত্রবিশেষে শিক্ষার্থীর প্রদানকৃত বেতন নির্ভর। তাদের পাঠ্যক্রম এখনও অনেকাংশে আঠারো শতকের দারস-ই-নিজামি সিলেবাসের ওপর নির্ভরশীল।
এই দ্বৈত কাঠামোর ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে জ্ঞান ও দক্ষতার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে। আলিয়া শিক্ষার্থীরা সীমিত পরিসরে আধুনিক শিক্ষার সুযোগ পেলেও কওমি শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, গণিত ও ইংরেজি শিক্ষার পর্যাপ্ত সুযোগ থেকে বঞ্চিত থাকে। ফলে উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে তারা তুলনামূলকভাবে অনেকখানি পিছিয়ে পড়ে। সংস্কারের যে দিকগুলো অপরিহার্য বা যার কোন বিকল্প নেই, এমন কিছু দিক নিয়ে আমি আলোচনায় যেতে চাই। মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থায় কিছু বিষয়ে পরিবর্তন এবং কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন এখন সময়ের দাবী।
পাঠ্যক্রম আধুনিকায়ন
মাদ্রাসা শিক্ষার সবচেয়ে জরুরি সংস্কার হলো পাঠ্যক্রম আধুনিকায়ন। বর্তমান বিশ্বে ধর্মীয় জ্ঞানের পাশাপাশি বিজ্ঞান, গণিত, তথ্যপ্রযুক্তি, সামাজিক বিজ্ঞান, নাগরিক শিক্ষা এবং ইংরেজি ভাষাজ্ঞান অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পাঠ্যক্রম সংস্কারের লক্ষ্য ধর্মীয় শিক্ষাকে প্রতিস্থাপন করা নয়; বরং ধর্মীয় ও আধুনিক জ্ঞানের মধ্যে একটি কার্যকর সমন্বয় গড়ে তোলা। একজন শিক্ষার্থী যেন ইসলামী জ্ঞানে দক্ষ হওয়ার পাশাপাশি আধুনিক রাষ্ট্র, সমাজ ও অর্থনীতির বাস্তবতাও বুঝতে পারে, সেই সক্ষমতা তৈরি করাই হওয়া উচিত সংস্কারের মূল উদ্দেশ্য।
শিক্ষক প্রশিক্ষণ
মানসম্মত শিক্ষার পূর্বশর্ত দক্ষ শিক্ষক। পাঠ্যক্রম যতই উন্নত হোক, দক্ষ শিক্ষক ছাড়া তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। বর্তমানে অনেক মাদ্রাসায় এখনও মুখস্থনির্ভর শিক্ষা পদ্ধতির আধিক্য দেখা যায়, যা শিক্ষার্থীদের বিশ্লেষণী চিন্তা, সমস্যা সমাধান ও সৃজনশীলতার বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে। এক্ষেত্রে অবিলম্বে শিক্ষক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করা জরুরি। আধুনিক শিক্ষণ-পদ্ধতি, প্রযুক্তির ব্যবহার, শ্রেণিকক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং নতুন বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান অর্জনের সুযোগ শিক্ষকদের জন্য নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে যোগ্য শিক্ষক আকর্ষণ ও ধরে রাখতে বেতন-ভাতা ও পেশাগত সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
কর্মমুখী ও কারিগরি শিক্ষা
বাংলাদেশে প্রতিবছর বিপুল সংখ্যক মাদ্রাসা শিক্ষার্থী শিক্ষাজীবন শেষ করে শ্রমবাজারে প্রবেশ করে। কিন্তু তাদের অনেকেরই ধর্মীয় জ্ঞানের বাইরে কর্মসংস্থান উপযোগী দক্ষতা সীমিত থাকে। এই বাস্তবতায় তথ্যপ্রযুক্তি, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি, ইলেকট্রনিক্স, দর্জিবিদ্যা এবং অন্যান্য কারিগরি বিষয়ে প্রশিক্ষণ অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। এতে শিক্ষার্থীরা ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি জীবন ও জীবিকার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতাও অর্জন করবে। ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার মতো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলো এ ধরনের সমন্বিত শিক্ষা মডেলের সফল উদাহরণ তৈরি করেছে।
জবাবদিহিতা ও মাননিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা
বিশেষ করে কওমি মাদ্রাসাগুলোর ক্ষেত্রে কার্যকর মাননিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহিতা কাঠামোর অভাব দীর্ঘদিনের একটি আলোচিত বিষয়। যদিও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের স্বাতন্ত্র্য ও স্বাধীনতা রক্ষা গুরুত্বপূর্ণ, তবুও রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো নিশ্চিত করা যে দেশের প্রতিটি শিক্ষার্থী একটি ন্যূনতম মানসম্পন্ন শিক্ষা পাচ্ছে। এজন্য কওমি আলেম, শিক্ষাবিদ, অভিভাবক ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে একটি গ্রহণযোগ্য নিয়ন্ত্রক কাঠামো প্রণয়ন করা যেতে পারে। এই কাঠামোতে পাঠ্যক্রমের ন্যূনতম মান, শিক্ষক যোগ্যতা, শিক্ষার্থীদের কল্যাণ এবং অবকাঠামোগত মানদণ্ড অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। তবে কোনোভাবেই ধর্মীয় পরিচয় বা শিক্ষার মৌলিক চরিত্র ক্ষুণ্ন করা উচিত নয়।
সমতা আনায়ন
মাদ্রাসা শিক্ষা সংস্কারের প্রশ্নটি মূলত সামাজিক ন্যায়বিচার ও সমঅধিকারের প্রশ্ন। একজন মাদ্রাসা শিক্ষার্থীও যেন সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থার শিক্ষার্থীর মতো উচ্চশিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক অগ্রগতির সমান সুযোগ পায়, সেটিই হওয়া উচিত রাষ্ট্রের লক্ষ্য। আধুনিকায়িত মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা এমন একটি প্রজন্ম গড়ে তুলতে পারে, যারা ধর্মীয় মূল্যবোধে দৃঢ় থাকার পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর ও প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে সফলভাবে নিজেদের অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে। ফলে মাদ্রাসা সংস্কারকে ধর্মীয় পরিচয়ের বিরুদ্ধে কোনো উদ্যোগ হিসেবে নয়, বরং দেশের মানবসম্পদ উন্নয়ন ও স্থায়ী জাতীয় অগ্রগতির জন্য একটি অপরিহার্য বিনিয়োগ হিসেবে দেখা উচিত।
উপসংহার
বাংলাদেশের মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার এখন আর কেবল একটি নীতিগত আলোচনার বিষয় নয়; এটি জাতীয় উন্নয়নের অপরিহার্য শর্তে পরিণত হয়েছে। ধর্মীয় ঐতিহ্য ও আধুনিক শিক্ষার মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটি সমন্বিত, দক্ষ ও যুগোপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। সরকারের উচিত অংশীদারিত্বমূলক ও সংবেদনশীল দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করে ধর্মীয় সম্প্রদায়ের আস্থা অর্জনের মাধ্যমে এমন সংস্কার বাস্তবায়ন করা, যা সর্বোপরি শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎকে সমৃদ্ধ করবে এবং দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে অবদান রাখবে।
