শেখ সেলিম
বেশি দিন আগের কথা নয়, বসার ঘরের একটিমাত্র টেলিভিশনই একটি বাংলাদেশি পরিবারকে এক জায়গায় জড়ো করত। সেই পর্দার সঙ্গে ছিল একটা অলিখিত সমঝোতাও: কী দেখা যাবে, কী মুখে আনা যাবে, আর কী মনে রাখার মতো। সম্মিলিতভাবে ভালো-মন্দ বেছে নেওয়ার সেই চল এখন প্রায় নেই। তার জায়গায় এসেছে অগণিত ব্যক্তিগত পর্দা। প্রতিটি পর্দায় চলছে নিজস্ব অ্যালগরিদম, আর সবগুলোরই লক্ষ্য এক: এক মিনিটের মধ্যে যা মনোযোগ কাড়তে পারে, তাকেই পুরস্কৃত করা।
গত এক দশকে বাংলাদেশ আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম গভীর সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে গেছে, অথচ এই পরিবর্তনের গতিপথ ঠিক করতে বিবেক প্রায় কোনো ভূমিকাই রাখেনি। এটি চালিয়েছে ক্লিক। এই সম্পাদকীয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিরুদ্ধে নয়, কল্পিত কোনো সোনালি অতীতের শিষ্টাচারে ফেরার আর্জিও নয়। আমরা চাই, প্রচার, আয় আর প্রাসঙ্গিকতার নামে কী কী স্বাভাবিক হয়ে গেছে, তা সৎভাবে খতিয়ে দেখা এবং নিজেদের জিজ্ঞেস করা, দেশ আজ যা হয়ে উঠেছে, তাতে আমরা স্বস্তি পাচ্ছি কি না।
এক দশকের সাজানো অশালীনতা
আজ বাংলাদেশের যেকোনো বড় সামাজিক প্ল্যাটফর্মে একটু স্ক্রল করলেই একটা ছক চোখে পড়ে, যা আর না দেখে থাকা যায় না। পারিবারিক ঝগড়া এখন ঘটনাচক্রে ক্যামেরায় ধরা পড়ে না, আগে থেকে মহড়া দিয়ে সাজানো হয় এবং আপলোড করা হয় যেন সবকিছু আচমকা ঘটেছে। চায়ের দোকানি, বাড়ি ফেরা নারী বা অর্ডার গুলিয়ে ফেলা ডেলিভারি রাইডারকে অনুমতি ছাড়াই ভিডিও করা হয়, তাঁদের বিব্রত অবস্থা হয়ে ওঠে এমন মানুষের হাসির খোরাক, যাঁদের সঙ্গে জীবনে কখনো দেখা হবে না।
ধর্মীয় অনুভূতি, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা আর শ্রেণিবিদ্বেষ এসব ভিডিওতে শুধু উপস্থিত থাকে না, ইচ্ছে করেই উসকে দেওয়া হয়। কারণ ক্ষোভ যত দ্রুত ও যত দূরে ছড়ায়, সম্মতি তা কখনো ছড়ায় না। ইনফ্লুয়েন্সারদের কাছে এখন সংঘাত আলাদা একটি ঘরানা। দোকানে, রিকশা স্ট্যান্ডে বা প্রতিপক্ষের মন্তব্যের ঘরে তাঁরা ঢোকেন ফলাফল আগে থেকে ঠিক করে, অপমান মেপে বসিয়ে যাতে বেশি জ্বালা ধরে। আর তাতে যে রাগ তৈরি হয়, ক্লিপ একদিন পুরোনো হওয়ার আগেই তা বিজ্ঞাপনের আয়ে রূপ নেয়।
বিজ্ঞাপনও একই যুক্তি ঠেকিয়ে না রেখে আত্মস্থ করেছে। বিতর্কের চেহারা এখন ইচ্ছে করেই ধার করা হয়: কৌতুকের মোড়কে নারীবিদ্বেষ, আপন-করে-নেওয়ার ছলে সাম্প্রদায়িক গৎবাঁধা ছবি, সাহসী গল্পের নামে সাজানো আগ্রাসন। যে ব্র্যান্ড একসময় সুনাম আগলে রাখত, তারা এখন বানানো কেলেঙ্কারির পেছনে ছোটে, কারণ অ্যালগরিদম বুঝতে পারে না কে বিজ্ঞাপনটি ভালোবাসছে আর কে ক্ষোভে ফুঁসছে। দুর্নীতিও একইভাবে কাঁচামালে পরিণত হয়েছে। প্রকৃত অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা এখনো আছে, কিন্তু তাকে লড়তে হয় নাটুকে ক্ষোভের বিশাল স্রোতের সঙ্গে, যা জবাবদিহির অনুভূতি দেয়, অথচ তার সারবস্তু একেবারেই দেয় না। এ যেন খারাপ মালে ভরা বাজার, যেখানে ভালো জিনিস চেনাই দায়।
এর কিছুই আকস্মিক নয়। শুধু মনোযোগের ওপর দাঁড়ানো একটি ব্যবসায়িক মডেলের থেকে এটাই প্রত্যাশিত ফল, যেখানে সেই মনোযোগ সৎ উপায়ে অর্জিত হলো কি না, তা জিজ্ঞেস করার কোনো ব্যবস্থাই নেই। শালীনতা নীরব, তার প্রতিদান আসে ধীরে। নিষ্ঠুরতা, অপমান আর তামাশা মেলে তাৎক্ষণিকভাবে এবং তা অবিরাম ছড়ানোও যায়। তাই ফিডে কোনটি রাজত্ব করছে, তা নিয়ে অবাক হওয়ার কিছু নেই।
যেখানে মানবাধিকার চুপিসারে হারিয়ে যায়
এ সবকে শুধু রুচির দুর্বলতা বলে উড়িয়ে দেওয়া সহজ। কিন্তু ব্যাপারটা তা নয়। কেউ ব্যক্তিগত বা অসহায় মুহূর্তে তাঁর অনুমতি ছাড়া ক্যামেরাবন্দি হলে এবং সেই ফুটেজ থেকে আয় হলে, তাঁর মর্যাদা কার্যত অন্যের বিজ্ঞাপনের জায়গা হিসেবে বিক্রি হয়ে যায়। শুধু বিনোদনের জন্য সাজানো সহিংসতা, ভুয়া মারামারি বা বানানো সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা আপলোড হলে কল্পনা আর প্রকৃত উসকানির সীমারেখা ঝাপসা হয়ে আসে। যে দেশে গত এক দশকে অনলাইনের গুজবে সত্যিকারের গণপিটুনি ও সহিংসতা ঘটেছে, সেখানে এটা বিশেষভাবে বিপজ্জনক।
নারী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু বা অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা মানুষকে বারবার এসব ভিডিওতে হাসির পাত্র বা উসকানিদাতা হিসেবে হাজির করা হলে প্ল্যাটফর্মগুলো কেবল সমাজের বিদ্যমান বিভাজনের প্রতিফলন ঘটায় না, মুনাফার জন্য সেগুলোর মহড়া দেয় এবং গভীর করে তোলে। একে রুচির প্রশ্ন বলে এড়িয়ে না গিয়ে স্পষ্ট ভাষায় মানবাধিকারের সমস্যা বলাই উচিত।
মর্যাদা, নিজের ছবি ও গল্পের ওপর সম্মতির অধিকার এবং উসকানিমুক্ত জীবনের অধিকার আইনের বইয়ে বন্দী কোনো বিমূর্ত নীতি নয়। বাংলাদেশের সামাজিক ফিডে প্রতিদিন এগুলো ছোট ছোট টুকরো হয়ে ক্ষয়ে যাচ্ছে, আর সেই টুকরোগুলো থেকেই আয় হচ্ছে। যেহেতু এই ক্ষতি কোনো একটি চোখে পড়ার মতো বিপর্যয়ে জমাট বাঁধেনি, ছড়িয়ে আছে লাখো ক্লিপে, তাই সমাজ এর গুরুত্ব কম করে দেখেছে এবং যে তৎপরতা দরকার ছিল, তা দেখাতেও দেরি করেছে।
রেটিং কি সমাধান?
সিনেমা ও সম্প্রচারের ঐতিহ্য থেকে ধার করা কনটেন্ট রেটিংকে প্রায়ই সহজ সমাধান হিসেবে হাজির করা হয়। কনটেন্টে লেবেল দেওয়া হবে, বয়স ও সংবেদনশীলতা অনুযায়ী অ্যালগরিদম তা সাজাবে, আর প্রাপ্তবয়স্করা নিজের পছন্দ বেছে নেবেন। এর কিছুটা মূল্য আছে। গ্রাফিক দৃশ্য, সাজানো সংঘাত বা অশ্লীল ভাষায় স্পষ্ট লেবেল ব্যবহারকারীদের, বিশেষ করে অভিভাবকদের, সচেতন সিদ্ধান্ত নেওয়ার একটি হাতিয়ার দেয়। কিন্তু রেটিং ধরে নেয় যে কনটেন্ট সুসংগঠিত, কেন্দ্রীয়ভাবে তৈরি, যা অধিকাংশ ভাইরাল ভিডিওর ক্ষেত্রে খাটে না।
চলচ্চিত্র স্টুডিওর জন্য বানানো রেটিং ব্যবস্থা দিয়ে শোবার ঘর থেকে রিয়েল টাইমে আপলোড করা লাখো নির্মাতাকে সামলানো সহজ নয়। বড়জোর এটি সমস্যার কিনারায় একটি আংশিক ছাঁকনির কাজ করে। কিন্তু যে প্রণোদনা-কাঠামো গোড়াতেই বানানো ক্ষোভকে পুরস্কৃত করে, সে বিষয়ে এটি কিছুই করে না।
মডারেশন কি সমাধান?
প্ল্যাটফর্ম বা নিয়ন্ত্রক সংস্থার মডারেশন তুলনামূলক ভালো কাজ করলেও এর নিজস্ব গুরুতর ঝুঁকি আছে। কড়া কনটেন্ট মডারেশন, বিশেষ করে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে থাকলে, ইতিহাসে বারবার রাজনৈতিক অপব্যবহারের শিকার হয়েছে, শালীনতা রক্ষার নামে বৈধ ভিন্নমত দমন করা হয়েছে। অন্যদিকে প্ল্যাটফর্মের নিজস্ব মডারেশন অসংগত, স্থানীয় সংস্কৃতি ও ভাষার প্রেক্ষাপট বোঝে না, আর ক্ষতি ঠেকানোর বদলে ঘটনার পরে সাড়া দেয়, যখন ভিডিও ততক্ষণে ছড়িয়ে গিয়ে ক্ষতি করে ফেলেছে।
নিরাপত্তা জালের মতো মডারেশন প্রয়োজন, কিন্তু একে প্রতিকার ভাবা ভুল। কনটেন্ট কেন তৈরি হলো আর কেন তা পুরস্কৃত হলো, সেই প্রশ্নে না গিয়ে এটি কেবল ঘটনার পরে উপসর্গ সামলায়।
কঠিন কিন্তু ভালো পথ: সামাজিক রূপান্তর
সবচেয়ে টেকসই সমাধান রেটিং লেবেল বা মডারেশনের সারি নয়। দরকার সামাজিক রীতিনীতি ও শিল্পখাতের মানে সত্যিকারের পরিবর্তন, যেখানে ডিজিটাল শালীনতাকে সেই গুরুত্বে দেখা হবে, যে গুরুত্ব একসময় সামনাসামনি শিষ্টাচারকে দেওয়া হতো। এর অর্থ স্কুল থেকেই মিডিয়া সাক্ষরতার শিক্ষা, যাতে তরুণরা বানানো ক্ষোভ ও সাজানো সংঘাত চিনতে শেখে, শুধু গিলে না ফেলে।
এর অর্থ বিজ্ঞাপনদাতা ও ব্র্যান্ডগুলোর স্বেচ্ছায় এমন মান মেনে চলা, যা বানানো নিষ্ঠুরতার বদলে প্রকৃত সৃজনশীলতাকে পুরস্কৃত করে, এবং এটা বোঝা যে ঝুঁকিতে আছে শুধু পৌঁছানোর সংখ্যা নয়, সুনামের পুঁজিও। এর অর্থ বাংলাদেশে কাজ করা প্ল্যাটফর্মগুলোকে স্থানীয় পর্যায়ে স্বচ্ছ জবাবদিহির আওতায় আনা, যেখানে এখন প্রতিটি বাজারকে একই চোখে দেখা অস্বচ্ছ বৈশ্বিক নীতি চলছে। সামাজিক রূপান্তর আইনের চেয়ে ধীর এবং নিষেধাজ্ঞার চেয়ে কম তৃপ্তিদায়ক, তবু এটাই একমাত্র পথ, যা প্রণোদনাকেই বদলায়, শুধু তার ফলাফল আড়াল করে না।
সরকার কি পদক্ষেপ নেবে, নাকি সবকিছু চলতে দেবে?
এ প্রশ্নে আমরা স্পষ্ট অবস্থান নিতে পারি। সরকার সবকিছু অবাধে চলতে দিতে পারে না, আবার ঝোঁকের বশে কড়া সেন্সরশিপের দিকেও যাওয়া উচিত নয়। নিষ্ক্রিয়তার ঝুঁকি গুরুতর এবং ইতিমধ্যে দৃশ্যমান: স্বাভাবিক হয়ে যাওয়া নিষ্ঠুরতা একটি পুরো প্রজন্মকে অসাড় করে দিচ্ছে এবং ব্যাপক হারে সহমর্মিতা ক্ষয় করছে। অনুমতিহীন ফুটেজ আইনি প্রতিকারের কোনো পথ না রেখে সুনাম ও মানসিক স্বাস্থ্য নষ্ট করছে। সাজানো সংঘাত মাঝে মাঝে সত্যিকারের সাম্প্রদায়িক উত্তেজনায় গড়াচ্ছে। আর বিপণন শিল্প ঐক্যের বদলে বিভাজন থেকে মুনাফা করায় ক্রমেই স্বচ্ছন্দ হয়ে উঠছে। পুরোপুরি ছেড়ে দিলে এই গতিপথ নিজে থেকে শুধরাবে না, কারণ যে প্ল্যাটফর্মগুলো এ থেকে লাভ করছে, গতি কমানোর কোনো আর্থিক তাগিদ তাদের নেই।
আবার সীমা ছাড়ানো নিয়ন্ত্রণের ঝুঁকিও বাস্তব, এমন দেশে যেখানে সদিচ্ছার নিয়ন্ত্রণে মতপ্রকাশের স্বাধীনতাই প্রায়ই প্রথম বলি হয়েছে। তাই সমাধান হওয়া উচিত লক্ষ্যভিত্তিক ও স্বচ্ছ শাসন, ব্যাপক নিয়ন্ত্রণ নয়। অনুমতি ছাড়া ভিডিও করা ও ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁসের বিরুদ্ধে সরকারকে স্পষ্ট আইনি সুরক্ষা দিতে হবে। বাণিজ্যিকভাবে বাংলাদেশে কাজ করা প্ল্যাটফর্মগুলোকে বাধ্য করতে হবে স্থানীয় অভিযোগ ও কনটেন্ট সরানোর ব্যবস্থা রাখতে, যেখানে সাড়া দেওয়ার সময়সীমা কার্যকরযোগ্য হবে। বক্তব্য নিয়ন্ত্রণের বদলে স্বাধীন মিডিয়া সাক্ষরতা কর্মসূচিতে অর্থ জোগাতে হবে। নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য হবে ক্ষতিকর আচরণ, যেমন উসকানি, হয়রানি এবং শিশু বা দুর্বলদের শোষণ, মত বা ব্যঙ্গ নয়।
সম্পাদকীয় ডেস্কের শেষ কথা
বাংলাদেশের শালীনতাবোধ এক রাতে ক্ষয়ে যায়নি, আর একটিমাত্র আইন বা অ্যালগরিদমের একটু অদলবদলে তা ফিরেও আসবে না। এই সময়ের দাবি একটি যৌথ সংকল্প, যেখানে পরিবার, স্কুল, বিজ্ঞাপনদাতা, প্ল্যাটফর্ম ও নীতিনির্ধারক সবাই একসঙ্গে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাবেন যে মানুষের মর্যাদা কখনো ট্রেন্ডিং ক্লিপের দাম হতে পারে না।
ভাইরাল হওয়া কার্যত নিজেই এক ধরনের মুদ্রা হয়ে উঠেছে। কিন্তু যেকোনো মুদ্রার মূল্য টেকে কেবল তখনই, যখন যথেষ্ট মানুষ তাকে মূল্যবান বলে মানতে থাকে। সেই মান্যতা প্রত্যাহার করার ক্ষমতা আমাদের হাতেই আছে: যে নির্মাতাদের অনুসরণ করি, যে ব্র্যান্ডকে সমর্থন দিই, আর রোজ না ভেবেই যে প্ল্যাটফর্ম খুলি, তাদের কাছ থেকে আরও বেশি দাবি করার ক্ষমতা। বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আগামী দশক গত দশকের পুনরাবৃত্তি হতে বাধ্য নয়। সেই সিদ্ধান্ত কোনোদিন অ্যালগরিদমের হাতে ছিল না। তা আমাদেরই, আর সব সময় আমাদেরই ছিল।
