ক্যারোলিন মওয়েন্ডে
কেনিয়াট্টা বিশ্ববিদ্যালয়, কেনিয়া
যদি বিশ্বের কাছে দুর্নীতি ও অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা বাস্তবতার কেবল অর্ধেক চিত্র তুলে ধরে, তাহলে? বাংলাদেশ ও নাইজেরিয়াকে প্রায়ই এমন দুটি অর্থনীতি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, যেগুলো দুর্নীতি ও অনানুষ্ঠানিকতার কারণে দুর্বল হয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক দুর্নীতি সূচক এবং সংবাদ শিরোনামগুলোতে অনেক সময় এই দেশগুলোকে নেতিবাচকভাবে তুলে ধরা হয়।
তবে এসব ধারণার আড়ালে উভয় দেশেই রয়েছে অর্থনৈতিক গতিশীলতা, উদ্ভাবন এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতা। বাস্তবতা দেখায়, কেবল স্বচ্ছতা সূচক বা দুর্নীতির ধারণাভিত্তিক মূল্যায়নের ওপর নির্ভর করে কোনো দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। তাই প্রয়োজন প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়ে বাস্তব চিত্র বিশ্লেষণ করা।
দুর্নীতি সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা
বাংলাদেশ ও নাইজেরিয়ায় দুর্নীতি সম্পর্কে বৈশ্বিক ধারণা মূলত আন্তর্জাতিক সূচকের মাধ্যমে গঠিত হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত হলো ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের দুর্নীতি ধারণা সূচক (CPI), যা বিশেষজ্ঞ মতামত ও জরিপের ভিত্তিতে সরকারি খাতে দুর্নীতির ধারণাগত মাত্রা পরিমাপ করে।
চলতি বছরে ১৮২টি দেশের মধ্যে নাইজেরিয়ার অবস্থান ১৪২তম। দেশটির স্কোর ১০০-এর মধ্যে ২৬, যা ২০২৫ সালের সমান রয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ ২৪ স্কোর নিয়ে বিশ্বের ১৩তম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছে, যদিও ২০২৫ সালের তুলনায় সামান্য উন্নতি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক মহলে উভয় দেশই এখনও সুশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা নিয়ে উল্লেখযোগ্য উদ্বেগের মুখোমুখি।
দুর্নীতির বাস্তবতা: সূচকের বাইরের চিত্র
বাংলাদেশ ও নাইজেরিয়া উভয় দেশেই দুর্নীতি একটি বড় চ্যালেঞ্জ, তবে বাস্তবতা কেবল আন্তর্জাতিক সূচক বা নেতিবাচক ধারণার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দুর্নীতি যে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা দুর্বল করে, ব্যবসার খরচ বাড়ায়, জনগণের আস্থা কমায় এবং সরকারি নীতির কার্যকারিতা সীমিত করে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
তবে একই সঙ্গে স্বীকার করতে হবে, কোনো দেশের সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে শুধু দুর্নীতির মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যায় না। বাংলাদেশে দীর্ঘদিনের সুশাসনগত চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও রপ্তানিমুখী প্রবৃদ্ধি, বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্প, কৃষি এবং প্রবাসী আয়ের মাধ্যমে দেশটি উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক রূপান্তর অর্জন করেছে।
একইভাবে নাইজেরিয়া সরকারি সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহির ক্ষেত্রে দুর্নীতির সমস্যার মুখোমুখি হলেও টেলিযোগাযোগ, প্রযুক্তি, কৃষি, তেল ও গ্যাস খাতের মাধ্যমে আফ্রিকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে অবস্থান ধরে রেখেছে। এই অভিজ্ঞতাগুলো দেখায়, দুর্নীতি উন্নয়নের পথে একটি বড় বাধা হলেও তা কোনো দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতার একমাত্র নির্ধারক নয়।
অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি সম্পর্কে ধারণা
দুর্নীতির পাশাপাশি উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলো সম্পর্কে বৈশ্বিক ধারণা গঠনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির বিস্তার। অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিকে প্রায়ই কর ফাঁকি, দুর্বল নিয়ন্ত্রণ এবং সীমিত অর্থনৈতিক সুযোগের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। তবে এই দৃষ্টিভঙ্গি অনেক সময় ভুলে যায় যে, অনানুষ্ঠানিক খাত লাখো মানুষের জীবিকা, কর্মসংস্থান এবং স্থানীয় অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
অনেক উন্নয়নশীল দেশে অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি কেবল একটি পছন্দ নয়; বরং বেকারত্ব, অর্থায়নের সীমিত সুযোগ, জটিল নিবন্ধন প্রক্রিয়া এবং আনুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে প্রবেশের বাধার প্রতিক্রিয়া। বাংলাদেশ ও নাইজেরিয়ার অভিজ্ঞতা দেখায়, অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি যেমন সরকারের রাজস্ব সংগ্রহ ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনার ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ তৈরি করে, তেমনি এটি লাখো মানুষের অভিযোজন ক্ষমতা ও অর্থনৈতিক টিকে থাকার সক্ষমতার প্রতিফলনও।
প্রবৃদ্ধিশীল অর্থনীতির মধ্যে অনানুষ্ঠানিকতা: বাংলাদেশ
বাংলাদেশে মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৮৫ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে এবং দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (GDP) এই খাতের অবদান প্রায় ৪৩ শতাংশ। কৃষি, রাস্তার পাশের ছোট ব্যবসা, রিকশার মতো পরিবহন সেবা এবং ঘরে বসে পরিচালিত ক্ষুদ্র কাজ এই খাতের অন্তর্ভুক্ত।
বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা দেখায়, একটি বড় অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি থাকা সত্ত্বেও উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক অগ্রগতি সম্ভব। তবে দীর্ঘস্থায়ী অনানুষ্ঠানিকতা কিছু গুরুতর সমস্যাও তৈরি করে। এর মধ্যে রয়েছে শ্রমিক সুরক্ষার অভাব, সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধায় সীমিত প্রবেশাধিকার এবং ক্ষুদ্র ব্যবসার কম উৎপাদনশীলতা।
অর্থনৈতিক টিকে থাকার মাধ্যম হিসেবে অনানুষ্ঠানিকতা: নাইজেরিয়া
নাইজেরিয়াও দেখায়, অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি একই সঙ্গে অর্থনৈতিক সংকট ও মানুষের অভিযোজন ক্ষমতার প্রতিফলন হতে পারে। দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং সীমিত আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের কারণে দেশটির লাখো মানুষ ছোট ব্যবসা, পরিবহন সেবা, কৃষি এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা কার্যক্রমের ওপর নির্ভরশীল।
অনানুষ্ঠানিক খাত দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৬৫ শতাংশের সঙ্গে যুক্ত।এই খাতের আধিপত্য নানা সমস্যা তৈরি করে, তবে একে অর্থনৈতিক ব্যর্থতার প্রতীক হিসেবে দেখা সঠিক নয়। বরং এটি অনেকাংশে প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা এবং কর্মসংস্থানের চাপের প্রতিফলন।
বাংলাদেশ ও নাইজেরিয়া থেকে শিক্ষা
বাংলাদেশ ও নাইজেরিয়ার অভিজ্ঞতা দেখায়, কোনো দেশের উন্নয়ন যাত্রাকে শুধু প্রচলিত ধারণার মাধ্যমে মূল্যায়ন করা যায় না। উভয় দেশই দুর্নীতি, দুর্বল প্রতিষ্ঠান এবং বৃহৎ অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির মতো বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। তবে শুধু এসব সমস্যার আলোকে দেশ দুটিকে বিচার করলে তাদের অর্থনৈতিক অগ্রগতি, উদ্যোক্তা সংস্কৃতি এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও টিকে থাকার সক্ষমতা উপেক্ষিত থেকে যায়।
দুর্নীতি ও অনানুষ্ঠানিকতা কার্যকর সুশাসনের পথে বড় বাধা। একই সঙ্গে এসব বাস্তবতা দেখায়, যেখানে আনুষ্ঠানিক কাঠামো দুর্বল, সেখানে মানুষ কীভাবে নিজেদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করে নেয়। প্রচলিত ধারণার বাইরে যেতে হলে প্রতিটি দেশের ঐতিহাসিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা গভীরভাবে বুঝতে হবে।
বাংলাদেশ ও নাইজেরিয়ার অভিজ্ঞতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, উন্নয়ন কেবল ধারণা বা সূচকের মাধ্যমে পরিমাপ করা যায় না। প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ, অগ্রগতি স্বীকার করা এবং সেই কাঠামোগত সমস্যাগুলো সমাধান করা, যেগুলো অর্থনৈতিক ফলাফলকে প্রভাবিত করে।
