ব্যারিস্টার নাসির উদ্দিন মাহমুদ
স্বাধীন আইন বিশেষজ্ঞ
বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম মুসলিম জনসংখ্যার দেশ বাংলাদেশে মদ্যপান ও অ্যালকোহলজাত পানীয়ের উৎপাদন, বিক্রি এবং ভোগের ওপর এশিয়ার অন্যতম কঠোর আইনি নিয়ন্ত্রণ বিদ্যমান। এই আইন কাঠামো একদিকে ইসলামী মূল্যবোধ, অন্যদিকে আদিবাসী ও ঐতিহ্যগত সাংস্কৃতিক চর্চা এবং আধুনিক অর্থনীতির বাস্তব চাহিদার মধ্যে একটি ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করে। এই কাঠামো কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে এবং কোথায় সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে, তা বোঝা যেকোনো নীতিগত সংস্কার নিয়ে আলোচনার পূর্বশর্ত। সেই আলোচনার ভিত্তি গড়ে তোলাই এই লেখার উদ্দেশ্য।
বর্তমান আইনগত কাঠামো
বাংলাদেশে অ্যালকোহল নিয়ন্ত্রণের মূল আইন হলো মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮, যা ১৯৯০ সালের আইনকে প্রতিস্থাপন করেছে। এই আইনে অ্যালকোহল বলতে এমন সব স্পিরিট, ওয়াইন, বিয়ার বা তরল পদার্থকে বোঝানো হয়েছে, যাতে আয়তনের ভিত্তিতে অর্ধ শতাংশের বেশি অ্যালকোহল রয়েছে।
আইনের ১০ ধারায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, সরকারি লাইসেন্স বা অনুমতি ছাড়া কেউ অ্যালকোহল উৎপাদন, সরবরাহ, বিক্রি, পান, আমদানি, রপ্তানি কিংবা সংরক্ষণ করতে পারবেন না। এই বিধান লঙ্ঘনের শাস্তি অপরাধের ধরন ও পরিমাণ অনুযায়ী ছয় মাস থেকে সর্বোচ্চ দশ বছরের কারাদণ্ড। অনুমতি ছাড়া ডিস্টিলারি পরিচালনার অপরাধে সর্বোচ্চ দশ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
২০১৮ সালের আইন কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের জন্য ২০২২ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অ্যালকোহল নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা প্রণয়ন করে। এই বিধিমালার মাধ্যমে পূর্ববর্তী বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শূন্যতা পূরণ করা হয়।
প্রথমবারের মতো অ্যালকোহল ক্রয়ের সর্বনিম্ন বয়স ২১ বছর নির্ধারণ করা হয়। এর আগে বাংলাদেশে এ বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট বয়সসীমা ছিল না।
এ ছাড়া সব অ্যালকোহলজাত পানীয়ে স্বাস্থ্য সতর্কবার্তা সংযুক্ত করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। একজন পারমিটধারী একবারে সর্বোচ্চ তিন ইউনিট এবং মাসে সর্বোচ্চ সাত ইউনিট অ্যালকোহল কিনতে পারবেন, যদিও কিছু ক্ষেত্রে সীমিত ব্যতিক্রম রয়েছে।
বিধিমালায় আরও বলা হয়েছে, শুক্রবার এবং মুহররম, শবে বরাত, ঈদে মিলাদুন্নবী, শবে কদর, ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার মতো প্রধান ধর্মীয় উপলক্ষে বার ও মদের দোকান বন্ধ থাকবে। পাশাপাশি হোটেল, রেস্তোরাঁ ও ক্লাবে বার স্থাপনের জন্য কমপক্ষে ২০০ জন পারমিটধারী সদস্য থাকার শর্ত আরোপ করা হয়েছে।
ধর্মভিত্তিক নিয়ন্ত্রণের কাঠামো
বাংলাদেশের অ্যালকোহল আইনের সবচেয়ে ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্য হলো ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে ভিন্ন ভিন্ন নিয়ম প্রয়োগ।
যেকোনো বাংলাদেশি নাগরিককে অ্যালকোহল পান করতে হলে সরকারি পারমিট নিতে হয়। তবে দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ জনগোষ্ঠী মুসলিম হওয়ায়, মুসলমানদের ক্ষেত্রে পারমিট কেবল চিকিৎসাজনিত প্রয়োজনে দেওয়া হয়। আবেদনকারীকে সিভিল সার্জন অথবা কোনো মেডিকেল কলেজের সহযোগী অধ্যাপকের প্রেসক্রিপশন জমা দিতে হয়, যেখানে রোগের বিবরণ এবং কেন চিকিৎসার অংশ হিসেবে অ্যালকোহল প্রয়োজন, তা উল্লেখ থাকতে হয়।
অন্যদিকে হিন্দু, খ্রিস্টান ও বৌদ্ধ নাগরিকদের জন্য এমন চিকিৎসাগত শর্ত নেই। তারা তুলনামূলক বিস্তৃত ভিত্তিতে পারমিট পেতে পারেন। বিদেশি নাগরিকরা লাইসেন্সপ্রাপ্ত বারে অ্যালকোহল পান করতে পারেন এবং কূটনৈতিক ব্যবস্থার আওতায় আলাদা সুবিধাও পান।
রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ির আদিবাসী জনগোষ্ঠী তাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে ঐতিহ্যবাহী মদ্যপান করতে পারেন। একইভাবে চা বাগানের শ্রমিকদের মতো কিছু সম্প্রদায় ঐতিহ্যগতভাবে প্রস্তুতকৃত তারি ও পচুইয়ের মতো গাঁজনজাত পানীয় ব্যবহারের অনুমতি পেয়ে থাকে। এই বহুস্তরভিত্তিক ব্যবস্থা বাংলাদেশের সাংবিধানিক ও সামাজিক বাস্তবতায় ইসলামের প্রাধান্যকে প্রতিফলিত করার পাশাপাশি ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও আদিবাসী সংস্কৃতিকেও স্বীকৃতি দেয়।
তবে একই সঙ্গে একাধিক অসামঞ্জস্যও তৈরি হয়েছে। একজন মুসলিম নাগরিক চিকিৎসাগত পারমিট ছাড়া অ্যালকোহল পান করলে তা ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়, অথচ একই পরিস্থিতিতে একজন অমুসলিম নাগরিকের ক্ষেত্রে সেই অপরাধ প্রযোজ্য হয় না।
বাস্তবে চিকিৎসাজনিত পারমিট পাওয়ার প্রক্রিয়াও অনেকের কাছে কেবল আনুষ্ঠানিকতা বলেই বিবেচিত হয়। বিভিন্ন মাত্রার যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে এমন পারমিট সংগ্রহ করা সম্ভব হওয়ায় বর্তমান সীমাবদ্ধতার কার্যকারিতা ও আন্তরিকতা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে।
জনস্বাস্থ্যের বাস্তবতা
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, মাথাপিছু অ্যালকোহল সেবনের দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বের সর্বনিম্ন দেশগুলোর একটি। দেশের ৯০ শতাংশেরও বেশি মানুষ কোনো ধরনের অ্যালকোহল পান করেন না। তবে যারা পান করেন, তাদের একটি বড় অংশের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ প্রবণতা দেখা যায়।
১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী অ্যালকোহল সেবনকারীদের মধ্যে ৪১ শতাংশেরও বেশি অতিরিক্ত মাত্রায় মদ্যপানে অভ্যস্ত। এক বছরে দেশে অ্যালকোহলজনিত কারণে তিন হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। অথচ জনস্বাস্থ্যভিত্তিক সমন্বিত নীতির পরিবর্তে কেবল নিষেধাজ্ঞানির্ভর ব্যবস্থা অনুসরণ করায় আসক্তি, অপব্যবহার এবং চিকিৎসাসেবার ঘাটতির মতো বিষয়গুলো এখনো কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব হয়নি।
নীতিগত করণীয়
মুসলিম নাগরিকদের জন্য বিদ্যমান চিকিৎসাজনিত পারমিট ব্যবস্থার পরিবর্তে ধর্মনিরপেক্ষ ও অভিন্ন পারমিট ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে, যেখানে ধর্মীয় পরিচয়ের পরিবর্তে বয়স যাচাই হবে মূল শর্ত। এতে সামাজিক মূল্যবোধ অক্ষুণ্ন রেখেই বর্তমান আইন কাঠামোর বৈষম্যমূলক দিক দূর করা সম্ভব হবে। ধর্মভিত্তিক এই পার্থক্য সাংবিধানিকভাবে যেমন প্রশ্নবিদ্ধ, বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রেও তেমন কার্যকর নয়।
একই সঙ্গে অ্যালকোহল নির্ভরতার চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং কাউন্সেলিংয়ে সরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। শুধু অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। বর্তমানে দেশে জাতীয় পর্যায়ে কোনো সমন্বিত পুনর্বাসন কর্মসূচি না থাকায় আসক্ত ব্যক্তিরা প্রয়োজনীয় সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এবং অনেক ক্ষেত্রেই সমস্যা আরও আড়ালে চলে যাচ্ছে।
আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রেও আরও কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন। ২০২২ সালের বিধিমালায় নির্ধারিত ক্রয়সীমা বাস্তবায়নে লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর কঠোর তদারকি থাকতে হবে, যাতে বৈধ উৎস থেকে অ্যালকোহল অবৈধ বাজারে চলে না যায়।
একই সঙ্গে স্কুল, মসজিদ এবং আবাসিক এলাকার নির্দিষ্ট দূরত্বের মধ্যে অ্যালকোহল বিক্রির স্থান স্থাপনে স্পষ্ট নিয়ম কার্যকর করা উচিত। এতে সীমিত প্রবেশাধিকার সম্পর্কে সমাজে যে ঐকমত্য রয়েছে, তা আরও শক্তিশালী হবে।
জনসচেতনতামূলক প্রচারণায় অ্যালকোহলের স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টি ইসলামে জীবন ও শারীরিক সুস্থতা রক্ষার শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উপস্থাপন করা যেতে পারে। এতে জনস্বাস্থ্যের বার্তা সাংস্কৃতিক বাস্তবতার সঙ্গে সংঘাত তৈরি না করে আরও গ্রহণযোগ্য হবে।
অন্যদিকে পার্বত্য অঞ্চলের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ও ঐতিহ্যগত ব্যতিক্রমগুলো অবশ্যই সংরক্ষণ করতে হবে। তবে সেই সুযোগ যেন বাণিজ্যিকভাবে অপব্যবহার না হয়, সেজন্য স্বাস্থ্য শিক্ষা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের সামনে ধর্মীয় পরিচয় ও যৌক্তিক অ্যালকোহল নীতির মধ্যে কোনো একটি বেছে নেওয়ার প্রশ্ন নেই। প্রয়োজন এমন একটি আইন কাঠামো, যা দেশের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতাকে সম্মান জানিয়ে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করবে এবং একই সঙ্গে আইনের দৃষ্টিতে সবার জন্য সমান ও ন্যায়সঙ্গত আচরণ নিশ্চিত করবে।
