তানজীনা ফেরদৌস
কমিশনিং সম্পাদক, অনিকেত বুলেটিন
বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার সামনে এক কঠিন প্রশ্ন: চূড়ান্ত বিচারের অপেক্ষায় স্বজনদের আর কত দিন কাটাতে হবে? সোহাগী জাহান তনুর হত্যার রহস্যের অমীমাংসিত অবস্থা, সাংবাদিক সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যা মামলার দীর্ঘ তদন্ত এবং নারায়ণগঞ্জের সাত খুন মামলায় দণ্ড কার্যকরের অনিশ্চয়তা দেখিয়ে দেয়, বিচারপ্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা কতটা গভীর।
অন্যদিকে, ২০২৬ সালের ৭ জুন ঢাকার একটি ট্রাইব্যুনাল আট বছর বয়সী রামিসা আক্তারকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় অপরাধ সংঘটিত হওয়ার মাত্র ১৯ দিনের মাথায় এক দম্পতিকে মৃত্যুদণ্ড দেন। দ্রুত তদন্ত, কার্যকর প্রসিকিউশন ও নির্বিঘ্ন বিচারপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে যে অল্প সময়েও রায় দেওয়া সম্ভব, এই ঘটনা তার প্রমাণ। কিন্তু একটি দ্রুত রায় বিচারব্যবস্থার দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাকে আড়াল করতে পারে না।
দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বহু পরিবারকে তদন্ত শেষ হওয়া কিংবা আপিলের নিষ্পত্তির জন্য বছরের পর বছর, এমনকি কয়েক দশক পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে। মূল প্রশ্ন হলো, বিচারপ্রক্রিয়া কেন বারবার সময়মতো, বিশ্বাসযোগ্য ও আইনসম্মত পরিণতিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হচ্ছে?
রায় থেকে চূড়ান্ত বিচার: দীর্ঘ পথ
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের হত্যাকাণ্ড বিচারিক আদালতের রায় থেকে বিচারপ্রক্রিয়ার চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছানোর দীর্ঘ পথের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। ২০১৯ সালের অক্টোবরে তাঁকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল ২০ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং পাঁচজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। ২০২৫ সালের মার্চে হাইকোর্ট ওই দণ্ড বহাল রাখেন। তবে এরপরও আপিলসহ বিচারপ্রক্রিয়ার আরও কিছু ধাপ বাকি থেকে যায়।
এই মামলা বিচারব্যবস্থার একটি বৃহত্তর প্রাতিষ্ঠানিক চ্যালেঞ্জ সামনে আনে। বাংলাদেশের আইনে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৭৪ ধারার অধীনে হাইকোর্টের অনুমোদন প্রয়োজন। আপিল, কারা আপিল, মামলার নথি প্রস্তুত, আইনজীবীর মাধ্যমে প্রতিনিধিত্ব এবং পরবর্তী বিচারিক পর্যালোচনার কারণে প্রক্রিয়াটি দীর্ঘ হতে পারে।
এই আইনি সুরক্ষাগুলো অপরিহার্য। মৃত্যুদণ্ড একবার কার্যকর হলে তা ফিরিয়ে নেওয়ার সুযোগ নেই। তাই প্রতিটি দণ্ড যেন বিচারিক পর্যালোচনায় টিকে থাকে, তা নিশ্চিত করা জরুরি। তবে আইনি সুরক্ষার প্রয়োজনকে অনির্দিষ্টকালের বিলম্বের অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা যায় না। ন্যায়বিচারের অধিকার অক্ষুণ্ন রেখেই মামলার ব্যবস্থাপনা উন্নত করা, নথিপত্র ডিজিটাল করা, বিচারকের পর্যাপ্ত নিয়োগ নিশ্চিত করা এবং বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপের জন্য বাস্তবসম্মত সময়সীমা নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
সাগর-রুনি হত্যা মামলা: তদন্তই যখন দীর্ঘসূত্রতার কারণ
সাংবাদিক সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনিকে ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার পশ্চিম রাজাবাজারে তাঁদের ভাড়া বাসায় হত্যা করা হয়। হত্যাকাণ্ডের সময় তাঁদের ছোট ছেলেও বাসায় ছিল। এক যুগেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও মামলাটি বাংলাদেশের তদন্তব্যবস্থার অন্যতম আলোচিত ব্যর্থতা হয়ে রয়েছে। তদন্ত প্রথমে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হাতে ছিল, পরে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) দায়িত্ব পায়। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে হাইকোর্ট উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স গঠনের নির্দেশ দেওয়ার পর তদন্তের দায়িত্ব পায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
২০২৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর ঢাকার একটি আদালত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের সময়সীমা ১৩০তমবারের মতো পিছিয়ে দেন। পরবর্তী তারিখ নির্ধারণ করা হয় ৫ নভেম্বর। প্রতিবার সময় বাড়ানোর ঘটনায় তদন্তের পরিকল্পনা, আলামত সংরক্ষণ, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি এবং বিচারিক তদারকি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। কোনো সময়সীমা তখনই কার্যকর হয়, যখন তা অমান্য করার জন্য সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা দিতে হয় এবং প্রয়োজনীয় সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
অন্য একটি মামলার কল রেকর্ড বিশ্লেষণ থেকে সম্ভাব্য সূত্র পাওয়ার খবর ডিজিটাল প্রমাণের গুরুত্ব তুলে ধরে। একই সঙ্গে প্রশ্ন জাগে, এমন সূত্র সামনে আসতে এত দেরি হলো কেন? এই মামলার তথ্যের ভিত্তিতে কাউকে অপরাধী বলা যায় না। বরং দীর্ঘ সময়েও তদন্তের চূড়ান্ত আইনি পরিণতি না আসায় যে জনভোগান্তি ও অবিশ্বাস তৈরি হয়, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
সোহাগী জাহান তনু: চূড়ান্ত জবাবের অপেক্ষায় এক দশক
সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলাও দীর্ঘসূত্রতার এক বেদনাদায়ক উদাহরণ। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ১৯ বছর বয়সী শিক্ষার্থী ও নাট্যকর্মী তনু ২০১৬ সালের ২০ মার্চ কুমিল্লা সেনানিবাসের ভেতরে একটি বাসায় শিক্ষার্থী পড়াতে যাওয়ার পর নিখোঁজ হন। পরে সেনানিবাসের বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাছে ঝোপের মধ্যে তাঁর মরদেহ পাওয়া যায়।
এক দশক পেরিয়ে গেলেও তদন্ত চলমান, কিন্তু কোনো দণ্ডাদেশ হয়নি। ২০২৬ সালের মে মাসে তদন্তকারীরা জানান, তনুর পোশাকে চারজন পুরুষের জৈবিক উপাদানের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। এতে নতুন করে ফরেনসিক পরীক্ষার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে ডিএনএ প্রোফাইল শনাক্ত করা এবং অপরাধের সঙ্গে কারও সংশ্লিষ্টতা আইনগতভাবে প্রমাণ করা এক বিষয় নয়।
২০২৬ সালের এপ্রিলে পিবিআই অবসরপ্রাপ্ত সেনা ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে। একই বছরের সেপ্টেম্বরে আরও দুই সাবেক সেনাসদস্যের বিরুদ্ধে ইন্টারপোল রেড নোটিশ জারি করে। এসব পদক্ষেপ থেকে বোঝা যায়, তদন্ত থেমে থাকেনি। তবে ফরেনসিক বিশ্লেষণ, সন্দেহভাজন শনাক্তকরণ ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেতে এত দীর্ঘ সময় লাগায় তদন্তের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। গ্রেপ্তার, ডিএনএ মিলিয়ে দেখা কিংবা রেড নোটিশ জারি করা কোনো ব্যক্তির অপরাধ প্রমাণ করে না। তার জন্য প্রয়োজন আইনসম্মত বিচারপ্রক্রিয়া ও আদালতে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ।
মামলাটি সময়মতো ফরেনসিক পরীক্ষা, বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় এবং তদন্তে জবাবদিহির প্রয়োজনীয়তা সামনে আনে। তনুর পরিবারের কাছে প্রতিটি নতুন অগ্রগতি আশার জন্ম দেয়, কিন্তু চূড়ান্ত ও বিশ্বাসযোগ্য বিচারিক নিষ্পত্তির বিকল্প হতে পারে না।
নারায়ণগঞ্জের সাত খুন: রায়ই শেষ কথা নয়
২০১৪ সালের এপ্রিলে নারায়ণগঞ্জে সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম ও আইনজীবী চন্দন সরকারসহ সাতজনকে অপহরণ ও হত্যা করা হয়। পরে শীতলক্ষ্যা নদী থেকে তাঁদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সংগঠিত সহিংসতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগের ভয়াবহ পরিণতি এই হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায়।
২০১৭ সালের জানুয়ারিতে বিচারিক আদালত ২৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেন। একই বছরের আগস্টে হাইকোর্ট ১৫ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন, ১১ জনের মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন এবং অন্যদের কারাদণ্ড বহাল রাখেন। কিন্তু ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত আপিলপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়নি এবং দণ্ড কার্যকরও করা হয়নি।
বারো বছর পেরিয়ে গেলেও স্বজনদের অপেক্ষার অবসান হয়নি। একটি বিচারিক রায় এবং চূড়ান্তভাবে দণ্ড কার্যকরের মধ্যে যে দীর্ঘ ব্যবধান তৈরি হতে পারে, মামলাটি তারই উদাহরণ। দোষী সাব্যস্ত করার পর আপিল ও পরবর্তী বিচারিক পর্যালোচনার ধাপগুলো বছরের পর বছর অসম্পূর্ণ থেকে গেলে বিচারপ্রক্রিয়াও শেষ হয় না।
ক্ষমতাধর প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে জবাবদিহির প্রয়োজন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আইনের প্রতি মানুষের আস্থা বজায় রাখতে হলে প্রভাবশালী সন্দেহভাজনদের বিরুদ্ধে স্বাধীন তদন্ত, আলামতের সুরক্ষা এবং অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব ছাড়াই আপিল নিষ্পত্তি নিশ্চিত করতে হবে।
নুসরাত জাহান রাফি: রায়ের পরও বছরের পর বছর পর্যালোচনা
ফেনীর সোনাগাজীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফির হত্যাকাণ্ড যৌন হয়রানির অভিযোগ তোলা ব্যক্তিদের নিরাপত্তা এবং তাঁদের ভয়ভীতি থেকে সুরক্ষিত রাখার প্রয়োজনীয়তা সামনে আনে। ২০১৯ সালের এপ্রিলে মাদ্রাসার অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে করা যৌন হয়রানির অভিযোগ প্রত্যাহার করতে অস্বীকৃতি জানালে নুসরাতের গায়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। পরে দগ্ধ অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। একই বছরের অক্টোবরে বিচারিক আদালত ১৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেন।
২০২৬ সালের আগস্টে মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন ও আপিলপ্রক্রিয়া শেষে হাইকোর্ট দুজনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন, চারজনের দণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন এবং মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দশজনকে খালাস দেন।
এই রায় দেখায়, আপিলের মাধ্যমে বিচারিক পর্যালোচনা কেন গুরুত্বপূর্ণ। প্রত্যেক অভিযুক্তের বিরুদ্ধে উপস্থাপিত প্রমাণ আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। তবে অপরাধ সংঘটনের পর হাইকোর্টের সিদ্ধান্ত আসতে সাত বছর লেগে যাওয়া আপিলপ্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে গুরুতর সহিংসতার মামলায় বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
লক্ষ্য হওয়া উচিত বিচারিক আদালতের প্রতিটি রায় অক্ষরে অক্ষরে বহাল রাখা নয়; বরং এমন একটি প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা, যেখানে দোষী সাব্যস্ত করা, খালাস দেওয়া কিংবা সাজা নির্ধারণ, প্রতিটি সিদ্ধান্তই যথাযথ পর্যালোচনার ভিত্তিতে এবং অযথা বিলম্ব ছাড়াই আসে।
সালমান শাহ: তিন দশকেও প্রশ্নের শেষ নেই
জনপ্রিয় অভিনেতা সালমান শাহর ১৯৯৬ সালের সেপ্টেম্বরে মৃত্যু আজও বিতর্কিত ও আলোচিত। ১৯৯৭ সালে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ঘটনাটিকে আত্মহত্যা বলে সিদ্ধান্ত দেয়। ২০০৩ সালে বিচার বিভাগীয় তদন্ত হয়। ২০২০ সালে পিবিআইও একই সিদ্ধান্তে পৌঁছায়, তবে তাঁর পরিবার তা প্রত্যাখ্যান করে।
২০২৫ সালের অক্টোবরে একটি দায়রা আদালত পরিবারের রিভিশন আবেদন গ্রহণ করে ঘটনাটিকে হত্যা মামলা হিসেবে বিবেচনার নির্দেশ দেন। পরবর্তী পদক্ষেপের মধ্যে ছিল ১১ জনকে আসামি করে মামলা এবং নতুন করে ময়নাতদন্তের জন্য সালমান শাহর মরদেহ কবর থেকে তোলার অনুমতি।
অভিযোগ কখনোই প্রমাণের বিকল্প নয়। কোনো মামলাকে নতুনভাবে শ্রেণিবদ্ধ করলেই হত্যা সংঘটিত হয়েছিল, তা প্রমাণিত হয় না। তবে তদন্ত কয়েক দশক ধরে বিতর্কিত অবস্থায় থাকলে জনআস্থা বজায় রাখার জন্য প্রয়োজন স্বচ্ছ প্রক্রিয়া, প্রমাণের বিশ্বাসযোগ্য পর্যালোচনা এবং সিদ্ধান্তের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা, বারবার তদন্ত শুরু করা নয়।
এই সপ্তাহে আমরা গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচিত এমন কয়েকটি মামলার দিকে নজর দিলাম, যেগুলোর রায় দেওয়া হয়েছে অথবা বিচারপ্রক্রিয়া এখনও চলছে। দ্বিতীয় পর্বে এসব মামলার বিশ্লেষণ নিয়ে আলোচনা করা হবে।
