ওয়াহিদুল মালিক
ডিটেক বাংলাদেশ
জামালপুরের নদীর চরঘেঁষা এলাকায় একটি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র গড়ে তোলার কথা ছিল, যা জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করবে। বাস্তবে কেন্দ্রটি এখন বিদ্যুৎ উৎপাদনের বদলে বিরোধের জন্ম দিচ্ছে। প্রায় ৩১৭ একর জমিতে, কৈজার চরে ২০২১ সাল থেকে বাস্তবায়নাধীন ১০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার মাদারগঞ্জ সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ গত বছরের নভেম্বর থেকে বন্ধ রয়েছে বলে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দাবি, প্রায় ২১২ কোটি টাকার বিল এখনও বকেয়া। গত বছরের জুলাইয়ে ৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরপ্যানেল প্রকল্প এলাকায় পৌঁছালেও সেগুলো এখনও স্থাপন করা হয়নি। কারণ, পণ্য খালাসের পর প্রয়োজনীয় পরিদর্শন সম্পন্ন করেনি বাস্তবায়নকারী সংস্থা। পরিচ্ছন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ানোর লক্ষ্যে নির্মিত প্রকল্পটি আপাতত কিছুই যোগ করতে পারছে না। গত সপ্তাহে বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিকগুলোতে এসব তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। তবে ওই প্রতিবেদনগুলোতে যে বিষয়টি আলোচনায় আসেনি, সেটিই এই নিবন্ধের মূল বক্তব্য।
কী ঘটেছে
জাতীয় দৈনিকগুলোতে প্রকাশিত তথ্যগুলো উদ্বেগজনক, বিশেষ করে ঘটনার সরল ধারাবাহিকতার কারণে। বাস্তবায়নকারী সংস্থা রুরাল পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড প্রায় এক বছর ধরে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিল আটকে রেখেছে। কাজ বন্ধ হয়ে গেছে। এরপর আগস্টে সরকার প্রকল্পের সংশোধিত প্রস্তাব অনুমোদন করে ব্যয় কমিয়ে ১ হাজার ৬১২ কোটি টাকা নির্ধারণ করে। প্রকল্পের প্রায় ৬০ শতাংশ কাজ শেষ হওয়ার পর প্রায় ২০০ কোটি টাকার কাজ বাদ দেওয়া হয়।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দাবি, তাদের সঙ্গে কিংবা সংশ্লিষ্ট সুইস পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এ বিষয়ে কোনো আলোচনা করা হয়নি। বাদ দেওয়া কাজের মধ্যে রয়েছে স্ট্যাটিক ভিএআর জেনারেটর, সৌরপ্যানেল পরিষ্কারের ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম। বাস্তবায়নকারী সংস্থার একটি প্রতিনিধিদল প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনে গেলে ব্যয় কমানো, নকশায় বারবার পরিবর্তন, বকেয়া বিল এবং কাজের ধীরগতির বিষয়ে প্রশ্নের উত্তর দিতে অস্বীকৃতি জানায়।
দুর্নীতির অভিযোগ তোলার আগে একটি সতর্কতা
গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে ঘুষ বা অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ তোলা হয়নি। ন্যায্যতার স্বার্থে বিষয়টি স্পষ্ট করা জরুরি। তবে প্রতিবেদনে যে চিত্র উঠে এসেছে, তা হলো অব্যবস্থাপনা, অস্বচ্ছতা এবং ব্যাখ্যা দিতে অনীহা। দুর্নীতি বিকাশের সুযোগ তৈরি হয় ঠিক এমন পরিবেশেই। যথাযথ কারণ ছাড়া বিল আটকে রাখা হলে, নকশায় বারবার পরিবর্তন এলে এবং দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা নীরব থাকলে সাধারণ মানুষের পক্ষে অদক্ষতা ও অনিয়মের মধ্যে পার্থক্য করা কঠিন হয়ে পড়ে। সেই পার্থক্য বোঝার সুযোগ তৈরি করতেই স্বচ্ছতা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে অতিরিক্ত সক্ষমতা বাবদ উচ্চ ব্যয় এবং অস্বচ্ছ ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক রয়েছে। ফলে গোপনীয়তাকে মানুষ সহজেই সতর্কসংকেত হিসেবে দেখে। কাজ থেমে থাকা প্রতিটি নতুন প্রকল্পও সেই সন্দেহের মুখে পড়ে।
ব্যবস্থাপনাগত ব্যর্থতায় বিদ্যুৎ সরবরাহ কেন ব্যাহত হয়
একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ, পরীক্ষা এবং জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে সংযোগ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে না। তাই প্রতিটি বিলম্বিত মাস মানে সম্ভাব্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের স্থায়ী ক্ষতি। ঘাটতি পূরণ করতে তখন আমদানি করা জ্বালানি কিংবা ব্যয়বহুল ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর নির্ভর করতে হয়। এর খরচ বহন করে সরকারি কোষাগার ও সাধারণ গ্রাহক, উভয় পক্ষই।
স্থানীয় পর্যায়ে এর প্রভাবও সরাসরি পড়ে। নতুন বিদ্যুৎ সরবরাহের অপেক্ষায় থাকা এলাকাগুলোতে লোডশেডিং, দুর্বল ভোল্টেজ ও অনিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহ চলতে থাকে। কৃষক, ক্ষুদ্র উৎপাদক এবং পরিবারগুলো এমন একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হওয়ার আশায় নিজেদের কাজকর্মের পরিকল্পনা করে, যার কার্যক্রম শুরুই হয় না।
প্রকল্পের পরিসর কমানোর সিদ্ধান্ত আরও একটি ঝুঁকি তৈরি করেছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রের স্থিতিশীল ও দক্ষ পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, যেমন রিঅ্যাকটিভ পাওয়ার নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং প্যানেল পরিষ্কারের ব্যবস্থা, কোনো বাড়তি সুবিধা নয়। ধুলায় ঢেকে থাকা সৌরপ্যানেল কম বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। পর্যাপ্ত ভোল্টেজ নিয়ন্ত্রণ না থাকলে জাতীয় গ্রিডেও অস্থিতিশীলতা দেখা দিতে পারে। আজ যে সিদ্ধান্তকে ব্যয় সাশ্রয় হিসেবে দেখানো হচ্ছে, তা আগামী কয়েক দশকে প্রকল্পের পরিচালন ব্যয় ও ক্ষতির কারণ হতে পারে। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা বাদ দিয়ে নির্মিত একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে বাস্তব অবদান রাখে না; বরং তা স্বল্পমেয়াদি হিসাবনিকাশের ব্যর্থতার স্মারক হয়ে দাঁড়ায়।
ঠিকাদারদের ২১২ কোটি টাকা আটকে রাখায় ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়ছে। এতে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে আগ্রহী প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক সক্ষমতা দুর্বল হয়। ভবিষ্যৎ দরপত্রে তারা বাড়তি ঝুঁকির কথা বিবেচনা করে বেশি দর দিতে পারে। বিনিয়োগকারীদের কাছেও এমন বার্তা যায় যে চুক্তির প্রতিশ্রুতি সব সময় রক্ষা করা হয় না। অথচ বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এই বিনিয়োগকারীদেরই প্রয়োজন। ফলে বকেয়া অর্থের কারণে সৃষ্ট ক্ষতি শুধু ওই অর্থের অঙ্কে সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে।
মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগ কোথায়?
প্রকাশ্য তথ্য অনুযায়ী, মন্ত্রণালয় মূলত ঘটনার পর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। সংশোধিত প্রকল্প প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে, কিন্তু প্রকল্পের ৬০ শতাংশ কাজ শেষ হওয়ার পর কেন কাজের পরিসর কমানো হলো, সিদ্ধান্তটি কে নিয়েছেন, তার পক্ষে কী কারিগরি প্রমাণ ছিল কিংবা বাদ পড়া সরঞ্জামগুলোর কী হবে, তার কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। বিল পরিশোধে বিলম্বের কারণ খতিয়ে দেখতে কোনো নিরীক্ষার ঘোষণা দেওয়া হয়নি। প্রকল্প এলাকায় পড়ে থাকা সৌরপ্যানেল কবে স্থাপন করা হবে, তারও কোনো সময়সীমা নেই।
এই প্রবণতা শুধু মাদারগঞ্জ প্রকল্পের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে আন্তরিক কোনো মন্ত্রণালয় সংবাদমাধ্যমের প্রশ্ন ওঠার অপেক্ষায় বসে থাকবে না। বিল পরিশোধের সময়সূচি এবং বিলম্বের কারণ প্রকাশ করা, প্রকল্পের কাজ কমানোর আগে স্বাধীন কারিগরি পর্যালোচনা বাধ্যতামূলক করা, পরিদর্শনের সময়সীমা কার্যকর করা এবং ব্যাখ্যাহীনভাবে কাজ বন্ধ রাখার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন। জনগণের অর্থে পরিচালিত প্রকল্প নিয়ে কর্মকর্তারা নীরব থাকলে সেই নীরবতা উপেক্ষা না করে তদন্তের কারণ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
একই ধরনের ঘটনা ঠেকাতে কয়েকটি সংস্কার কার্যকর হতে পারে। নির্ধারিত আকারের চেয়ে বড় প্রতিটি বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য একটি উন্মুক্ত ডিজিটাল তথ্যপর্দা থাকা উচিত। সেখানে প্রকল্পের ব্যয়, কাজের অগ্রগতি, পরিশোধিত ও বকেয়া বিল এবং সংশোধনের কারণ নিয়মিত প্রকাশ করতে হবে। এতে সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানের অপেক্ষায় না থেকে নিয়মিত তথ্য প্রকাশের মাধ্যমেই সমস্যা শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
প্রকল্পের উল্লেখযোগ্য অংশের কাজ শেষ হওয়ার পর পরিসর কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে স্বাধীন পর্যালোচনা ও লিখিত ব্যাখ্যা বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। মাদারগঞ্জের ক্ষেত্রেও এমন ব্যবস্থা থাকলে কাজের পরিসর কমানোর আগেই সিদ্ধান্তের পক্ষে কাউকে ব্যাখ্যা দিতে হতো। বিল নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য দ্রুত ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থাও প্রয়োজন, যাতে চালান ও পাওনা নিয়ে দুই পক্ষের বিরোধের কারণে পুরো প্রকল্প স্থবির হয়ে না পড়ে।
এই শৃঙ্খলা সরকারি কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে হবে। যথার্থ কারণ ছাড়া তথ্য গোপন করা কিংবা অনুমোদনে বিলম্ব ঘটানোর জন্য তাঁদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। কারণ, জবাবদিহি ছাড়া বিলম্ব চলতে থাকলে একবারের স্থবিরতা ধীরে ধীরে নিয়মিত চর্চায় পরিণত হয়।
সবশেষে, মাদারগঞ্জ প্রকল্পের একটি স্বাধীন নিরীক্ষা প্রতিবেদন প্রকাশ করা জরুরি, ফলাফল যা-ই হোক না কেন। তবেই জনগণ বুঝতে পারবে, এই অভিজ্ঞতা থেকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সত্যিই কোনো শিক্ষা নিয়েছে কি না।
উপসংহার
সৌরপ্যানেল গুদামে পড়ে থাকবে আর ঠিকাদারের বিল বকেয়া থাকবে, এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের পক্ষে নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব নয়। নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে প্রকৌশলগত দক্ষতার পাশাপাশি প্রয়োজন সৎ ব্যবস্থাপনা, সময়মতো বিল পরিশোধ এবং স্বচ্ছ হিসাবনিকাশ।
মাদারগঞ্জ প্রকল্প মন্ত্রণালয়ের সামনে একটি সরল প্রশ্ন রেখেছে: পরবর্তী কোনো প্রকল্প একই পরিণতির মুখে পড়ার আগে কি মন্ত্রণালয় ব্যাখ্যা দেবে, তদন্ত করবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে? সেই পদক্ষেপ না আসা পর্যন্ত জামালপুরের মানুষের কাছে বিদ্যুতের আলো কেবল প্রতিশ্রুতিই হয়ে থাকবে।
