আমিরা হায়দার
স্বতন্ত্র স্থপতি
পর্যালোচনার আওতায় থাকা মতামতধর্মী লেখাটি সাজেদ কামাল (২০২৬) দ্য ডেইলি স্টারে প্রকাশিত। লেখাটিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে, যার বড় অংশ এখনও কাজে লাগানো হয়নি। বিশ্বজুড়ে আগুন, উষ্ণতা বৃদ্ধি ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রবণতা দ্রুত জ্বালানি রূপান্তরের প্রয়োজনীয়তা আরও বাড়িয়েছে। তাই লেখক তাঁর ভাষায়, শতভাগ নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের দিকে এগোতে একটি জরুরি কর্মপরিকল্পনা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
দীর্ঘদিন ধরে নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে কাজ ও শিক্ষা দেওয়া একজন মানুষের আবেগপূর্ণ আহ্বান হিসেবে লেখাটি কার্যকর। কিন্তু বিশ্লেষণ হিসেবে বিষয়টির জন্য যে মাত্রার কঠোরতা প্রয়োজন, লেখাটি সেখানে যথেষ্ট পিছিয়ে। কোথায় ঘাটতি রয়েছে, তা খুঁটিয়ে দেখা জরুরি।
পরিমাণগত মডেলের বদলে প্ররোচনামূলক বয়ান
বাংলাদেশকে নবায়নযোগ্য জ্বালানির এক বিশাল, এখনও অচেনা সম্ভাবনার ক্ষেত্র হিসেবে দেখানো হয়েছে লেখাটির মূল বক্তব্যে। কিন্তু এই দাবির ভিত্তি মূলত গুণগত বর্ণনা। উপকূলরেখা, সূর্যালোকের প্রাপ্যতা, জৈববস্তুর সম্ভাবনা এবং জার্মানির সঙ্গে সৌর বিকিরণের মাত্রার তুলনাকে কামাল (২০২৬) সম্ভাবনার প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেছেন। কিন্তু সম্ভাবনা থাকা আর সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবায়নের জন্য ব্যয়সাপেক্ষ ও কারিগরিভাবে পরীক্ষিত একটি পথ থাকা এক বিষয় নয়।
শতভাগ নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ বাস্তবে সম্ভব কি না, তা যাচাই করতে হলে বিদ্যুৎ গ্রিডের স্থিতিশীলতার প্রয়োজনীয়তা, রাত ও বর্ষাকালে উৎপাদন ঘাটতি সামাল দিতে কতটা সঞ্চয়ক্ষমতা দরকার, ঘনবসতিপূর্ণ বদ্বীপ দেশে জমির ব্যবহার নিয়ে কী ধরনের সমঝোতা করতে হবে, সঞ্চালন অবকাঠামোর ব্যয় কত হতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ কীভাবে ধাপে ধাপে এগোবে, তার একটি বাস্তবসম্মত হিসাব প্রয়োজন। লেখাটিতে এসবের কোনোটি নেই।
বরং কৃষিজমির সঙ্গে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সমন্বয় থেকে শুরু করে মহাকাশে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র পর্যন্ত প্রযুক্তির অত্যন্ত দীর্ঘ একটি তালিকা দেওয়া হয়েছে। এরপর সেখান থেকে এমন একটি সিদ্ধান্তে যাওয়া হয়েছে যে সম্ভাবনা যেহেতু রয়েছে, তাই পথটিও স্পষ্ট। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কোনো প্রযুক্তির ব্যবহার হচ্ছে, সেই তালিকা নিজে থেকে প্রমাণ করে না যে একই প্রযুক্তি বাংলাদেশের বাস্তবতায় আর্থিক বা অবকাঠামোগত দিক থেকে কার্যকর হবে।
নির্বাচিত ও যাচাই করা কঠিন সূত্র
কামাল (২০২৬) এমআইটির একজন অধ্যাপকের একটি হিসাব উল্লেখ করেছেন, যেখানে বলা হয়েছে, সূর্যের শক্তির মাত্র ০.০৭ শতাংশ আহরণ করতে পারলেই বিশ্বের মোট জ্বালানি চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। পাশাপাশি তিনি বার্কলির রিনিউএবল অ্যান্ড অ্যাপ্রোপ্রিয়েট এনার্জি ল্যাবরেটরি, ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস এবং ন্যাশনাল রিনিউএবল এনার্জি ল্যাবরেটরির বিভিন্ন প্রতিবেদনের উল্লেখ করেছেন। বাংলাদেশে গ্রিড বিদ্যুতের মোট সরবরাহের ২.৩ শতাংশ বর্তমানে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে আসে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
কিন্তু এসব পরিসংখ্যানের কোনোটি লেখাটিতে সরাসরি সূত্রসহ দেওয়া হয়নি, সুনির্দিষ্ট প্রকাশনার তারিখও নেই এবং কোন পদ্ধতিতে হিসাব করা হয়েছে, তার ব্যাখ্যাও নেই। পাঠকের পক্ষে যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়ে, উল্লেখ করা প্রতিবেদনগুলো বাংলাদেশের নির্দিষ্ট গ্রিড ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় নিয়েছে কি না, ২.৩ শতাংশের হিসাব বিদ্যুৎ বিভাগ, টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, নাকি কোনো স্বাধীন গবেষণা থেকে এসেছে, কিংবা ওই গবেষণাগুলো বিদ্যুৎ সঞ্চয় ও সঞ্চালনজনিত ক্ষতির ব্যয় হিসাব করেছে কি না।
প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করলে একটি বক্তব্যের গ্রহণযোগ্যতা বাড়তে পারে। কিন্তু সেই প্রতিষ্ঠানের গবেষণার কোন অংশ, কী পদ্ধতিতে এবং কোন প্রেক্ষাপটে বর্তমান দাবিকে সমর্থন করছে, তা না জানালে পাঠকের পক্ষে সেই গ্রহণযোগ্যতা যাচাই করা সম্ভব হয় না।
প্রকৃত ব্যয় ও বিকল্পগুলোর হিসাব কোথায়?
একটি পূর্ণাঙ্গ জ্বালানি রূপান্তর পরিকল্পনায় সময়ের সঙ্গে ব্যয় ও সুবিধার তুলনা করতে হয়। এর মধ্যে অবকাঠামো তৈরির মূলধনী ব্যয়, ভর্তুকির চাপ, আমদানি করা যন্ত্রাংশের কারণে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর নির্ভরতা এবং বিনিয়োগকারী রাষ্ট্রের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় নিতে হয়। কামাল (২০২৬) সেই হিসাব করার চেষ্টা করেননি।
তিনি ২০২০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ ১০ শতাংশে নেওয়ার আগের সরকারের লক্ষ্যকে অত্যন্ত কম উচ্চাভিলাষী বলে সমালোচনা করেছেন। একইভাবে ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশে পৌঁছানোর বর্তমান লক্ষ্যকেও যথেষ্ট উচ্চাভিলাষী নয় বলে মনে করেছেন। কিন্তু এর বিকল্প হিসেবে কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্যও তিনি দেননি, যা বাস্তব সক্ষমতা বাড়ানোর একটি পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত।
জরুরি ভিত্তিতে গতি বাড়ানোর আহ্বান জানিয়ে বছরে কত শতাংশ সক্ষমতা বাড়াতে হবে, প্রতিবছর কত বিনিয়োগ প্রয়োজন এবং কোন প্রযুক্তি কোন পর্যায়ে যুক্ত হবে, তার কোনো হিসাব না থাকলে জ্বালানি নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন শেষ পর্যন্ত স্লোগানে পরিণত হয়।
রাজনৈতিক ও শিল্পখাতের আপত্তিকে শুধু অজ্ঞতা হিসেবে দেখার সমস্যা
কামালের লেখায় কয়লা, আমদানি করা গ্যাস এবং ছোট আকারের পারমাণবিক চুল্লির প্রতি আগ্রহকে অজ্ঞতা বা বাস্তবতা অস্বীকারের ফল হিসেবে দেখানো হয়েছে। পরিচ্ছন্ন কয়লা এবং ছোট আকারের পারমাণবিক চুল্লিকেও পুরোনো প্রযুক্তিকে নতুন মোড়কে বাজারজাত করার প্রচেষ্টা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। কিন্তু কামাল (২০২৬) যেভাবে বিষয়টি উপস্থাপন করেছেন, তাতে নীতিনির্ধারকেরা কেন এসব বিকল্পকে এখনও বিবেচনায় রাখছেন, সেই প্রশ্নের প্রকৃত বিশ্লেষণের সুযোগ থাকে না।
বাংলাদেশের জ্বালানি পরিকল্পনাকারীদের সামনে কিছু বাস্তব স্বল্পমেয়াদি সীমাবদ্ধতা রয়েছে। জাতীয় পর্যায়ে অনিয়মিতভাবে উৎপাদনকারী নবায়নযোগ্য উৎস দিয়ে গ্রিডের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার সব সমস্যার এখনও সমাধান হয়নি। গ্যাস ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি এবং ইতোমধ্যে করা অবকাঠামোগত বিনিয়োগ রয়েছে। পাশাপাশি বাণিজ্যিক সম্পর্কের চাপও আছে, যার মধ্যে গ্যাস আমদানির সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন ব্যবস্থা রয়েছে। লেখাটিতে যে বাণিজ্য চুক্তির সমালোচনা করা হয়েছে, সেসব সম্পর্কও তার অংশ। এসব বাস্তবতাকে শুধু স্ববিরোধিতা হিসেবে দেখলে সেই রাজনৈতিক অর্থনীতিকে পাশ কাটানো হয়, যার মধ্য দিয়েই যেকোনো বড় ধরনের জ্বালানি রূপান্তর পরিকল্পনাকে এগোতে হবে।
মতামতধর্মী লেখার বদলে প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্লেষণ কেন জরুরি
একটি সংবাদপত্রের কলাম, যত ভালো গবেষণার ওপরই লেখা হোক না কেন, এত বড় একটি প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর দেওয়ার জন্য কাঠামোগতভাবে যথেষ্ট নয়। এই সমালোচনাটিও তার ব্যতিক্রম নয়। বিষয়টির জন্য প্রয়োজন আইনগত ক্ষমতা ও কারিগরি সক্ষমতা থাকা কোনো প্রতিষ্ঠানের তৈরি বা তত্ত্বাবধানে পরিচালিত একটি পূর্ণাঙ্গ কারিগরি ও অর্থনৈতিক মূল্যায়ন। বিদ্যুৎ বিভাগ, টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ কিংবা বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থার মতো কোনো স্বাধীন প্রতিষ্ঠান উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে কাজ করে এমন মূল্যায়ন করতে পারে।
এ ধরনের মূল্যায়নে বিদ্যুৎ গ্রিডের বিভিন্ন পরিস্থিতি নিয়ে মডেল তৈরি, ব্যয়ের হিসাবের পরিবর্তন হলে ফলাফল কীভাবে বদলায় তার বিশ্লেষণ এবং গবেষণার পদ্ধতি স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করা প্রয়োজন, যাতে অন্য বিশেষজ্ঞরা তা যাচাই করতে পারেন। কামাল (২০২৬) এর মতো একটি মতামতধর্মী লেখা লেখকের দক্ষতা বা আন্তরিকতা যতই থাকুক, সেই প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যায়নের বিকল্প হতে পারে না।
স্বচ্ছ মূল্যায়নের পথে রাজনৈতিক ও শিল্পগত বাধা
আরও গভীর সমস্যা হলো, এমন কঠোর ও পূর্ণাঙ্গ সরকারি মূল্যায়ন অভ্যন্তরীণভাবে করা হলেও সেগুলো খুব কমই সম্পূর্ণ আকারে বা ব্যবহৃত পদ্ধতিসহ প্রকাশ করা হয়। বাংলাদেশের জ্বালানি পরিকল্পনা রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল চুক্তি, জ্বালানি আমদানির সঙ্গে যুক্ত বিদেশি সরকারের সম্পর্ক এবং কয়লা ও গ্যাসভিত্তিক অবকাঠামোয় বিনিয়োগ করা দেশীয় শিল্পের স্বার্থের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
ব্যয়ের হিসাব, চুক্তির শর্ত এবং ভবিষ্যৎ সক্ষমতা পরিকল্পনার মডেল পুরোপুরি প্রকাশ করা হলে এসব সম্পর্ক জনসম্মুখে আলোচনার সুযোগ পাবে। বর্তমান ও অতীতের সরকারগুলো সাধারণত এমন পরিস্থিতি এড়িয়ে চলতেই আগ্রহী থেকেছে। ফলে জনপরিসরে জ্বালানি নিয়ে বিতর্ক গড়ে উঠছে কামাল (২০২৬) এর মতো মতামতধর্মী লেখা এবং সরকারি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিকে ঘিরে, প্রকাশিত ও কারিগরিভাবে যাচাইযোগ্য পরিকল্পনা নথির ভিত্তিতে নয়। এর ফলে সাধারণ মানুষকে অনেক সময় দুটি চরম অবস্থানের মধ্যে দাঁড়াতে হয়। একদিকে শিল্পখাতের অর্থায়নে নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে সংশয়, অন্যদিকে প্রচারনির্ভর নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে আশাবাদ। এই দুইয়ের মাঝখানে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্যের জায়গা খুবই সীমিত।
আরও ভালো বিশ্লেষণ কেমন হতে পারে
এই বিষয়টি নিয়ে শক্তিশালী কোনো বিশ্লেষণে স্পষ্ট অনুমানের ভিত্তিতে বিভিন্ন সম্ভাব্য পরিস্থিতির মডেল দেখানো প্রয়োজন। উদ্ধৃত গবেষণাগুলোর পদ্ধতি ও অর্থায়নের উৎস জানাতে হবে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের অনিয়মিততা সামাল দিতে কতটা সঞ্চয়ক্ষমতা ও গ্রিড অবকাঠামো প্রয়োজন, তার পরিমাণগত হিসাব থাকতে হবে। একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরের বিরোধিতাকে শুধু বোঝাপড়ার ঘাটতি হিসেবে না দেখে কোন কোন প্রাতিষ্ঠানিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ সেই অবস্থানকে ধরে রাখছে, সেটিও বিশ্লেষণ করা দরকার।
বাংলাদেশের জ্বালানি কর্তৃপক্ষগুলো যতদিন না এমন মূল্যায়ন প্রকাশ্যে প্রকাশের উদ্যোগ নেয়, ততদিন কামাল (২০২৬) এর মতো লেখা, উদ্দেশ্য যতই আন্তরিক হোক, বাংলাদেশের জ্বালানি ভবিষ্যৎ নিয়ে যে কঠোর ও স্বচ্ছ জনসম্মুখের হিসাব প্রয়োজন, তার জায়গায় দৃঢ় বিশ্বাসকেই বেশি গুরুত্ব দেবে।
