মিনহাজ-উস-সালেকীন ফাহমী
গেইম এক্স আর ও এসএএএস উদ্যোক্তা
আমার প্রজন্মের ঢাকায় বেড়ে ওঠা প্রায় সবারই একটি শব্দ আজও মনে আছে। ছোট্ট একটি ক্লিক, তারপর হঠাৎ অন্ধকার। লোডশেডিং কখনও আগাম সতর্কতা দিত না। কখনও কথার মাঝখানে, কখনও ভিডিও গেমের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে, কখনও আবার কোনো ফাইল সংরক্ষণের ঠিক আগে বিদ্যুৎ চলে যেত। তখন মোমবাতি জ্বালানো ছাড়া উপায় থাকত না। ভাগ্য ভালো হলে কয়েক মিনিট আগে কাজটি সংরক্ষিত থাকত। আর ভাগ্য খারাপ হলে অন্ধকারে বসে পুরো কাজ বা পুরো গেম আবার শুরু করতে হতো, এমন এক বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর বিরক্ত হয়ে, যার ওপর নিজের কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না।
আজ যখন কেউ বলেন, বাংলাদেশ শিগগিরই সবুজ ডেটা সেন্টারের আঞ্চলিক কেন্দ্র হয়ে উঠবে, তখন সেই ছোট্ট ক্লিকের শব্দটিই আমার মনে পড়ে। আসলে একটি ডেটা সেন্টারের ভিত্তি হলো বিদ্যুতের প্রতি একটি অঙ্গীকার। সারিবদ্ধ সার্ভারগুলোতে যে বিদ্যুৎ পৌঁছাবে, তা কখনও হঠাৎ বন্ধ হবে না, ভোল্টেজের অস্বাভাবিক ওঠানামায় ব্যাহত হবে না এবং ক্রমশ এমন উৎস থেকে আসবে, যা ডিজেলচালিত ব্যাকআপ জেনারেটরের ওপর নির্ভরশীল নয়।
কোনো স্থাপনাকে যখন “সবুজ” বলা হয়, তখন দাবি করা হয় যে তার বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য, যাচাইকৃত এবং নিরবচ্ছিন্ন। এই তিনটির যেকোনো একটি অনুপস্থিত থাকলে “সবুজ” শব্দটি কেবল বাহ্যিক অলংকারে পরিণত হয়। সুন্দর দেখালেই যেমন মোমবাতিকে নবায়নযোগ্য আলোর উৎস বলা যায় না, তেমনি নতুন হলেই কোনো ডেটা সেন্টার পরিবেশবান্ধব হয়ে যায় না।
বর্তমানে বাংলাদেশে দুটি জাতীয় ডেটা সেন্টার রয়েছে, যেগুলো ভিন্ন স্থানে এবং ভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে। ঢাকার আগারগাঁওয়ে অবস্থিত টিয়ার থ্রি ডেটা সেন্টার পরিচালনা করছে বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল। অন্যদিকে গাজীপুরের বঙ্গবন্ধু হাইটেক সিটিতে অবস্থিত টিয়ার ফোর ডেটা সেন্টারের দায়িত্বে রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ ডেটা সেন্টার কোম্পানি লিমিটেড।
২০২৪ সালে বাংলাদেশ ডেটা সেন্টার কোম্পানি লিমিটেড এবং জেননেক্সট টেকনোলজিসের যৌথ উদ্যোগে কালিয়াকৈরের ওই স্থাপনাতেই চালু হয় ‘মেঘনা ক্লাউড’, দেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ ক্লাউড অবকাঠামো। লক্ষ্য ছিল দেশের তথ্য দেশের ভেতরেই সংরক্ষণ করা এবং বিদেশে ক্লাউড সেবার জন্য ব্যয় হওয়া বৈদেশিক মুদ্রার একটি অংশ দেশে ধরে রাখা। বেসরকারি কোলোকেশন বাজার এখনও সীমিত। ফেলিসিটি আইডিসি ও রেড.ডিজিটালের মতো কয়েকটি স্থানীয় প্রতিষ্ঠান সেই বাজারে কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে এমন একটি ঘোষণা আসে, যা সত্যিকার অর্থে “সবুজ” শব্দটির দাবি প্রতিষ্ঠা করে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ, বিটিসিএল এবং সরকারি বেসরকারি অংশীদারিত্ব কর্তৃপক্ষের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, চট্টগ্রামের কাছে বিটিসিএলের মালিকানাধীন জমিতে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে সরকারি বেসরকারি অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে দেশের প্রথম নবায়নযোগ্য জ্বালানিচালিত ডেটা সেন্টার নির্মিত হবে।
একই সময়ে সৌদি আরবের ডেটাভোল্ট এবং ভারতের যোত্তা বাংলাদেশে বিনিয়োগের পরিকল্পনা ঘোষণা করে। পরে দেশের সবচেয়ে বড় বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান সামিট গ্রুপও ঢাকার কাছে একটি নতুন ডেটা সেন্টার নির্মাণের ঘোষণা দেয়। প্রতিষ্ঠানটি আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি অংশীদার খুঁজছে এবং প্রায় আঠারো মাসের মধ্যে কার্যক্রম শুরু করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি, কারণ পুরো আলোচনার ভিত্তিই নির্ভুল তথ্য। সামিটের পরিকল্পিত ডেটা সেন্টার পরিচালিত হবে তাদের বিদ্যমান গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে, নবায়নযোগ্য জ্বালানির মাধ্যমে নয়। প্রকল্পটি আর্থিকভাবে শক্তিশালী এবং বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামোও বটে। কিন্তু একে সবুজ ডেটা সেন্টার বলা যাবে না। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন ব্যাংকের সহায়তায় নির্মাণাধীন নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক চট্টগ্রামের প্রকল্পের সঙ্গে একই কাতারে একে রাখা একটি মৌলিক বিভ্রান্তি। নতুন মানেই পরিবেশবান্ধব নয়।
এই বিভ্রান্তিই অবকাঠামোগত ঘাটতির চেয়ে বেশি উদ্বেগের বিষয়। কারণ অবকাঠামো অর্থ ও সময়ের মাধ্যমে গড়ে তোলা সম্ভব। ঢাকার গ্রীষ্মেও স্থিতিশীল বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা, একটি অপটিক্যাল ফাইবার বিচ্ছিন্ন হলেও বিকল্প সংযোগ সচল রাখা কিংবা বাংলাদেশের আর্দ্র আবহাওয়ার উপযোগী শীতলীকরণ ব্যবস্থা তৈরি করা অসম্ভব নয়। কিন্তু বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে “সবুজ” শব্দটির প্রকৃত অর্থ অক্ষুণ্ণ রাখার নৈতিক শৃঙ্খলা গড়ে তোলা অনেক বেশি কঠিন।
বিনিয়োগের সম্ভাবনা অবশ্য বাস্তব। তথ্যপ্রযুক্তি ও হাইটেক পার্কে বিনিয়োগের জন্য বাংলাদেশ দশ বছরের কর অবকাশ দিচ্ছে। চলতি অর্থবছরের বাজেটে ডেটা সেন্টার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক অবকাঠামোকে দেশের প্রযুক্তি উন্নয়নের চারটি প্রধান অগ্রাধিকারের একটি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পাশাপাশি সংযোগ অবকাঠামো, ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার এবং ইলেকট্রনিক্স উৎপাদনও সমান গুরুত্ব পেয়েছে। সরকার যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানকে বাংলাদেশে বিনিয়োগে উৎসাহিত করছে। ফলে আন্তর্জাতিক পুঁজি বাংলাদেশের দিকে নজর দিচ্ছে।
এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ এই বিনিয়োগের বিনিময়ে কী অর্জন করবে। ভবিষ্যতে ডেটা সেন্টার সংক্রান্ত প্রতিটি বিদেশি বিনিয়োগ চুক্তিতে নিশ্চিত করতে হবে, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার স্বাধীনভাবে যাচাই না হওয়া পর্যন্ত কোনো প্রতিষ্ঠান নিজেদের “সবুজ” বলে প্রচার করতে পারবে না। একই সঙ্গে বাংলাদেশি প্রকৌশলীদের শীতলীকরণ প্রযুক্তি, কার্বন হিসাব এবং টেকসই অবকাঠামো ব্যবস্থাপনায় প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করতে হবে।
পরিচালন আয় থেকে একটি নির্দিষ্ট অংশ এমন একটি তহবিলে জমা হওয়া প্রয়োজন, যার মাধ্যমে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ নিজস্ব মালিকানায় আন্তর্জাতিক মানের ডেটা সেন্টার গড়ে তুলতে পারে, কেবল বিদেশি প্রতিষ্ঠানের আতিথ্যদাতা হয়ে না থেকে। আমি এমন এক বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে শিখেছি, যা খুব কমই বিশ্বাসের কারণ তৈরি করেছিল। ছোটবেলাতেই বুঝেছি, বাস্তবে জ্বলে থাকা আলো আর কেবল প্রতিশ্রুতির আলো এক জিনিস নয়। বাংলাদেশের ডেটা সেন্টার যাত্রাও সেই একই শিক্ষার বৃহৎ সংস্করণ।
আমরা এমন একটি ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারি, যেখানে বিদ্যুৎ হবে বাস্তব, যাচাইকৃত এবং আমাদের নিজেদের নিয়ন্ত্রণে। আবার এমন ভবিষ্যৎও তৈরি হতে পারে, যা সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দৃষ্টিনন্দন দেখাবে, কিন্তু মিটার পরীক্ষা করলেই যার আসল চিত্র স্পষ্ট হয়ে যাবে। কোনটি সত্য আর কোনটি কেবল প্রচার, সেই পার্থক্য বুঝতে বাংলাদেশ বহু দশক ব্যয় করেছে। এখন সেই অভিজ্ঞতাকেই সবচেয়ে বেশি কাজে লাগানোর সময়।
