ফারাহ জেহির
সম্পাদক, অনিকেত রিসার্চ গ্রুপ
এই নিবন্ধের উদ্দেশ্য হলো, কেন বাংলাদেশ নিয়মিতভাবে বিদেশি রন্ধন কূটনীতির আয়োজন করে, কিন্তু আন্তর্জাতিক পরিসরে নিজের খাদ্যসংস্কৃতিকে সমমানের প্ল্যাটফর্মে তুলে ধরতে পারে না, সেই প্রশ্নের অনুসন্ধান করা। আন্তর্জাতিক খাদ্য উৎসবকে সাধারণত সাংস্কৃতিক বিনিময়ের অংশ হিসেবে দেখা হলেও বাস্তবে এসব আয়োজন বাণিজ্য সম্প্রসারণ, পর্যটন বিপণন এবং অর্থনৈতিক কূটনীতির কার্যকর হাতিয়ার হিসেবেও কাজ করে।
এই নিবন্ধের মূল বক্তব্য হলো, বর্তমান পরিস্থিতি অনেকাংশেই একমুখী। থাইল্যান্ডের মতো দেশ দূতাবাস, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, বিমান সংস্থা, হোটেল এবং খাদ্য রপ্তানিকারকদের সমন্বয়ে একটি সমন্বিত কাঠামো গড়ে তুলেছে, যার মাধ্যমে তারা আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের খাদ্যসংস্কৃতি তুলে ধরছে। বাংলাদেশ এসব উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও নিজের খাদ্য ঐতিহ্যের জন্য একই ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করতে পারেনি বা পারস্পরিক সুযোগ নিশ্চিত করার মতো কূটনৈতিক উদ্যোগও গ্রহণ করেনি।
বিদেশি রন্ধন উৎসবকে নিরুৎসাহিত করার কোনো প্রয়োজন নেই। বরং বাণিজ্য আলোচনায় পারস্পরিক সাংস্কৃতিক বিনিময়ের সুযোগ তৈরি, রন্ধন কূটনীতিকে বাণিজ্য কৌশলের অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের উপযোগী খাদ্যপণ্য ও ব্র্যান্ড উন্নয়নে বিনিয়োগ করা এখন সময়ের দাবি।
ঢাকার প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে রয়্যাল থাই দূতাবাসের কমার্শিয়াল উইংয়ের সহযোগিতায় আয়োজিত থাই গুরমে গালা ভলিউম ৩ দেখায়, কীভাবে একটি দেশ সংস্কৃতি ও বাণিজ্যকে একসঙ্গে কাজে লাগাতে পারে। চিয়াং মাইয়ের একজন খ্যাতিমান শেফের অংশগ্রহণ, ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, কূটনৈতিক উপস্থিতি এবং মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, থাই এয়ারওয়েজ ও কোকাকোলা বাংলাদেশের মতো প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতা এই আয়োজনকে শুধু একটি হোটেলভিত্তিক খাবারের অনুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ রাখেনি। একই সময়ে অনুষ্ঠিত টপ থাই ব্র্যান্ডস ট্রেড এক্সিবিশন দেখিয়েছে, কীভাবে একটি দেশ পরিকল্পিত কৌশলের মাধ্যমে তার খাদ্য, ভোক্তা পণ্য এবং জাতীয় পরিচয়কে আন্তর্জাতিকভাবে উপস্থাপন করতে পারে।
তবে আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, এর বিনিময়ে বাংলাদেশ কী অর্জন করছে? ব্যাংককে কোনো বাংলাদেশি হোটেলে কি বাংলাদেশি গুরমে গালা আয়োজন করা হয়? কোনো বাংলাদেশি দূতাবাস কি একই ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতায় বিরিয়ানি, পিঠা, ইলিশ বা বাঙালি ঐতিহ্যবাহী খাবারের উৎসব আয়োজন করে? বিদেশি রাজধানীতে বাংলাদেশি শেফদের নেতৃত্বে রন্ধন প্রদর্শনী আয়োজনের উদ্যোগ কতটা দেখা যায়? বাস্তবতা হলো, এই বিনিময় এখনো প্রধানত একমুখী। ফলে অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কূটনীতিতে পারস্পরিকতার বিষয়টি নতুন করে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে।
রন্ধন কূটনীতি আসলে অর্থনৈতিক কূটনীতি
খাদ্য কূটনীতিকে অনেক সময় কেবল সাংস্কৃতিক যোগাযোগের অংশ হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু এর অর্থনৈতিক প্রভাবও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রন্ধন উৎসব নতুন খাদ্যপণ্য, কৃষিপণ্য, প্রক্রিয়াজাত খাবার, রেস্তোরাঁ ব্যবসা, পর্যটন এবং জাতীয় ব্র্যান্ডের জন্য বাজার তৈরি করে। একটি সফল খাদ্য প্রচারণা ভোক্তাদের নির্দিষ্ট দেশের উপকরণ ব্যবহারে আগ্রহী করে, সেই দেশের রেস্তোরাঁর প্রতি আকৃষ্ট করে এবং পর্যটনের সম্ভাবনাও বাড়ায়।
থাইল্যান্ড কয়েক দশক ধরে এই মডেলকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করছে। দেশটির দূতাবাসের উদ্যোগগুলো বাণিজ্য প্রদর্শনী, বিমান সংস্থা, হোটেল, ব্যাংক এবং রপ্তানিকারকদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে একটি সমন্বিত প্রচারণা কাঠামো তৈরি করেছে। কোনো অতিথি যখন একটি থাই খাবারের অনুষ্ঠানে অংশ নেন, তখন তিনি একই সঙ্গে থাই পণ্য, ভ্রমণ সম্ভাবনা এবং বাণিজ্যিক সুযোগ সম্পর্কেও পরিচিত হন। ধীরে ধীরে সাংস্কৃতিক পরিচিতি বাণিজ্যিক পছন্দে রূপান্তরিত হয়।
পারস্পরিকতা এই ধরনের উদ্যোগের সবচেয়ে বড় শক্তি। দুটি দেশ যখন একে অপরের খাদ্যসংস্কৃতি প্রচার করে, তখন উভয় দেশ নতুন ভোক্তা গোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানোর সুযোগ পায়, কৃষিপণ্যের চাহিদা বাড়ায় এবং মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক আরও গভীর করে, যা বৃহত্তর বাণিজ্য সম্পর্ককে শক্তিশালী করে।
বাংলাদেশে থাই গুরমে গালা একাধিক বছর ধরে আয়োজিত হচ্ছে, যার ফলে ঢাকার আতিথেয়তা খাতে থাই খাবারের পরিচিতি ও গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে। কিন্তু বিদেশে বাংলাদেশি খাবারের জন্য একই ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ এখনো সীমিত।
কেন পিছিয়ে বাংলাদেশ
প্রথম সমস্যা হলো প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ঘাটতি। থাইল্যান্ডের রন্ধন কূটনীতি দূতাবাসের বাণিজ্যিক শাখার মাধ্যমে পরিচালিত হয়, যেখানে হোটেল, বিমান সংস্থা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং বাণিজ্যিক সংগঠনগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করে। বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশনগুলোতে এ ধরনের ধারাবাহিক কর্মসূচি এখনো গড়ে ওঠেনি। খাদ্যকে এখনো একটি সম্ভাবনাময় রপ্তানি খাত হিসেবে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।
দ্বিতীয় সমস্যা হলো পণ্যের প্রস্তুতি ও মান নির্ধারণ। থাই খাবার আন্তর্জাতিকভাবে সফল হয়েছে কারণ থাইল্যান্ড দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ববাজারের উপযোগী খাদ্যপণ্য তৈরি করেছে। থাই কারি পেস্ট, সস, চালের বিভিন্ন জাত, হিমায়িত খাবার এবং প্যাকেটজাত উপকরণ আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে বাজারজাত করা হয়। ফলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রেস্তোরাঁ সহজেই নির্ভরযোগ্য সরবরাহ ব্যবস্থার মাধ্যমে থাই খাবারের স্বাদ পুনর্নির্মাণ করতে পারে।
বাংলাদেশি খাবারের ক্ষেত্রে এই অবকাঠামো এখনো সীমিত। মানসম্মত মসলা মিশ্রণ, রপ্তানিযোগ্য প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, হিমায়িত পিঠা, উন্নতমানের সামুদ্রিক খাদ্যপণ্য এবং আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডিংয়ের অভাব রয়েছে। বিদেশে বাংলাদেশি খাবারের চাহিদা থাকলেও অনেক হোটেল ও রেস্তোরাঁ নিয়মিতভাবে প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহ করতে সমস্যায় পড়ে। বাণিজ্যিকভাবে সম্প্রসারণযোগ্য পণ্য ছাড়া সাংস্কৃতিক জনপ্রিয়তাকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সুযোগে রূপান্তর করা কঠিন।
তৃতীয় সমস্যা হলো কূটনৈতিক কৌশলের সীমাবদ্ধতা। সফল রন্ধন কূটনীতি সাধারণত বৃহত্তর বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্কের অংশ হিসেবে পরিচালিত হয়। বাংলাদেশ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা চুক্তি করলেও এসব আলোচনায় পারস্পরিক খাদ্য প্রচারের বিষয়টি খুব কমই গুরুত্ব পেয়েছে। ফলে বাংলাদেশি খাবার মূলত প্রবাসী রেস্তোরাঁ ও কমিউনিটি আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে।
আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড পরিচিতি। যেসব দেশ রন্ধন কূটনীতিতে সফল, তারা নিজেদের খাদ্য ঐতিহ্যকে একটি সুস্পষ্ট জাতীয় পরিচয়ের মাধ্যমে উপস্থাপন করে। বাংলাদেশের রয়েছে সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময় খাদ্য ঐতিহ্য, কিন্তু এখনো এমন কোনো আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড তৈরি হয়নি, যা দেশের আঞ্চলিক বৈচিত্র্য, ঐতিহ্যবাহী উপকরণ এবং রান্নার স্বাতন্ত্র্যকে বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরতে পারে।
আয়োজক থেকে সমান অংশীদার হওয়ার পথে
বাংলাদেশের মাটিতে আন্তর্জাতিক রন্ধন উৎসব আয়োজনের বিরোধিতা করার কোনো কারণ নেই। এসব উদ্যোগ সাংস্কৃতিক বিনিময় বাড়ায় এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক শক্তিশালী করে। তবে ভবিষ্যতের লক্ষ্য হওয়া উচিত পারস্পরিক সুযোগ নিশ্চিত করা।
ভবিষ্যৎ বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক আলোচনায় অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশি খাবার, খাদ্যপণ্য এবং রন্ধন পর্যটন প্রচারের বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে একটি বিশেষায়িত রন্ধন কূটনীতি কর্মসূচি গড়ে তোলা যেতে পারে, যা দূতাবাস, রপ্তানিকারক, শেফ, পর্যটন সংস্থা এবং বেসরকারি খাতকে একত্রে কাজ করার সুযোগ দেবে।
একই সঙ্গে হোটেল, বিমান সংস্থা, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান এবং কৃষিপণ্য রপ্তানিকারকদের আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পণ্য, শক্তিশালী সরবরাহ ব্যবস্থা এবং পেশাদার ব্র্যান্ডিংয়ে যৌথ বিনিয়োগ করতে হবে। রন্ধন কূটনীতি সফল হয় তখনই, যখন সাংস্কৃতিক উপস্থাপনার সঙ্গে নির্ভরযোগ্য বাণিজ্যিক পণ্য যুক্ত থাকে।
থাই গুরমে গালা দেখিয়ে দিয়েছে, একটি পরিকল্পিত জাতীয় কৌশল কী অর্জন করতে পারে। সমস্যা থাইল্যান্ড বাংলাদেশে তাদের খাবার প্রচার করছে, তা নয়। মূল প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কেন এখনো এমন প্রতিষ্ঠান, পণ্য ও কূটনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলতে পারেনি, যার মাধ্যমে নিজের খাদ্যসংস্কৃতিকে সমান আত্মবিশ্বাসে বিশ্বের সামনে তুলে ধরা যায়।
যে দেশ তৈরি পোশাক, ওষুধ, চামড়া এবং কৃষিপণ্য রপ্তানি করে, সেই দেশ তার অন্যতম বড় সাংস্কৃতিক সম্পদ খাদ্যকেও বিশ্ববাজারে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। বাংলাদেশের খাবারের স্থান বিশ্ব টেবিলে থাকা উচিত। সেই অবস্থান অর্জনের জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ এবং আয়োজক নয়, সমান অংশীদার হিসেবে আলোচনায় বসার আত্মবিশ্বাস।
