ইফতেখার রহমান
ভারড্যান্ট গ্লোবাল
উৎপাদনের শক্তি, কিন্তু ব্র্যান্ডের দুর্বলতা
বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পোশাক উৎপাদন প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলেছে। দেশের কারখানাগুলো বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক খুচরা বিক্রেতাদের পোশাক সরবরাহ করে, আর তৈরি পোশাক খাত জাতীয় রপ্তানির মূল ভিত্তি হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। তবু একটি কৌশলগত বৈপরীত্য রয়েই গেছে। বাংলাদেশ অন্যদের জন্য পোশাক তৈরিতে বৈশ্বিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক, কিন্তু বাংলাদেশি পোশাক ব্র্যান্ডগুলো দেশে বা বিদেশে ভোক্তামুখী ব্র্যান্ড হিসেবে সমতুল্য শক্তি অর্জন করতে পারেনি।
এটা সক্ষমতার ব্যর্থতা নয়, বরং মূল্যশৃঙ্খলের সমস্যা। বাংলাদেশ উৎপাদন, নিয়মকানুন মেনে চলা, খরচ নিয়ন্ত্রণ এবং বড় পরিসরে সরবরাহে দক্ষতা অর্জন করেছে। কিন্তু ডিজাইনের মালিকানা, ভোক্তা তথ্য, খুচরা অভিজ্ঞতা, মূল্য নির্ধারণের ক্ষমতা এবং ব্র্যান্ডের গল্প বলার মতো উচ্চ মুনাফার কাজগুলো এখনো আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের হাতেই নিয়ন্ত্রিত। পরবর্তী ধাপে উৎপাদন দক্ষতা থেকে ব্র্যান্ড সক্ষমতায় উত্তরণ ঘটানো জরুরি।
চুক্তি উৎপাদনের কাঠামোগত উত্তরাধিকার
সমস্যার শিকড় কাঠামোগত। পোশাক শিল্প মূলত বিদেশি লেবেলের জন্য চুক্তি উৎপাদনের মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়েছে। এই মডেল কর্মসংস্থান, বৈদেশিক মুদ্রা ও শিল্পের বিশাল পরিসর তৈরি করেছে, কিন্তু বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানকে ডিজাইন স্টুডিও, ভোক্তা গবেষণা দল, খুচরা নেটওয়ার্ক বা বিপণন প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলতে বাধ্য করেনি। ধীরে ধীরে খাতটি বাস্তবায়নে অত্যন্ত দক্ষ হয়ে উঠেছে, কিন্তু মৌলিক ফ্যাশন পরিচয় তৈরিতে অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারেনি।
এই উত্তরাধিকার এখনো শিল্পের আচরণ নির্ধারণ করে। উৎপাদনকে প্রায়শই কৌশলের কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়, আর ব্র্যান্ডিংকে গৌণ মনে করা হয়। অগ্রাধিকারমূলক বাজারে প্রবেশাধিকার, শ্রমমূল্যের সুবিধা ও ক্রেতাচালিত সোর্সিং যখন প্রতিযোগিতামূলকতা নির্ধারণ করত, তখন এই দৃষ্টিভঙ্গি কাজে লেগেছিল। কিন্তু যেখানে ভোক্তা, নিয়ন্ত্রক ও খুচরা বিক্রেতারা ক্রমেই ভিন্নতা, টেকসইতা ও দ্রুত বাজারে আসার সক্ষমতাকে পুরস্কৃত করছে, সেখানে এই পদ্ধতি আর যথেষ্ট নয়।
দেশীয় ব্র্যান্ড ও ধারণাগত ব্যবধান
দেশীয় বাজারে সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতা দুটোই স্পষ্ট। বাংলাদেশে ইতিমধ্যে আড়ং, ইয়েলো, সেইলর, এক্সট্যাসি ও লা রেভের মতো বিশ্বাসযোগ্য স্থানীয় ব্র্যান্ড রয়েছে। এই উদাহরণগুলো প্রমাণ করে যে স্থানীয়ভাবে ব্র্যান্ড গড়ে তোলা সম্ভব। তবে অনেক শহুরে ভোক্তা এখনো বিদেশি লেবেলকে উচ্চমান, মর্যাদা ও আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হিসেবে দেখেন।
এই ধারণা শুধু দেশপ্রেমের বার্তায় পরিবর্তন করা যাবে না। এর জন্য দরকার ধারাবাহিক ডিজাইন গুণমান, সুশৃঙ্খল পণ্য উপস্থাপনা, উন্নত খুচরা পরিবেশ, নির্ভরযোগ্য মাপ, বিক্রয়োত্তর সেবা এবং আত্মবিশ্বাসী ব্র্যান্ড ভাষা। ভালো পণ্য বিক্রি করেও যে স্থানীয় ব্র্যান্ড একটি বিশ্বাসযোগ্য জীবনযাত্রার প্রস্তাব দিতে পারে না, সে আঞ্চলিক প্রতিযোগীদের সঙ্গে টিকে থাকতে হিমশিম খাবে।
ডিজাইন, ডিজিটাল সক্ষমতা ও বাজারে প্রবেশাধিকার
ডিজাইন একটি শিল্পগত অগ্রাধিকার, কোনো আলংকারিক বিষয় নয়। বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজির মতো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাংলাদেশ ফ্যাশন শিক্ষায় অগ্রগতি করেছে। তবু ব্যাপক পরিবেশ এমন দেশগুলোর তুলনায় এখনো অনুন্নত, যারা ডিজাইন ও ব্র্যান্ডিংকে রপ্তানি সক্ষমতা হিসেবে বিবেচনা করে।
ফ্যাশন ইনস্টিটিউট, কারখানা, খুচরা বিক্রেতা, কারিগর, ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম ও পরামর্শদাতাদের মধ্যে শক্তিশালী সংযোগ গড়ে তোলা বাংলাদেশের জন্য জরুরি। ডিজাইন শিক্ষায় ভোক্তা বিশ্লেষণ, ডিজিটাল পণ্য উন্নয়ন, টেকসইতা, মূল্য নির্ধারণ, মেধাস্বত্ব এবং আন্তর্জাতিক খুচরা ব্যবস্থাপনা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এই বিস্তৃত প্রশিক্ষণ ভিত্তি না থাকলে অনেক ব্র্যান্ড প্রবণতা নির্ধারণের বদলে কেবল প্রতিক্রিয়াশীল হয়েই থাকবে।
ডিজিটাল ব্যবধানটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বৈশ্বিক ফ্যাশন এখন অনলাইন আবিষ্কার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নান্দনিকতা, ইনফ্লুয়েন্সার নেটওয়ার্ক, তথ্যনির্ভর পণ্য উপস্থাপনা এবং সরাসরি ভোক্তার কাছে বিক্রয়ের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। বাংলাদেশের অনেক ব্র্যান্ড এখনো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে মূলত বিক্রয় মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে, পূর্ণাঙ্গ ব্র্যান্ড ইকোসিস্টেম হিসেবে নয়। একটি প্রতিযোগিতামূলক ব্র্যান্ডের জন্য দরকার কন্টেন্টের শৃঙ্খলা, গ্রাহক বিভাজন, পেমেন্টে আস্থা এবং তথ্য বিশ্লেষণ।
বাজারে প্রবেশাধিকারের বিষয়টিও জরুরি হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হলেও স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের ফলে প্রধান বাজারগুলোতে অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধা ধীরে ধীরে কমে যাবে। খাতটি যদি কেবল মূল্য প্রতিযোগিতায় থেকে যায়, তাহলে মুনাফার চাপ আরও বাড়বে। সেই পরিস্থিতিতে ব্র্যান্ড ইকুইটিই হবে সুরক্ষাকবচ। যে কোম্পানি গ্রাহকের আনুগত্য অর্জন করেছে, সে কেবল ক্রেতার অর্ডারের জন্য প্রতিযোগিতাকারী উৎপাদনকারীর চেয়ে মূল্য ধরে রাখতে অনেক বেশি সক্ষম।
টেকসইতা, ঐতিহ্য ও মেধাস্বত্ব
টেকসইতা এখন একটি কৌশলগত প্রয়োজনীয়তা। বৈশ্বিক পোশাক নিয়ন্ত্রণ পরিবেশবান্ধব উৎপাদন চক্র, পণ্যের উৎস অনুসরণযোগ্যতা, দায়িত্বশীল সোর্সিং ও কম বর্জ্য উৎপাদনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি (ইউএনইপি) জোর দিয়েছে যে বস্ত্র খাতে টেকসইতার জন্য ভোগ, উৎপাদন পদ্ধতি ও অবকাঠামোতে ব্যাপক পরিবর্তন আনা দরকার। বাংলাদেশি ব্র্যান্ডগুলোর জন্য টেকসইতা কেবল মেনে চলার স্লোগান হয়ে থাকলে চলবে না। ডিজাইন, সোর্সিং, লেবেলিং, প্যাকেজিং এবং ভোক্তা যোগাযোগ সবকিছুতেই এর ছাপ থাকতে হবে।
বাংলাদেশের একটি সাংস্কৃতিক সুবিধাও রয়েছে, যা এখনো বাণিজ্যিকভাবে পুরোপুরি কাজে লাগানো হয়নি। মসলিন, জামদানি, কাঁথা, প্রাকৃতিক তন্তু ও কারিগরি কৌশল একটি স্বতন্ত্র ফ্যাশন পরিচয়ের ভিত্তি হতে পারে। বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক কাঠামোর আওতায় জামদানির সুরক্ষা প্রমাণ করে যে ঐতিহ্যকে কেবল সাংস্কৃতিক স্মৃতি নয়, একটি অর্থনৈতিক সম্পদ হিসেবে দেখা সম্ভব।
লক্ষ্য হওয়া উচিত ভারতীয়, তুর্কি বা পশ্চিমা ফ্যাশনের অনুকরণ নয়, বরং একটি সমসাময়িক বাংলাদেশি নান্দনিকতা তৈরি করা, যা হবে খাঁটি, রপ্তানিযোগ্য ও বাণিজ্যিকভাবে সুশৃঙ্খল। এর জন্য প্রয়োজন ট্রেডমার্ক, ডিজাইন স্বত্ব, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ভৌগোলিক নির্দেশক সুরক্ষা, কারিগরদের সঙ্গে অংশীদারিত্ব এবং অনুকরণের বিরুদ্ধে সুরক্ষাব্যবস্থা।
ব্র্যান্ড প্রতিযোগিতামূলকতার জন্য নীতি কাঠামো
নীতি সহায়তাকেও বিকশিত হতে হবে। বিদ্যমান প্রণোদনাগুলো মূলত রপ্তানি উৎপাদনকে সহায়তা করেছে। এটা গুরুত্বপূর্ণ থাকলেও ব্র্যান্ড গড়ে তুলতে ভিন্ন ধরনের উপকরণ দরকার। সরকারি সহায়তা কেবল কারখানা নির্মাণে নয়, ডিজাইন, ব্র্যান্ডিং, বাজারে প্রবেশ এবং মেধাস্বত্ব সুরক্ষাতেও বিনিয়োগ করা উচিত। একটি বাংলাদেশ ফ্যাশন ব্র্যান্ড উন্নয়ন তহবিল ডিজাইন স্টুডিও, আন্তর্জাতিক বিপণন, ই-কমার্স অবকাঠামো, পণ্য পরীক্ষা, মেধাস্বত্ব নিবন্ধন ও বাজারে প্রবেশ প্রচারণাকে সহায়তা করতে পারে।
সহায়তা হতে হবে স্বচ্ছ ও কার্যক্ষমতার সঙ্গে সংযুক্ত। সূচকগুলোর মধ্যে থাকতে পারে রপ্তানি বিক্রয়, কর্মসংস্থানের মান, নারীনেতৃত্বাধীন ডিজাইনে অংশগ্রহণ, কারিগরদের সম্পৃক্ততা, টেকসইতা মেনে চলা এবং ডিজিটাল বাজারের সম্প্রসারণ। এতে ভর্তুকির অপচয় কমবে এবং সরকারি সহায়তা পরিমাপযোগ্য জাতীয় মূল্য তৈরি করছে কি না, তা নিশ্চিত করা যাবে।
শিল্পের সমন্বয়ও অপরিহার্য। বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, ফ্যাশন বিশ্ববিদ্যালয়, চেম্বার, রপ্তানি উন্নয়ন সংস্থা ও শীর্ষস্থানীয় স্থানীয় ব্র্যান্ডগুলো মিলে একটি বাংলাদেশ ফ্যাশন কম্পিটিটিভনেস কাউন্সিল গঠন করা উচিত। এই কাউন্সিল ডিজাইন শিক্ষা, বাজার তথ্য, খুচরা মান, টেকসইতার প্রস্তুতি, আন্তর্জাতিক মেলায় অংশগ্রহণ এবং স্থানীয় ব্র্যান্ডগুলোর রপ্তানি পথ সমন্বয় করবে।
কারখানার শক্তি থেকে ফ্যাশনের পরিচয়ে
বাংলাদেশের উচিত একটি সুশাসিত ‘মেড ইন বাংলাদেশ ফ্যাশন’ প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা। এটা কোনো আলগা স্লোগান হবে না, বরং মান নিয়ন্ত্রণ, নৈতিক সোর্সিং মানদণ্ড, ডিজাইনের সততা, পণ্যের উৎস অনুসরণযোগ্যতার প্রত্যাশা ও বিশ্বাসযোগ্য সার্টিফিকেশনের মাধ্যমে পরিচালিত হবে। এই ধরনের প্ল্যাটফর্ম স্থানীয় ব্র্যান্ডগুলোকে সহায়তা করতে, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আকর্ষণ করতে এবং দেশকে একটি বিশ্বাসযোগ্য ফ্যাশন উৎপাদনকারী অর্থনীতি হিসেবে পুনর্বিন্যস্ত করতে সাহায্য করবে।
বাংলাদেশকে তার উৎপাদন শক্তি ছেড়ে দিতে হবে না। সেই শক্তিকেই উচ্চমূল্যের মালিকানায় রূপান্তরিত করতে হবে। সামনের চ্যালেঞ্জ কেবল আরও বেশি পোশাক রপ্তানি করা নয়, বরং আরও বেশি ডিজাইন, ভোক্তার আস্থা, ব্র্যান্ড ইকুইটি ও মূল্য নির্ধারণের ক্ষমতার মালিক হওয়া। বাংলাদেশের পোশাক খাতের পরবর্তী প্রতিযোগিতামূলকতা নির্ভর করবে কেবল কতটুকু রপ্তানি হচ্ছে তার ওপর নয়, বরং কতটুকু মূল্যের মালিকানা অর্জিত হচ্ছে তার ওপর।
তথ্য
- Bangladesh Garment Manufacturers and Exporters Association, Export Performance, Dhaka, BGMEA, available at BGMEA Export Performance.
- BGMEA University of Fashion and Technology, Department of Fashion Design and Technology, Dhaka, BUFT, available at BUFT Department of Fashion Design and Technology.
- Mohammad Abdur Razzaque, Deen Islam and Jillur Rahman, Can Bangladesh Absorb LDC Graduation-Induced Tariff Hikes? Evidence Using Product-Specific Price Elasticities of Demand and Markups for Apparel Exports to Europe, International Growth Centre and Research and Policy Integration for Development, 2024, available at International Growth Centre.
- World Trade Organization, Bangladesh Working Towards a Sustainable Export Future, Geneva, WTO, available at World Trade Organization.
- United Nations Environment Programme, Sustainability and Circularity in the Textile Value Chain. A Global Roadmap, Nairobi, UNEP, 2023, available at United Nations Environment Programme.
- Circle Economy Foundation, Chatham House and European Environmental Bureau, Impacts of EU Circular Textiles Policy on Trade Partners. A Case Study of Bangladesh, 2025, available at Circular Economy Earth.
- Mahua Zahur, Challenges for “Jamdani Saree” and “Bangladesh Ilish”, the Two Registered Geographical Indications from Bangladesh in the Post-Registration Epoch, WIPO-WTO Colloquium Papers, Geneva, World Trade Organization, 2018, available at World Trade Organization.
