সুমাইয়া হাসি
কমিশনিং সম্পাদক, অনিকেত বুলেটিন
“মেয়ের মতো কাঁদছ কেন?” শ্রেণিকক্ষে কোনো ছেলেকে এ কথা বলার উদ্দেশ্য তাকে শুধু থামানো নয়, তার আবেগকেও লজ্জার বিষয় করে তোলা। যেন কান্না, ভয় কিংবা কোমলতা পুরুষের স্বভাবের সঙ্গে যায় না। অথচ এই পরিচিত বাক্যটির ভেতরেই লুকিয়ে আছে নারীর প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির একটি গভীর সংকট। এখানে নারী হওয়াকে দুর্বলতা হিসেবে দেখানো হয়, আর সেই দুর্বলতার সঙ্গে তুলনা করে ছেলেদের শাসন করা হয়।
সমস্যাটি তাই একটি শব্দ বা বাক্যে সীমাবদ্ধ নয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র এবং গণমাধ্যমে প্রতিদিনের এমন ভাষা নারী ও পুরুষের জন্য আলাদা আচরণবিধি তৈরি করে। এর প্রভাব পড়ে আত্মপরিচয়, সম্পর্ক এবং সমাজে ক্ষমতার বণ্টনে।
শব্দের ভেতরের ধারণা
পুরুষত্ব নিয়ে ৩৭টি গবেষণার পর্যালোচনায় দেখা গেছে, প্রচলিত পুরুষালি আচরণের সঙ্গে আবেগ গোপন রাখা, কঠোরতা এবং দুর্বলতা প্রকাশ না করার ধারণা জড়িত। ঢাকার ৪০ জন কিশোরকে নিয়ে ২০২৩ সালের একটি গবেষণাও দেখায়, পুরুষত্ব সম্পর্কে সামাজিক প্রত্যাশা কিশোরদের মানসিক সুস্থতা ও আচরণকে প্রভাবিত করতে পারে।
কোনো ছেলেকে বারবার বলা হলে যে কান্না তার জন্য নয়, সে ধীরে ধীরে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে সংকোচ বোধ করতে পারে। একইভাবে, কোনো মেয়েকে সাহসী, দৃঢ় কিংবা নেতৃত্বদানে সক্ষম হওয়ার জন্য তিরস্কার করা হলে তার আত্মবিশ্বাসও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ভাষা তখন শুধু মনোভাব প্রকাশ করে না, মানুষের সম্ভাবনার সীমাও নির্ধারণ করে।
ঘরের ভেতরের হিসাব
এই মানসিকতার বাস্তব প্রভাব সবচেয়ে স্পষ্ট হয় নারীর প্রতি সহিংসতা ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউএনএফপিএর ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, জীবনে কখনো সঙ্গীর সহিংসতার শিকার হয়েছেন এমন নারীর হার প্রায় ৭০ শতাংশ। আগের ১২ মাসে এ অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন ৪১ শতাংশ নারী। নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণ, শারীরিক, মানসিক ও যৌন সহিংসতা এই বাস্তবতার অংশ।
নারীর চলাফেরা, অর্থব্যবহার, পোশাক কিংবা সিদ্ধান্তের ওপর নিয়ন্ত্রণকে অনেক সময় যত্ন বা পারিবারিক শৃঙ্খলা বলে গ্রহণ করা হয়। কিন্তু যত্নের নামে স্বাধীনতা সীমিত করা সমান সম্পর্কের ধারণার বিরোধী। নারীর উপার্জন বা আর্থিক স্বাধীনতা বাড়লেই যে সহিংসতা কমে যাবে, বাস্তবতা সব সময় তেমন নয়। ক্ষমতার অসমতা অক্ষুণ্ণ থাকলে স্বাধীনতাও কখনো সংঘাতের কারণ হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।
নীরবতার সংস্কৃতি
সহিংসতার শিকার অনেক নারী কাউকে কিছু জানান না। অনেকে জানেন না কোথায় অভিযোগ করতে হবে বা কোথায় সহায়তা পাওয়া সম্ভব। সামাজিক সম্মান হারানোর ভয়, পরিবারের চাপ, আর্থিক নির্ভরতা এবং সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ তাঁদের নীরব রাখে। এই নীরবতাকে সম্মতি হিসেবে দেখা ভুল। বরং এটি এমন এক পরিবেশের ইঙ্গিত, যেখানে ভুক্তভোগীর নিরাপত্তার চেয়ে সামাজিক ভাবমূর্তিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। অনলাইন হয়রানি ও প্রযুক্তিনির্ভর সহিংসতাও এই সমস্যাকে আরও জটিল করেছে। প্রতিরোধের জন্য তাই আইনগত সহায়তার পাশাপাশি নিরাপদ অভিযোগব্যবস্থা এবং সামাজিক সমর্থন নিশ্চিত করা জরুরি।
সূচকের আড়ালে
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের বৈশ্বিক লিঙ্গবৈষম্য সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ২০২৫ সালের ২৪তম স্থান থেকে ২০২৬ সালে ৭৯তম স্থানে নেমেছে। রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রেও অবনতি দেখা গেছে। এসব সূচক শুধু অবস্থান নির্ধারণ করে না; সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর অংশগ্রহণ ও প্রতিনিধিত্বের সীমাবদ্ধতাও সামনে আনে। শিক্ষায় অগ্রগতি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে সুযোগের সমতা নিশ্চিত না হলে সেই অগ্রগতি পূর্ণতা পায় না। সংসদ, প্রশাসন, ব্যবসা এবং স্থানীয় নেতৃত্বে নারীর কার্যকর অংশগ্রহণ বাড়ানো তাই জরুরি।
কাজের জগতের অদৃশ্য দেয়াল
বাংলাদেশে নারীর শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ পুরুষের তুলনায় অনেক কম। বিবিএসের শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, নারীর শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার প্রায় ৩৮.৪১ শতাংশ, যেখানে পুরুষের হার ৭৯.৯৬ শতাংশ। অনানুষ্ঠানিক কাজে নারীর অংশগ্রহণ, মজুরিবৈষম্য, নিরাপদ কর্মপরিবেশের অভাব এবং ঘরের অবৈতনিক কাজ এই ব্যবধানকে আরও গভীর করে। নারীর কাজকে প্রায়ই পরিবারের সহায়তা হিসেবে দেখা হয়, স্বতন্ত্র অর্থনৈতিক অবদান হিসেবে নয়। কর্মক্ষেত্রে পদোন্নতি, নেতৃত্ব এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগেও এই দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাব পড়ে। সমাধানের জন্য সমান মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, হয়রানির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা এবং শিশুযত্নের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন।
যত্নের দায় সবার
সন্তান লালন-পালন, বয়স্কদের দেখাশোনা এবং ঘরের কাজকে এখনো প্রধানত নারীর দায় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফলে কর্মজীবী নারীদের একসঙ্গে পেশাগত ও পারিবারিক দায় সামলাতে হয়। পিতৃত্বকালীন ছুটি এবং কর্মক্ষেত্রে নমনীয় ব্যবস্থা এই ভার ভাগ করে নিতে সাহায্য করতে পারে। যত্নের দায় ভাগাভাগি হলে পরিবার ও কর্মক্ষেত্র উভয়ই উপকৃত হয়। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার ৪.৭ নম্বর লক্ষ্য সমতা ও মানবাধিকারের শিক্ষা এবং ৫.৪ নম্বর লক্ষ্য অবৈতনিক যত্ন ও গৃহস্থালি কাজের স্বীকৃতির ওপর গুরুত্ব দেয়। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য নীতিমালার পাশাপাশি দৈনন্দিন আচরণেও পরিবর্তন দরকার।
পরিবারে শিশুদের শেখাতে হবে, আবেগ প্রকাশ দুর্বলতা নয়; ঘরের কাজ কোনো একটি লিঙ্গের দায় নয়; আর সাহস, নেতৃত্ব ও সহমর্মিতা নারী-পুরুষের আলাদা বৈশিষ্ট্য নয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও কর্মক্ষেত্রকেও অবমাননাকর ভাষার বদলে পারস্পরিক সম্মানের চর্চা গড়ে তুলতে হবে। ‘মেয়ের মতো’ কথাটি কখনো নিছক ঠাট্টা বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু এমন ঠাট্টাই যখন বারবার নারীকে ছোট করে এবং পুরুষকে আবেগহীন হতে শেখায়, তখন তা বৈষম্যের সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখে। পরিবর্তন শুরু হতে পারে একটি বাক্য থেকে: কাউকে ছোট না করে, তার মানুষ হয়ে ওঠার অধিকারকে সম্মান করা।
