ফারাহ জেহির
নির্বাহী সম্পাদক, অনিকেত বুলেটিন
মতিউর রহমানের ‘সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য আর কত দিন অপেক্ষা করতে হবে?’ শীর্ষক নিবন্ধটি বঙ্গোপসাগর সংলাপ ২০২৬-এ দেওয়া তাঁর একটি বক্তব্যের সংক্ষিপ্ত সংস্করণ। প্রথম আলোর সম্পাদক ও প্রকাশক ১৯৬২ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ছাত্র আন্দোলনের সময় থেকে আজ পর্যন্ত সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার পক্ষে তাঁর অবস্থানের বিবরণ দিয়েছেন।
অন্তর্বর্তী সরকার এবং এর আগের কর্তৃত্ববাদী শাসনামলে সংবাদমাধ্যমের ওপর চাপের কথা তুলে ধরে তিনি ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচিত বিএনপি সরকারের প্রতি গণমাধ্যম সংস্কারের প্রতিশ্রুতি পূরণের আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য আবেগপূর্ণ এবং প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতানির্ভর। তবে নীতিগতভাবে যেসব প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন, তার কয়েকটি অনুত্তরিত থেকে গেছে।
ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা
নিবন্ধটির বড় অংশজুড়ে রয়েছে লেখকের নিজের এবং তাঁর সংবাদপত্রের অভিজ্ঞতা। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রথম আলো কার্যালয়ে হামলা, বিজ্ঞাপন প্রত্যাহার, প্রায় ৮০টি মামলা এবং মালিকানা ছেড়ে দেওয়ার চাপের বিবরণ গুরুতর ও তাৎপর্যপূর্ণ। তবে এসব অভিজ্ঞতা মূলত একটি প্রতিষ্ঠানের চিত্র তুলে ধরে।
সংবাদপত্রের ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন, সম্পাদকদের সরিয়ে দেওয়া এবং বহু সাংবাদিককে চাকরি ছাড়তে বাধ্য করার কথা লেখক উল্লেখ করেছেন, কিন্তু এ বিষয়ে কোনো পরিসংখ্যান, নাম কিংবা নির্দিষ্ট ঘটনার বিবরণ দেননি। কতজন সাংবাদিক হামলার শিকার হয়েছেন, চাকরি হারিয়েছেন, মামলার মুখে পড়েছেন কিংবা তাঁদের কণ্ঠরোধ করা হয়েছে, তার নির্ভরযোগ্য হিসাব ছাড়া পাঠকের পক্ষে বোঝা কঠিন যে লেখকের অভিজ্ঞতা বৃহত্তর বাস্তবতার প্রতিফলন, নাকি ব্যতিক্রমী কোনো পরিস্থিতি।
প্রস্তাবিত গণমাধ্যম কমিশনের অধীনে সাংবাদিকদের ওপর হামলা, মামলা ও চাকরিচ্যুতির ঘটনা নিয়ে একটি স্বাধীন ও সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত তথ্যভান্ডার গড়ে তুলতে পারে সরকার। এর সঙ্গে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ১৬, অর্থাৎ শান্তি, ন্যায়বিচার ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ করে ১৬.১০ লক্ষ্যমাত্রায় তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার এবং মৌলিক স্বাধীনতা সুরক্ষার কথা বলা হয়েছে। এর ১৬.১০.১ সূচকে সাংবাদিকদের হত্যা, অপহরণ, নির্বিচারে আটক ও নির্যাতনের ঘটনা গণনা করা হয়। নির্ভরযোগ্য তথ্য ছাড়া বাংলাদেশের পক্ষে এই সূচকের অগ্রগতি যথাযথভাবে তুলে ধরা সম্ভব নয়।
বিভিন্ন সরকারের মূল্যায়নে অসম দৃষ্টিভঙ্গি
নিবন্ধে অন্তর্বর্তী সরকার ও আওয়ামী লীগ সরকারের সমালোচনা বেশ তীক্ষ্ণ। বিপরীতে, বিএনপি সম্পর্কে লেখকের দৃষ্টিভঙ্গি তুলনামূলকভাবে ইতিবাচক। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ এবং ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি সরকারের আমলে দলটির নেতাদের সঙ্গে নিজের যোগাযোগের অভিজ্ঞতাকে তিনি এর পক্ষে প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেছেন। এমনকি বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হলেও শাস্তির মুখে পড়তে হয়নি বলেও উল্লেখ করেছেন।
তবে এই অভিজ্ঞতা দিয়ে সামগ্রিক পরিস্থিতির বিচার করা কঠিন। একজন প্রভাবশালী সম্পাদকের সঙ্গে রাজনৈতিক নেতৃত্বের যোগাযোগ থাকা আর সাধারণ সাংবাদিকদের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা নিশ্চিত হওয়া এক বিষয় নয়। অন্য সাংবাদিকেরা ওই সময়কে কীভাবে দেখেন, সে প্রশ্নও নিবন্ধে ওঠেনি।
বর্তমান সরকার সম্পর্কে আশাবাদের প্রধান ভিত্তি নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি, যার মধ্যে ৩১ দফা কর্মসূচির ১১ নম্বর দফাও রয়েছে। অথচ লেখক নিজেই স্বীকার করেছেন, এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতির চেয়ে ক্ষমতায় থাকার সময়কার কাজই সরকারের অবস্থান যাচাইয়ের অধিক নির্ভরযোগ্য মাপকাঠি।
গণমাধ্যমসংক্রান্ত প্রতিশ্রুতিগুলোর বাস্তবায়ন কত দূর এগিয়েছে, সে বিষয়ে সরকারকে প্রতিবছর সংসদে ও জনসমক্ষে প্রতিবেদন দিতে বাধ্য করা যেতে পারে। এই প্রস্তাব ১৬.৬ লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেখানে সব স্তরে কার্যকর, জবাবদিহিমূলক ও স্বচ্ছ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সংস্কার নিয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্যের অভাব
গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন সুপারিশ করেছে এবং সেগুলোর বিষয়ে ব্যাপক ঐকমত্য তৈরি হয়েছিল বলে নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু সুপারিশগুলোর তালিকা দেওয়া হয়নি। পাঠক জানতে পারেন, প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়িত হয়নি; তবে কোন সুপারিশগুলো সবচেয়ে জরুরি কিংবা কোন ক্রমে সেগুলো কার্যকর করা উচিত, তা স্পষ্ট হয় না।
তথ্য মন্ত্রণালয়ের সংবাদপত্র নিরীক্ষা এবং পুরোনো বিল নিষ্পত্তির আগ্রহের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু নিরীক্ষায় কী যাচাই করা হবে কিংবা বিষয়টি নিয়ে বিতর্কের কারণ কী, তার ব্যাখ্যা নেই। সাইবার আইন নিয়ে উদ্বেগের ক্ষেত্রেও একই অস্পষ্টতা রয়ে গেছে। আইনের কোন ধারাগুলো সাংবাদিকতার স্বাধীনতার জন্য হুমকি, সরকারের অবস্থানে কী পরিবর্তন এসেছে এবং তার বিকল্প হিসেবে কী প্রস্তাব করা হচ্ছে, তা বলা হয়নি। সংস্কারের দাবি তখনই কার্যকর হয়, যখন কোন কাজটি কে করবেন এবং কত দিনের মধ্যে করবেন, তা নির্দিষ্ট থাকে।
কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য নির্দিষ্ট তারিখসহ একটি কর্মপরিকল্পনা প্রকাশ করতে পারে সরকার। একই সঙ্গে সম্পাদক ও সাংবাদিক ইউনিয়নের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে সাইবার আইন পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ১৬.৩ লক্ষ্যমাত্রা এবং বৈষম্যহীন আইন ও নীতির ১৬.বি লক্ষ্যমাত্রা এখানে প্রাসঙ্গিক। বক্তব্যসংক্রান্ত আইনের অস্পষ্ট বিধান বেছে বেছে প্রয়োগের সুযোগ তৈরি করে, যা সাংবাদিকতার স্বাধীনতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
কাঠামোগত ও নৈতিক প্রশ্নগুলো উপেক্ষিত
নিবন্ধে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতাকে প্রধানত রাষ্ট্রীয় চাপ ও জনতার হামলার প্রেক্ষাপটে দেখা হয়েছে। অথচ আরও গভীর কিছু সমস্যার ইঙ্গিত সেখানে রয়েছে, যেগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়নি। বিজ্ঞাপনের ওপর সংবাদমাধ্যমের নির্ভরতা, রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত চাপের মুখে মালিকপক্ষের অসহায়ত্ব এবং পুরো শিল্পের অস্থিতিশীলতার বিষয়গুলো তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য।
সরকারি বিজ্ঞাপন কীভাবে ন্যায্যভাবে বণ্টন করা হবে, গণমাধ্যমের মালিকানা অল্প কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত হলে সম্পাদকীয় স্বাধীনতা কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও অনলাইন বিদ্বেষমূলক প্রচারণার ভূমিকা কী, এসব প্রশ্নের উত্তর নিবন্ধে নেই। একইভাবে, স্বাধীন ও দায়িত্বশীল সংবাদমাধ্যমের কথা বলা হলেও দায়িত্বশীলতার অর্থ কী, সাংবাদিকতার নৈতিকতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং জনআস্থা রক্ষায় সংবাদমাধ্যমের নিজস্ব ভূমিকা কী হওয়া উচিত, সে আলোচনাও অনুপস্থিত। স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের সুরক্ষা তার বিশ্বাসযোগ্যতার ওপরও নির্ভর করে। এ বিষয়ে লেখকের অবস্থান জানা গেলে আলোচনাটি আরও পূর্ণতা পেত।
সরকারি বিজ্ঞাপন বণ্টনের সুস্পষ্ট ও প্রকাশিত নীতিমালা, গণমাধ্যমের মালিকানাসংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ এবং আরও শক্তিশালী ও স্বাধীন প্রেস কাউন্সিল গঠন এসব সমস্যার সমাধানে ভূমিকা রাখতে পারে। পদক্ষেপগুলো স্বচ্ছ প্রতিষ্ঠান গঠনের ১৬.৬ লক্ষ্যমাত্রা এবং নির্ভরযোগ্য তথ্যপ্রাপ্তির ১৬.১০ লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সম্পর্কিত। পাশাপাশি, প্রযুক্তির সুযোগ বৃদ্ধি ও সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ৫.বি লক্ষ্যমাত্রাও প্রাসঙ্গিক, বিশেষ করে অনলাইনে নারী সাংবাদিকদের হয়রানির বিষয়টি বিবেচনায় নিলে।
জবাবদিহি ও অনুপস্থিত কণ্ঠস্বর
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে অগ্নিসংযোগের সময় নিরাপত্তা বাহিনীকে কার্যকর নির্দেশনা দেওয়া হয়নি এবং ক্ষয়ক্ষতি হয়ে যাওয়ার পর পুলিশ অগ্নিনির্বাপকদের পথ করে দেয় বলে নিবন্ধে দাবি করা হয়েছে। অভিযোগগুলো অত্যন্ত গুরুতর। কিন্তু এ বিষয়ে কোনো তদন্ত, বিচারিক পদক্ষেপ কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য তুলে ধরা হয়নি।
নিবন্ধে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পক্ষের অভিজ্ঞতা অনুপস্থিত। আঞ্চলিক ও স্থানীয় সাংবাদিক, নারী সাংবাদিক এবং প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের মতো বড় প্রতিষ্ঠানের তুলনায় কম সম্পদ ও পরিচিতি নিয়ে কাজ করা ছোট সংবাদমাধ্যমগুলোর কর্মীরা অনেক সময় আরও কম সুরক্ষা নিয়ে হুমকি মোকাবিলা করেন। তাঁদের অভিজ্ঞতা আলোচনায় এলে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার সংকটের আরও বিস্তৃত চিত্র পাওয়া যেত।
১৯৬২ সালে যে মৌলিক সমস্যাগুলো ছিল, সেগুলো এখনো একই জায়গায় রয়ে গেছে, নিবন্ধের শেষাংশে এমন দাবি করা হয়েছে। বক্তব্যটি আবেগগতভাবে শক্তিশালী হলেও সামরিক শাসন, কর্তৃত্ববাদী শাসন, অন্তর্বর্তী সময় এবং নির্বাচিত সরকারের মধ্যে থাকা বাস্তব পার্থক্যগুলোকে এক করে ফেলে।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরের হামলার বিষয়ে একটি স্বাধীন তদন্ত পরিচালনা করে তার ফলাফল জনসমক্ষে প্রকাশ করা হলে ঘটনার সত্যতা ও দায় নির্ধারণ করা সম্ভব হবে। এর মাধ্যমে সমান ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার ১৬.৩ লক্ষ্যমাত্রার অগ্রগতি যাচাই করা যাবে। সাংবাদিকদের হয়রানি প্রতিরোধে যে বিশেষ সেল গঠনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, তার কার্যক্রম ঢাকার বাইরেও বিস্তৃত হওয়া প্রয়োজন। এর সঙ্গে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ১৬.৭ লক্ষ্যমাত্রা এবং নারীর অংশগ্রহণ ও নেতৃত্ব নিশ্চিত করার ৫.৫ লক্ষ্যমাত্রার সম্পর্ক রয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ হস্তক্ষেপ, তবে উত্তর প্রয়োজন
নিবন্ধটির গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কয়েক দশকের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব বর্তমান উদ্বেগকে দীর্ঘ জাতীয় সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত করেছেন এবং নতুন সরকারের কাছে তার প্রতিশ্রুতি পূরণের দাবি জানিয়েছেন। গণমাধ্যম কমিশন গঠন, আইন সংস্কার এবং সাংবাদিকদের হয়রানি প্রতিরোধে বিশেষ সেল প্রতিষ্ঠার মতো বিষয়গুলোও তিনি সামনে এনেছেন। তাঁর মূল প্রশ্নের নৈতিক গুরুত্ব রয়েছে।
তবে আরও জোরালো প্রমাণ, সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রাসহ সংস্কার পরিকল্পনা, গণমাধ্যমের মালিকানা ও বিজ্ঞাপন বণ্টন নিয়ে আলোচনা, পেশাগত দায়িত্ব সম্পর্কে অকপট পর্যালোচনা এবং আরও বিস্তৃত পরিসরের মানুষের অভিজ্ঞতা যুক্ত হলে এই আবেগপূর্ণ আবেদন সাংবাদিক, সরকার ও জনগণের মধ্যে কার্যকর নীতিগত আলোচনার ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে। নিবন্ধটি আলোচনার সূচনা ভালোভাবেই করেছে। পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ সেই আলোচনাকে আরও সুস্পষ্ট সিদ্ধান্তের দিকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে।
তথ্যসূত্র:
https://www.thedailystar.net/opinion/views/news/how-much-longer-must-we-wait-press-freedom-4296346
