ডেস্ক রিপোর্ট
অনিকেত ডেস্ক
বাংলাদেশের কারাব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে এক গভীর সংকটের মধ্যে আবদ্ধ। সংশোধন ও পুনর্বাসনের যে লক্ষ্যকে সামনে রেখে কারাগার পরিচালিত হওয়ার কথা, বাস্তবে তা প্রতিনিয়ত চাপা পড়ে যাচ্ছে অতিরিক্ত বন্দীসংখ্যা, অপর্যাপ্ত অবকাঠামো এবং ১৮৯৪ সালের ঔপনিবেশিক যুগের কারাগার আইননির্ভর প্রশাসনিক কাঠামোর নিচে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে। ২০২৫ সালের আগস্টে বাংলাদেশ জেলের নাম পরিবর্তন করে বাংলাদেশ কারেকশন সার্ভিস রাখা হয়। এই পরিবর্তন কেবল প্রতীকী নয়, বরং রাষ্ট্রের সেই ঘোষিত অভিপ্রায়ের প্রতিফলন, যেখানে কারাবাসকে শুধু শাস্তি নয়, পুনর্বাসনকেন্দ্রিক একটি প্রক্রিয়া হিসেবে দেখার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু প্রতীকী পরিবর্তন যথেষ্ট নয়। যদি কারাব্যবস্থা সত্যিকার অর্থে সংশোধনমূলক ভূমিকা পালন করতে চায় এবং অপরাধ প্রতিরোধে কার্যকর অবদান রাখতে চায়, তাহলে এর সঙ্গে কাঠামোগত সংস্কারও অপরিহার্য।
কারাগারের বাস্তবতা কতটা সংকটময়
বাংলাদেশের সংশোধনাগারগুলোর সবচেয়ে তাৎক্ষণিক এবং পরিমাপযোগ্য সংকট হলো অতিরিক্ত বন্দীসংখ্যা। ২০২৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত ঢাকা বিভাগের ১৮টি কারাগারে প্রায় ২৮ হাজার বন্দী ছিল। একই সময়ে চট্টগ্রাম বিভাগের ১১টি কারাগারে বন্দীর সংখ্যা ছিল ১৫ হাজার ৮০০ জনেরও বেশি। জাতীয় পর্যায়ে কয়েকটি বিভাগে কারাগারগুলো তাদের ধারণক্ষমতার তিন গুণেরও বেশি বন্দী নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে।
এর প্রভাব শুধু প্রশাসনিক বা ব্যবস্থাপনাগত নয়। অতিরিক্ত ভিড় এমন এক পরিবেশ তৈরি করে, যা অনেক ক্ষেত্রে অমানবিক এবং কখনো কখনো জীবনঝুঁকিপূর্ণ। বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশন, চিকিৎসাসেবা এবং পর্যাপ্ত ঘুমানোর জায়গার অভাব বন্দীদের দৈনন্দিন বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার পর্যবেক্ষকদের বিভিন্ন প্রতিবেদনে কারাকর্মীদের দ্বারা শারীরিক নির্যাতন এবং বন্দীদের পারস্পরিক সহিংসতার ঘটনাও উঠে এসেছে।
এই পরিস্থিতির মানসিক প্রভাবও গভীর। বিশেষত উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বন্দী এখনো বিচারাধীন, যারা কোনো অপরাধে দণ্ডিত নন, বরং আদালতের শুনানির অপেক্ষায় আছেন। তাঁদের ওপর এই পরিবেশের মানসিক চাপ ব্যাপক হলেও তা প্রায় অদৃশ্য এবং অনেকাংশে উপেক্ষিত। কারাগারে অতিরিক্ত জনসংখ্যার পেছনে ধীরগতির ও অদক্ষ ফৌজদারি বিচারব্যবস্থারও বড় ভূমিকা রয়েছে। মামলার জট এবং অনিয়মিত শুনানির কারণে বিচারপূর্ব আটক দীর্ঘায়িত হয়। ফলে হাজার হাজার মানুষ অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার আগেই কার্যত শাস্তিমূলক পরিবেশে দিন কাটান। এই কাঠামোগত দুর্বলতা কারাগারগুলোকে এমন এক চক্রে আবদ্ধ করে রেখেছে, যা শুধুমাত্র নতুন অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব নয়।
পুনর্বাসনের সীমাবদ্ধতা
বাংলাদেশের কারাগারগুলোতে পুনর্বাসন এখনো একটি সুসংগঠিত ও কার্যকর ব্যবস্থা হিসেবে গড়ে ওঠেনি। কিছু কারাগারে কারিগরি প্রশিক্ষণ কর্মসূচি থাকলেও সেগুলোর পরিধি সীমিত, ধারাবাহিকতা দুর্বল এবং শ্রমবাজারের বাস্তব চাহিদার সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রেই অসামঞ্জস্যপূর্ণ। শিক্ষা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং আইনি সহায়তার সুযোগও সীমিত এবং সব কারাগারে সমানভাবে পৌঁছায় না।
কারামুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ার হার এই বাস্তবতাই তুলে ধরে। বর্তমান ব্যবস্থা মানুষকে কারাবাসের মধ্য দিয়ে নিয়ে যায় ঠিকই, কিন্তু সমাজে ফিরে গিয়ে স্বাভাবিক জীবন গড়ার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা, মানসিক স্থিতি এবং সামাজিক সহায়তা তাদের হাতে তুলে দিতে পারে না। ফলে অপরাধ প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর সুযোগটি হারিয়ে যায় ঠিক সেই মুহূর্তে, যখন সেটি সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
প্রয়োজনীয় সংস্কার
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজন কাঠামোগত এবং কর্মসূচিভিত্তিক উভয় ধরনের সংস্কার।
প্রথমত, বিচারপূর্ব আটক কমাতে ফৌজদারি বিচারব্যবস্থাকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। জামিনের সুযোগ সম্প্রসারণ, সমঝোতাভিত্তিক নিষ্পত্তি এবং দ্রুত বিচার আদালতের ব্যবহার বাড়িয়ে কারাগারের জনসংখ্যাকে নিয়ন্ত্রণযোগ্য পর্যায়ে আনা সম্ভব, ন্যায়বিচারকে ক্ষতিগ্রস্ত না করেই।
দ্বিতীয়ত, সহিংস নয় এমন অপরাধী এবং প্রথমবারের অপরাধীদের জন্য কারাবাসের বিকল্প ব্যবস্থা চালু করতে হবে। কমিউনিটি সার্ভিস, প্রবেশন এবং পুনর্মিলনভিত্তিক বিচারব্যবস্থার মতো পদ্ধতি আইনগতভাবে প্রতিষ্ঠা ও বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। এতে কারাগারের ওপর চাপ কমবে এবং যাদের সত্যিই কারাবাস প্রয়োজন, তাদের জন্য সম্পদ ব্যবহারের সুযোগ বাড়বে।
তৃতীয়ত, বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বলা যায়, বাংলাদেশের প্রতিটি সংশোধনাগারে বাধ্যতামূলক, কাঠামোবদ্ধ এবং কর্মসংস্থানমুখী কারিগরি ও শিক্ষামূলক কর্মসূচি চালু করা প্রয়োজন।
বর্তমানে কারাগারভিত্তিক কারিগরি প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন, অর্থসংকটে ভোগা এবং শ্রমবাজারের বাস্তবতার সঙ্গে অনেকাংশে অসংগত। যেখানে প্রশিক্ষণ রয়েছে, সেখানেও তা সাধারণত নিম্নদক্ষতাভিত্তিক এবং স্বীকৃত সনদবিহীন। ফলে কারামুক্ত হওয়ার পর এসব প্রশিক্ষণ বন্দীদের প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা দিতে পারে না। কারাগারে শেখানো দক্ষতা এবং বাইরের অর্থনীতির চাহিদার মধ্যে এই ব্যবধানই পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ার অন্যতম প্রধান কারণ। একটি কার্যকর কারিগরি প্রশিক্ষণ কাঠামো গড়ে তুলতে বাংলাদেশ কারেকশন সার্ভিস, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের যৌথ উদ্যোগে জাতীয় দক্ষতা জরিপ পরিচালনা করা প্রয়োজন। এই জরিপের মাধ্যমে দেশের প্রতিটি বিভাগের শিল্পখাত ও দক্ষ জনবলের ঘাটতি চিহ্নিত করে সেই অনুযায়ী প্রশিক্ষণ পাঠক্রম নির্ধারণ করতে হবে।
ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো শিল্পপ্রধান অঞ্চলে তৈরি পোশাক, শিল্প সেলাই, মান নিয়ন্ত্রণ, ইলেকট্রনিক্স সংযোজন এবং সরবরাহ ব্যবস্থাপনা বিষয়ে প্রশিক্ষণ সরাসরি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। কৃষিনির্ভর অঞ্চলে আধুনিক কৃষি, মৎস্যচাষ এবং কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ বিষয়ক প্রশিক্ষণ স্থানীয় অর্থনীতির চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বন্দীদের উৎপাদনশীল জীবনে ফিরে যেতে সহায়তা করবে। প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থানের দ্রুত সম্প্রসারণের বাস্তবতায় ডিজিটাল সাক্ষরতা এবং মৌলিক তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষা সব কারাগারেই বাধ্যতামূলক করা উচিত। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কারিগরি প্রশিক্ষণ শেষে অংশগ্রহণকারীদের বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের স্বীকৃত জাতীয় সনদ প্রদান করতে হবে। এই সনদের মূল্য যেন সাধারণ শিক্ষার্থীর অর্জিত সনদের সমান হয়।
কারাবাসের সামাজিক কলঙ্ক নিজেই কর্মসংস্থানের পথে একটি বড় বাধা। তাই এমন একটি সনদ, যার ওপর কারাগার সংশ্লিষ্ট কোনো পরিচয়চিহ্ন থাকবে না, কারামুক্ত ব্যক্তিকে তার অতীতের পরিবর্তে দক্ষতার ভিত্তিতে মূল্যায়িত হওয়ার সুযোগ দেবে। একই সঙ্গে কারিগরি প্রশিক্ষণের ভিত্তি হিসেবে সাক্ষরতা ও গণিতজ্ঞান উন্নয়ন কর্মসূচিও চালু করতে হবে। কারণ উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বন্দীর মৌলিক শিক্ষাগত দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে, যা কারিগরি শিক্ষা গ্রহণে বাধা সৃষ্টি করে। এসব কর্মসূচির কার্যকারিতা মূল্যায়নের জন্য একটি জাতীয় বন্দী পুনর্বাসন তথ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। এর মাধ্যমে কারামুক্ত ব্যক্তিদের কর্মসংস্থান, পুনরায় অপরাধে জড়ানোর হার এবং আয়সংক্রান্ত তথ্য নিয়মিতভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে। এই তথ্যের ভিত্তিতে প্রশিক্ষণ কর্মসূচি নিয়মিত পরিমার্জন করা গেলে কারাগারভিত্তিক প্রশিক্ষণ কেবল আনুষ্ঠানিকতা হয়ে থাকবে না, বরং অপরাধ প্রতিরোধ এবং সামাজিক পুনর্গঠনের কার্যকর হাতিয়ার হয়ে উঠবে।
পরিশেষে, ১৮৯৪ সালের কারাগার আইন সম্পূর্ণভাবে বাতিল করে একটি আধুনিক কারেকশনাল সার্ভিসেস আইন প্রণয়ন করা প্রয়োজন, যেখানে পুনর্বাসনকে কারাবাসের প্রধান উদ্দেশ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হবে, স্বাধীন তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে এবং বন্দীদের অধিকার ও কারাগারের মানদণ্ড আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক করা হবে। কারাগার বিভাগের নাম পরিবর্তনের মাধ্যমে বাংলাদেশ তার অভিপ্রায় ঘোষণা করেছে। এখন প্রয়োজন সেই অভিপ্রায়কে বাস্তব অর্থ দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় আইন, প্রতিষ্ঠান এবং সম্পদ গড়ে তোলা।
