সুমাইয়া হাসি
অনিকেত রিসার্চ গ্রুপ
আজকের বিশ্বায়িত পুঁজিবাদী সমাজে ‘নারীবাদ’ শব্দটিকে এক ধরনের চোখধাঁধানো চটকদার পণ্যে রূপ দেওয়া হয়েছে। বিশ্বজুড়ে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ও ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলো ‘উইমেন এম্পাওয়ারমেন্ট’ বা ‘গার্ল পাওয়ার’ লেখা টি-শার্ট, প্রসাধনী ও নানা লাইফস্টাইল উপাদান বিক্রি করে নারীবাদকে একটি সম্পূর্ণ ভোগবাদী উপাদানে (Commodity Feminism) পরিণত করেছে। বিজ্ঞাপনের নান্দনিক ভাষা ও বাণিজ্যিক প্রচারণায় নারীদের প্রায়ই বোঝানো হয় যে, নির্দিষ্ট কিছু প্রসাধনী ব্যবহার করা, ব্র্যান্ডের পোশাক পরা কিংবা কেনাকাটা করার সামর্থ্য অর্জন করাই স্বাধীনতা। কিন্তু চরম বাস্তব সত্য হলো, নারীবাদ কোনো কেনাকাটা, ক্ষণিকের স্টাইল কিংবা বাহ্যিক আধুনিকতার ব্র্যান্ডিং নয়।
নারীবাদ হলো প্রতিদিনের সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে নিরন্তর লড়াই এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সাম্যের বাস্তব প্রয়োগ। ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি যখন নারীবাদকে একটি বিক্রেয় পণ্য বানিয়ে ফেলে, তখন তা মূল সামাজিক ও কাঠামোগত শোষণের ইতিহাসকে কৌশলে আড়াল করে দেয়। কারণ প্রসাধনী কিংবা পোশাকের রূপ বদলে সমাজের গভীরে চেপে বসা পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা ও অর্থনৈতিক বৈষম্য মোটেও দূর করা সম্ভব নয়।
ইতিহাস ও নারী ভাবনার দার্শনিক ভিত্তির দিকে তাকালে এটা স্পষ্ট হয় যে, নারীবাদ সব সময়ই ছিল ব্যবস্থা পরিবর্তনের সামাজিক আন্দোলন। বিখ্যাত ফরাসি দার্শনিক ও নারীবাদী চিন্তাবিদ সিমোন দ্য বোভোয়ার তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ ‘দ্য সেকেন্ড সেক্স’-এ লিখেছিলেন, “কেউ নারী হয়ে জন্মায় না, বরং ক্রমান্বয়ে সে নারী হয়ে ওঠে।” অর্থাৎ, সমাজ ও তার তৈরি সংস্কৃতিই কৃত্রিমভাবে নির্ধারণ করে দেয় একজন নারীর অবস্থান, চালচলন, কাজ ও জীবনের সীমানা কতটুকু হবে। জন্মসূত্রে কোনো নারী পরাধীন বা অবলা হয়ে জন্মায় না; সামাজিক কাঠামোর একমুখী শিক্ষা ও বাধ্যবাধকতাই তাকে সংকুচিত করে ফেলে।
এই একই পরম সত্যকে আমাদের নিজস্ব বঙ্গীয় সামাজিক প্রেক্ষাপটে বহু আগেই অনুধাবন করেছিলেন নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন। তিনি সোচ্চার কণ্ঠে লিখেছিলেন, “কন্যাগুলিকে কেবল সুচিশিল্প ও গৃহকার্যে আবদ্ধ রাখিয়া অকর্মণ্য করিয়া রাখা অনুচিত। তাহাদিগকে সুশিক্ষা দিয়া অর্থকরী কার্যে নিযুক্ত করা আবশ্যক।” রোকেয়া শতবর্ষ আগে অত্যন্ত দূরদর্শিতার সঙ্গে উপলব্ধি করেছিলেন যে, নারীকে কেবল ঘরের চার দেয়ালে বন্দি রাখলে এবং তাদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতার সুযোগ না দিলে সমাজ কখনোই পঙ্গুত্ব কাটিয়ে উঠতে পারবে না। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামও তাঁর সাম্যবাদী বয়ানে এই অধিকার ও অংশীদারিত্বের মূল সূত্রটি ফুটিয়ে তুলেছেন, “বিশ্বে যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।” অতএব, নারীদের অধিকার আদায়ের এই মূল দর্শন বাইরের কোনো আমদানিকৃত বস্তু নয়; এটি আমাদের নিজেদের ইতিহাস, স্বাধিকার আন্দোলন ও সামাজিক রূপান্তরেরই এক সমৃদ্ধ অংশ।
স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশে নারীরা নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে দৃশ্যমানভাবে অনেক দূর এগিয়েছেন। তৈরি পোশাক শিল্পে (RMG) লাখ লাখ নারী শ্রমিকের সক্রিয় অংশগ্রহণ জাতীয় অর্থনীতিতে এক বিপ্লব ঘটিয়েছে। এছাড়া সামাজিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে প্রান্তিক পর্যায়ের ক্ষুদ্রঋণ ব্যবস্থার ইতিবাচক প্রভাব, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় মেয়েদের অভাবনীয় উপস্থিতি এবং রাজনীতি ও প্রশাসনের নীতি নির্ধারণী পর্যায় পর্যন্ত নারীদের পদচারণা এর উজ্জ্বল প্রমাণ।
তবে এই অর্জনের উজ্জ্বল আলোর পাশাপাশি যদি আমরা সমাজকাঠামোর গভীরে তাকাই, তবে দেখব আমাদের মানসিকতার স্তরে বৈষম্যের শিকড় এখনো অনড়। কেবল অর্থনৈতিক অংশগ্রহণের কিছু পরিসংখ্যান দিয়ে নারীর প্রকৃত স্বাধীনতা মাপা যায় না, যদি না সামাজিক মূল্যবোধ, আইনি পরিকাঠামো ও সামগ্রিক মনস্তত্ত্বের মৌলিক পরিবর্তন ঘটে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নারীর কার্যকর, দীর্ঘস্থায়ী ও বাস্তব ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে কয়েকটি মূল ক্ষেত্রে আমূল ও গভীর পরিবর্তন আনা এখন সময়ের দাবি।
মানসিকতা ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির রূপান্তর
সন্তান লালন-পালন ও রান্নাবান্নার মতো গৃহস্থালি কাজগুলোকে আজও কেবল “নারীর একক দায়িত্ব” মনে করা হয়। এই ‘অবৈতনিক পরিচর্যামূলক কাজের’ (Unpaid Care Work) সঠিক সামাজিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে এবং একে পরিবারের নারী-পুরুষ উভয়ের যৌথ দায়িত্ব হিসেবে গণ্য করতে হবে। নারীকে কোনো ভোগ্যপণ্য, কারও সম্পত্তি কিংবা অবলা সদস্য না ভেবে সর্বাগ্রে একজন স্বাধীন ও পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে মূল্যায়নের মানসিকতা সমাজে গড়ে তুলতে হবে।
অর্থনৈতিক ও আইনি সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা
প্রচলিত পারিবারিক ও উত্তরাধিকার আইনে নারী এখনো পুরুষের সমান সম্পত্তির অংশ পান না, যা নারীকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন হওয়ার পথে বড় বাধা হিসেবে কাজ করে। তাই আইন সংস্কারের মাধ্যমে সম্পত্তিতে নারীর সমঅধিকার নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি গণপরিবহন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি কঠোর হস্তে দমন করে দিন-রাত যেকোনো সময়ে নারীর নিরাপদ চলাচলের নিশ্চয়তা দেওয়া রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব।
বৈষম্যহীন মজুরি ও নেতৃত্বের সমান সুযোগ
পোশাক খাত, কৃষি এবং অন্যান্য অনানুষ্ঠানিক খাতে আজও পুরুষ ও নারী শ্রমিকের মধ্যে বড় ধরনের মজুরি বৈষম্য বিদ্যমান। ‘সমান কাজের সমান মজুরি’ আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক করে তা বাস্তবায়ন করতে হবে। একই সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কেবল নিম্নস্তরে নয়, বরং সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী শীর্ষ নীতি নির্ধারণী পদেও নারীদের সমান সুযোগ ও প্রবেশাধিকার দিতে হবে।
কারিগরি শিক্ষা ও অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা
সাধারণ শিক্ষার গণ্ডি পেরিয়ে প্রযুক্তি, ডিজিটাল সাক্ষরতা, কারিগরি ও বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিতভিত্তিক (STEM) শিক্ষায় মেয়েদের অংশগ্রহণ বহুগুণ বাড়াতে হবে, যেন তারা উদীয়মান বৈশ্বিক চাকরির বাজারের উপযোগী হয়ে উঠতে পারে। এর পাশাপাশি বাল্যবিয়ে পুরোপুরি বন্ধ করা এবং নারীদের তাদের মৌলিক মানবাধিকার ও আইনি অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে তোলা প্রয়োজন।
আমাদের সমাজে ‘ফেমিনিজম’ বা নারীবাদ শব্দটিকে প্রায়ই ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয় এবং অনেকে না বুঝে একে পশ্চিমা সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ কিংবা পুরুষবিদ্বেষ বলে মনে করেন। এই ভ্রান্তি দূর করতে হলে নারীবাদকে আমাদের দেশীয় ঐতিহ্যের আলোতে উপস্থাপন করতে হবে। বেগম রোকেয়া, সুফিয়া কামাল কিংবা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের ত্যাগ ও লড়াইয়ের ইতিহাসকে সামনে এনে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে হবে যে, নারীবাদ আমাদের নিজস্ব অধিকার আদায়ের আন্দোলনেরই এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
একই সঙ্গে পুরুষদের সামনে এই সত্য পরিষ্কার করা প্রয়োজন যে, নারীর ক্ষমতায়ন কোনো শত্রুতা বা প্রতিযোগিতা নয়; বরং এটি পুরুষকে সংসারের একক অর্থনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক চাপ থেকে মুক্ত করে যৌথ অগ্রগতি নিশ্চিত করে। গণমাধ্যমেও নারীকে কেবল অবলা, ত্যাগের প্রতিমূর্তি কিংবা ব্র্যান্ডের মডেল বানানোর প্রথা ভেঙে স্বাবলম্বী, বুদ্ধিমান ও সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী চরিত্র হিসেবে ফুটিয়ে তোলা দরকার।
ভোগবাদী সমাজ ও করপোরেট বাণিজ্যিক বিশ্ব নারীবাদকে কেবল চোখধাঁধানো স্লোগান, টি-শার্টের ক্যাপশন কিংবা বিজ্ঞাপনী পণ্যের মোড়কে বন্দি রাখতে চায়। কিন্তু নারীবাদ কোনো কেনাকাটা বা ভোগের বিষয় নয়; নারীবাদ হলো সচেতনতা, মানবিক সমতা এবং প্রতিদিনের বাস্তব জীবনের অনুশীলনের নাম। পরিবার, সমাজ, কর্মক্ষেত্র ও রাষ্ট্রীয় নীতিতে যখন নারীর সমান অধিকার, পূর্ণ সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে, তখনই অর্জিত হবে কাঙ্ক্ষিত প্রকৃত স্বাধীনতা। তাই পণ্যভিত্তিক নারীবাদের সাময়িক চটকদার চমক সরিয়ে রেখে আমাদের মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন এবং কাঠামোগত অধিকার আদায়ের মূল লড়াইয়েই মনোযোগ দিতে হবে।
