পাঁচ নেতার রাজনীতি, পাঁচটি ভিন্ন ধারা এবং একটি দেশের জন্মের দীর্ঘ পথ
ফারাহ জেহির
নির্বাহী সম্পাদক, অনিকেত বুলেটিন
বাংলাদেশের জন্ম ১৯৭১ সালে। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিচয় তৈরি হয়েছিল তার বহু আগে, আর ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সালের পূর্ব পাকিস্তানের ইতিহাস সেই দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোর একটি। এই সময়ে রাজনীতি শুধু পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। কৃষকের অধিকার, প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন, ভাষার মর্যাদা, গণতন্ত্র, ধর্ম ও রাষ্ট্রের সম্পর্ক, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার এবং শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতার প্রশ্নও ধীরে ধীরে সেই রাজনীতির কেন্দ্রে আসে। এই পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে উঠে আসেন কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা, যাদের প্রত্যেকের রাজনৈতিক চিন্তা বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাবনার ওপর আলাদা ছাপ রেখে গেছে।
ফজলুল হক থেকে ভাসানী: জনভিত্তিক রাজনীতির শিকড়
১৯৪৭-এর পর পূর্ব বাংলার রাজনীতিতে এ কে ফজলুল হকের মতো প্রবীণ নেতার উপস্থিতি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারাবাহিকতা। কৃষক ও সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক অধিকার, প্রাদেশিক স্বার্থ এবং বাংলার নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রশ্ন তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গে যুক্ত ছিল। ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাব উত্থাপনকারী হিসেবে তাঁর ভূমিকা উপমহাদেশের মুসলিম রাজনীতির ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ। গবেষক সানা আইয়ার দেখিয়েছেন, ফজলুল হকের রাজনীতি সর্বভারতীয় ধর্মভিত্তিক রাজনীতির সরল দ্বৈততার বাইরে বাংলার আঞ্চলিক স্বার্থ ও রাজনৈতিক বাস্তবতাকে সামনে এনেছিল।
এরপর আবদুল হামিদ খান ভাসানীর রাজনীতি পূর্ব বাংলার কৃষক, শ্রমিক ও প্রান্তিক মানুষের সঙ্গে আরও সরাসরি যুক্ত হয়। ১৯৪৯ সালে তাঁর নেতৃত্বে আওয়ামী মুসলিম লীগ গড়ে ওঠে। পরে তিনি ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির মাধ্যমে বামঘেঁষা রাজনীতির একটি শক্তিশালী ধারা তৈরি করেন। ভাসানীর রাজনৈতিক চিন্তায় ধর্মীয় মূল্যবোধ, সামাজিক ন্যায়বিচার, কৃষক ও শ্রমিকের অধিকার এবং সাম্রাজ্যবাদবিরোধী অবস্থান পাশাপাশি ছিল। ইতিহাসবিদ পিটার কাস্টার্সের গবেষণা দেখায়, ভাসানীর রাজনৈতিক চিন্তা ধর্মীয় পরিচয়কে অস্বীকার না করেও রাষ্ট্র পরিচালনা ও ব্যক্তির ধর্মবিশ্বাসকে আলাদা রাখার দিকে এগিয়েছিল।
সোহরাওয়ার্দী ও মুজিব: গণতন্ত্র থেকে স্বাধিকারের পথে
হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ছিলেন সংসদীয় রাজনীতির একজন গুরুত্বপূর্ণ প্রবক্তা। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় রাজনীতিতেও তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের রাজনীতিতে ফজলুল হক, ভাসানী ও সোহরাওয়ার্দীর মতো নেতারা ভিন্ন রাজনৈতিক ধারা থেকে এসে পূর্ব বাংলার স্বার্থকে সামনে এনেছিলেন। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগের পরাজয় ছিল পূর্ব বাংলার রাজনীতিতে একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত।
এই রাজনৈতিক পরিবেশেই শেখ মুজিবুর রহমানের উত্থান ঘটে। ভাষা আন্দোলন, স্বায়ত্তশাসনের দাবি এবং ১৯৬৬ সালের ছয় দফাকে কেন্দ্র করে তাঁর রাজনীতি পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালির রাজনৈতিক অধিকারকে আরও সুস্পষ্ট করে তোলে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর ক্ষমতা হস্তান্তর না করা এবং পরবর্তী সামরিক দমন-পীড়ন স্বাধীনতার আন্দোলনকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যায়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে আওয়ামী লীগ প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নেতৃত্ব দেয়।
মুজিবের রাজনৈতিক চিন্তার কেন্দ্রে ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে এই চার নীতি সংবিধানের মৌলিক নীতির অংশ হয়। তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার তাই শুধু স্বাধীনতার নেতৃত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, রাষ্ট্র কেমন হবে সেই প্রশ্নের সঙ্গেও যুক্ত।
তাজউদ্দীন: মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক নেতৃত্ব
তাজউদ্দীন আহমদের ভূমিকা স্বাধীনতার ঠিক আগের এবং মুক্তিযুদ্ধের সময়ের রাজনীতিতে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানে বন্দি থাকা অবস্থায় তাজউদ্দীনের নেতৃত্বে প্রবাসী সরকার সংগঠিত হয় এবং মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামো পরিচালিত হয়।
তাঁর রাজনৈতিক চিন্তায় গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি সমর্থন ছিল। সাম্প্রতিক এক স্মারক বক্তৃতায় অধ্যাপক এ এফ সেরাজুল ইসলাম চৌধুরী তাজউদ্দীনের ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণাকে রাষ্ট্র ও ধর্মের পৃথক অবস্থানের সঙ্গে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে, তাজউদ্দীন সমাজতন্ত্রের প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন, তবে গণতান্ত্রিক পরিবর্তনকে প্রয়োজনীয় পূর্বশর্ত হিসেবে দেখতেন।
এই পাঁচ নেতার রাজনৈতিক পথ এক ছিল না। তাঁদের মধ্যে মতপার্থক্য ছিল, রাজনৈতিক কৌশলও ছিল আলাদা। কিন্তু তাঁদের রাজনীতির মধ্যে একটি বিষয় বারবার ফিরে আসে: পূর্ব বাংলার মানুষের রাজনৈতিক মর্যাদা, অর্থনৈতিক অধিকার এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের প্রশ্ন।
তাহলে আমরা তাঁদের রাজনীতি থেকে এত দূরে কেন?
সমস্যা সম্ভবত শুধু আমরা তাঁদের দর্শন ভুলে গেছি কি না, সেই প্রশ্নে নেই। বরং বড় প্রশ্ন হলো, আমরা তাঁদের ইতিহাসকে কতটা সম্পূর্ণভাবে জানার সুযোগ পেয়েছি।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বহু বছর ধরে তীব্র রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্য দিয়ে লেখা ও পড়ানো হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, স্কুলের পাঠ্যবইও রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ইতিহাসের বিভিন্ন ব্যাখ্যা ও রাজনৈতিক পরিচয়ের ওপর জোর দিয়েছে। জাতীয় ইতিহাস শেখানোর জায়গাটি তাই অনেক সময় অনুসন্ধানের বদলে রাজনৈতিক বিতর্কের অংশ হয়ে উঠেছে।
এই কারণে নতুন প্রজন্মের কাছে একজন নেতা হয়তো খুব পরিচিত, কিন্তু তাঁর সমসাময়িক অন্য নেতাদের রাজনৈতিক অবদান অচেনা থেকে যায়। কেউ হয়ে ওঠেন কেবল একটি দলের নেতা, কেউ একটি নির্দিষ্ট মতাদর্শের প্রতীক, আবার কেউ প্রায় পাঠ্যবইয়ের একটি অধ্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকেন। অথচ ইতিহাস এত সরল নয়।
ফজলুল হককে শুধু লাহোর প্রস্তাবের নেতা হিসেবে দেখলে তাঁর বাংলাকেন্দ্রিক রাজনীতি বোঝা যায় না। ভাসানীকে শুধু বামপন্থী নেতা বললে তাঁর ধর্ম, কৃষক রাজনীতি ও সামাজিক ন্যায়বিচারের চিন্তার জটিলতা হারিয়ে যায়। সোহরাওয়ার্দীকে শুধু মুজিবের রাজনৈতিক গুরু হিসেবে দেখলে তাঁর সংসদীয় রাজনীতির গুরুত্ব কমে যায়। মুজিবকে শুধু স্বাধীনতার নেতা হিসেবে দেখলে তাঁর রাষ্ট্রভাবনা অসম্পূর্ণ থাকে। আর তাজউদ্দীনকে শুধু মুক্তিযুদ্ধের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখলে তাঁর গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক চিন্তা আড়ালে পড়ে যায়।
ইতিহাসকে দল থেকে ফিরিয়ে আনতে হবে
ইতিহাসের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হয় শুধু জাতীয় দিবস পালন করে নয়। ইতিহাস জানতে হলে প্রশ্ন করতে হয়, ভিন্ন মত পড়তে হয় এবং একই ঘটনার একাধিক রাজনৈতিক ব্যাখ্যা বুঝতে হয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ঐতিহ্যও সেভাবেই নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছানো দরকার।
পাঠ্যবইয়ে পরিবর্তন এলেই ইতিহাসের ব্যাখ্যা বদলে যাবে, এমন ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি। গবেষণাভিত্তিক ইতিহাস, মূল দলিল, নেতাদের বক্তৃতা, চিঠি, আত্মজীবনী এবং সমকালীন সংবাদপত্রকে শিক্ষার অংশ করা যেতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়, গ্রন্থাগার ও গণমাধ্যমও এই কাজে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। ইতিহাসকে মুখস্থ করার বিষয় না বানিয়ে বিতর্ক, তুলনা ও অনুসন্ধানের বিষয় করে তুলতে হবে।
সবচেয়ে জরুরি হলো, রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে কোনো একটি দল বা পরিবারের একচেটিয়া সম্পত্তি হিসেবে না দেখা। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পথ তৈরি হয়েছে বহু দশকের আন্দোলন, মতভেদ, সংগ্রাম এবং বহু মানুষের অংশগ্রহণে। সেই ইতিহাসে নেতৃত্বের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ভূমিকাও রয়েছে।
একটি জাতি তার রাজনৈতিক ঐতিহ্যকে তখনই সত্যিকার অর্থে ধারণ করে, যখন সে নিজের ইতিহাসের পছন্দের অংশই শুধু মনে রাখে না, কঠিন ও বিতর্কিত অধ্যায়গুলোকেও পড়তে শেখে। ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সালের ইতিহাস তাই কেবল অতীতের গল্প নয়। সেখানে আজকের বাংলাদেশের রাষ্ট্র, রাজনীতি এবং নাগরিক পরিচয়ের অনেক প্রশ্নের শিকড় রয়েছে। পরবর্তী প্রজন্ম সেই ইতিহাস কতটা জানবে, তার ওপর নির্ভর করবে তারা শুধু স্বাধীন দেশের নাগরিক হবে, নাকি স্বাধীনতার রাজনৈতিক অর্থও বুঝবে।
References
- Schendel, Willem van. A History of Bangladesh. Cambridge University Press, 2009.
- Aiyar, Sana. “Fazlul Huq, Region and Religion in Bengal: The Forgotten Alternative of 1940–43.” Modern Asian Studies, Cambridge University Press.
- Custers, Peter. “Maulana Bhashani and the Transition to Secular Politics in East Bengal.” Indian Economic & Social History Review, vol. 47, no. 2, 2010.
- Ankit, Rakesh. “Probing Early Pakistan: East Bengal Politicians and Their Exchanges with Prime Minister Liaquat Ali Khan, 1947–51.” Modern Asian Studies, Cambridge University Press.
- Schendel, Willem van. “Key Political Figures Since 1947.” In A History of Bangladesh. Cambridge University Press.
- Ghosh, Shreya. Identity, Politics and Nation-building in History Textbooks in Bangladesh. Georg Eckert Institute for International Textbook Research.
- Ghosh, Shreya. “The Politics of Learning Reforms in Bangladesh.” Oxford Research Encyclopedia of Education. Oxford University Press.
- Government of Bangladesh. The Constitution of the People’s Republic of Bangladesh. Bangladesh Government Press.
