সুমাইয়া হাসি
জনসংযোগ সম্পাদক, অনিকেত বুলেটিন
বাংলাদেশ একটি অনন্য ঋতু-বৈচিত্র্যময় দেশ। ষড়ঋতুর এই দেশে আষাঢ় ও শ্রাবণ, এই দুই মাস মিলে বর্ষাকাল হলেও এর সার্বিক প্রভাব বাঙালির চিত্তে সারা বছর ধরে বিস্তৃত থাকে। কদম ফুলের মিষ্টি গন্ধ, আকাশে ঘন কালো মেঘের আনাগোনা এবং নদীর ভরা যৌবন মিলিয়ে বর্ষা এমন এক অপরূপ পরিবেশ সৃষ্টি করে, যা এদেশের কবি, শিল্পী এবং সাধারণ মানুষকে একইভাবে আলোড়িত করে।
বর্ষাকাল এই ভূখণ্ডের মানুষের জীবন, জীবিকা, শিল্প, সাহিত্য, সংগীত ও ঐতিহ্যের সাথে এত গভীরভাবে জড়িয়ে আছে যে, বর্ষাকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশের সংস্কৃতির পূর্ণ চিত্র আঁকা মোটেও সম্ভব নয়। ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার মৌসুমি জলবায়ু অঞ্চলে অবস্থিত। বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী হওয়ায় দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু এ দেশে প্রচুর বৃষ্টিপাত ঘটায়, যার ফলে বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাতের প্রায় ৭০ শতাংশই কেবল বর্ষাকালে রেকর্ড করা হয়। এই বিশাল জলরাশি দেশের প্রায় ৭০০টিরও বেশি নদী, হাওর, বাঁওড় ও বিলগুলোকে নতুনভাবে সজীব করে তোলে। প্রাচীনকাল থেকেই এই জলময় পরিবেশ ও কৃষিনির্ভর সমাজকে কেন্দ্র করে বাংলার অর্থনীতি, লোকশিল্প ও সংস্কৃতি আবর্তিত হয়ে আসছে।
সাহিত্যে বর্ষার চিরন্তন উপস্থিতি
বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন চর্যাপদ থেকে শুরু করে মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্য ও বৈষ্ণব পদাবলিতে বর্ষার প্রসঙ্গ বারবার এসেছে। বিদ্যাপতি বা চণ্ডীদাসের মতো কবিরা রাধার বিরহকে বর্ষার ঘন মেঘ ও বৃষ্টির প্রেক্ষাপটে চিত্রিত করেছেন। অন্যদিকে মনসামঙ্গল ও চণ্ডীমঙ্গলের মতো কাব্যে বর্ষার বিশদ বর্ণনা থাকত, কারণ এই কাব্যগুলো গ্রামীণ সমাজের কৃষিনির্ভর জীবনকে প্রতিফলিত করত, আর সেই সমাজে বৃষ্টি ছিল অপরিহার্য।
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বর্ষাকে এক গভীর আত্মিক ও রোমান্টিক অনুভূতিতে রূপ দিয়েছেন। তাঁর “বর্ষামঙ্গল” সংকলনসহ অসংখ্য কবিতা ও গানে বর্ষা এসেছে এক ভিন্ন মাত্রায়। লক্ষণীয় যে, বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত “আমার সোনার বাংলা” নিজেই বর্ষার সোঁদা মাটি, নদী ও কদম ফুলের গন্ধকে ধারণ করে, যা বর্ষা ও বাংলার অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের সবচেয়ে বড় প্রমাণ। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্যেও বর্ষা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। “বর্ষা-বিদায়” কিংবা “বাদলের ধারা ঝরে ঝরঝর” এর মতো কালজয়ী সৃষ্টিতে তিনি বর্ষাকে প্রেম, বিরহ এবং একই সাথে ঔপনিবেশিক শোষণের বিরুদ্ধে জেগে ওঠার প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছেন। জীবনানন্দ দাশের নিসর্গ কবিতা, আল মাহমুদের আধুনিক পঙ্ক্তি এবং হুমায়ূন আহমেদের কথাসাহিত্যে “বৃষ্টি বিলাস” ও চিরন্তন নস্টালজিয়া বর্ষাকে বাংলা সাহিত্যের এক অমলিন চরিত্রে রূপান্তর করেছে।
সংগীতে বর্ষার সুর ও ঝংকার
বর্ষার বৃষ্টি যেন নিজেই এক একটি সুর, এবং সুরপ্রিয় বাঙালি সেই প্রাকৃতিক সুরকেই তার গানে ধারণ করেছে। রবীন্দ্রনাথের বর্ষা পর্যায়ের গানে শাস্ত্রীয় সংগীতের রাগ মেঘ মল্লারের প্রভাব স্পষ্ট, যা প্রতিটি মানুষের মনকে উদাস করে তোলে। কাজী নজরুল ইসলামের বর্ষার গানগুলোও আমাদের সাংগীতিক ঐতিহ্যের অবিদ্যেদ্য অংশ হিসেবে টিকে আছে।
বাংলাদেশের লোকসংগীতে বর্ষা সবচেয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রকাশিত হয়েছে। হাওরাঞ্চলের ভাটিয়ালি গানে ভরা নদী ও মাঝির জীবনের টানাপোড়েন ফুটে ওঠে, আর মাঝিদের দলবদ্ধ সারিগানে দাঁড়টানার ছন্দে বর্ষার নদীর চিরচেনা রূপ টের পাওয়া যায়। বাউল গানে বর্ষা পায় একটি গভীর আধ্যাত্মিক মাত্রা, যেখানে বৃষ্টি ও মেঘ সৃষ্টি এবং স্রষ্টার সম্পর্কের রূপক হয়ে ওঠে। এছাড়া সিলেটের ঐতিহ্যবাহী ধামাইল গানে বর্ষার লৌকিক অনুভূতি প্রকাশ পায়। স্বাধীনতার পর থেকে আধুনিক ব্যান্ড সংগীত পর্যন্ত বর্ষার এই সুর ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে বৃষ্টি ও মেঘ অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ হিসেবে বারবার ফিরে আসে।
চিত্রকলা, লোকশিল্প ও কারুশিল্প
চিত্রকলায় বাংলাদেশের শিল্পীরা বর্ষাকে নানাভাবে উপস্থাপন করেছেন। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন তাঁর বিখ্যাত “বন্যা” সিরিজে বর্ষার রুদ্র রূপ ও মানুষের জীবন-সংগ্রামকে ক্যানভাসে অমর করে রেখেছেন। শিল্পী কামরুল হাসান ও এসএম সুলতানের চিত্রকর্মেও বর্ষার পুষ্ট নদী, সবুজ মাঠ ও বলিষ্ঠ কৃষকের অবয়ব অনন্য শিল্পভাষায় প্রকাশিত হয়েছে। আলোকচিত্রী শহীদুল আলামের মতো আন্তর্জাতিক মানের ফটোগ্রাফাররা বর্ষার রূপকে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরেছেন।
কারুশিল্পে বর্ষার প্রভাব অত্যন্ত নিবিড়। আমাদের ঐতিহ্যবাহী নকশিকাঁথা এবং ইউনেস্কো স্বীকৃত জামদানি শাড়ির বুননে মেঘ, তরঙ্গ ও পদ্মফুলের মোটিফ দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বর্ষাকালে যখন মাঠে কৃষকদের কাজ কমে যায়, তখন ঘরে ঘরে শীতলপাটি ও বাঁশ-বেতের ঐতিহ্যবাহী পণ্য তৈরির ধুম পড়ে। কৃষকদের রোদে-বৃষ্টিতে সুরক্ষার জন্য বাঁশ ও পাতার তৈরি ঐতিহ্যবাহী ছাতা বা ‘মাথাল’ (যা মূলত ঢোলা টোকাই নামে পরিচিত) তৈরি করা হয়, যা আমাদের কৃষি ঐতিহ্যের এক অনন্য লোকশিল্পকর্ম।
উৎসব ও ঐতিহ্যবাহী খাদ্যসংস্কৃতি
বর্ষার সাংস্কৃতিক উদযাপন কেবল বইয়ের পাতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। আষাঢ়ের প্রথম দিনে উদযাপিত ‘বর্ষা উৎসব’ এই ঋতুটিকে একটি সামাজিক কৃতজ্ঞতা ও শৈল্পিক রূপ দেয়। তবে বর্ষার সবচেয়ে প্রাণবন্ত ও ঐতিহ্যবাহী ক্রীড়া-উৎসব হলো নৌকাবাইচ। ভরা নদীতে রঙিন নৌকার এই তুমুল প্রতিযোগিতা দেখতে নদীতীরে আবালবৃদ্ধবনিতার ঢল নামে।
এছাড়া বর্ষায় হাওর অঞ্চলে নৌকায় ভেসে বেড়ানো মেলা বা ‘ভাসমান বাজার’ বসে, যা গ্রামীণ বাণিজ্য ও সংস্কৃতির এক অনন্য মিশ্রণ। এই সময়ে নিচু অঞ্চলের মানুষের যাতায়াত, বাজার, এমনকি নৌকার স্কুল; সবই নদীকেন্দ্রিক জীবনযাত্রার অংশ হয়ে ওঠে। আমাদের প্রধান ফসল আমন ধান ও পাটের চাষ সম্পূর্ণভাবে এই বর্ষার পানির ওপর নির্ভরশীল। রন্ধনশৈলীর দিক থেকে বর্ষার দিনে খিচুড়ি ও বিভিন্ন ধরনের ভাজাপোড়া বাঙালির জাতীয় খাবারে পরিণত হয়। এই ঋতুটি সুস্বাদু ইলিশ মাছের মূল মৌসুম, যা বর্তমানে বাংলাদেশের একটি ভৌগোলিক নির্দেশক (GI) পণ্য হিসেবে স্বীকৃত। এছাড়া গ্রামীণ ঐতিহ্যের বিভিন্ন ধরনের পিঠাপুলি বৃষ্টির দিনে ঘরে ঘরে আনন্দের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়।
নদীভাঙন, বন্যা ও বর্তমান প্রেক্ষাপট
বর্ষা যেমন একদিকে অফুরন্ত প্রাণের সঞ্চার করে, অন্যদিকে এর মুদ্রার ওপিঠটি অত্যন্ত নির্মম ও বেদনাদায়ক। প্রতি বছর অতিবৃষ্টি এবং উজান থেকে আসা পানির ঢলে তীব্র নদীভাঙন শুরু হয়, যা রাতারাতি হাজারো পরিবারকে ভিটেমাটিহীন ও নিঃস্ব করে দেয়। এর পাশাপাশি বড় বন্যা দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীকে পানিবন্দী করে ফেলে। তখন বিশুদ্ধ পানি ও খাদ্যের সংকট, রোগব্যাধি এবং ফসল হানির কারণে প্রান্তিক মানুষের জীবন হয়ে ওঠে চরম দুর্বিষহ। তাদের কাছে বর্ষা কোনো কাব্যিক বিলাসিতা নয়, বরং টিকে থাকার এক কঠিন জীবন-সংগ্রাম।
বর্তমানে দ্রুত নগরায়ণের ফলে শহরগুলোতে বর্ষা নিয়ে আসে তীব্র জলাবদ্ধতা, ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব ও নাগরিক সংকট। তবে এর মধ্যেও হাওর অঞ্চলের ইকো-ট্যুরিজম বর্ষার ঐতিহ্যকে নতুন অর্থনৈতিক মাত্রা দিয়েছে। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অনিয়মিত অতিবৃষ্টি বা দীর্ঘস্থায়ী অনাবৃষ্টি আমাদের এই চিরন্তন ঋতুচক্র ও কৃষিব্যবস্থাকে চরম হুমকিতে ফেলছে।
বর্ষা শুধু একটি আবহাওয়ার ধরন নয়, এটি বাংলাদেশের আত্মার এবং সংস্কৃতির এক গভীর প্রতিফলন। সাহিত্য, সংগীত, লোকশিল্প, উৎসব এবং কৃষি ঐতিহ্য: প্রতিটি ক্ষেত্রে বর্ষার ছাপ অমোচনীয়। আধুনিকতা ও জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে আমাদের ঐতিহ্যবাহী বর্ষাকেন্দ্রিক জ্ঞান ও সংস্কৃতিকে সংরক্ষণ করা এবং নতুন প্রজন্মের কাছে তা পৌঁছে দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। কারণ বর্ষা ও বাংলাদেশ একে অপরের পরিপূরক, একটি ছাড়া আরেকটির পরিচয় সর্বদা অসম্পূর্ণ রয়ে যাবে।
