সুমাইয়া হাসি
অনিকেত রিসার্চ গ্রুপ
ইতিহাস কোনো নিছক অতীত দিনের কাহিনী নয়; ইতিহাস হলো একটি জাতির আত্মপরিচয়, শিল্প-সংস্কৃতি এবং শেকড়ের বেঁচে থাকার স্পন্দন। আমাদের প্রাচীন স্থাপনা ও প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলোর প্রতিটি ইটের গাঁথুনিতে সুরক্ষিত থাকে শত শত বছরের স্মৃতি। এই স্থানগুলো কেবল ইট-পাথরের তৈরি অবকাঠামো নয়, বরং এক জীবন্ত দলিল। আমাদের ঐতিহাসিক স্থানের মধ্যে অবিনশ্বর হয়ে জীবিত থাকে ইতিহাস, যা আমাদের অতীত ঐতিহ্যকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চির অমর করে বহমান রাখে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বাণিজ্যিক বিনোদন, অসচেতনতা এবং অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের বলিকাতে আমাদের এই অমূল্য স্মারকগুলো যে চরম সংকটের মুখে পড়ছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়।
সম্প্রতি সোনারগাঁয়ের ঐতিহ্যবাহী বড় সরদার বাড়িতে ‘কোক স্টুডিও বাংলা’র চতুর্থ সিজনের “পাতার বাঁশুরি” গানের চিত্রগ্রহণের ঘটনাটি এই জাতীয় সংকটকে পুনরায় নগ্নভাবে সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, একটি সুরম্য সঙ্গীত আয়োজনের শুটিং স্পট হিসেবে ব্যবহার করতে গিয়ে শত বছরের প্রাচীন এই প্রত্নতাত্ত্বিক কাঠামোর স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট করা হয়েছে এবং অভ্যন্তরীণ অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করা হয়েছে।
তবে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, এটি কেবল সোনারগাঁয়ের বড় সরদার বাড়ির একক কোনো ঘটনা নয়। দেশের প্রায় প্রতিটি অঞ্চল-তা হতে পারে পুরান ঢাকার লালবাগ কেল্লা, পানাম নগর, মহাস্থানগড়, কিম্বা জমিদারি আমলের প্রাচীন রাজবাড়িগুলো – নিয়মিতভাবে নাটক, সিনেমা, মিউজিক ভিডিও এবং বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপনের শুটিং স্পট হিসেবে অনিয়ন্ত্রিতভাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
ঐতিহাসিক স্থানের স্পর্শকাতরতা ও কাঠামোগত ঝুঁকি
সোনারগাঁয়ের বড় সরদার বাড়িসহ আমাদের দেশের ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো একটি সুনির্দিষ্ট যুগের রাজনৈতিক, সামাজিক ও স্থাপত্যশৈলীর দুর্লভ স্বাক্ষর বহন করে। শত বছরের ঝড়-বৃষ্টি এবং প্রাকৃতিক ক্ষয় সহ্য করে দাঁড়িয়ে থাকা এই ধরনের সংবেদনশীল ভবনগুলোর সহনশীলতা অত্যন্ত সীমিত।
একটি সুরক্ষিত প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানে যখন বাণিজ্যিকভাবে ভারী কারিগরি সরঞ্জাম বহন করা হয়, অনিয়ন্ত্রিত উচ্চশব্দের সাউন্ড সিস্টেম চালু রাখা হয়, শক্তিশালী লেজার বা প্রজেকশন লাইট ফেলা হয় এবং অনিয়ন্ত্রিত জনসমাগম ঘটে, তখন ভবনের সূক্ষ্ম নকশা ও অভ্যন্তরীণ অবকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শিল্প সৃষ্টি ও সংস্কৃতির চর্চা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়, কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট মিউজিক ভিডিও বা চলচ্চিত্রের তাগিদে যদি একটি জাতির মৌলিক ঐতিহাসিক ভিত্তিটাই ক্ষয়ে যায়, তবে সেই সৃজনশীলতার সার্থকতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন থেকেই যায়।
ফিল্ম সিটি: ঐতিহাসিক স্থান সুরক্ষায় টেকসই সুদূরপ্রসারী সমাধান
আমাদের দেশে চিত্রগ্রহণ বা বিনোদন শিল্পের বিকাশ যেমন আটকে রাখা সম্ভব নয়, তেমনি বিনোদনের দোহাই দিয়ে দেশের ইতিহাস ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়াও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এই দুই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের মধ্যে একটি স্থায়ী এবং ইতিবাচক ভারসাম্য রক্ষা করার একমাত্র কার্যকর উপায় হলো একটি পূর্ণাঙ্গ, আধুনিক এবং আন্তর্জাতিক মানের ‘ফিল্ম সিটি’ বা ‘চলচ্চিত্র নগরী’ গড়ে তোলা।
একটি পরিকল্পিত ফিল্ম সিটি কেবল চলচ্চিত্র শিল্পকেই সমৃদ্ধ করে না, বরং ঐতিহ্য রক্ষায় অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী ভূমিকা পালন করে:
১. ঐতিহাসিক স্থানের বিকল্প সেট নির্মাণ: আধুনিক ফিল্ম সিটিতে উন্নত প্রযুক্তি এবং প্রকৌশলের মাধ্যমে যেকোনো যুগের রাজপ্রাসাদ, ঐতিহাসিক দুর্গ, জমিদার বাড়ি কিংবা সুনির্দিষ্ট প্রাচীন শহরের অনুলিপি বা কৃত্রিম সেট তৈরি করা যায়। ফলে মূল প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলোতে না গিয়েও নির্মাতারা নিখুঁত ঐতিহাসিক আবহ তৈরি করতে পারেন এবং আসল প্রাচীন ভবনগুলো সম্ভাব্য সমস্ত ক্ষতি থেকে রক্ষা পায়।
২. সৃজনশীল স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা: সুরক্ষিত ঐতিহাসিক স্থানে শুটিং করতে গেলে স্থানটির অবকাঠামোগত নিরাপত্তার খাতিরে শব্দ, আলো এবং ক্যামেরার ব্যবহারে নানা সীমাবদ্ধতা থাকে। কিন্তু একটি নির্ধারিত ফিল্ম সিটিতে নির্মাতারা তাদের গল্প বা গানের দৃশ্যপট অনুযায়ী আলো, শব্দ ও ক্রেনসহ যেকোনো ভারী প্রযুক্তির অবাধ ব্যবহার করতে পারেন। এতে একদিকে যেমন কাজের মান উন্নত হয়, অন্যদিকে আসল ঐতিহ্যও থাকে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত।
৩. সংস্কৃতি সংরক্ষণ ও অর্থসামাজিক উন্নয়ন: একটি সুসংগঠিত ফিল্ম সিটির মাধ্যমে ঐতিহাসিক স্থানগুলো কেবল পর্যটন, গবেষণা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধ্যয়নের জন্য শতভাগ সুরক্ষিত থাকে। পাশাপাশি একটি স্থায়ী ফিল্ম সিটি দেশের বিনোদন শিল্পকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয় এবং অর্থনৈতিকভাবেও লাভজনক খাত তৈরি করে।
যদি আমাদের দেশে একটি আন্তর্জাতিক মানের আধুনিক ফিল্ম সিটির সুব্যবস্থা থাকত, তবে কোক স্টুডিওর মতো বড় বাজেটের টিমের বড় সরদার বাড়ির মতো স্পর্শকাতর স্থানে গিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত ঝুঁকি নিয়ে শুটিং করার কোনো প্রয়োজনই পড়ত না।
আমাদের দায়বদ্ধতা ও উত্তরণের পথ
আমাদের মনে রাখতে হবে, ঐতিহাসিক স্থানগুলো কেবল আজকের দিনের কোনো বিনোদনের উপকরণ বা সাময়িক শুটিংয়ের স্থান নয়, এগুলো আগামী প্রজন্মের জন্য আমাদের কাছে থাকা গচ্ছিত ঐতিহাসিক আমানত। নিজের ঐতিহ্য ও পরিচয়কে আঘাত করে যে শিল্প নির্মিত হয়, তা কখনো কোনো জাতিকে সমৃদ্ধ করতে পারে না।
সোনারগাঁয়ের বড় সরদার বাড়ি বা দেশের অন্যান্য প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানে বাণিজ্যিক শুটিং পুরোপুরি বন্ধ কিংবা কঠোর নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনতে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং নীতি-নির্ধারকদের অবিলম্বে কঠোর আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ করতে হবে।
সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি হলো-আমাদের অতীতের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে অক্ষত রাখা এবং শিল্পচর্চাকে নিরাপদ কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা। একটি আধুনিক ফিল্ম সিটি গড়ে তোলার মাধ্যমে আমরা যেমন আমাদের সুরক্ষিত প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলোকে চিরকালের জন্য জীবিত ও নিরাপদ রাখতে পারি, ঠিক তেমনি বাংলা বিনোদন শিল্পকেও নিয়ে যেতে পারি এক নতুন ও সমৃদ্ধ উচ্চতায়। ঐতিহ্যের অস্তিত্ব রক্ষা করেই আমাদের শিল্পকে এগিয়ে নিতে হবে, ঐতিহ্যকে বিলীন করে নয়।
