ইকবাল মাহমুদ
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়
বাংলাদেশে অপরাধের সংবাদ প্রকাশ একটি বিশেষ ঝুঁকিপূর্ণ সাংবাদিকতা। একদিকে পুলিশি তদন্ত, অন্যদিকে রাজনৈতিক স্বার্থ, ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও ব্যক্তিগত সুনাম, সবকিছুর সঙ্গেই অপরাধ সাংবাদিকতার যোগ রয়েছে। ফলে কোনো ঘটনার একটি নির্দিষ্ট বয়ান জনসমক্ষে প্রতিষ্ঠিত হলে যারা লাভবান হতে পারে, তাদের প্রভাবের ঝুঁকিও এই সাংবাদিকতায় বেশি।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই প্রবণতা আরও স্পষ্ট হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে তথ্যের নির্ভুলতার চেয়ে কোন পক্ষের বয়ান বেশি জোরালো বা কার যোগাযোগ বেশি শক্তিশালী, তা সংবাদ প্রকাশের গতিপথ নির্ধারণ করছে।
বাংলাদেশে লবিং ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলো কীভাবে অপরাধের সংবাদকে প্রভাবিত করে, এর ফলে তথ্যের নির্ভুলতা ও মানুষের আস্থার ওপর কী প্রভাব পড়ে এবং গণমাধ্যমের সংস্কৃতি, পেশাগত নীতি ও সরকারি নীতিতে কী ধরনের পরিবর্তন আনা গেলে এই ঝুঁকিপূর্ণ সাংবাদিকতার বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব, এই লেখায় সেই প্রশ্নগুলোই বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
লবিং কীভাবে সংবাদ নির্ধারণ করে
স্বার্থসংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলো সাধারণত প্রকাশ্যে নিজেদের প্রভাবের কথা জানায় না। অপরাধের সংবাদে তাদের প্রভাব আসে নানা পথে। কোনো বিশেষ তদন্ত তত্ত্বকে প্রতিষ্ঠা করতে বাছাই করা পুলিশি তথ্য ফাঁস করা হতে পারে। স্থানীয় কোনো রাজনৈতিক নেতার ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি মামলায় জড়িয়ে পড়লে সংবাদমাধ্যমের ওপর চাপ আসতে পারে। আবার কোনো ব্যবসায়ী প্রতিদ্বন্দ্বীর বিরুদ্ধে খবর প্রকাশ বা কোনো খবর চাপা দেওয়ার চেষ্টা করতে পারেন।
শক্তিশালী কোনো সূত্রের স্বার্থের সঙ্গে মিলে গেলে একটি যাচাই না করা তথ্যও কয়েক ঘণ্টার মধ্যে প্রথম পাতার খবর হয়ে যেতে পারে। অথচ সাংবাদিকতার মৌলিক দায়িত্ব অনুযায়ী এমন তথ্য প্রকাশের আগে স্বাধীনভাবে তা যাচাই করার কথা।
সরকারি সূত্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতাও সমস্যাটিকে বাড়িয়ে দেয়। পুলিশ কোনো ঘটনার যে বিবরণ দেয়, তাকে আদালতে যাচাই না হওয়া পর্যন্ত একটি পক্ষের বক্তব্য হিসেবে বিবেচনা করা দরকার। কিন্তু সেই বক্তব্যকেই যদি চূড়ান্ত সত্য হিসেবে প্রকাশ করা হয়, তাহলে তদন্তকারী কর্মকর্তা কিংবা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা আদালতে প্রমাণ বিবেচনার আগেই জনমতকে নিজেদের পক্ষে নিয়ে যেতে পারেন। দুর্নীতি নিয়ে কাজ করা সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক সময়ে ফৌজদারি মানহানি ও সাইবার নিরাপত্তা আইনের মতো আইনি পদক্ষেপের ঘটনাগুলোও দেখিয়েছে, এই সম্পর্ক কখনও এমন পর্যায়ে যেতে পারে যেখানে স্বাধীন অনুসন্ধানী সাংবাদিকতাই নিরুৎসাহিত হয়।
নির্ভুলতার মূল্য, আস্থার ক্ষয়
এই পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় সংবাদে। যাচাই না করা তথ্য কিংবা একটি মাত্র সূত্রের বক্তব্যকে কেন্দ্র করে তৈরি চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদন আদালতের বিচার শেষ হওয়ার অনেক আগেই জনমতের কাঠগড়ায় একজন সন্দেহভাজনকে দোষী বানিয়ে দিতে পারে। উল্টো দিকটিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। প্রকৃত অপরাধী যদি যথেষ্ট প্রভাবশালী হন, তাহলে তাঁর স্বার্থে সংবাদ আড়াল করা কিংবা তদন্তের দিক ঘুরিয়ে দেওয়াও সম্ভব হতে পারে।
এই সমীকরণে সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে থাকেন ভুক্তভোগী ও তাঁর পরিবার। কোনো রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক বয়ান সামনে এলে তাঁদের বক্তব্যই অনেক সময় সবার আগে বাদ পড়ে যায়। এর প্রভাব পড়ে মানুষের আস্থায়। সাম্প্রতিক বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মূল্যায়নে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার অবস্থান নিয়ে উদ্বেগ উঠে এসেছে। এর একটি দিক হলো, অপরাধ ও রাজনৈতিক সংবাদ অনেক ক্ষেত্রে যাচাই করা তথ্যের বদলে কে তথ্য দিতে পারছে এবং কার প্রভাব বেশি, তার ওপর নির্ভর করছে বলে মানুষের মধ্যে ধারণা তৈরি হওয়া।
পাঠকের মনে যখন সন্দেহ তৈরি হয় যে কোনো সংবাদ ঘটনার নিরপেক্ষ বিবরণ নয়, বরং কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থের প্রতিফলন, তখন সংবাদ থেকে তারা দূরে সরে যেতে পারেন। কেউ কেউ আবার এমন মাধ্যম বেছে নেন, যেখানে নিজের আগে থেকে তৈরি ধারণারই সমর্থন পাওয়া যায়। এতে তথ্যভিত্তিক বিতর্কের বদলে সামাজিক বিভাজন আরও গভীর হয়।
সাংবাদিকতার পোশাকে প্রচারণা
লবিংয়ের প্রভাবের সবচেয়ে ক্ষতিকর দিকগুলোর একটি হলো প্রচারণাকে সাংবাদিকতার রূপ দেওয়া। কোনো রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে দুর্বল করা, অন্য কোনো বিতর্ক থেকে মানুষের দৃষ্টি সরানো কিংবা ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষা করার উদ্দেশ্যে তৈরি সংবাদও বৈধ সাংবাদিকতার মতো করে প্রকাশ করা সম্ভব।
সেখানে উদ্ধৃতি থাকে, প্রতিবেদকের নাম থাকে, সরকারি সূত্রের মতো শোনায় এমন বক্তব্যও থাকে। ফলে বাইরে থেকে দেখলে সেটিকে সাধারণ সংবাদ প্রতিবেদন বলেই মনে হতে পারে। কিন্তু এর উদ্দেশ্য জনস্বার্থে তথ্য দেওয়া নয়, বরং নির্দিষ্ট কোনো স্বার্থ পূরণ করা। পাঠকের হাতে প্রতিটি প্রতিবেদনের সূত্র যাচাই করার মতো সময় বা প্রয়োজনীয় দক্ষতা সবসময় থাকে না। ফলে প্রকৃত সাংবাদিকতা আর উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণার পার্থক্য ধরা কঠিন হয়ে পড়ে। আর এই কারণেই এমন প্রতিবেদন প্রভাব বিস্তারের কার্যকর হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।
গণমাধ্যমের সংস্কৃতিতে যে সংস্কার প্রয়োজন
সমস্যাটির সমাধান এক জায়গায় হবে না। সংবাদকক্ষের নিজস্ব নীতিতেও পরিবর্তন প্রয়োজন। অপরাধের কোনো অভিযোগ প্রকাশের আগে অন্তত দুটি স্বাধীন সূত্র থেকে তথ্য যাচাইয়ের নিয়ম চালু করা যেতে পারে। পুলিশ বা রাষ্ট্রপক্ষের কোনো দাবি আদালতে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তাকে নিশ্চিত তথ্যের বদলে সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য হিসেবে আলাদা করে উপস্থাপন করা দরকার।
প্রতিবেদকের নাম এবং সম্পাদকের অনুমোদনকেও আরও অর্থবহ করা প্রয়োজন। কোনো যাচাইহীন অভিযোগ পরে মিথ্যা প্রমাণিত হলে প্রতিবেদক ও সম্পাদককে তার জন্য জবাবদিহির আওতায় আসতে হবে। এমন ব্যবস্থা থাকলে ক্ষতিকর ও ভিত্তিহীন প্রতিবেদন প্রকাশের ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যমের দায়ও স্পষ্ট হবে। প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রেও নতুন করে ভাবতে হবে। সাংবাদিক সংগঠন, বিশ্ববিদ্যালয় এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানগুলো একসঙ্গে এমন প্রশিক্ষণ কর্মসূচি তৈরি করতে পারে, যেখানে তথ্যের উৎস যাচাই, অপরাধের সংবাদ এবং আদালতসংক্রান্ত প্রতিবেদন তৈরির পেশাগত পদ্ধতি নিয়ে গভীরভাবে কাজ করা হবে।
অপরাধ সাংবাদিকতা এমন একটি ক্ষেত্র, যেখানে সামান্য অসতর্কতাও সহজে কোনো বাইরের স্বার্থের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। তাই এই সাংবাদিকতায় দক্ষতা ও নৈতিকতার প্রশিক্ষণ সাধারণ সংবাদ প্রতিবেদনের তুলনায় আরও গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে।
আচরণবিধি ও প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারি শক্ত করা
বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল দীর্ঘদিন ধরে সত্যতা ও নির্ভুলতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে আচরণবিধি প্রয়োগ করে আসছে। তবে তার কার্যকর করার সুযোগ সীমিত। মুদ্রিত সংবাদমাধ্যমের বাইরে টেলিভিশন ও অনলাইন গণমাধ্যমের জন্য একই ধরনের বাধ্যতামূলক আচরণবিধিও নেই।
মুদ্রণ, সম্প্রচার ও ডিজিটাল সাংবাদিকতার জন্য একটি অভিন্ন ও কার্যকর আচরণবিধি তৈরি করা যেতে পারে। সেই কাজ সরকারের একতরফা সিদ্ধান্তে না করে সাংবাদিক সংগঠন, সম্পাদক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের যৌথ অংশগ্রহণে করা প্রয়োজন। তাহলে পেশাটির জন্য একটি অভিন্ন মানদণ্ড তৈরি হতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে এ ধরনের আচরণবিধি নিয়ে সম্পাদকদের সংগঠনের উদ্যোগগুলো তাই গুরুত্বপূর্ণ। তবে কোনো আচরণবিধি শুধু কাগজে থাকলে তার কার্যকারিতা সীমিত থাকবে। বাস্তবে তা প্রয়োগের সুযোগ ও জবাবদিহির ব্যবস্থা থাকতে হবে।
সরকারের ভূমিকা কোথায়
তথ্য মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা হওয়া উচিত সহায়কের, নিয়ন্ত্রকের নয়। স্বাধীন প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে অর্থায়ন, রাজনৈতিক চাপ থেকে সুরক্ষিত একটি সংবাদ অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং সাংবাদিকতার বৈধ কাজকে অপরাধ হিসেবে দেখানোর সুযোগ তৈরি করে এমন আইনি বিধান সংস্কারে সহায়তা করা হতে পারে মন্ত্রণালয়ের সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা।
সাইবার নিরাপত্তা সংক্রান্ত আইনের যেসব বিধান বৈধ সাংবাদিকতাকে অপরাধের আওতায় নিয়ে আসার ঝুঁকি তৈরি করে, সেগুলোও পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন রয়েছে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষায় কাজ করে এমন একটি মন্ত্রণালয়, যেখানে সাংবাদিকদের নীরব করার বদলে তাদের স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে, অতিরিক্ত রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের চেয়ে অনেক বেশি কার্যকরভাবে মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারে।
অপরাধ সাংবাদিকতার মূল দায়িত্ব হলো ঘটনা সম্পর্কে যাচাই করা তথ্য মানুষের সামনে তুলে ধরা। কোনো রাজনৈতিক, ব্যবসায়িক বা ব্যক্তিগত স্বার্থ যখন সেই দায়িত্বের জায়গা দখল করে নেয়, তখন ক্ষতি শুধু একটি প্রতিবেদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। ক্ষতিগ্রস্ত হয় সংবাদমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং শেষ পর্যন্ত মানুষের জানার অধিকারও।
