রুদাইনা বশির
ব্রুনেল ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাজ্য
তানজীনা ফেরদৌসের “বাংলাদেশের বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭: আমরা কি গুরুত্ব দিয়েছিলাম?” শীর্ষক লেখার প্রতিক্রিয়া। অনিকেত বুলেটিন, ২৩ জুলাই ২০২৬।
ফারদৌসের লেখার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, বাংলাদেশের বাল্যবিবাহ আইনের সবচেয়ে বিতর্কিত জায়গা হিসেবে ১৯ নম্বর ধারাকে সামনে আনা। তবে একটি পূর্ণাঙ্গ সংস্কার পরিকল্পনার জন্য লেখাটিতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষণ ও করণীয় এখনো অনুপস্থিত।
১৯ নম্বর ধারার পেছনের রাজনৈতিক অর্থনীতি
লেখাটির সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো এর পরিসংখ্যানভিত্তিক আলোচনা। ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের ৫১.৪ শতাংশ ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই বিয়ে করেছেন এবং বাংলাদেশে বাল্যবিবাহের শিকার নারীর সংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ, এই তথ্যগুলো সমস্যাটির ব্যাপকতা স্পষ্ট করে। কিন্তু ১৯ নম্বর ধারা কেন রাখা হলো, সেই প্রশ্নে আলোচনা খুব বেশি দূর এগোয়নি। যে আইনের জায়গা নিতে ২০১৭ সালের আইন করা হয়েছে, ১৯২৯ সালের সেই আইনে এমন কোনো বিশেষ বিধান ছিল না, এই তথ্য উল্লেখ করাই যথেষ্ট নয়।
একটি গভীরতর আইনি পর্যালোচনায় জানতে হবে, ধারাটি যুক্ত করার পেছনে কারা ভূমিকা রেখেছিল, ধর্মীয় ও সামাজিক চাপ কীভাবে এর ভাষা নির্ধারণে প্রভাব ফেলেছিল এবং আইনপ্রণেতারা কেন একটি ব্যতিক্রমকে আইনের অংশ করার পথ বেছে নিলেন। একই সঙ্গে দারিদ্র্য, যৌতুক এবং মেয়েদের স্কুলে ধরে রাখার দুর্বলতা, বাল্যবিবাহের এসব গভীর কারণ কেন যথেষ্ট গুরুত্ব পেল না, সেই প্রশ্নও সামনে আসা দরকার। এই কারণগুলো না বুঝলে পরবর্তী সংস্কার প্রস্তাবগুলো মূল সমস্যার রাজনৈতিক উৎসে না গিয়ে কেবল আইনের কিছু জায়গা ঠিক করার প্রচেষ্টা হয়ে দাঁড়ায়।
প্রয়োগের দুর্বলতা, কিন্তু কোনটি আগে?
আইন প্রয়োগের দুর্বলতাগুলো নিয়ে অংশটি অনেকটা সমস্যার তালিকার মতো হয়েছে, বিশ্লেষণের মতো নয়। সম্মতি যাচাইয়ের ব্যবস্থা নেই, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ কমিটি দুর্বল, জন্মনিবন্ধন ব্যবস্থা নির্ভরযোগ্য নয়, এসব বিষয় সেখানে এসেছে। কিন্তু কোন দুর্বলতা অন্যগুলোর ওপর বেশি প্রভাব ফেলে, সেই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় না। সব সমস্যাকে সমান গুরুত্ব দিলে বোঝা কঠিন হয় কোনটি মূল কারণ এবং কোনটি তার ফল। ফলে সংস্কারের প্রচেষ্টাও সব জায়গায় সমানভাবে ছড়িয়ে পড়ে, অথচ সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন আনার সুযোগ যেখানে, সেখানে মনোযোগ কমে যেতে পারে।
দুর্বল জন্মনিবন্ধন ব্যবস্থার বিষয়টি এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এটি কেবল চারটি সমস্যার একটি নয়; বরং অন্য সব সুরক্ষা ব্যবস্থা কার্যকর করার অন্যতম পূর্বশর্ত। নির্ভরযোগ্য জন্মনিবন্ধন না থাকলে আদালত বা বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ কমিটি বয়স যাচাই করবে কীভাবে? বয়সের তথ্যই যদি অনির্ভরযোগ্য হয়, তাহলে সম্মতি যাচাইয়ের ব্যবস্থাও সেই দুর্বলতার ওপর দাঁড়াবে। একইভাবে, বয়স নিশ্চিত করার উপায় ছাড়া কমিটিগুলোকে সিদ্ধান্ত নিতে হলে আইন প্রয়োগের বদলে অনুমানের ওপর নির্ভর করতে হবে।
তাই একটি কার্যকর সংস্কার পরিকল্পনায় অগ্রাধিকার ঠিক করা জরুরি। সীমিত সম্পদের একটি সরকার একসঙ্গে সব সমস্যার সমাধানে সমান মাত্রায় কাজ করতে পারে না। কোন কাজ আগে করতে হবে, আর কোন কাজ তার ওপর নির্ভর করবে, সেই ক্রম নির্ধারণ না করলে দুর্বল ভিত্তির ওপরই নতুন প্রয়োগ ব্যবস্থা দাঁড় করানোর ঝুঁকি থাকে।
সংস্কার প্রস্তাব আছে, বাস্তবায়নের কাঠামো নেই
শাসন ও আইন সংস্কার নিয়ে প্রস্তাবগুলো, যেমন ১৯ নম্বর ধারা সংশোধন, নারী ও পুরুষের জন্য বিয়ের বয়সের সমতা, বিয়েকে বাতিলযোগ্য করার সুযোগ এবং বৈবাহিক ধর্ষণের আইনি ব্যতিক্রম বাতিল করা, গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এসব প্রস্তাবের বাস্তবায়ন নিয়ে বিস্তারিত কাঠামো নেই।
বিশেষ বিধানের অধীনে কোনো নিম্ন আদালত বিয়ের অনুমতি দেওয়ার আগে সুপ্রিম কোর্টের অনুমোদন নেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু দেশের সর্বোচ্চ আদালতের ওপর এর ফলে কী ধরনের অতিরিক্ত চাপ তৈরি হবে, সেই প্রশ্নের উত্তর নেই। এই দায়িত্ব বাস্তবসম্মতভাবে নেওয়ার জন্য কোনো মধ্যবর্তী ট্রাইব্যুনাল বা বিশেষায়িত পারিবারিক আদালতের ব্যবস্থা করা যায় কি না, সেই আলোচনাও প্রয়োজন।
একইভাবে, উদ্ধার ও পুনর্বাসনের জন্য একটি স্বাধীন তহবিলের কথা এক বাক্যে বলা হয়েছে। কিন্তু সেই তহবিলের অর্থ কোথা থেকে আসবে, কে তা পরিচালনা করবে এবং পরে যে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির কথা বলা হয়েছে, যেমন Social Protection Plus উদ্যোগ, তার সঙ্গে এই তহবিলের সম্পর্ক কী হবে, এসব বিষয়ে কোনো পরিষ্কার কাঠামো নেই। বাস্তবায়নের ব্যবস্থা ছাড়া সংস্কারের প্রস্তাব অনেক সময় বাংলাদেশের নীতিপত্রে থাকা উচ্চাকাঙ্ক্ষী ঘোষণার মতোই থেকে যায়।
পরিবার ও সমাজের দিকটি কোথায়?
আরও বড় একটি ঘাটতি হলো, পরিবার ও সমাজের আচরণগত দিক নিয়ে প্রায় কোনো আলোচনা নেই। লেখাটির প্রায় সব সমাধান আইন ও প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক: আদালত, সংসদ, বিচারকদের প্রশিক্ষণ এবং আইনের ভাষা। অথচ লেখাটির নিজের তথ্যেই দেখা যায়, আইন সম্পর্কে সীমিত সামাজিক সচেতনতা আইন প্রয়োগের একটি বড় বাধা।
শুধু আইনের ভাষা বদলে বাল্যবিবাহ বন্ধ করা সম্ভব নয়। আইনি সংস্কারের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে কাজ দরকার। মেয়েদের স্কুলে ধরে রাখার সঙ্গে শর্তযুক্ত আর্থিক সহায়তা, অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের বিয়ে পড়ান এমন ধর্মীয় ও সামাজিক নেতাদের সঙ্গে কাজ করা এবং দারিদ্র্যের কারণে মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দিতে বাধ্য হওয়া পরিবারগুলোর জন্য অর্থনৈতিক সহায়তা, এসব ব্যবস্থাও আলোচনায় থাকা দরকার।
পরিবারগুলো কেন ১৯ নম্বর ধারার আশ্রয় নিতে চায়, সেই প্রশ্নের উত্তর না খুঁজে শুধু ধারাটির আইনি ভাষা কঠোর করলে বাল্যবিবাহ কমার বদলে আরও গোপনে সংঘটিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
বিচারিক সক্ষমতার পাশাপাশি জবাবদিহিও দরকার
লেখাটিতে বিচারিক সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টি মূলত প্রশিক্ষণ ও আইনের ব্যাখ্যা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। কিন্তু আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন রয়ে গেছে: বিচারকদের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে জবাবদিহি কীভাবে নিশ্চিত হবে?
১৯ নম্বর ধারার ব্যতিক্রমী সুযোগ ব্যবহারের ক্ষেত্রে কোনো নিম্ন আদালতের বিচারক নিয়ম না মেনে অনুমতি দিলে তার কোনো পরিণতি না থাকলে শুধু প্রশিক্ষণ দিয়ে আচরণ বদলানো কঠিন। তাই একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থায় নজরদারির ব্যবস্থা, বিশেষ বিধানের অধীনে হওয়া প্রতিটি মামলার তথ্য একটি কেন্দ্রীয় নিবন্ধনে সংরক্ষণ এবং সুপ্রিম কোর্টের নিয়মিত পর্যালোচনার ব্যবস্থা থাকা দরকার। এর মাধ্যমে কোথায় এবং কীভাবে বিশেষ বিধানের অপব্যবহার হচ্ছে, তার একটি পরিষ্কার চিত্র পাওয়া সম্ভব হবে।
আন্তর্জাতিক আইন আছে, কিন্তু প্রয়োগের প্রশ্নটি অনুপস্থিত
লেখাটিতে শিশু অধিকার সনদ এবং নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য বিলোপ সনদ বা CEDAW-এর উল্লেখ আছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক আইনের এসব অঙ্গীকার বাস্তবে কীভাবে ব্যবহার করা যায়, সেই প্রশ্নটি যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি।
এই সনদগুলোর নীতিকে দেশের আইনি কাঠামোর সঙ্গে আরও সরাসরি যুক্ত করার ব্যবস্থা করা গেলে দেশীয় আদালতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের ব্যবহার শক্তিশালী হতে পারে। এর ফলে শিশুর বিয়ে যে জোরপূর্বক বিয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে, সেই যুক্তিও আরও শক্ত ভিত্তি পেতে পারে। ব্যক্তিগত আইন ও আইনে নির্ধারিত ন্যূনতম বয়সের মধ্যে কোনো সংঘাত তৈরি হলে বিচারকদের জন্যও স্পষ্ট আইনি ভিত্তি তৈরি করা সম্ভব হবে।
উপসংহার
সব মিলিয়ে, লেখাটি সমস্যার লক্ষণগুলো সঠিকভাবে চিহ্নিত করেছে, কিন্তু সম্পূর্ণ চিত্রটি তুলে ধরতে আরও এক ধাপ এগোনোর প্রয়োজন ছিল। প্রস্তাবিত সংস্কারগুলো মূলত আইনের কাঠামো নিয়ে কথা বলে, কিন্তু বাল্যবিবাহকে টিকিয়ে রাখে যে সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতা, তার সঙ্গে সেই সংস্কারগুলোর সম্পর্ক যথেষ্ট স্পষ্ট নয়।
একটি কার্যকর সংস্কার পরিকল্পনায় আইন সংশোধন, আইন প্রয়োগের অবকাঠামো, পরিবার ও সমাজকেন্দ্রিক কর্মসূচি এবং আন্তর্জাতিক সনদের নীতিকে দেশের আইনি কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করার বিষয়গুলোকে একটি ধারাবাহিক পরিকল্পনার মধ্যে আনতে হবে। প্রতিটি পদক্ষেপকে আলাদা করে দেখলে চলবে না। কোন কাজ আগে, কোনটি পরে এবং একটি পদক্ষেপ কীভাবে পরবর্তী পদক্ষেপের ভিত্তি তৈরি করবে, সেই বাস্তবতাও পরিকল্পনার অংশ হতে হবে।
তথ্যসূত্র:
