রুকসানা আখতার
স্বতন্ত্র স্থপতি
এই লেখায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক সৌরবিদ্যুৎ উদ্যোগ এবং পোশাকশিল্পসহ দেশের বৃহত্তর শিল্পায়নের ক্ষেত্রে এই ভাবনার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ৭-এর সঙ্গে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থার তুলনা করে দেখানো হয়েছে। পাশাপাশি এমন কিছু সংস্কারের কথাও বলা হয়েছে, যার মাধ্যমে দেশের প্রতিটি কারখানায় সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হতে পারে।
শীর্ষ পর্যায় থেকে জাতীয় অগ্রাধিকার
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী সৌরবিদ্যুৎকে জাতীয় অগ্রাধিকারের একটি দৃশ্যমান অংশ করে তুলেছেন। জাতীয় সংসদ ভবনে এক মেগাওয়াট ক্ষমতার ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা উদ্বোধন করে তিনি জ্বালানি ব্যবস্থার পরিবর্তনকে শুধু পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব হিসেবে নয়, অর্থনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গেও যুক্ত বিষয় হিসেবে তুলে ধরেছেন। ধাপে ধাপে বঙ্গভবন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, সচিবালয় এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভবনে সৌর প্যানেল স্থাপনের নির্দেশও দিয়েছেন তিনি।
সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো, দেশে সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জাম উৎপাদনে উৎসাহ দেওয়া এবং সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ আনার জন্য কার্যকর আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার তিনটি নির্দেশনাও দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। সরকারি ভবন থেকেই ব্যবহারের দৃষ্টান্ত তৈরি হলে পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান উভয়ের কাছেই তার একটি শক্তিশালী বার্তা যায়।
পোশাকশিল্পের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ
দেশের পোশাকশিল্পের বিকাশে দীর্ঘদিন ধরে দেশীয় গ্যাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এখন গ্যাসের সংকটের কারণে অনেক কারখানাকে ব্যয়বহুল ডিজেলের দিকে যেতে হচ্ছে। ছাদে সৌর প্যানেল বসালে দিনের বেলায় নিয়মিত জ্বালানি কেনার প্রয়োজন ছাড়াই বিদ্যুৎ পাওয়া সম্ভব। গবেষণায় দেখা গেছে, উপযুক্ত আকারের সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করলে পাঁচ থেকে আট বছরের মধ্যে বিনিয়োগের খরচ উঠে আসতে পারে।
তবে গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের ৮৭৮টি কারখানা নিয়ে করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, এসব কারখানার বিদ্যুৎ চাহিদার মাত্র প্রায় ৩ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে এসেছে। ছোট কারখানাগুলো এখনো প্রায় পুরোপুরি প্রচলিত জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল।
সৌরবিদ্যুৎকে সাশ্রয়ী করা এবং দেশে সরঞ্জাম উৎপাদনের ওপর প্রধানমন্ত্রীর গুরুত্বারোপ তাই বাস্তব সমস্যাগুলোর সঙ্গেই সরাসরি যুক্ত। খরচ, সহজলভ্যতা ও সরবরাহ, তিনটি বিষয়ই এখানে গুরুত্বপূর্ণ। তুলনামূলক পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার রপ্তানি প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রেও সহায়ক হতে পারে। কারণ আন্তর্জাতিক ক্রেতারা কম কার্বন নিঃসরণকারী সরবরাহকারীদের প্রতি ক্রমেই বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছেন।
জ্বালানি নিরাপত্তা ও শিল্পায়ন
শিল্পের প্রবৃদ্ধির জন্য নির্ভরযোগ্য ও পূর্বানুমানযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ জরুরি। আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করলে কারখানাগুলো এমন মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহ সংকটের ঝুঁকিতে পড়ে, যার ওপর দেশের নিয়ন্ত্রণ সীমিত। সৌরবিদ্যুৎ দেশের নিজস্ব একটি সম্পদ এবং গত এক দশকে এর খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
দেশে সৌর সরঞ্জাম উৎপাদনের ওপর জোর দিলে উৎপাদন, স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে দক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হতে পারে। এর সুফল শুধু পোশাকশিল্পে সীমাবদ্ধ থাকবে না, অন্য শিল্পেরও বিকাশ ঘটতে পারে। ফলে জ্বালানি নীতির সঙ্গে শিল্পনীতির একটি সরাসরি যোগ তৈরি হয়। পরিচ্ছন্ন বিদ্যুৎকে শুধু ব্যয় হিসেবে দেখার বদলে শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ তৈরি হয়।
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ৭-এর সঙ্গে তুলনা
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ৭ সবার জন্য সাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য, টেকসই ও আধুনিক জ্বালানি নিশ্চিত করার কথা বলে। পাশাপাশি মোট জ্বালানি ব্যবস্থায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর লক্ষ্যও রয়েছে। বাংলাদেশ এখনো সেই পথের শুরুর পর্যায়ে আছে। তবে জাতীয় পর্যায়ে যে দিকনির্দেশনা নেওয়া হচ্ছে, তা এই লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
এই উদ্যোগ সহনশীল অবকাঠামো ও টেকসই শিল্পায়নসংক্রান্ত লক্ষ্যমাত্রা ৯, শোভন কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিসংক্রান্ত লক্ষ্যমাত্রা ৮ এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলাসংক্রান্ত লক্ষ্যমাত্রা ১৩ অর্জনেও সহায়ক হতে পারে। সৌরবিদ্যুৎ সবার নাগালের মধ্যে আনার ওপর প্রধানমন্ত্রীর জোর দেওয়ার বিষয়টি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ৭-এর মূল ভাবনার সঙ্গেও মেলে। সুবিধা শুধু বড় প্রতিষ্ঠান, যাদের হাতে বাড়তি বিনিয়োগের অর্থ আছে, তাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না।
এই উদ্যোগকে ব্যাপক ব্যবহারে নিয়ে যেতে কয়েকটি সহায়ক সংস্কার প্রয়োজন।
লক্ষ্যভিত্তিক অর্থায়ন: অবকাঠামো উন্নয়ন কোম্পানি লিমিটেডের পরিকল্পিত কর্মসূচি, যেখানে মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ সুদে অর্থায়নের ব্যবস্থা রয়েছে, একটি ভালো ভিত্তি তৈরি করতে পারে। এই সুবিধা ছোট ও মাঝারি কারখানায়ও সম্প্রসারণ করা দরকার। একাধিক প্রতিষ্ঠানের যৌথ আবেদন, সহজ নথিপত্র এবং সাশ্রয় থেকে ঋণ পরিশোধের উপযোগী সময়সীমা রাখা যেতে পারে।
ঋণের নিশ্চয়তা: রাষ্ট্র বা উন্নয়ন অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানের নিশ্চয়তা থাকলে ছোট কারখানার জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি ও উন্নয়নকারীর অর্থায়নে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের মডেলও আর্থিকভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে। আন্তর্জাতিক ক্রেতারাও অর্থায়ন বা নিশ্চিত ক্রয়চুক্তির মাধ্যমে ঝুঁকির একটি অংশ নিতে পারেন।
দ্রুত বিদ্যুৎ সংযোগ: একটি প্রতিষ্ঠান তিন মাসেরও কম সময়ে ৪ দশমিক ৫ মেগাওয়াটের একটি সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করেছিল। কিন্তু পরে দ্বিমুখী বিদ্যুৎ মিটার ব্যবহারের অনুমোদনের জন্য আরও দুই মাস অপেক্ষা করতে হয়েছে। নির্দিষ্ট সময়সীমাসহ একক জানালা পদ্ধতি চালু করা গেলে কারখানাগুলো দ্রুত সাশ্রয়ের সুবিধা পেতে পারে।
বিদ্যুৎ সরবরাহ ও সঞ্চালন সুবিধা: ছাদে জায়গা শেষ হয়ে গেলে অন্য স্থানে স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে কারখানাগুলো যাতে বিদ্যুৎ কিনতে পারে, তার জন্য স্বচ্ছ ও কম সঞ্চালন ব্যয় নির্ধারণ করা প্রয়োজন। চা-বাগানের ওপর সৌর প্যানেল স্থাপনের মতো যৌথ ভূমি ব্যবহারের পরীক্ষামূলক উদ্যোগও নেওয়া যেতে পারে। তবে বড় পরিসরে চালুর আগে এসব উদ্যোগের বাস্তব প্রভাব সতর্কভাবে যাচাই করা দরকার।
কারিগরি সহায়তা: একটি জরিপে সৌরবিদ্যুৎ গ্রহণ না করা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রায় অর্ধেক দক্ষ জনশক্তির অভাবকে বড় বাধা হিসেবে উল্লেখ করেছে। শিল্প সংগঠন ও কারিগরি প্রতিষ্ঠানগুলো সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনকারীদের সনদ দিতে পারে, সরঞ্জামের মান নির্ধারণ করতে পারে এবং পরামর্শসেবা দিতে পারে। এতে কারখানার মালিকেরা বিভিন্ন সরবরাহকারীর প্রস্তাব তুলনা করে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।
স্পষ্ট পরিমাপ: সাফল্য পরিমাপের ক্ষেত্রে দেখতে হবে, বিভিন্ন আকারের কারখানায় জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুতের ব্যবহার কতটা কমেছে। প্রতি বছর এই তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করা দরকার।
উপসংহার
প্রধানমন্ত্রীর সৌরবিদ্যুৎ উদ্যোগ বাংলাদেশের শিল্প খাতকে দীর্ঘদিনের একটি প্রয়োজনের বিষয়ে স্পষ্ট জাতীয় দিকনির্দেশনা দিয়েছে। পরিচ্ছন্ন, দেশীয় ও সাশ্রয়ী বিদ্যুতের দিকে যাওয়ার যে গুরুত্ব এখানে দেওয়া হয়েছে, তা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ৭-এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং শিল্প, কর্মসংস্থান ও জলবায়ু মোকাবিলার বৃহত্তর লক্ষ্যগুলোকেও সমর্থন করে।
অর্থায়ন, ঋণের নিশ্চয়তা, বিদ্যুৎ সংযোগ এবং কারিগরি সহায়তার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সংস্কার করা গেলে বড় শিল্পগোষ্ঠীর পাশাপাশি ছোট কারখানাগুলোও সৌরবিদ্যুতের সুবিধা নিতে পারবে। পোশাকশিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি বাংলাদেশের শিল্পায়নের জন্যও গড়ে উঠতে পারে দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানি ভিত্তি।
