ডেস্ক রিপোর্ট
ফেসবুক ও ইউটিউব থেকে আয় করার আশায় বাংলাদেশে তরুণদের একটি বড় অংশ এখন কনটেন্ট তৈরি ও আয় করার পথে ঝুঁকছেন। ভাইরাল হয়ে সফল হওয়ার গল্প এবং স্মার্টফোন ব্যবহার করেই ডলারে আয় করার আকর্ষণ তাদের টানছে। সরকারও এই প্রবণতাকে উৎসাহ দিচ্ছে। তরুণদের কর্মসংস্থান ও ডিজিটাল উদ্যোক্তা তৈরির পথ হিসেবে কনটেন্ট নির্মাণকে সামনে রেখে প্রশিক্ষণ কর্মসূচি ও সরকারি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
তবে এই আশাবাদী ছবির আড়ালে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে একটি উদ্বেগও ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। অবাস্তব প্রত্যাশা, অতিরিক্ত ফোন ব্যবহার এবং সামাজিক ও নৈতিক ভিত্তির দুর্বলতার সঙ্গে এই সমস্যার যোগ রয়েছে। তরুণদের কাছে এই পথ আকর্ষণীয় হওয়ার কারণও বোঝা যায়। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ পড়াশোনা শেষ করে শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও পর্যাপ্ত প্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের সুযোগ নেই। অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এসব প্ল্যাটফর্ম নিজেদের এমন এক বিকল্প হিসেবে তুলে ধরে, যেখানে কোনো বিশেষ যোগ্যতা, পরিচিতি বা বড় মূলধন ছাড়াই সাফল্য পাওয়া সম্ভব।
কিন্তু এই প্রচারের বাইরে থেকে যায় অ্যালগরিদমের বাস্তবতা। অল্পসংখ্যক নির্মাতা অধিকাংশ দর্শক ও আয় দখল করেন। আর লাখ লাখ মানুষ মাসের পর মাস, কখনো বছরের পর বছর সময় ও শ্রম দিয়েও সামান্য আয় পান।
ধীরে ধীরে আয় বাড়বে, এই ভুল প্রত্যাশা
বাংলাদেশের অনেক তরুণ এই আয়ের পথ কতটা ধীর, অনিশ্চিত এবং প্রতিযোগিতাপূর্ণ, সে বিষয়ে সঠিক ধারণা না থাকায় পড়াশোনা বা স্থিতিশীল খণ্ডকালীন কাজ ছেড়ে দেন। সময় ও মানসিক শক্তি ব্যয় করতে থাকেন এমন একটি আয়ের আশায়, যা অধিকাংশের ক্ষেত্রেই জীবনযাপনের ন্যূনতম খরচ মেটানোর পর্যায়েও পৌঁছাবে না। অথচ তারা যেসব সফল প্রভাবশালীর জীবনযাপন অনুসরণ করতে চান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারই ঝলমলে ছবি বারবার সামনে আসে।
প্রত্যাশা ও বাস্তবতার এই ব্যবধানের মানসিক প্রভাবও কম নয়। কনটেন্ট নির্মাতাদের অনেকেই অ্যালগরিদমের পরিবর্তন, দর্শকসংখ্যার ওঠানামা এবং ব্যক্তিগত পরিস্থিতি যেমনই হোক নিয়মিত প্রকাশনা চালিয়ে যাওয়ার চাপ থেকে দীর্ঘস্থায়ী উদ্বেগের কথা বলেন।
অনেকের সঙ্গে ফোনের সম্পর্কও এক ধরনের বাধ্যতামূলক অভ্যাসের রূপ নেয়। দিনে অসংখ্যবার আয়ের হিসাব ও দর্শকসংখ্যা দেখা, জনপ্রিয় হতে থাকা বিষয় ধরতে ঘুম বিসর্জন দেওয়া কিংবা দর্শকের সাড়া কমে গেলে গভীর অস্বস্তি অনুভব করা সেই আচরণেরই লক্ষণ। কৈশোর ও তরুণ বয়সের স্বাভাবিক মানসিক চাপের সঙ্গে যারা এমনিতেই লড়ছেন, তাদের ওপর এই নতুন চাপ আরও একটি জটিল বোঝা তৈরি করছে। বাংলাদেশের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা এখনো প্রয়োজনের তুলনায় কম অর্থায়ন পায় এবং সেবার বড় অংশ শহরকেন্দ্রিক। ফলে এই সমস্যার মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় সহায়তা অনেকের কাছেই পৌঁছাচ্ছে না।
ফোননির্ভরতা ও মনোযোগ কমে যাওয়া
ফোনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার সমস্যা শুধু কনটেন্ট নির্মাতাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এসব কনটেন্টের দর্শক তরুণদের মধ্যেও এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে। স্বল্পদৈর্ঘ্যের ভিডিও একের পর এক দেখার পেছনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যয় করলে মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা কমতে পারে এবং দীর্ঘ সময় ধরে মনোযোগ দিয়ে কোনো কঠিন কাজ করার অভ্যাস দুর্বল হতে পারে। বিভিন্ন দেশের গবেষণায় এমন উদ্বেগ উঠে এসেছে। বাংলাদেশের শিক্ষকেরাও শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ও অংশগ্রহণ কমে যাওয়ার সঙ্গে বিষয়টির সম্পর্ক নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, ধীরে ধীরে এমন কিছু মূল্যবোধ স্বাভাবিক হয়ে উঠছে যেখানে ধৈর্য, বিনয় ও সমাজের প্রতি দায়িত্বের চেয়ে দৃশ্যমানতা, বিতর্ক এবং তাৎক্ষণিক আনন্দ বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বহু পরিবার যে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ ধরে রাখতে চায়, তার সঙ্গে এই পরিবর্তনের সংঘাত তৈরি হতে পারে। বেশি মানুষের কাছে পৌঁছানোর জন্য তৈরি করা কনটেন্ট অনেক সময় এমন আচরণকে পুরস্কৃত করে, যা প্রচলিত সামাজিক মূল্যবোধে নিরুৎসাহিত করা হতো। ফলে জনপরিসরের কথাবার্তার মানও বদলাতে পারে এবং তরুণ দর্শকদের কাছে কোন জীবনধারা আকর্ষণীয়, সেই ধারণাতেও পরিবর্তন আসতে পারে।
সামাজিক সচেতনতা ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে নতুনভাবে দেখা
অর্থনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও মানসিক ক্ষতির এই যোগসূত্র মোকাবিলায় শুধু সতর্কবার্তা যথেষ্ট নয়। স্কুলের পাঠ্যক্রমে ডিজিটাল সচেতনতার বিষয়গুলো যুক্ত করা গেলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে আয়ের বিষয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা অনেকটাই কমানো সম্ভব। শিক্ষার্থীদের আয়সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে বাস্তব পরিস্থিতি বোঝার প্রশিক্ষণ দিতে হবে। ভাইরাল সাফল্যের গল্পে যে অল্প কয়েকজনের সাফল্য চোখে পড়ে, তাদের দেখে পুরো চিত্র সম্পর্কে ধারণা করা ঠিক নয়। কারণ যারা টেকসই আয় করতে পারেননি, সেই বিপুলসংখ্যক মানুষের গল্প সাধারণত সামনে আসে না।
তবে এসব উদ্যোগ কেবল আনুষ্ঠানিক কর্মসূচিতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থাকবে, যদি মানসিক স্বাস্থ্যসেবার অবকাঠামোয় বাস্তব বিনিয়োগ না বাড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের সঙ্গে যুক্ত উদ্বেগ ও বাধ্যতামূলক ব্যবহারের প্রবণতা শনাক্ত এবং চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় পরামর্শসেবা গড়ে তুলতে হবে। প্রয়োজনের তুলনায় বাংলাদেশের মানসিক স্বাস্থ্যব্যবস্থায় এখনো পর্যাপ্ত অর্থ ও জনবল নেই। প্রশিক্ষিত পেশাজীবীদের বড় অংশ শহরকেন্দ্রিক হওয়ায় গ্রামীণ তরুণদের কাছে এই সেবা পৌঁছানো কঠিন।
স্থানীয় পর্যায়ে পরামর্শ ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের উদ্যোগও কাজে আসতে পারে। যারা প্ল্যাটফর্মভিত্তিক আয়ের জগতে বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন, তাদের সঙ্গে নতুন কনটেন্ট নির্মাতাদের যুক্ত করা গেলে অবাস্তব প্রত্যাশা কিছুটা কমানো সম্ভব। তরুণদের কাছে সমবয়সী বা কাছাকাছি অভিজ্ঞতার মানুষের কথা অনেক সময় দূরের কোনো প্রতিষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক সতর্কবার্তার চেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য হয়।
এই ধরনের উদ্যোগে ব্যর্থতা ও ধীরে এগোনোর অভিজ্ঞতা নিয়েও খোলামেলা আলোচনা করা যেতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে সাজানো সাফল্যের গল্পগুলো বেশি দেখা যায়, তার বাইরে বাস্তব অভিজ্ঞতা সামনে এলে তরুণেরা আয়ের এই পথ সম্পর্কে আরও বাস্তব ধারণা পেতে পারেন।
পরিবার ও স্থানীয় সমাজের অংশগ্রহণও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আগে যে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ভিত্তির দুর্বলতার কথা বলা হয়েছে, তার অনেকটাই কনটেন্টের সরাসরি প্রভাব নয়। বরং ফোন ব্যবহারের ওপর নজরদারি ও কাঠামোর অভাব, যা পরিবার ও সমাজের স্বাভাবিক মেলামেশা ও দিকনির্দেশনার জায়গা দখল করে নিচ্ছে, সেখান থেকেও সমস্যা তৈরি হচ্ছে। ফোনকে শুধু প্রযুক্তিগত সমস্যা হিসেবে না দেখে পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের সঙ্গে যুক্ত বিষয় হিসেবে দেখা প্রয়োজন। দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য সেই সামাজিক কাঠামোর কিছু অংশ ফিরিয়ে আনা জরুরি হতে পারে।
উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও সুস্থতার মধ্যে ভারসাম্য
ডিজিটাল মাধ্যমে আয়ের সুযোগ বাড়ানোর সরকারি উদ্যোগ বন্ধ করার প্রয়োজন নেই। তবে এর পাশাপাশি তরুণদের মানসিক ও সামাজিক জীবনে যে চাপ তৈরি হচ্ছে, তাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। ডিজিটাল অর্থনীতির নীতিতে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, গণমাধ্যম ও ডিজিটাল সচেতনতা এবং মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষা যেন মূল অংশ হিসেবে থাকে, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এসব বিষয়কে পরে দেখা যাবে এমন পার্শ্বপ্রশ্ন হিসেবে রাখলে চলবে না।
