ড. নুরুজ্জামান খান
অ্যাডিলেড বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ
ভারত বাংলাদেশ থেকে আমদানি করা পলিইথিলিন টেরেফথালেট বা পিইটি ফিল্মের ওপর অন্যায্য আমদানি প্রতিরোধমূলক শুল্ক আরোপের সুপারিশ করেছে। এর আগে পাট ও পাটজাত পণ্যের ওপরও শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত এসেছে। এই লেখায় বাংলাদেশের অর্থনীতি ও ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের ওপর এসব ব্যবস্থার সম্ভাব্য প্রভাব পর্যালোচনা করা হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ কী ধরনের নীতি সংস্কার নিতে পারে এবং ভারতের সঙ্গে কোন কোন বিষয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু করা সম্ভব, তারও কিছু দিক তুলে ধরা হয়েছে।
বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, একটি ধারাবাহিকতা
ভারতের বাণিজ্যবিষয়ক কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশি পিইটি ফিল্মের ওপর পাঁচ বছরের জন্য প্রতি টনে সর্বোচ্চ ২১৮ ডলার অন্যায্য আমদানি প্রতিরোধমূলক শুল্ক আরোপের সুপারিশ করেছে। এর মাত্র কয়েক দিন আগে পাট ও পাটজাত পণ্যের ওপর সর্বোচ্চ ৪৪৫ ডলার অন্যায্য আমদানি প্রতিরোধমূলক শুল্কের সুপারিশ করা হয়। একই সঙ্গে পাটজাত পণ্যের ওপর সম্ভাব্য ১৪০ দশমিক ০৪ ডলার ক্ষতিপূরণমূলক শুল্কের বিষয়টিও সামনে এসেছে।
তবে এসব শুল্ক এখনো কার্যকর হয়নি। ভারতের অর্থ মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে প্রজ্ঞাপন জারি করলেই তা কার্যকর হবে। ফলে কূটনৈতিক আলোচনার সুযোগ এখনো রয়েছে। বাংলাদেশের পাঁচটি রপ্তানি পণ্য এখন একই প্রতিবেশী দেশের বাণিজ্য প্রতিকারমূলক ব্যবস্থার আওতায় এসেছে। বিষয়টি তাই বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ কমে যাচ্ছে এবং বাংলাদেশের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্ব দিয়ে ভাবার প্রয়োজন তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কী প্রভাব পড়তে পারে
পিইটি ফিল্ম বাংলাদেশের তুলনামূলক নতুন রপ্তানি পণ্য। ২০২১ থেকে ২০২২ অর্থবছরে যেখানে রপ্তানি ছিল মাত্র ১২ টন, ২০২৪ থেকে ২০২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে ২ হাজার ৭৬৩ টনে দাঁড়িয়েছে। ভারতের মোট আমদানির প্রায় ৩ দশমিক ৪ শতাংশ এসেছে বাংলাদেশ থেকে। ফলে তাৎক্ষণিক রাজস্ব ক্ষতি খুব বড় নাও হতে পারে। কিন্তু পরিমাণের চেয়ে বড় বিষয় হলো এর বার্তা।
প্যাকেজিং ও প্লাস্টিক খাতে যারা আঞ্চলিক বাজারে বিনিয়োগ ও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছিল, তারা এখন এমন একটি বাজার দেখতে পারে যেখানে খুব দ্রুত বাণিজ্যিক প্রবেশাধিকার সীমিত হয়ে যেতে পারে। এই অনিশ্চয়তা নতুন রপ্তানি প্রকল্পে মূলধনের খরচ বাড়াতে পারে।
পাটের বিষয়টি ভিন্ন। পাট বাংলাদেশের পুরোনো ও গুরুত্বপূর্ণ একটি শিল্প, যার সঙ্গে কৃষক, কলকারখানার শ্রমিক এবং ব্যবসায়ীরা সরাসরি যুক্ত। একের পর এক শুল্ক এই শিল্পের মুনাফার ওপর চাপ তৈরি করে। অথচ দেশীয় মূল্য সংযোজনের দিক থেকে পাট এমন কয়েকটি শিল্পের একটি, যার শক্তিশালী ভিত্তি বাংলাদেশে রয়েছে।
আরেকটি ঝুঁকি রপ্তানি বহুমুখীকরণ নিয়ে। পোশাকের বাইরে নতুন পণ্য রপ্তানি বাড়ানো বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের নীতিগত লক্ষ্য। কিন্তু নতুন কোনো পণ্য বাজারে জায়গা করে নেওয়ার পর বাণিজ্য প্রতিকারমূলক ব্যবস্থার মুখে পড়লে অন্য উদ্যোক্তারাও সেই খাতে বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত হতে পারেন। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশ যখন আগের মতো বাণিজ্যিক সুবিধার ওপর নির্ভর করতে পারবে না, তখন বড় প্রতিবেশী বাজারে পূর্বানুমানযোগ্য প্রবেশাধিকার আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
ভারত বাংলাদেশের পণ্যের একটি বড় বাজার। একই সঙ্গে বাংলাদেশে ভারতীয় পণ্যের সরবরাহও অনেক বেশি, ফলে বাংলাদেশের দিক থেকে বাণিজ্য ঘাটতি বড়। ভারতের পক্ষ থেকে বারবার প্রতিরক্ষামূলক বাণিজ্য ব্যবস্থা নেওয়া হলে দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্কে ভারসাম্যহীনতার ধারণা আরও জোরালো হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশি আমদানিকারকেরাও ভারতীয় কাঁচামাল ও উপকরণের বিকল্প খুঁজতে পারেন, যা শেষ পর্যন্ত ভারতীয় রপ্তানিকারকদের জন্যও ক্ষতির কারণ হতে পারে।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নিয়মের অধীনে বাণিজ্য প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার বৈধ সুযোগ রয়েছে। কিন্তু ছোট একটি বাণিজ্য অংশীদারের বিরুদ্ধে এই ধরনের ব্যবস্থা বারবার নেওয়া হলে জ্বালানি, যোগাযোগ ও ট্রানজিটের মতো আরও বিস্তৃত সহযোগিতার জন্য প্রয়োজনীয় পারস্পরিক আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বাংলাদেশ যে সংস্কারগুলো নিতে পারে
বাংলাদেশের নিজস্ব বাণিজ্য প্রতিকার ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা দরকার। বর্তমান তদন্তে বাংলাদেশের মাত্র একটি প্রতিষ্ঠান, আকিজ বাইঅ্যাক্স ফিল্মস, ভারতের তদন্ত প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করেছে। সেই প্রতিষ্ঠান প্রতি টনে ৫৮ ডলারের শুল্কহারের মুখে পড়েছে, যেখানে সহযোগিতা না করা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য হার নির্ধারণ করা হয়েছে ২১৮ ডলার। বার্তাটি পরিষ্কার: তদন্তে সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়ার সুফল আছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ বাণিজ্য ও শুল্ক কমিশনের যৌথভাবে একটি দ্রুত প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা গড়ে তোলা দরকার। রপ্তানিকারকদের প্রশ্নপত্রের উত্তর দেওয়া, ব্যয় হিসাব রাখা এবং আইনি প্রতিরক্ষা প্রস্তুতের বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে যৌথভাবে প্রতিনিধিত্ব করার ব্যবস্থাও করা যেতে পারে।
পণ্যের উৎপাদন ব্যয় ও মূল্য নির্ধারণের তথ্য আরও স্বচ্ছ করা প্রয়োজন। ভারতের তদন্তকারী কর্তৃপক্ষ সহযোগিতাকারী প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ বাজারে উৎপাদন ব্যয়ের নিচে পণ্য বিক্রির তথ্য পেয়েছে এবং রপ্তানি প্রণোদনার বিষয়টি সমন্বয়ের জন্য গ্রহণ করেনি। বাংলাদেশেরও নিজস্ব প্রণোদনা ব্যবস্থাগুলো পর্যালোচনা করা দরকার। নগদ প্রণোদনা ও শুল্ক ফেরত ব্যবস্থাকে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ভর্তুকি সংক্রান্ত নিয়মের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। একই সঙ্গে রপ্তানিকারকদের এমন হিসাব সংরক্ষণে উৎসাহিত করতে হবে, যা প্রয়োজনে নিরীক্ষার জন্য সহজে যাচাই করা যায়।
রপ্তানিকারকদের পণ্যের মূল্যশৃঙ্খলে আরও ওপরে উঠতে হবে। যেসব প্রতিষ্ঠান মূলত কম দামের ওপর প্রতিযোগিতা করে, তাদের বিরুদ্ধে অন্যায্য কম দামে পণ্য বিক্রির অভিযোগ ওঠার ঝুঁকি বেশি। মান সনদ, পণ্যের বৈচিত্র্য, পণ্যের নিজস্ব পরিচিতি তৈরি এবং গবেষণায় সহায়তা বাড়ালে সেই ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
বাজার ও কাঁচামালের উৎসও বহুমুখী করা দরকার। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাজারে পিইটি ফিল্ম ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানি বাড়ানো গেলে একটি মাত্র বাজারের ওপর নির্ভরতা কমবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশকে নিজের বাণিজ্য প্রতিকারমূলক ব্যবস্থাগুলোও পর্যালোচনা করতে হবে, যাতে আন্তর্জাতিক আলোচনায় দেশের অবস্থান ধারাবাহিক ও বিশ্বাসযোগ্য থাকে।
ভারতের সঙ্গে যে আলোচনাগুলো শুরু করা যেতে পারে
বাংলাদেশ দুই দেশের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে বাণিজ্য প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নিয়ে একটি নিয়মিত দ্বিপক্ষীয় সংলাপের প্রস্তাব দিতে পারে। কোনো মামলা চূড়ান্ত হওয়ার পর আপত্তি জানানোর বদলে তদন্ত চলাকালেই তথ্য বিনিময় ও পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করা গেলে বিরোধ কমানোর সুযোগ বাড়বে।
বিদ্যমান যৌথ পরামর্শক কমিশনের কাঠামোকে কাজে লাগিয়ে অশুল্ক বাধা নিয়ে একটি যৌথ কর্মদল গঠন করা যেতে পারে। বন্দরসংক্রান্ত বিধিনিষেধ, পণ্য পরীক্ষার শর্ত এবং নতুন বাণিজ্য ব্যবস্থা নিয়ে প্রতিটি বিরোধ আলাদাভাবে সামলানোর বদলে দুই দেশের জন্য একটি নির্দিষ্ট আলোচনার জায়গা তৈরি হবে।
পাট ও প্যাকেজিং খাতসহ সংশ্লিষ্ট শিল্পের ব্যবসায়ী সংগঠন ও বাণিজ্য সংগঠনগুলোর মধ্যে সরাসরি আলোচনা আরও একটি পথ খুলে দিতে পারে। যৌথ বিনিয়োগ, সরবরাহ ব্যবস্থার সংযোগ এবং মূল্য নিয়ে সমঝোতার মতো উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব। দীর্ঘ বাণিজ্য বিরোধের বদলে ভারতীয় উৎপাদকদের জন্যও এমন সহযোগিতা আকর্ষণীয় হতে পারে। বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলো যদি ভারতের শিল্পের জন্য কাঁচামাল বা আধা প্রস্তুত পণ্য সরবরাহের মূল্যশৃঙ্খলে যুক্ত হতে পারে, তাহলে সরাসরি প্রতিযোগিতার বদলে দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারে।
দুই দেশের মধ্যে একটি বিস্তৃত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তির আলোচনাও নতুন গতি পেতে পারে। সেখানে বাণিজ্য প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার আগে আগাম নোটিশ, পরামর্শ এবং ব্যবস্থার মাত্রা নির্ধারণের মতো বিষয় যুক্ত করা যেতে পারে। পাশাপাশি বঙ্গোপসাগরীয় বহুখাতভিত্তিক কারিগরি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা উদ্যোগ, দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মতো বহুপক্ষীয় মঞ্চেও বাংলাদেশ আলোচনা চালিয়ে যেতে পারে। তবে দ্বিপক্ষীয় আলোচনাই এই ক্ষেত্রে প্রধান হাতিয়ার হিসেবে কাজ করতে পারে।
উপসংহার
পিইটি ফিল্মের রপ্তানির পরিমাণ হয়তো খুব বড় নয়, কিন্তু এর তাৎপর্য কম নয়। পাটজাত পণ্যের ওপর নেওয়া ব্যবস্থার সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে বোঝা যায়, ভারতের বাজারে বাংলাদেশের উপস্থিতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আইনি ও বাণিজ্যিক প্রতিরোধও সামনে আসতে পারে।
প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলে এমন একটি বাণিজ্যিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকবে, যেখানে বাংলাদেশের ক্ষতির সম্ভাবনাই বেশি। বরং দেশের ভেতরের সংস্কার, তদন্ত প্রক্রিয়ায় রপ্তানিকারকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং কাঠামোবদ্ধ দ্বিপক্ষীয় আলোচনার সমন্বিত পথ প্রয়োজন। বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের প্রস্তুত করা এবং প্রতিযোগিতার বদলে সহযোগিতার জায়গা তৈরি করতে পারলে নতুন শিল্পগুলোকে সুরক্ষা দেওয়া এবং ভারত ও বাংলাদেশের বাণিজ্য সম্পর্ককে স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হতে পারে।
