ড. নাঈমা পারভীন
কভেন্ট্রি ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাজ্য
রমজানের বাজার ও অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশে রমজান শুধু আধ্যাত্মিক সাধনার মাস নয়, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেরও অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সময়। এ মাসে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের চাহিদা দ্রুত বেড়ে যায়। ফলে সরবরাহব্যবস্থা, বাজার ব্যবস্থাপনা এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সক্ষমতা বড় পরীক্ষার মুখে পড়ে। ২০২৭ সালের রমজান ফেব্রুয়ারির শুরুতে শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ অবস্থায় নীতিনির্ধারকদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, পবিত্র মাস যেন লাখো পরিবারের আর্থিক দুর্ভোগের প্রতিশব্দ হয়ে না ওঠে, তা নিশ্চিত করা।
রমজানে দাম বাড়বে কি না, এখন আর প্রশ্ন শুধু তা নয়। বরং প্রশ্ন হলো, অস্বাভাবিক মূল্য ওঠানামা কীভাবে ঠেকানো যায় এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে নিত্যপণ্যের দাম কীভাবে রাখা যায়। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সাময়িক বাজার নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে প্রস্তুতি, স্বচ্ছতা ও সংকট মোকাবিলার সক্ষমতাকে গুরুত্ব দিয়ে সমন্বিত কৌশল গ্রহণ করতে হবে।
মূল্যস্ফীতির দীর্ঘস্থায়ী চাপ পরিবারে
সাম্প্রতিক সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও তার প্রভাব সমাজের বিভিন্ন স্তরে রয়ে গেছে। দীর্ঘদিন ধরে পণ্যমূল্য বেশি থাকায় মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে, বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলোর। ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে সামান্য বৃদ্ধি হলেও রমজানে তা অনেক পরিবারের জন্য বড় আর্থিক সংকট তৈরি করতে পারে।
খাদ্যপণ্যের বাজারে এই চাপ বিশেষভাবে স্পষ্ট। ভোজ্যতেল, চিনি, মসুর ডাল, ছোলা, খেজুর ও গমজাত পণ্যের মতো রমজানে বহুল ব্যবহৃত খাদ্যপণ্যের বড় অংশ আমদানিনির্ভর। পাশাপাশি পরিবহন, বাসস্থান, বিদ্যুৎ-গ্যাস-পানি, চিকিৎসা ও জ্বালানির খরচও বাড়ছে। খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের সম্মিলিত মূল্যবৃদ্ধিতে পরিবারের বাজেটের ওপর দীর্ঘস্থায়ী চাপ তৈরি হয়েছে। ফলে মৌসুমি মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা সামলানো অনেক পরিবারের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে।
বৈশ্বিক ঝুঁকি ও দেশীয় বাজারের সংকট
আমদানিনির্ভরতার কারণে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব বাংলাদেশের বাজারে দ্রুত পড়ে। ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, জ্বালানির দামের ওঠানামা, পণ্য পরিবহনে বাধা এবং বিনিময় হারের চাপ আমদানি ব্যয় বাড়াতে পারে। শেষ পর্যন্ত তার প্রভাব পড়ে দেশের ভোক্তামূল্যে।
তবে বৈশ্বিক সংকটই একমাত্র কারণ নয়। দেশীয় বাজারের কাঠামোও অনেক সময় মূল্যবৃদ্ধির চাপ বাড়িয়ে দেয়। নিত্যপ্রয়োজনীয় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের বাজারে সীমিতসংখ্যক আমদানিকারক ও পাইকারি ব্যবসায়ীর হাতে সরবরাহের বড় অংশ নিয়ন্ত্রিত হয়। অন্যদিকে, মজুত, আমদানির পরিমাণ ও বাজার পরিস্থিতি সম্পর্কে পর্যাপ্ত স্বচ্ছ তথ্য পাওয়া যায় না। এমন পরিস্থিতিতে অনিশ্চয়তার সুযোগ নিয়ে কেউ কেউ জল্পনানির্ভরভাবে দাম বাড়াতে পারে কিংবা অতিরিক্ত মুনাফা করতে পারে। ফলে প্রকৃত ব্যয় যতটা বাড়ে, বাজারদর অনেক সময় তার চেয়ে দ্রুত বেড়ে যায়।
রমজানের আগেই আস্থা তৈরি করা
২০২৭ সালের রমজানে বাজার পরিস্থিতি কতটা স্থিতিশীল থাকবে, তা অনেকাংশে নির্ভর করবে মানুষের আস্থার ওপর। ভোক্তাদের নিশ্চিত হতে হবে যে প্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ বজায় থাকবে। ব্যবসায়ীদের আস্থা থাকতে হবে যে সরবরাহব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটবে না। একই সঙ্গে বাজারের অংশীজনদের বুঝতে হবে, কারসাজি শনাক্ত করা হবে এবং তা নিরুৎসাহিত করতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ লক্ষ্য অর্জনে রমজানের কয়েক মাস আগেই প্রস্তুতি শুরু করা প্রয়োজন। বাণিজ্য, খাদ্য, কৃষি, অর্থ, পরিবহন ও স্থানীয় সরকারবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে একটি রমজান প্রস্তুতি কাঠামো গড়ে তোলা যেতে পারে। এর মাধ্যমে সরবরাহ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, সম্ভাব্য ঘাটতি শনাক্ত এবং পরিবহন ও পণ্য সরবরাহের প্রতিবন্ধকতা আগেভাগে দূর করা সম্ভব হবে। ফলে সংকট দেখা দেওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে আগাম পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করা যাবে।
ভবিষ্যৎ চাহিদা নিরূপণের ব্যবস্থাকেও অগ্রাধিকার দিতে হবে। রমজানে বহুল ব্যবহৃত প্রধান পণ্যগুলোর চাহিদা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য পূর্বাভাস থাকলে ব্যবসায়ীরা আমদানির পরিকল্পনা আরও কার্যকরভাবে করতে পারবেন। এতে পণ্যের ঘাটতি ও আতঙ্কে অতিরিক্ত কেনাকাটার ঝুঁকি কমবে। চাহিদার সর্বোচ্চ সময়েও সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে সরকারি সংস্থা ও বেসরকারি আমদানিকারকদের মধ্যে নিবিড় সমন্বয় জরুরি।
নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক পণ্য আমদানিনির্ভর হওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রা ও বাণিজ্য অর্থায়নের সুযোগ নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। ঋণপত্র (এলসি) খুলতে বিলম্ব কিংবা বৈদেশিক মুদ্রার সংকটে আমদানি ব্যাহত হলে তার প্রভাব দ্রুত খুচরা বাজারে পড়ে। তাই প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির অর্থায়ন নির্বিঘ্ন রাখা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত।
স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতা জরুরি
বাজারে স্বচ্ছতা বাড়লে মূল্য পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। আমদানি, মজুত, পণ্যের প্রাপ্যতা ও বাজারদরের তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করে এমন একটি তাৎক্ষণিক ডিজিটাল পর্যবেক্ষণব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। ভোক্তা, ব্যবসায়ী ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা একই তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে পারলে গুজব ও বাজার কারসাজির সুযোগ কমে আসবে।
একই সঙ্গে প্রচলিত বাজার তদারকির পাশাপাশি তথ্যনির্ভর নজরদারি জোরদার করতে হবে। এর মাধ্যমে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, অতিরিক্ত মজুত এবং সরবরাহে বিঘ্নের প্রবণতা শনাক্ত করা সম্ভব হবে। প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করার নীতিও আরও কার্যকর করতে হবে। বাজারে প্রতিযোগিতাবিরোধী কর্মকাণ্ড ও মধ্যস্বত্বভোগীদের অতিরিক্ত মুনাফা পর্যবেক্ষণ করা হলে বাজারদর প্রকৃত ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখার সুযোগ বাড়বে। এতে সীমিতসংখ্যক ব্যবসায়ীর বাজার নিয়ন্ত্রণের প্রভাবও কমানো সম্ভব হবে।
ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোর সুরক্ষা
শুধু মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করলেই রমজানের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ভালো থাকবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে আকস্মিকভাবে ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার হাত থেকে অসচ্ছল ও ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোকে কতটা সুরক্ষা দেওয়া যাচ্ছে, তার ওপর।
রমজান শুরুর আগেই লক্ষ্যভিত্তিক খাদ্যসহায়তা কর্মসূচি জোরদার করা প্রয়োজন। দাম বেড়ে যাওয়ার পর সহায়তা দেওয়ার পরিবর্তে আগেভাগে প্রস্তুতি নিলে পরিবারগুলো বেশি উপকৃত হবে। ডিজিটাল উপকারভোগী তালিকা উন্নত করলে প্রকৃত প্রয়োজন রয়েছে এমন মানুষের কাছে সহায়তা পৌঁছানো সহজ হবে। ভর্তুকিমূল্যে খাদ্যপণ্য বিক্রি ও খোলাবাজারে বিক্রির কার্যক্রম নিম্ন আয়ের শহুরে জনগোষ্ঠী এবং মূল্যস্ফীতির ঝুঁকিতে থাকা অঞ্চলগুলোতে বেশি গুরুত্ব দিয়ে পরিচালনা করা উচিত।
সাময়িক সহায়তার পাশাপাশি পরিবারের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানোর দিকেও নজর দিতে হবে। কর্মসংস্থানে সহায়তা, মজুরি সুরক্ষা এবং আয় বাড়ানোর উদ্যোগ জোরদার করা জরুরি। নিয়মিত ও স্থিতিশীল আয় থাকলে পরিবারগুলো সাময়িক মূল্যবৃদ্ধির চাপ ভালোভাবে সামলাতে পারে এবং জরুরি সহায়তার ওপর নির্ভরশীলতাও কমে।
মৌসুমি পদক্ষেপ থেকে দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা
বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত, রমজানের বাজার ব্যবস্থাপনাকে প্রতি বছরের পুনরাবৃত্ত সংকট হিসেবে না দেখে পূর্বপরিকল্পিত ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় রূপ দেওয়া। এ জন্য গুদামজাতকরণ, শীতল সরবরাহব্যবস্থা, কৌশলগত খাদ্য মজুত এবং পণ্য সংরক্ষণের আরও কার্যকর ব্যবস্থায় বিনিয়োগ প্রয়োজন। আমদানির উৎসে বৈচিত্র্য আনতে পারলেও বৈশ্বিক সংকটের ঝুঁকি কমবে।
এই বৃহত্তর পরিকল্পনায় জ্বালানি নীতিকেও যুক্ত করতে হবে। জ্বালানি ও বিদ্যুতের ব্যয় উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন এবং খুচরা পর্যায়ে পণ্য বিতরণের খরচকে প্রভাবিত করে। তাই জ্বালানির দামে পূর্বানুমানযোগ্যতা এবং সরবরাহ ও পরিবহনে দক্ষতা বাড়ানো দীর্ঘমেয়াদে মূল্য স্থিতিশীল রাখতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে।
সব মিলিয়ে, ২০২৭ সালের রমজান বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা আরও শক্তিশালী করার একটি সুযোগ। সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বয় উন্নত করা, বাজারে স্বচ্ছতা বাড়ানো, প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা এবং ঝুঁকিতে থাকা ভোক্তাদের সুরক্ষা দেওয়ার মাধ্যমে দেশটি মৌসুমি সংকট মোকাবিলার সীমা ছাড়িয়ে আরও স্থিতিশীল অর্থনৈতিক কাঠামোর দিকে এগোতে পারে। এমন সংস্কার শুধু সাশ্রয়ী রমজান নিশ্চিত করতেই সহায়তা করবে না, বরং আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, প্রতিযোগিতামূলক ও অর্থনৈতিকভাবে নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়তেও ভূমিকা রাখবে।
