সায়মা নাজনীন
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়
সম্প্রতি দ্য অনিকেত বুলেটিনে প্রকাশিত ‘সার্ক কি পুনরুজ্জীবিত হতে পারে, আর হলে বাংলাদেশের নেতৃত্বে?’ শীর্ষক লেখাটি আঞ্চলিক অস্থিরতার সাম্প্রতিক ঢেউকে একটি অভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক শূন্যতার সঙ্গে যুক্ত করে দেখার চেষ্টা করেছে। বাংলাদেশে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান থেকে শুরু করে শ্রীলঙ্কার আরাগালায়া এবং নেপালের তরুণদের আন্দোলন, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোকে লেখাটি একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করেছে। এর মূল বক্তব্য যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। কার্যকর সার্ক থাকলে সমন্বিত সংকট মোকাবিলা, অভিন্ন শ্রমবাজার এবং আর্থিক সহায়তার মতো কিছু ব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারত, যা এককভাবে কোনো দেশের পক্ষে সামাল দেওয়া কঠিন।
লেখাটিতে বলা হয়েছে, সার্ক পুনরুজ্জীবনের নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ভালো অবস্থানে রয়েছে। প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে বাংলাদেশের ভূমিকা, বর্তমান সভাপতিত্ব এবং ভারত ও পাকিস্তানের সঙ্গে তুলনামূলক ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ককে এর পক্ষে যুক্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। তবে বিশ্লেষণটি মূলত রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি ও সার্ক সনদের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার ওপর নির্ভর করেছে। ফলে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক একীভবনের মূল যুক্তি এবং এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে আলোচনা অনেকটাই অনালোচিত থেকে গেছে।
লেখাটি যেখানে গুরুত্বপূর্ণ, আর যেখানে থেমে গেছে
সার্ক পুনরুজ্জীবনের পথে দুটি বড় কাঠামোগত বাধার কথা লেখাটি যথার্থভাবেই তুলে ধরেছে। একটি হলো ভারত ও পাকিস্তানের চলমান নিরাপত্তা বিরোধ, অন্যটি সার্ক সনদের সীমিত কার্যকর ক্ষমতা।
বিশ্বব্যাংকের একটি হিসাবও এখানে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। বর্তমানে সার্কভুক্ত দেশগুলোর পারস্পরিক বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১৯ বিলিয়ন ডলার, যেখানে সম্ভাব্য বাণিজ্যের পরিমাণ ৬২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। এই ব্যবধানের গুরুত্ব এত বেশি যে, আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতেই থাকার কথা ছিল। কিন্তু লেখাটিতে তা অনেকটা পার্শ্বপ্রসঙ্গ হয়ে এসেছে।
প্রশ্ন হলো, রাজনৈতিক অবিশ্বাস ছাড়াও এই বিশাল ব্যবধান কেন টিকে আছে? শুল্ক ও অশুল্ক বাধা, দুর্বল আন্তঃসীমান্ত অবকাঠামো, কাস্টমস ব্যবস্থার অসামঞ্জস্য এবং কার্যকর আঞ্চলিক অর্থ পরিশোধ ব্যবস্থার অনুপস্থিতি রাজনৈতিক উত্তেজনার প্রভাব আরও বাড়িয়ে দেয়। অথচ এসব বিষয় নিয়ে লেখাটিতে গভীর আলোচনা নেই।
একইভাবে, ৪৩ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি কমানো গেলে দক্ষিণ এশিয়ার দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধিতে কী ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে, সেই প্রশ্নও যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি। উৎপাদন খাতের প্রতিযোগিতা, বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহ কিংবা দক্ষিণ এশিয়ার বিশাল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ, সব ক্ষেত্রেই এর সম্ভাব্য প্রভাব রয়েছে।
এই গভীর অর্থনৈতিক হিসাব ছাড়া ৪৩ বিলিয়ন ডলারের ব্যবধান কেবল একটি পরিসংখ্যান হয়ে থাকে। অথচ সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করা গেলে এই ব্যবধানই আঞ্চলিক একীভবনের পক্ষে সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনৈতিক যুক্তিগুলোর একটি হতে পারে।
আলোচনার শুরুতেই যে অর্থনৈতিক যুক্তি সামনে আসা দরকার
এই ধরনের আঞ্চলিক একীভবন থেকে বাস্তব ও পরিমাপযোগ্য কিছু অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়া সম্ভব। শুল্ক কমলে বাণিজ্য বাড়তে পারে। ছোট অর্থনীতির দেশ যেমন নেপাল ও ভুটান, যারা ভারতের বাইরে বড় বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি, তারা বৃহত্তর আঞ্চলিক বাজার থেকে লাভবান হতে পারে। অভিন্ন কাস্টমস পদ্ধতি ও মানদণ্ড চালু হলে লেনদেনের ব্যয় কমবে। একই সঙ্গে শ্রমশক্তির চলাচল সহজ হলে তরুণদের বেকারত্বের চাপ কমাতে তা ভূমিকা রাখতে পারে। আর এই তরুণ বেকারত্বই দক্ষিণ এশিয়ার সাম্প্রতিক অস্থিরতার অন্যতম আলোচিত বিষয়।
দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রেও আঞ্চলিক একীভবনের একটি তাত্ত্বিক ভিত্তি রয়েছে। ছোট ও অপেক্ষাকৃত কম উন্নত অর্থনীতিগুলো বড় বাজার, পুঁজি এবং প্রযুক্তির প্রবাহের সঙ্গে যুক্ত হলে তুলনামূলকভাবে বেশি লাভবান হতে পারে। তবে তার জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, যাতে আঞ্চলিক চুক্তির প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবে কার্যকর করা যায়।
কিন্তু এখানেই খরচের প্রশ্ন আসে, যা আলোচনাটিতে যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি। আঞ্চলিক একীভবন কখনোই বিনা খরচে হয় না। শুল্ক সুরক্ষা কমে গেলে সুরক্ষিত দেশীয় শিল্পগুলোকে বাস্তব সমন্বয় ব্যয়ের মুখোমুখি হতে হয়। দক্ষিণ এশীয় মুক্ত বাণিজ্য এলাকা বা সাফটার সুফলও স্বয়ংক্রিয়ভাবে সব দেশের মধ্যে সমানভাবে বণ্টিত হবে এমন নিশ্চয়তা নেই। বড় অর্থনীতি হিসেবে ভারতের দিকে সুবিধা তুলনামূলকভাবে বেশি ঝুঁকে পড়তে পারে।
এই কারণেই ভুটান, মালদ্বীপ, নেপাল ও আফগানিস্তানের মতো ছোট দেশগুলোর আধিপত্যের আশঙ্কা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাদের উদ্বেগ হলো, আঞ্চলিক সহযোগিতা যেন প্রকৃত অংশীদারত্বের বদলে বড় অর্থনীতির প্রভাব বিস্তারের পথ না হয়ে ওঠে।
আঞ্চলিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাস্তব ক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সক্ষমতা দিতে গেলেও উল্লেখযোগ্য আর্থিক ব্যয় হবে। বর্তমান সার্ক সনদের সীমাবদ্ধতা নিয়ে লেখাটি যথার্থভাবেই বলেছে, কিন্তু সেই প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা তৈরিতে কতটা ব্যয় হতে পারে, তা হিসাবের মধ্যে আনা হয়নি।
সার্ক পুনরুজ্জীবন নিয়ে একটি কার্যকর আলোচনা তাই পুরো অর্থনৈতিক হিসাব সামনে রেখে শুরু হওয়া দরকার। সম্ভাব্য সুবিধার পাশাপাশি সমন্বয় ব্যয়, অসম লাভ এবং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যয়ও স্পষ্টভাবে বিবেচনায় নিতে হবে। শুধু রাজনৈতিক বিরোধকে একমাত্র নির্ধারক হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়বে না।
আরও যে বিষয়গুলো আলোচনায় আসা দরকার
এখানে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতি চোখে পড়ে। প্রথমত, জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগ মোকাবিলায় আঞ্চলিক সহযোগিতার বিষয়টি লেখাটিতে খুব কম এসেছে। অথচ বাণিজ্য বা নিরাপত্তার মতো ক্ষেত্রগুলোর তুলনায় জলবায়ু ও দুর্যোগ মোকাবিলায় সার্কের আটটি দেশের স্বার্থ অনেক বেশি অভিন্ন।
বন্যা ও ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় একটি সমন্বিত আঞ্চলিক কাঠামো তৈরি করা সনদে বড় ধরনের পরিবর্তন আনার চেয়ে অনেক কম রাজনৈতিক প্রতিরোধের মুখে পড়তে পারে। তাই এটিকেই সার্ক পুনরুজ্জীবনের একটি বাস্তবসম্মত সূচনাবিন্দু হিসেবে বিবেচনা করা যেত।
দ্বিতীয়ত, লেখাটি বাংলাদেশের নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতাকে অনেকটা স্বতঃসিদ্ধ ধরে নিয়েছে। অথচ অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার পর একটি সরকার যখন নিজ দেশের রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি সুসংহত করার প্রক্রিয়ায় থাকে, তখন আঞ্চলিক পুনরুজ্জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক প্রভাব ও ধারাবাহিকতা ধরে রাখা একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হতে পারে।
চীনের ভূরাজনৈতিক ভূমিকা
সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনালোচিত বিষয়টি ভূরাজনৈতিক। সার্কের স্থবিরতাকে শুধু দক্ষিণ এশিয়ার অভ্যন্তরীণ সমস্যা হিসেবে দেখলে একটি বড় বাস্তবতা বাদ পড়ে যায়। প্রতিবছর সার্কের অচলাবস্থা যত দীর্ঘ হয়, সদস্য দেশগুলো তত বেশি চীনের সঙ্গে পৃথকভাবে অবকাঠামো ও অর্থায়ন চুক্তির দিকে ঝুঁকতে পারে। এর ফলে আঞ্চলিকভাবে সম্মিলিত দরকষাকষির পরিবর্তে দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার প্রবণতা বাড়ে।
সার্ক পুনরুজ্জীবনের আরেকটি উদ্যোগও যদি ব্যর্থ হয়, তাহলে এই প্রবণতা আরও তীব্র হতে পারে। শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানে চীনের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে। বাংলাদেশ ও নেপালেও বিভিন্ন অবকাঠামো ও অর্থায়ন প্রকল্পের মাধ্যমে চীনের সম্পৃক্ততা বাড়ছে। এসব সম্পর্কের বড় অংশই বহুপক্ষীয় আঞ্চলিক কাঠামোর পরিবর্তে পৃথক দ্বিপক্ষীয় প্রকল্পের ভিত্তিতে গড়ে উঠছে।
দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। একটি মাত্র বহিরাগত অর্থদাতার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা অনেক ক্ষেত্রে এমন শর্ত তৈরি করতে পারে, যা সম্মিলিতভাবে দরকষাকষি করা একটি আঞ্চলিক জোটের পক্ষে আরও ভালোভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব হতো।
বিভক্ত দক্ষিণ এশিয়া যখন বাণিজ্য, অবকাঠামো কিংবা অর্থায়নের মতো বিষয়ে অভিন্ন অবস্থান নিতে পারে না, তখন বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রভাবের সামনে তার দরকষাকষির সক্ষমতাও দুর্বল হতে পারে। অথচ আঞ্চলিক একীভবনের অন্যতম উদ্দেশ্যই হলো এই সম্মিলিত অর্থনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করা।
তাই ভারত ও পাকিস্তানের বিরোধের পাশাপাশি চীনের ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভূমিকার প্রশ্নটিও সার্ক পুনরুজ্জীবনের আলোচনায় সমান গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে। দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ আঞ্চলিক সহযোগিতা নিয়ে ভাবতে হলে শুধু কে নেতৃত্ব দেবে, সেই প্রশ্ন যথেষ্ট নয়। তার সঙ্গে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, সেই সহযোগিতা কী অর্থনৈতিক সুবিধা তৈরি করবে, কে কতটা লাভবান হবে, কী খরচ বহন করতে হবে এবং বৃহৎ শক্তিগুলোর সঙ্গে দরকষাকষিতে দক্ষিণ এশিয়া কতটা সম্মিলিত অবস্থান নিতে পারবে।
তথ্যসূত্র:
