নাঈমা অনামিকা
কমিশনিং সম্পাদক, অনিকেত বুলেটিন
বাংলাদেশে গত এক দশকে ডিজিটাল সেবার বিস্তার রাষ্ট্রীয় সেবা ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এনেছে। সরকারি তথ্য, আবেদন, নিবন্ধন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা, আর্থিক লেনদেনসহ নানা ধরনের সেবা এখন ক্রমেই অনলাইননির্ভর হয়ে উঠছে। নিঃসন্দেহে এটি বাংলাদেশের উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। কিন্তু এই অগ্রগতির পাশাপাশি একটি মৌলিক প্রশ্নও সামনে এসেছে, ডিজিটাল সেবা কি সত্যিই সবার জন্য সমানভাবে ব্যবহারযোগ্য?
প্রশ্নটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, প্রবীণ নাগরিক এবং প্রযুক্তি ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা আছে এমন মানুষের ক্ষেত্রে। কোনো সরকারি ওয়েবসাইট যদি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি স্ক্রিন রিডারের মাধ্যমে ব্যবহার করতে না পারেন, কোনো ভিডিওতে শ্রবণপ্রতিবন্ধী মানুষের জন্য ক্যাপশন না থাকে, কিংবা কোনো অনলাইন ফরম সহায়ক প্রযুক্তির মাধ্যমে পূরণ করা সম্ভব না হয়, তাহলে সেটি প্রযুক্তিগতভাবে অনলাইন সেবা হলেও নাগরিক অধিকারের দৃষ্টিতে তা সবার জন্য সমানভাবে উন্মুক্ত নয়।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ডিজিটাল সেবা সবার জন্য সহজলভ্য করার বিষয়ে ইতোমধ্যে আইন, নীতিমালা ও নির্দেশিকা রয়েছে। তাই মূল প্রশ্ন এখন আর শুধু ‘নীতি আছে কি না’-তা নয়। বরং প্রশ্ন হলো, বিদ্যমান আইন ও নীতিগুলো কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে? এখানেই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। আলোচনার শুরুতেই আমরা যদি বাংলাদেশে বিদ্যমান আইন ও নির্দেশনাগুলোর প্রতি আলোকপাত করি, তাহলে প্রতিবেদনের অন্যান্য অংশগুলোর স্বচ্ছতা, প্রয়োজনীয়তা এবং গুরুত্ব প্রতীয়মান হবে সহজেই।
সাংবিধানিক ভিত্তি: সমতার অধিকার
ডিজিটাল অ্যাকসেসিবিলিটির বিষয়টি বুঝতে হলে প্রথমেই বাংলাদেশের সংবিধানের দিকে তাকানো প্রয়োজন। সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সব নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী। ২৮ অনুচ্ছেদে বৈষম্য না করার নীতি এবং ২৯ অনুচ্ছেদে সরকারি চাকরিতে সমান সুযোগের কথা বলা হয়েছে। ডিজিটাল যুগে এসব অধিকারের অর্থ কেবল শারীরিক পরিসরে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। রাষ্ট্র যখন ক্রমেই ডিজিটাল মাধ্যমে নাগরিক সেবা প্রদান করছে, তখন সেই সেবা ব্যবহারের সুযোগও সমতার নীতির আওতায় আসতে হবে। অর্থাৎ একজন নাগরিককে যদি সরকারি সেবা পেতে ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করতে হয়, তাহলে তার শারীরিক সক্ষমতা বা সীমাবদ্ধতার কারণে যেন তিনি সেই সেবা থেকে বঞ্চিত না হন, এটিও রাষ্ট্রের দায়িত্বের অংশ।
প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩
বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার রক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আইন হলো প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩। ২০১৩ সালের ৯ অক্টোবর আইনটি প্রণীত হয়। এর মাধ্যমে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার, মর্যাদা, সুরক্ষা এবং সমাজে সমান অংশগ্রহণের জন্য একটি সুস্পষ্ট আইনগত ভিত্তি তৈরি হয়েছে। এই আইনের গুরুত্ব হলো, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কেবল সহায়তা বা অনুদানের প্রাপক হিসেবে নয়, বরং অধিকারসম্পন্ন নাগরিক হিসেবে বিবেচনা করা।
পরবর্তীতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা বিধিমালা, ২০১৫ প্রণয়ন করা হয়। আইন বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা নির্ধারণে এই বিধিমালা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। ২০১৩ সালে আইনটি প্রণীত হওয়ার সময় বাংলাদেশের ডিজিটাল সেবা আজকের মতো সর্বব্যাপী ছিল না। ফলে বর্তমানে রাষ্ট্রীয় সেবা যখন দ্রুত ডিজিটাল মাধ্যমে স্থানান্তরিত হচ্ছে, তখন বিদ্যমান আইন ও বিধিমালাকে ডিজিটাল বাস্তবতার সঙ্গে আরও সুস্পষ্টভাবে সমন্বয় করা প্রয়োজন।
জাতিসংঘের সনদ ও বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার
বাংলাদেশ ২০০৭ সালে জাতিসংঘের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকারবিষয়ক সনদ (CRPD)-এ স্বাক্ষর এবং অনুমোদন করে। এই সনদের ৯ নম্বর অনুচ্ছেদে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন সেবা ও সুযোগে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ২১ নম্বর অনুচ্ছেদেও তথ্যপ্রাপ্তি ও মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ ডিজিটাল প্রযুক্তিতে সমান সুযোগ নিশ্চিত করা শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ নীতির বিষয় নয়, এটি বাংলাদেশের একটি আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারও।
জাতীয় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি নীতিমালা, ২০১৮
বাংলাদেশের ডিজিটাল রূপান্তরের ক্ষেত্রে জাতীয় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি নীতিমালা, ২০১৮ একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত দলিল। এই নীতিমালায় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির বিস্তার, ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি এবং প্রযুক্তিনির্ভর অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নীতিমালার বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণের জন্য বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার কথাও বলা হয়েছে।
কিন্তু এখানেই আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করা দরকার … নীতিমালায় লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, কিন্তু সেই লক্ষ্য বাস্তবে কতটা অর্জিত হয়েছে, তা পরিমাপ করার ব্যবস্থা কতটা কার্যকর? একটি নীতিমালার প্রকৃত সাফল্য তার পাতায় লেখা লক্ষ্য দিয়ে নয়, বরং মানুষের জীবনে তার বাস্তব প্রভাব দিয়ে বিচার করতে হয়।
২০২২ সালের অন্তর্ভুক্তিমূলক ডিজিটাল সেবা ও ওয়েব নকশা নির্দেশিকা
ডিজিটাল অ্যাকসেসিবিলিটির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হলো ২০২২ সালের অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবেশগম্যতার জন্য ডিজিটাল সেবা ও ওয়েব নকশা নির্দেশিকা। এই নির্দেশিকার উদ্দেশ্য হলো সরকারি ডিজিটাল সেবা ও ওয়েবসাইট এমনভাবে তৈরি করা, যাতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ সহজে সেগুলো ব্যবহার করতে পারেন। নির্দেশিকাটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ওয়েব কনটেন্ট প্রবেশগম্যতা নির্দেশিকা ২.১ মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তৈরি করা হয়েছে। ২০২৩ সালে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ থেকে এই নির্দেশিকা অনুসরণের বিষয়ে সরকারি নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশের হাতে এখন শুধু সাধারণ নীতিমালা নয়, ডিজিটাল সেবা কীভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলকভাবে তৈরি করতে হবে, তার একটি নির্দিষ্ট কারিগরি নির্দেশিকাও রয়েছে।
কিন্তু এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি সামনে আসে … নির্দেশিকা থাকা আর নির্দেশিকা কার্যকরভাবে অনুসরণ করা কি একই বিষয়? বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে-না, একেবারেই নয়! প্রকৃতভাবে মূল সংকট হল নীতি থেকে বাস্তবায়নের দূরত্ব। বাংলাদেশের ডিজিটাল অ্যাকসেসিবিলিটির সবচেয়ে বড় সমস্যা সম্ভবত আইন বা নীতির সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি নয়। বরং সমস্যা হলো, নীতি থেকে বাস্তবায়নে যাওয়ার পথে দীর্ঘ দূরত্ব।
কোনো সরকারি ওয়েবসাইট তৈরি করার সময় এর তথ্যের নির্ভুলতা, নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও ব্যবহারকারীর সংখ্যা বিবেচনা করা হয়। কিন্তু একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি সেটি স্ক্রিন রিডার দিয়ে ব্যবহার করতে পারবেন কি না, একজন শ্রবণপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি ভিডিওর বক্তব্য বুঝতে পারবেন কি না, কিংবা একজন প্রবীণ নাগরিক সহজে নেভিগেশন করতে পারবেন কি না, এসব বিষয় অনেক ক্ষেত্রেই সমান গুরুত্ব পায় না। ফলে প্রযুক্তি তৈরি হচ্ছে, সেবা অনলাইনে যাচ্ছে, কিন্তু সেই সেবা ব্যবহারের অধিকার সবার জন্য সমানভাবে নিশ্চিত হচ্ছে না।
