রুকসানা আখতার
স্বতন্ত্র স্থপতি
একসময় বাণিজ্য ও জনবসতির কেন্দ্র হিসেবে ঢাকার পরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে ছিল শহরের নদীগুলো। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বুড়িগঙ্গা ও তুরাগের অনেক অংশ পরিণত হয়েছে প্রায় খোলা নর্দমায়। নগরীর ৮০ শতাংশের বেশি বর্জ্যপানি কোনো ধরনের পরিশোধন ছাড়াই এসব নদীতে গিয়ে পড়ছে। অন্যদিকে, শহরের অর্ধেকের বেশি খাল হয় পুরোপুরি হারিয়ে গেছে, নয়তো এতটাই বর্জ্য ও আবর্জনায় ভরাট হয়ে গেছে যে সেগুলো আর স্বাভাবিকভাবে পানি প্রবাহিত করতে পারছে না।
নদীগুলোর ওপর একসঙ্গে বিভিন্ন দিক থেকে চাপ তৈরি হয়েছে। শিল্পবর্জ্য, প্লাস্টিকের আবর্জনা ও অপরিশোধিত পয়োনিষ্কাশন একত্রে বুড়িগঙ্গার পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা বছরের বেশির ভাগ সময় বিপজ্জনকভাবে কমিয়ে দিচ্ছে। ফলে নদীর বিস্তীর্ণ অংশে জলজ প্রাণীদের টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি বছরের পর বছর ধরে চলা দখল, অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ ও নদীতে বর্জ্য ফেলার কারণে নদীর তলদেশ ও প্রবাহপথ সংকুচিত হয়েছে। একসময় বড় নৌযান চলাচলের জন্য যে নদীপথে পর্যাপ্ত জায়গা ছিল, সেখানে এখন পানির স্বাভাবিক প্রবাহও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
বালু উত্তোলন ও ড্রেজিংয়ের বাড়তি চাপ
রাসায়নিক ও জৈব দূষণের পাশাপাশি অনিয়ন্ত্রিত বালু উত্তোলনও এসব নদীর স্বাভাবিক কাঠামো বদলে দেওয়ার একটি নীরব কিন্তু ভয়াবহ কারণ হয়ে উঠেছে। পরিবেশগত ছাড়পত্র ও যথাযথ তদারকি ছাড়াই পরিচালিত বালু উত্তোলন নদীর তলদেশকে অস্থিতিশীল করে, তীরভাঙন বাড়ায় এবং স্বাভাবিক পানিপ্রবাহের ধরন বদলে দেয়। ফলে নদীর স্রোতে দূষিত পদার্থ বেরিয়ে যাওয়ার বদলে অনেক সময় সেগুলো নদীতেই আটকে থাকে।
নৌচলাচল স্বাভাবিক করা বা পানিপ্রবাহ বাড়ানোর উদ্দেশ্যে পরিচালিত ড্রেজিংয়ের সময়ও নদীর তলদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ পলিথিন ও কঠিন বর্জ্য উঠে আসে। এতে বোঝা যায়, বছরের পর বছর ধরে দূষণ কতটা গভীরে নদীর তলদেশে জমা হয়েছে।
বাণিজ্যিক স্বার্থে পরিচালিত বালু উত্তোলনের সঙ্গে পরিবেশগত তদারকির সংঘাতও নতুন নয়। অতীতে ড্রেজিং ও অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধের উদ্যোগ নেওয়ার সময় সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সরাসরি হুমকি ও ভয়ভীতির মুখে পড়তে হয়েছে সংশ্লিষ্টদের। ফলে নদী পুনরুদ্ধারের প্রয়োজনীয় প্রকৌশল কাজ আর পরিবেশ ধ্বংসকারী বাণিজ্যিক বালু উত্তোলনের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য করা কর্তৃপক্ষের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
মৎস্যসম্পদে প্রভাব
নদীর মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর ওপর এর প্রভাব ভয়াবহ। অনেক এলাকায় পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে বুড়িগঙ্গার কিছু অংশকে মাছের জন্য কার্যত মৃত নদী হিসেবে বর্ণনা করেছে স্থানীয় পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো। পলি, জমে থাকা প্লাস্টিক এবং পানিতে অক্সিজেনের মাত্রাতিরিক্ত ঘাটতির কারণে জলজ প্রাণীর টিকে থাকার মতো পরিবেশ সেখানে আর নেই। প্রজননের সুযোগও ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে।
বালু উত্তোলন এই ক্ষতি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। নদীর তীরবর্তী এলাকায় মাছের প্রজননক্ষেত্র নষ্ট হচ্ছে। পাশাপাশি নদীর পলির স্বাভাবিক বিন্যাসও বদলে যাচ্ছে, যার ওপর দেশীয় অনেক মাছের প্রজননচক্র নির্ভরশীল।
একসময় নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করত যেসব পরিবার, তাদের অনেকেই এখন বিকল্প পেশায় যেতে বাধ্য হয়েছেন। কেউ কেউ রাস্তায় পণ্য বিক্রি করছেন। ফলে নদীর পরিবেশগত ক্ষতির পাশাপাশি তীরবর্তী মানুষের ওপর বড় ধরনের অর্থনৈতিক চাপও তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে যাদের অন্য পেশায় যাওয়ার মতো দক্ষতা বা সুযোগ সীমিত, তাদের জন্য এই পরিবর্তন আরও কঠিন।
নদীপথে পরিবহনে প্রভাব
বৃহত্তর ঢাকায় মানুষ ও পণ্য পরিবহনের অন্যতম কার্যকর ও সাশ্রয়ী মাধ্যম ছিল নদীপথ। কিন্তু পলি জমা এবং অনিয়ন্ত্রিতভাবে বালু ফেলার কারণে নদীর নাব্যতা কমে যাচ্ছে। ফলে নৌযানকে বিকল্প পথে যেতে হচ্ছে, যাত্রায় বিলম্ব হচ্ছে কিংবা পণ্য পরিবহনের পরিমাণ কমিয়ে দিতে হচ্ছে।
অন্যদিকে, অঞ্চলের নদীবাণিজ্যের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র সদরঘাট প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক যাত্রী ও নৌযান সামলালেও জ্বালানি নিঃসরণ এবং নৌযানের বর্জ্যের মাধ্যমে নদীদূষণের বোঝাও বাড়াচ্ছে। ফলে নদীপথে পরিবহন ও দূষণ এখন আর দুটি আলাদা সমস্যা নয়। বরং একে অন্যকে আরও জটিল করে তুলছে।
নদীপথের পর্যাপ্ত গভীরতা ফিরিয়ে আনতে নিয়মিত ড্রেজিং প্রয়োজন। কিন্তু বালু উত্তোলনের সঙ্গে যখন ড্রেজিংয়ের কাজ দুর্বল নিয়ন্ত্রণের মধ্যে পরিচালিত হয়, তখন নদীর তীর রক্ষার বদলে সেই তীরই আরও অস্থিতিশীল হয়ে পড়তে পারে।
নদীতীরের বাস্তুতন্ত্রে প্রভাব
নদীতীরের বাস্তুতন্ত্রেই সম্ভবত সবচেয়ে দৃশ্যমান পরিবর্তন ঘটেছে। একসময় নদীর প্রাকৃতিক তীরজুড়ে ছিল নানা ধরনের গাছপালা ও জলজ উদ্ভিদ। এসব প্রাকৃতিক অঞ্চল বন্যার সময় পানির চাপ কমাত এবং নদীতীরকে একটি প্রাকৃতিক সুরক্ষা বলয় হিসেবে কাজ করত। কিন্তু অনেক এলাকায় সেই জায়গা দখল করে নিয়েছে অনানুষ্ঠানিক বসতি, বর্জ্য ফেলার স্থান কিংবা বাণিজ্যিকভাবে বালু সংরক্ষণের জায়গা।
প্রাকৃতিক সুরক্ষা বলয় হারিয়ে যাওয়ায় বর্ষাকালে নদীর প্রবল স্রোতে তীরভাঙনের ঝুঁকি বেড়েছে। একই সঙ্গে জলজ খাদ্যশৃঙ্খলের ভিত্তি তৈরি করা ছোট ছোট প্রাণী ও জীবের আবাসস্থলও ধ্বংস হয়েছে। নদীতীর থেকে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে কোথাও কোথাও কর্তৃপক্ষ অগ্রগতি করেছে। তবে দখলমুক্ত জমি সব সময় পরিবেশগতভাবে পুনরুদ্ধার করা হচ্ছে না। ফলে খালি ও অস্থিতিশীল তীর পড়ে থাকছে, যা পরবর্তী সময়ে আবার নদীতে ভেঙে পড়ছে।
অর্থবহ সংস্কারের পথে
নদীগুলোকে সবার যৌথ সম্পদ হিসেবে রক্ষা করতে হলে বিচ্ছিন্ন কোনো প্রকল্প বা এককালীন অর্থ বরাদ্দ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার। বালু উত্তোলনের জন্য কঠোর এবং স্বচ্ছভাবে প্রয়োগযোগ্য লাইসেন্স ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। বৈধ নৌপথ উন্নয়নমূলক ড্রেজিং এবং অনিয়ন্ত্রিত বাণিজ্যিক বালু উত্তোলনের মধ্যে স্পষ্ট সীমারেখা থাকতে হবে। পাশাপাশি স্বাধীনভাবে নিয়মিত তদারকির ব্যবস্থা দরকার, যাতে রাজনৈতিক বা আর্থিক চাপের কারণে পরিবেশগত সীমা অতিক্রম করার সুযোগ না থাকে।
শিল্পকারখানার বর্জ্য পরিশোধনাগারগুলোও পুরোপুরি কার্যকর করতে হবে এবং নিয়মিত নজরদারির আওতায় আনতে হবে। শুধু নদীর পানিপ্রবাহ ফিরিয়ে আনলেই চলবে না। যদি শিল্পবর্জ্যের রাসায়নিক দূষণ অব্যাহত থাকে, তাহলে নদীর সামগ্রিক পরিবেশ পুনরুদ্ধার সম্ভব হবে না। নদীতীরের অঞ্চলগুলোকে পরিবেশগত সুরক্ষা বলয় হিসেবে আইনি সুরক্ষা দিতে হবে। দখলমুক্ত জায়গাগুলো খালি ফেলে না রেখে সেখানে পরিকল্পিতভাবে গাছ লাগাতে হবে এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে। নইলে নতুন করে দখলদারির সুযোগ তৈরি হবে।
পুনরুদ্ধার কার্যক্রমের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত জেলে ও নদীতীরবর্তী জনগোষ্ঠীর জন্য কাঠামোবদ্ধ ক্ষতিপূরণ এবং পুনঃপ্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। এসব কর্মসূচির সঙ্গে সুস্পষ্ট সময়সীমা যুক্ত থাকা জরুরি। নদী ও পরিবেশ রক্ষার নামে যেন সেই নদীর ওপর নির্ভরশীল মানুষের জীবিকা দীর্ঘমেয়াদে অনিশ্চিত না হয়ে পড়ে, সেদিকেও নজর দিতে হবে।
ঢাকার নদীগুলোকে বাঁচাতে আরেক দফা ঘোষণা নয়, প্রয়োজন দীর্ঘস্থায়ী, কঠোরভাবে প্রয়োগযোগ্য এবং সমন্বিত উদ্যোগ। নদীগুলো যাতে আর ফিরে আসার পথ হারিয়ে না ফেলে, সেই লক্ষ্যেই এখন কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার সময়।
