রেজা মাহমুদ
কার্ডিফ মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাজ্য
দূষণের সর্বোত্তম মাত্রার তত্ত্ব
অর্থনীতির তত্ত্বে দূষণকে একটি নেতিবাচক বহিঃপ্রভাব হিসেবে দেখা হয়। কোনো প্রতিষ্ঠান পণ্য উৎপাদনের পাশাপাশি দূষণ সৃষ্টি করলেও সেই দূষণের পুরো সামাজিক ক্ষতির ব্যয় তাকে বহন করতে হয় না। প্রতিষ্ঠান মূলত নিজের উৎপাদন ব্যয় হিসাব করে, আর দূষণের অতিরিক্ত ক্ষতির একটি বড় অংশ বহন করে সমাজ।
সামাজিকভাবে দূষণের সর্বোত্তম মাত্রা শূন্য নয়। বরং এমন একটি পর্যায় রয়েছে, যেখানে অতিরিক্ত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে পাওয়া প্রান্তিক সামাজিক সুবিধা এবং সেই কর্মকাণ্ডের কারণে সৃষ্ট দূষণের প্রান্তিক সামাজিক ক্ষতি সমান হয়। এই পর্যায়ের পর দূষণ কমাতে যে অতিরিক্ত ব্যয় করতে হয়, তা থেকে প্রতিরোধ করা ক্ষতির চেয়ে ব্যয় বেশি হয়ে যায়। আর এই পর্যায়ের আগে দূষণ আরও কমালে যে ক্ষতি ঠেকানো যায়, তার মূল্য দূষণ কমানোর ব্যয়ের চেয়ে বেশি।
বাজারব্যবস্থাকে কোনো নিয়ন্ত্রণ ছাড়া ছেড়ে দিলে দূষণের এই সামাজিক ব্যয় বাজারদরে প্রতিফলিত হয় না। ফলে দূষণের মাত্রা সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য বা সর্বোত্তম মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি হয়ে যায়। বাংলাদেশে বর্তমান পরিস্থিতি তারই একটি স্পষ্ট উদাহরণ।
ঢাকা নিয়মিতভাবে বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরগুলোর তালিকায় উঠে আসে। ক্ষুদ্র কণার দূষণ বা পিএম ২.৫ এর মাত্রা অনেক সময় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিত মাত্রার কয়েক গুণে পৌঁছে যায়। এর পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে রয়েছে ইটভাটা, যানবাহনের ধোঁয়া, শিল্পকারখানার নিঃসরণ এবং নির্মাণকাজের ধুলা।
তাত্ত্বিকভাবে এর সমাধান সুস্পষ্ট। অর্থনীতিবিদ আর্থার পিগুর ধারণা অনুযায়ী, দূষণের কারণে সৃষ্ট প্রান্তিক সামাজিক ক্ষতির সমান হারে কর আরোপ করা হলে দূষণকারীদের সেই ক্ষতির ব্যয় নিজেদের সিদ্ধান্তের মধ্যে বিবেচনা করতে বাধ্য করা যায়। ফলে উৎপাদন ও দূষণের মাত্রা সামাজিকভাবে কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ের দিকে এগোয়।
আরেকটি পদ্ধতি হলো নির্গমন বাণিজ্য ব্যবস্থা। এখানে মোট কত পরিমাণ দূষণ করা যাবে, তার একটি সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য অনুমতিপত্র দেওয়া হয়। বাজারে এসব অনুমতিপত্র কেনাবেচার সুযোগ থাকে। যেসব প্রতিষ্ঠান কম খরচে দূষণ কমাতে পারে, তারা বেশি দূষণ কমাবে। অন্যদিকে যাদের জন্য দূষণ কমানোর ব্যয় বেশি, তারা অনুমতিপত্র কিনতে পারে। ফলে বাজারের মাধ্যমে তুলনামূলকভাবে কম ব্যয়ে মোট দূষণ কমানোর সুযোগ তৈরি হয়।
বাংলাদেশের বর্তমান নীতিপদ্ধতি
বাংলাদেশ সীমিত পরিসরে এই দুই ধরনের ব্যবস্থাই প্রয়োগের চেষ্টা করেছে। পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালার আওতায় শিল্পকারখানার তরল বর্জ্য বা নিঃসরণের জন্য বিভিন্ন ধরনের পরিবেশগত ফি রয়েছে। একই সঙ্গে পুরোনো প্রযুক্তির স্থির চিমনির ইটভাটার কার্যক্রম বন্ধে বিভিন্ন সময়ে নিষেধাজ্ঞা ও মৌসুমি বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। এসব ব্যবস্থাকে মোটামুটি পরিমাণভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ হিসেবে দেখা যায়।
তাত্ত্বিকভাবে এসব পদক্ষেপ কর এবং দূষণ অনুমতিপত্রভিত্তিক ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কিন্তু বাস্তবে কাঙ্ক্ষিত পরিবেশগত ফলাফল এবং বাস্তব দূষণের মাত্রার মধ্যে ব্যবধান এখনো অনেক বড়। মূল সমস্যা নীতির ধারণায় নয়, বরং বাস্তবায়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতায়।
বাস্তবায়নের ঘাটতি কোথায়
এখানে কয়েকটি বড় সমস্যা স্পষ্ট: প্রথমত, বর্তমানে আরোপিত কর ও জরিমানার হার দূষণের প্রকৃত প্রান্তিক সামাজিক ক্ষতির তুলনায় অনেক কম। ফলে দূষণকারীদের আচরণে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আসে না। অনেক প্রতিষ্ঠান জরিমানাকে ব্যবসা পরিচালনার সামান্য অতিরিক্ত ব্যয় হিসেবে বিবেচনা করে, দূষণের প্রকৃত মূল্য হিসেবে নয়।
দ্বিতীয়ত, পর্যবেক্ষণ সক্ষমতার ঘাটতি বড় সমস্যা তৈরি করছে। কার্যকর পিগুভিয়ান কর কিংবা একটি সঠিকভাবে পরিচালিত দূষণ অনুমতিপত্রের বাজারের জন্য নিয়মিত ও নির্ভরযোগ্যভাবে প্রকৃত নিঃসরণ পরিমাপ করা জরুরি। কিন্তু ইটভাটা ও ছোট কারখানার মতো ছড়িয়ে থাকা এবং অনেক ক্ষেত্রে অনানুষ্ঠানিক উৎস থেকে নির্গমন পর্যবেক্ষণের জন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর পর্যাপ্ত জনবল, যন্ত্রপাতি ও আইনগত ক্ষমতা নেই।
অনুমতিপত্র ও নির্ধারিত সীমা যথাযথভাবে মূল্যায়ন বা কেনাবেচার ব্যবস্থা না থাকলে সেগুলো কার্যকর বাজারভিত্তিক ব্যবস্থা না হয়ে নিছক প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞায় পরিণত হয়। দুর্বল প্রয়োগ এবং স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে অনেক অননুমোদিত ইটভাটাও নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে চালু থাকে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি বড় সমস্যা। পরিবহননীতি, শিল্পনীতি, নগর পরিকল্পনা ও জ্বালানি নীতিকে সমন্বয় করে একটি ধারাবাহিক জাতীয় কৌশল এখনো গড়ে ওঠেনি। ফলে একটি খাতে দূষণ কমানোর অগ্রগতি অন্য খাতে বাড়তে থাকা নিঃসরণ দিয়ে অনেক সময় পুষিয়ে যায়। পরিবেশগত স্থায়িত্বের জন্য এমন সমন্বিত ও আন্তঃখাতভিত্তিক কৌশলের অভাবই বাজারের বাস্তব ফলাফল এবং সামাজিকভাবে কাঙ্ক্ষিত দূষণমাত্রার মধ্যে ব্যবধান দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ।
কপ কাঠামোর আলোকে বাংলাদেশ
জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক কনফারেন্স অব দ্য পার্টিস বা কপ কাঠামোর আলোকে দেখলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক জলবায়ু প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে হালনাগাদ জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান বা এনডিসি জমা দিয়েছে। পাশাপাশি মুজিব ক্লাইমেট প্রসপারিটি প্ল্যান গ্রহণের মাধ্যমে জলবায়ু সংক্রান্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষার কথাও জানিয়েছে।
তবে এসব লক্ষ্যের বড় অংশই আন্তর্জাতিক অর্থায়ন ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের ওপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার বৃহত্তর নীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক থাকলেও বায়ুর মান উন্নয়নের জন্য স্বল্পমেয়াদি অভ্যন্তরীণ পদক্ষেপ এখনো প্রয়োজনের তুলনায় কম অর্থ ও সম্পদ পাচ্ছে।
যেসব দেশে কার্যকর কার্বন মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা কিংবা কঠোরভাবে প্রয়োগ করা নির্গমন বাণিজ্য ব্যবস্থা রয়েছে, তাদের তুলনায় বাংলাদেশ এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। আমাদের অবস্থান এখনো অনেকটা ঘোষণা ও প্রতিশ্রুতির পর্যায়ে, যেখানে বাধ্যতামূলক, নিয়মিত পর্যবেক্ষণযোগ্য এবং ধারাবাহিকভাবে প্রয়োগযোগ্য ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
উত্তরণের জন্য যা প্রয়োজন
দূষণের কাঙ্ক্ষিত মাত্রা এবং বাস্তব দূষণের ব্যবধান কমাতে একই অর্থনৈতিক তত্ত্বের ভিত্তিতে কয়েকটি বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে।
প্রথমত, দূষণ করের হার নতুন করে নির্ধারণ করতে হবে। মানুষের স্বাস্থ্য ও পরিবেশের ওপর দূষণের প্রকৃত ক্ষতির হালনাগাদ হিসাবের ভিত্তিতে কর নির্ধারণ করা প্রয়োজন। মূল্যস্ফীতির কারণে সময়ের সঙ্গে করের কার্যকারিতা যেন কমে না যায়, সে জন্য করের হার নিয়মিত সমন্বয়ের ব্যবস্থাও থাকা দরকার।
দ্বিতীয়ত, দূষণ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা আধুনিক করতে হবে। নিয়মিত নিঃসরণ পরিমাপের জন্য স্বয়ংক্রিয় সেন্সর এবং উপগ্রহভিত্তিক ক্ষুদ্র কণা পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা ব্যবহার করা যেতে পারে। কারণ কর বা অনুমতিপত্রভিত্তিক যে কোনো ব্যবস্থার কার্যকারিতা নির্ভর করে তার পেছনে থাকা পরিমাপ ও তথ্যের নির্ভরযোগ্যতার ওপর।
তৃতীয়ত, ইটভাটা ও বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রসহ বড় শিল্প উৎসগুলোর জন্য দূষণ অনুমতিপত্র ব্যবস্থা নতুনভাবে সাজানো দরকার। নির্দিষ্ট প্রশাসনিক সীমার পরিবর্তে মোট দূষণের একটি বাধ্যতামূলক সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করে অনুমতিপত্র কেনাবেচার কার্যকর ব্যবস্থা তৈরি করা যেতে পারে। এতে যেখানে সবচেয়ে কম খরচে দূষণ কমানো সম্ভব, সেখানেই বেশি মাত্রায় দূষণ কমানোর প্রণোদনা তৈরি হবে।
চতুর্থত, পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতায় বাস্তব বিনিয়োগ প্রয়োজন। একই সঙ্গে স্থানীয় রাজনৈতিক চাপের কারণে যেন কারখানা বন্ধ বা জরিমানা কার্যকর করার সিদ্ধান্ত বাধাগ্রস্ত না হয়, সে জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আইনগত ক্ষমতা আরও স্পষ্ট ও কার্যকর করতে হবে।
সবশেষে প্রয়োজন একটি সমন্বিত জাতীয় কৌশল। পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তির ইটভাটা, গণপরিবহন এবং শিল্পকারখানা স্থানান্তরের মতো ক্ষেত্রে বিনিয়োগের ধারাবাহিক পরিকল্পনা থাকতে হবে। ছোট প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে একসঙ্গে বড় অঙ্কের দূষণ নিয়ন্ত্রণ ব্যয় বহন করতে গিয়ে টিকে থাকার সংকটে না পড়ে, সে জন্য তাদের জন্য রূপান্তরকালীন অর্থায়নের ব্যবস্থাও প্রয়োজন।
উপসংহার
পিগুভিয়ান কর কিংবা দূষণ অনুমতিপত্রের মতো অর্থনৈতিক উপকরণ নতুন কোনো ধারণা নয়। এসব ব্যবস্থার তাত্ত্বিক ভিত্তি বহুদিন ধরেই প্রতিষ্ঠিত। বাংলাদেশের মূল ঘাটতি ধারণার ক্ষেত্রে নয়। সমস্যা হলো এসব নীতিকে বাস্তবে কার্যকর করার মতো প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, দূষণের প্রকৃত ক্ষতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মূল্য নির্ধারণ এবং বিভিন্ন খাতকে একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়ার মতো সুসংহত কৌশলের অভাব।
ফলে সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য দূষণমাত্রা এবং আমাদের শহরগুলোর বাস্তব দূষণের মধ্যে ব্যবধান দীর্ঘদিন ধরে রয়ে গেছে। এই ব্যবধান কমাতে নতুন কোনো তত্ত্বের চেয়ে বেশি প্রয়োজন বিদ্যমান নীতিগুলোকে বাস্তব, পরিমাপযোগ্য এবং ধারাবাহিকভাবে প্রয়োগ করার সক্ষমতা।
