তানজীনা ফেরদৌস
কমিশনিং সম্পাদক, অনিকেত বুলেটিন
গত সপ্তাহে আমরা বাংলাদেশের বহুল আলোচিত কয়েকটি মামলার কথা তুলে ধরেছিলাম, যেসব মামলায় বিচারিক প্রক্রিয়ায় অগ্রগতি এলেও রায় কার্যকর করা কিংবা আইনি প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এখনো অসম্পূর্ণ বা অনিষ্পন্ন রয়ে গেছে। এই সপ্তাহে সেই মামলাগুলোর বিচারিক অগ্রগতি ও নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতার সামগ্রিক চিত্র বিশ্লেষণ করছি।
ব্যক্তিগত মামলার গণ্ডি ছাড়িয়ে যে চিত্র উঠে আসে
গত সপ্তাহে আলোচিত মামলাগুলো একসঙ্গে বিবেচনা করলে বিলম্বের নানা ধরন স্পষ্ট হয়। সাগর-রুনি ও সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলায় প্রধান উদ্বেগ দীর্ঘ তদন্ত এবং চূড়ান্ত বিচারিক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে না পারা। অন্যদিকে, নারায়ণগঞ্জের সাত খুন ও নুসরাত হত্যা মামলায় গুরুত্বপূর্ণ বিচারিক সিদ্ধান্ত এসেছে, কিন্তু আইনি প্রক্রিয়ার পরবর্তী ধাপগুলো সম্পন্ন করতে বছরের পর বছর লেগেছে। আবরার ফাহাদ হত্যা মামলাও দণ্ড ঘোষণার পর আইনি প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছানোর মধ্যকার দীর্ঘ ব্যবধান তুলে ধরে।
এই পার্থক্যগুলো গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সব ধরনের বিলম্বের সমাধান এক নয়। বারবার তদন্ত প্রতিবেদন দিতে ব্যর্থ হওয়া কোনো তদন্ত সংস্থার সমস্যার সঙ্গে আপিল আদালতে মামলার বিপুল জটের সমস্যাকে এক করে দেখার সুযোগ নেই। সাক্ষীর অনুপস্থিতি, ফরেনসিক প্রতিবেদনের অপ্রাপ্যতা, পেপার বুক প্রস্তুত না হওয়া এবং আপিল নিষ্পত্তিতে বিলম্ব, প্রতিটি সমস্যার ধরন আলাদা।
তবু এসব সমস্যার পেছনে একটি সাধারণ প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা রয়েছে। মামলা এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব প্রায়ই বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে বিভক্ত থাকে, অথচ বিলম্বের সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হয় ভুক্তভোগীর পরিবারকে। তদন্তের দায়িত্ব এক সংস্থা থেকে অন্য সংস্থায় গেলে নতুন দলকে আগের নথিপত্র ও তদন্তের অগ্রগতি বুঝে নিতে হয়। এর মধ্যে আলামত নষ্ট হতে পারে, সাক্ষীদের খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে এবং তদন্তের অগ্রাধিকার বদলে যেতে পারে। দায়িত্ব হস্তান্তরের লিখিত বিবরণ, সুস্পষ্ট তদন্ত পরিকল্পনা ও ব্যক্তিগত জবাবদিহি না থাকলে সংস্থা বদলের ফলে তৎপরতার ছাপ তৈরি হলেও প্রকৃত অগ্রগতি নিশ্চিত হয় না।
অপেক্ষার মানবিক মূল্য
প্রতিটি বিচারাধীন মামলার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, যারা প্রিয়জনকে হারানোর শোক নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছে। স্বজনের মৃত্যুর উত্তর খুঁজতে খুঁজতে মা-বাবার বয়স বাড়ে। কোনো শিশু খুন হওয়া মা কিংবা বাবার সান্নিধ্য ছাড়াই বড় হয়। সময়ের সঙ্গে সাক্ষীদের স্মৃতি ফিকে হয়ে আসে। অন্যদিকে, আদালতে বারবার হাজিরা দিতে গিয়ে পরিবারগুলোকে আর্থিক চাপ ও সামাজিক ক্লান্তির মুখোমুখি হতে হয়। অনিশ্চয়তার মানসিক যন্ত্রণা একটি সম্পন্ন বিচারিক প্রক্রিয়ার বেদনার চেয়ে আলাদা। মামলা অমীমাংসিত থাকলে পরিবার নিশ্চিত হতে পারে না যে হাতে থাকা সব প্রমাণ যথাযথভাবে পরীক্ষা করা হয়েছে কি না, কিংবা প্রকৃত দায়ীদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে কি না।
দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া জনআস্থাও দুর্বল করে। কিছু মামলা যখন ব্যাপক মনোযোগ পায়, অথচ অন্যগুলো প্রায় আড়ালেই থেকে যায়, তখন মানুষের মনে ধারণা জন্মাতে পারে যে ন্যায়বিচার নির্ভর করে প্রচার, রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা ব্যক্তিগত যোগাযোগের ওপর। প্রতিটি মামলার ক্ষেত্রে এমন ধারণা সত্য না হলেও তা ক্ষতিকর। আইনের শাসনের দাবি হলো, জনপরিচিতি বা প্রভাবের পার্থক্য সত্ত্বেও একই ধরনের মামলায় ন্যায়সংগত ও ধারাবাহিক আচরণ নিশ্চিত করা।
বিচারে দীর্ঘসূত্রতা কখনো কখনো জনক্ষোভকে গণপিটুনির মতো সহিংসতার দিকেও ঠেলে দিতে পারে। মানুষ যখন বিশ্বাস করতে শুরু করে যে আইনি প্রতিষ্ঠানগুলো ন্যায়বিচার দিতে পারছে না, তখন কেউ কেউ নিজেরাই সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে শাস্তি দেওয়ার চেষ্টা করে। এমন কর্মকাণ্ড নতুন ক্ষতি সৃষ্টি করে এবং নির্দোষ বলে গণ্য হওয়ার অধিকার ও আদালতের কর্তৃত্বকে দুর্বল করে। ফলে বিচারিক বিলম্বের মূল্য শুধু আদালতকক্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর প্রভাব পড়ে জনআস্থা, সামাজিক স্থিতিশীলতা ও রাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতার ওপরও।
জবাবদিহি দিয়েই শুরু হোক সংস্কার
বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় এমন সংস্কার প্রয়োজন, যা অপরাধ সংঘটনের পর প্রাথমিক পদক্ষেপ থেকে শুরু করে তদন্ত, অভিযোগ গঠন ও পরিচালনা, বিচার, আপিল এবং আইনসম্মত দণ্ড কার্যকর করা পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াকে বিবেচনায় নেবে।
প্রথমত, তদন্তের জন্য বাস্তবসম্মত ও কার্যকর সময়সীমা নির্ধারণ করতে হবে। গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট তদন্ত পরিকল্পনা, নির্দিষ্ট সময় পরপর অগ্রগতি পর্যালোচনা এবং বারবার সময় বাড়ানোর ক্ষেত্রে লিখিত ব্যাখ্যা বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। অবহেলা বা এড়ানো সম্ভব এমন প্রশাসনিক ব্যর্থতার কারণে বিলম্ব হলে তদারককারী কর্তৃপক্ষকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। তবে সময়সীমা বাস্তবসম্মত হওয়া জরুরি। জটিল ফরেনসিক তদন্তে অতিরিক্ত সময় লাগতে পারে, কিন্তু সময় বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়মিত আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত না হয়ে প্রমাণ ও যুক্তির ভিত্তিতে নিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, তদন্তের দায়িত্ব হস্তান্তর ব্যতিক্রমী ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়া হওয়া উচিত। প্রতিবার দায়িত্ব বদলের ক্ষেত্রে তার কারণ উল্লেখ করতে হবে, আলামতের সংরক্ষণ ও হেফাজতের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে হবে এবং অসম্পন্ন তদন্তকাজের দায়িত্ব নির্দিষ্ট করে দিতে হবে। আগের সংস্থার সম্পন্ন করা কাজের হিসাব না দিয়েই নতুন সংস্থাকে তদন্তের পুরো প্রক্রিয়া আবার শুরু করার সুযোগ দেওয়া উচিত নয়।
তৃতীয়ত, ফরেনসিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে। ডিএনএ বিশ্লেষণ, ডিজিটাল ফরেনসিক পরীক্ষা, আলামত যথাযথভাবে সংরক্ষণ এবং সময়মতো পরীক্ষাগারের প্রতিবেদন নিশ্চিত করা গুরুতর অপরাধের তদন্তের অবিচ্ছেদ্য অংশ হওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি পরীক্ষাগারে পর্যাপ্ত জনবল, মান নিয়ন্ত্রণ এবং তদন্তকারী ও আদালতের কাছে ফলাফল পৌঁছানোর স্বচ্ছ পদ্ধতি নিশ্চিত করতে হবে।
চতুর্থত, অভিযোগ পরিচালনার ক্ষেত্রে পেশাদারত্ব ও জবাবদিহি বাড়াতে হবে। তদন্তকারী কর্মকর্তা ও সরকারি কৌঁসুলিদের শুরু থেকেই সমন্বয়ের ভিত্তিতে কাজ করা প্রয়োজন, যাতে প্রমাণ সংগ্রহ ও সংরক্ষণের পদ্ধতি আদালতের বিচারিক যাচাইয়ে টিকে থাকে। কৌঁসুলিদের পেশাগত স্বাধীনতা, নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং মামলার প্রস্তুতির জন্য সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব বণ্টন অপরিহার্য।
পঞ্চমত, আপিল আদালতে মামলার ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করতে হবে। নির্দিষ্ট বেঞ্চ গঠন, ডিজিটাল পেপার বুক, ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে মামলার অগ্রগতি অনুসরণ এবং বাস্তবসম্মত নিষ্পত্তির সময়সূচি মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য পাঠানো মামলা ও অন্যান্য গুরুতর ফৌজদারি আপিলের অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব কমাতে পারে। আদালত প্রশাসনের উচিত মামলার প্রতিটি ধাপে কত সময় লাগছে, তার সামগ্রিক পরিসংখ্যান প্রকাশ করা।
ষষ্ঠত, বিচারপ্রক্রিয়ার শুরুতেই আইনি প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। রাষ্ট্রের অর্থায়নে আইনজীবী নিয়োগ সময়মতো সম্পন্ন হলে অভিযুক্ত ব্যক্তির অধিকার সুরক্ষিত থাকবে। একই সঙ্গে দেরিতে আইনজীবী নিয়োগের কারণে সৃষ্ট প্রক্রিয়াগত বিলম্বও কমবে। ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবারের জন্য আইনি সহায়তা নিশ্চিত করাও জরুরি, যাতে তাঁরা বিচারপ্রক্রিয়া বুঝতে পারেন এবং প্রাপ্য সহায়তা গ্রহণ করতে পারেন।
সপ্তমত, সাক্ষী সুরক্ষা ও ভুক্তভোগীদের সহায়তাকে নিয়মিত ব্যবস্থার অংশ করতে হবে। পরিবারকে মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য দিতে হবে, সাক্ষীদের ভয়ভীতি ও চাপ থেকে সুরক্ষা দিতে হবে এবং কী ঘটছে তা জানার জন্য ভুক্তভোগীর স্বজনদের যেন শুধু সংবাদমাধ্যমের ওপর নির্ভর করতে না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
সবশেষে, বিচারব্যবস্থার কর্মদক্ষতা বোঝার মতো অর্থবহ সূচক প্রকাশ করা প্রয়োজন। তদন্ত শেষ করতে গড় সময়, বারবার শুনানি মুলতবির কারণ, বিচারাধীন মামলার সংখ্যা, আপিল নিষ্পত্তির সময় এবং আদালতের নির্ধারিত সময়সীমা পালনের চিত্র এসব সূচকের অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত। এমন তথ্য নীতিনির্ধারকদের প্রকৃত সম্পদসংকট ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার মধ্যে পার্থক্য করতে সহায়তা করবে।
ন্যায়সংগত বিচার ছাড়া দ্রুত নিষ্পত্তি ন্যায়বিচার নয়
দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার দাবি যেন যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া উপেক্ষা করার দাবিতে পরিণত না হয়। ভুল দণ্ডাদেশ গুরুতর অবিচার। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়ে গেলে সেই ভুল সংশোধনের আর কোনো সুযোগ থাকে না। আপিলের অধিকার, প্রমাণ যাচাই এবং অভিযুক্ত ব্যক্তির ন্যায়সংগত শুনানি নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা কোনো আমলাতান্ত্রিক বাধা নয়, বরং ন্যায়বিচারের অপরিহার্য সুরক্ষা।
তবে ন্যায়সংগত বিচার নিশ্চিত করার অর্থ অনির্দিষ্টকাল অপেক্ষা করানো নয়। তদন্তের মান বাড়িয়ে, অপ্রয়োজনীয় শুনানি মুলতবি কমিয়ে, নথিপত্র দ্রুত প্রস্তুত করে এবং এড়ানো সম্ভব এমন বিলম্বের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহির আওতায় এনে আইনি অধিকার সুরক্ষিত রেখেই বিচারপ্রক্রিয়া উন্নত করা সম্ভব। বিচারব্যবস্থার প্রকৃত পরীক্ষা কোনো একটি বহুল আলোচিত মামলায় কত দ্রুত রায় দেওয়া গেল, তা নয়। বরং প্রতিটি পরিবার যথাযথ তদন্ত, ন্যায়সংগত বিচার এবং যুক্তিসংগত সময়ের মধ্যে আইনসম্মত পরিণতি প্রত্যাশা করতে পারে কি না, সেটিই আসল প্রশ্ন।
রামিসা আক্তার, আবরার ফাহাদ, সোহাগী জাহান তনু, সাগর সরওয়ার, মেহেরুন রুনি, নুসরাত জাহান রাফি এবং নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের শিকার ব্যক্তিরা বাংলাদেশের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতার প্রতিনিধিত্ব করেন। তাঁদের সব মামলাকে একই ধরনের প্রক্রিয়াগত সমস্যায় সীমাবদ্ধ করা যায় না। প্রতিটি মামলার আইনি পরিণতি বর্ণনা করতে হবে প্রমাণ এবং সংশ্লিষ্ট মামলার বর্তমান পর্যায়ের ভিত্তিতে।
তবু এসব ঘটনা একটি অভিন্ন দায়িত্বের কথা মনে করিয়ে দেয়। ন্যায়বিচার শুধু আদালতে ঘোষিত একটি রায় কিংবা জনরোষের মুখে দেওয়া প্রতিশ্রুতির নাম নয়। কার্যকর তদন্ত, নিরপেক্ষ বিচার এবং অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব ছাড়াই বিশ্বাসযোগ্য নিষ্পত্তি নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই ন্যায়বিচারের পূর্ণতা আসে। কারণ, আদালত রায় ঘোষণা করলেই ন্যায়বিচার পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয় না। আইন যখন ন্যায্যতা, স্বচ্ছতা ও সময়ানুবর্তিতার সঙ্গে নিজের দায়িত্ব পালন করে, তখনই ন্যায়বিচার বাস্তব রূপ পায়। কোনো পরিবারকে যখন উত্তরের অপেক্ষায় অনির্দিষ্টকাল কাটাতে হয় না, তখনই সেই বিচার পূর্ণতা লাভ করে।
