মো. আবরার তাজওয়ার রিজন
প্রভাষক, ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
অনিকেত বুলেটিনে প্রকাশিত একটি সাম্প্রতিক নিবন্ধে বলা হয়েছিল, সুনীল অর্থনীতির সম্ভাবনা কেবল উপকূলীয় অঞ্চলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোর ক্ষেত্রে এই বক্তব্যের গুরুত্ব আরও বেশি। পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের মতো জেলায় আন্তর্জাতিক সীমান্ত ঘেঁষে বয়ে গেছে তিস্তা, ধরলা, আত্রাই ও পুনর্ভবাসহ অসংখ্য নদী। রয়েছে অসংখ্য পুকুর ও মৌসুমি প্লাবনভূমি।
এই অঞ্চলগুলোর রয়েছে পানি, জমি ও শ্রমশক্তি। কিন্তু নিরাপত্তা, বাজারে প্রবেশাধিকার এবং রাজধানীকেন্দ্রিক উন্নয়ন পরিকল্পনায় যথাযথ গুরুত্বের অভাব রয়েছে। এসব ঘাটতি কীভাবে পূরণ করা হচ্ছে, তার ওপরই নির্ভর করবে সুনীল অর্থনীতি এই অঞ্চলের মানুষের জীবনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে, নাকি তাদের পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যাবে।
পিছিয়ে থাকা এক জনপদ
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) উপাত্তে এ অঞ্চলের চ্যালেঞ্জের চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২০২২ সালের খানা আয় ও ব্যয় জরিপ অনুযায়ী, ২০১৬ সালে রংপুর বিভাগে দারিদ্র্যের হার ছিল ৪৭ শতাংশ। ২০২২ সালে তা কমে দাঁড়ায় ২৪ দশমিক ৮ শতাংশে। তবে এই হার তখনও জাতীয় দারিদ্র্যের হার ১৮ দশমিক ৭ শতাংশের চেয়ে বেশি। দারিদ্র্য কমলেও খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত হয়নি। বিবিএসের ২০২৩ সালের খাদ্যনিরাপত্তা পরিসংখ্যানে খাদ্য অনিরাপত্তার সূচকে রংপুর বিভাগকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বিবিএসের ২০২১ সালের নমুনাভিত্তিক জনমিতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, রংপুর বিভাগের ৪৪ শতাংশের বেশি পরিবার সম্পদের বিচারে সবচেয়ে দরিদ্র ২০ শতাংশ পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। দেশের অন্য যেকোনো বিভাগের তুলনায় এই হার বেশি। অন্যদিকে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মৎস্য খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল ১১ দশমিক ০৫ শতাংশ। সর্বশেষ সাময়িক হিসাবে এই প্রবৃদ্ধি ১৫ দশমিক ৭৯ শতাংশে পৌঁছেছে, যেখানে সামগ্রিক কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি কমেছে। শিল্পায়নের সীমিত সুযোগ এবং দীর্ঘস্থায়ী খাদ্য অনিরাপত্তার মধ্যে থাকা এই অঞ্চলের জন্য মৎস্য খাতের প্রবৃদ্ধিতে ন্যায্য অংশীদারত্ব দাবি করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
চোরাচালান ও বৈধ জীবিকার সন্ধান
সীমান্তবর্তী জেলাগুলোর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটি অংশ অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল। এর মধ্যে গবাদিপশুর ব্যবসা অন্যতম। লালমনিরহাট থেকে পাওয়া বিভিন্ন প্রতিবেদনে সীমান্তে গরু ব্যবসায়ীদের গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনাও উঠে এসেছে। বৈধ জীবিকার সুযোগ সীমিত থাকলে চোরাচালানের মতো ঝুঁকিপূর্ণ কর্মকাণ্ড বিস্তারের ক্ষেত্র তৈরি হয়।
সীমান্তের কাছাকাছি হ্যাচারি, মাছের খাদ্য উৎপাদনকেন্দ্র, বরফকল ও হিমাগার গড়ে তোলা হলে স্থানীয়ভাবে নিয়মিত কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে বিশেষ করে তরুণদের ঝুঁকিপূর্ণভাবে রাতের আঁধারে সীমান্ত পারাপারের পথ বেছে নেওয়ার প্রবণতা কমতে পারে। তবে এর উল্টো ফলও হতে পারে। বৈধ রপ্তানি ব্যবস্থা ও ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত না করে মৎস্য খাতের সম্প্রসারণ ঘটলে সেই বাণিজ্যের একটি অংশ অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির হাতেই চলে যেতে পারে। পণ্যের উৎস শনাক্তকরণ ব্যবস্থা এবং মান সনদ নিশ্চিত করা গেলে বৈধ বাণিজ্য ও অবৈধ পণ্য চলাচলের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য করা সহজ হবে।
সীমান্ত সংঘাত ও অভিন্ন নদীর সংকট
সীমান্তবর্তী জনপদে সহিংসতা মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের গুলিতে ৩৪ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। গত এক দশকে এই সংখ্যা অন্তত ২৯৬। এ ধরনের সহিংসতা বিনিয়োগের পরিবেশকেও অনিশ্চিত করে তোলে।
তবে এসব হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি সবার আগে মানবাধিকার ও কূটনৈতিক ব্যর্থতার প্রশ্ন। ঢাকা ও নয়াদিল্লির আলোচনায় বাংলাদেশকে এ বিষয়ে সরাসরি ও ধারাবাহিকভাবে প্রতিবাদ জানাতে হবে। মাছের খামার বা জলজ সম্পদভিত্তিক প্রকল্প দিয়ে সীমান্তে প্রাণহানির সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। জীবিকাভিত্তিক প্রকল্পকে সীমান্ত সহিংসতার প্রতিকার হিসেবে উপস্থাপন করলে রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের ভারও শেষ পর্যন্ত সীমান্তবাসীর ওপরই চাপানো হয়।
নদীর সংকটও এখানে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। উত্তরাঞ্চলের নদীগুলোর অনেকগুলোই আন্তঃসীমান্ত নদী। ফলে শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ অনেকাংশে নির্ভর করে উজানের সিদ্ধান্তের ওপর। তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে। নদীনির্ভর মৎস্য আহরণ ও শুষ্ক মৌসুমে পুকুরে মাছ চাষের জন্য পানির পূর্বানুমানযোগ্য প্রবাহ অপরিহার্য। সীমান্তসংলগ্ন নদীতে মাছ ধরার ক্ষেত্রেও সুস্পষ্ট নিয়ম থাকা প্রয়োজন, যাতে বৈধভাবে জীবিকা নির্বাহ করতে গিয়ে জেলেদের অনুপ্রবেশকারী হিসেবে বিবেচিত হতে না হয়।
বন্যা এ অঞ্চলের জন্য আরেক ধরনের ঝুঁকি তৈরি করে। কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটে বর্ষার একটি বড় বন্যাই পুকুরের পাড় উপচে মাছ ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারে, নষ্ট করতে পারে পুরো মৌসুমের উৎপাদন। ব্রহ্মপুত্র ও তিস্তার ভাঙনে কয়েক মৌসুমের মধ্যেই পুকুর কিংবা হ্যাচারি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই মাছ চাষের প্রকল্পের সঙ্গে উঁচু ও মজবুত পাড় নির্মাণ, জাল দিয়ে ঘের তৈরি, বন্যার ঝুঁকিভিত্তিক বিমা এবং নদীভাঙনের আশঙ্কা বিবেচনায় নিয়ে স্থাপনা নির্মাণের ব্যবস্থা রাখতে হবে।
দূরত্বের মাশুল ও বাজারে প্রবেশের বাধা
রংপুর বিভাগ ঢাকা থেকে যেমন দূরে, তেমনি চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের সঙ্গেও এর যোগাযোগ সহজ নয়। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে গিয়ে পচনশীল মাছের গুণগত মান ও বাজারমূল্য কমে যায়। এর মধ্যে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যে উৎপাদকদের প্রাপ্য আয় আরও সংকুচিত হয়।
এ কারণে উৎপাদনকেন্দ্রের কাছাকাছি হিমাগার ও মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে তোলা জরুরি। স্থানীয় পর্যায়ে প্রক্রিয়াজাতকরণের ব্যবস্থা থাকলে কর্মসংস্থান ও উৎপাদিত পণ্যের মূল্য সংযোজন সংশ্লিষ্ট জেলাতেই থেকে যাবে, সবকিছু রাজধানীমুখী হবে না। একই সঙ্গে ডিজিটাল বিপণনব্যবস্থার মাধ্যমে উৎপাদকদের সরাসরি ক্রেতাদের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে বাজারে প্রবেশের বাধা কমবে।
সরকারি জলমহাল ইজারা ব্যবস্থার সংস্কারও সমান গুরুত্বপূর্ণ। দূরবর্তী সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে প্রভাবশালী ইজারাদারদের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ এবং পর্যাপ্ত নজরদারির অভাব স্থানীয় ক্ষুদ্র মৎস্যজীবীদের জলসম্পদ ব্যবহারের সুযোগ সীমিত করে দিতে পারে। তাই ইজারা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
নীতিনির্ধারণে প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগ
অগ্রগতির প্রথম শর্ত হলো, যেখানে প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি, সেখানে বিনিয়োগের অগ্রাধিকার নিশ্চিত করা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, বিশ্বব্যাংক ও বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির যৌথ উদ্যোগে তৈরি দারিদ্র্য মানচিত্রের সাহায্যে কোন কোন উপজেলায় আগে হ্যাচারি, হিমাগার ও প্রশিক্ষণকেন্দ্র স্থাপন করা প্রয়োজন, তা নির্ধারণ করা সম্ভব। অনুমান কিংবা প্রশাসনিক সুবিধার ভিত্তিতে নয়, বরং নির্ভরযোগ্য উপাত্তের ভিত্তিতে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে প্রান্তিক সীমান্ত জনগোষ্ঠীর কাছে উন্নয়নের সুফল পৌঁছানোর সম্ভাবনা বাড়বে।
তবে এই বিনিয়োগের সুফল ধরে রাখতে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও স্থানীয় উন্নয়নকে একই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিজিবি) এবং স্থানীয় বেসামরিক প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো প্রয়োজন, যাতে সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় বৈধভাবে মাছ ধরা, পণ্য পরিবহন ও ব্যবসায় নিয়োজিত মানুষ হয়রানির শিকার না হন কিংবা ভুলবশত চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত বলে বিবেচিত না হন। পাশাপাশি অভিন্ন নদীর পানিপ্রবাহ, মাছের বিচরণ এবং প্লাবনভূমির পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় বাংলাদেশকে যৌথ নদী ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
সবশেষে, নিরাপত্তা ও অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি অর্থায়ন এবং দক্ষতা বৃদ্ধির সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। সীমান্তবর্তী জনগোষ্ঠীর জন্য সহজ শর্তে ঋণ, বন্যা ও নদীভাঙনের ক্ষতি মোকাবিলায় কার্যকর বিমা এবং প্রয়োজনভিত্তিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে নারী ও তরুণদের অংশগ্রহণ বিশেষ গুরুত্ব পাওয়া উচিত। বাড়ির কাছেই মাছ চাষের মাধ্যমে নির্ভরযোগ্য আয় নিশ্চিত করা গেলে ঝুঁকিপূর্ণ ও অবৈধ পথে জীবিকা খোঁজার প্রবণতা কমবে। এ পরিবর্তন জোরজবরদস্তির মাধ্যমে নয়, বরং বৈধ জীবিকার বাস্তব সুযোগ তৈরির মধ্য দিয়েই সম্ভব।
উপসংহার
উত্তরাঞ্চলের সীমান্ত জেলাগুলোতে সুনীল অর্থনীতির সম্ভাবনা আপনা-আপনি বাস্তবায়িত হবে না। নিরাপত্তা, সম্পদ ব্যবহারে ন্যায্য অধিকার এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নিশ্চিত করা না গেলে এর সুফল চলে যাবে অপেক্ষাকৃত সুবিধাপ্রাপ্ত ও যোগাযোগে এগিয়ে থাকা জেলাগুলোর হাতে। অন্যদিকে, বৈধ বাণিজ্যের সুযোগ সীমিত থাকলে অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিই মানুষের জীবিকার বিকল্প হয়ে থাকবে।
কিন্তু যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া গেলে সীমান্তঘেঁষা নদী ও পুকুরগুলো স্থানীয় মানুষের স্থায়ী আয়ের উৎস হয়ে উঠতে পারে। তৈরি হতে পারে নতুন কর্মসংস্থান, শক্তিশালী হতে পারে স্থানীয় অর্থনীতি এবং কমতে পারে ঝুঁকিপূর্ণ জীবিকার ওপর নির্ভরতা।
উত্তরাঞ্চলকে উন্নয়নের মূলধারা থেকে দূরে রেখে আর কত দিন পরিকল্পনা করা হবে? সুনীল অর্থনীতি হতে পারে সেই দৃষ্টিভঙ্গি বদলের একটি সুযোগ। সীমান্তের এই জনপদগুলোকে আর উন্নয়নের প্রান্তিক অঞ্চল হিসেবে নয়, বরং সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করার সময় এসেছে।
তথ্যসূত্র:
