ফারাহ জেহির
নির্বাহী সম্পাদক, অনিকেত বুলেটিন
গত ৩১ আগস্ট সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি), বাংলাদেশ আয়োজিত একটি সংলাপে “স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে ই-গভর্নেন্স: বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যতের পথ” শীর্ষক এক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। আলোচকদের বিশ্লেষণ এবং প্রস্তাবনা প্রমাণ করে যে বাংলাদেশ ডিজিটাল রূপান্তরের পথে ইতিমধ্যে একটি ইতিবাচক গতি অর্জন করেছে এবং স্থানীয় পর্যায়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য এই অগ্রগতিকে আরও গভীর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করার সময় এসেছে। সিপিডির এই সংলাপ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে এই প্রতিবেদনে আমি নিজস্ব পর্যবেক্ষণ থেকে আরও কিছু অতিরিক্ত ঘাটতির কথা বিশ্লেষণাত্মকভাবে তুলে ধরছি, যা সরকারের বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করি, যাতে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে ই-গভর্নেন্স সহজ ও কার্যকরভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
এই আলোচনার মূল কাঠামো টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট ১৬ (এসডিজি-১৬) এর আলোকে সাজানো হয়েছে, যার লক্ষ্য শান্তিপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠন, সবার জন্য ন্যায়বিচারের সুযোগ নিশ্চিত করা এবং প্রতিটি স্তরে কার্যকর, জবাবদিহিমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠান তৈরি করা। মানুষ যেন জাতি, ধর্ম বা যৌন পরিচয় নির্বিশেষে ভয়মুক্ত ও নিরাপদ জীবনযাপন করতে পারে, সেই মূলনীতি মাথায় রেখেই ২০৩০ সালকে লক্ষ্য ধরে স্থানীয় সরকার পর্যায়ে ডিজিটাল সেবার রূপরেখা প্রস্তুত করা প্রয়োজন। সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে ডিজিটাল মাধ্যম সাধারণ জনগণ, বিশেষত নারী, তরুণ সমাজ এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য সবচেয়ে বেশি সুফল বয়ে আনতে পারে।
অবকাঠামোগত বাস্তবতা: প্রযুক্তি ও দারিদ্র্যের সন্ধিক্ষণ
আমার মূল্যায়নে ই-গভর্নেন্সের সফলতা নির্ভর করে দুই ধরনের অবকাঠামোর ওপর, ভৌত অবকাঠামো এবং প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো। ভৌত অবকাঠামোর ক্ষেত্রে স্মার্টফোন, বিদ্যুৎ সংযোগ, ওয়াই ফাই ও কম্পিউটারের প্রাপ্যতা অপরিহার্য। তবে বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশ হওয়ায় এখানে বাস্তব একটি ঝুঁকি থেকে যায়। যাঁরা দৈনন্দিন জীবিকার জন্য প্রতিদিন সংগ্রাম করেন, তাঁদের জন্য এসব ডিজিটাল উপকরণ অনেক সময় জরুরি প্রয়োজনে বিক্রি বা বন্ধক রাখার মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। এটি কারও ব্যর্থতা নয়, বরং একটি কাঠামোগত বাস্তবতা যা নীতিনির্ধারকদের স্বীকার করে সমাধানের পথ খুঁজতে হবে, যেমন সহজ শর্তে ডিভাইস সহায়তা কর্মসূচি বা কমিউনিটি ডিজিটাল সেন্টার স্থাপনের মাধ্যমে, যাতে ব্যক্তিগত ডিভাইসের ওপর নির্ভরতা কমে।
এর পাশাপাশি তথ্য সুরক্ষার প্রশ্নটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান অবকাঠামো কতটা নিরাপদভাবে নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য সংরক্ষণ করতে সক্ষম, সে বিষয়ে স্পষ্ট নীতিমালা ও তদারকি ব্যবস্থা এখনো পরিপূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
আস্থার সংকট: মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা পুনর্বিবেচনা
আমরা প্রায়ই দেখি যে ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে সেবা নিতে গিয়ে অনেক নাগরিককে মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে অপ্রয়োজনীয় হয়রানির শিকার হতে হয়। অনলাইন ফর্ম পূরণ বা জরুরি কাগজপত্র ডিজিটালি সম্পন্ন করা সম্ভব হলেও, বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে ইউনিয়ন বা উপজেলা কার্যালয়ে সরাসরি যেতে হয়, আর সেখানেই দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা মধ্যস্বত্বভোগী নির্ভরতার সংস্কৃতি নাগরিকের আস্থা দুর্বল করে দেয়।
এই প্রসঙ্গে একটি গঠনমূলক প্রস্তাবনা বিবেচনার দাবি রাখে। এই মধ্যস্বত্বভোগীদের সম্পূর্ণভাবে বাদ দেওয়ার পরিবর্তে সরকার যদি তাঁদের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃত ডিজিটাল সেবা এজেন্ট হিসেবে পুনর্বাসনের সুযোগ তৈরি করে, তাহলে একদিকে তাঁদের জীবিকা সুরক্ষিত থাকবে, অন্যদিকে জনগণ প্রশিক্ষিত ও জবাবদিহিমূলক একটি চ্যানেলের মাধ্যমে সেবা পাবে। এই ধরনের রূপান্তর প্রতিষ্ঠানকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তুলবে এবং এসডিজি-১৬ এর জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার লক্ষ্যের সঙ্গেও সরাসরি সামঞ্জস্যপূর্ণ।
সমাধানের পথ: গ্রামভিত্তিক প্রতিনিধি মডেল
আমার প্রস্তাব হলো, প্রতিটি গ্রামে খাতভিত্তিক এক বা দুইজন প্রশিক্ষিত প্রতিনিধি নিয়োগ করা যেতে পারে, যেমন স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, নারী স্বাস্থ্য এবং তরুণদের কৃষি উন্নয়নের জন্য পৃথক পৃথক প্রতিনিধি। তাঁরা নাগরিকদের ডিজিটাল ফর্ম পূরণ থেকে শুরু করে সঠিক সেবা প্রাপ্তি পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় সহায়তা করবেন। এই মডেলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আস্থা প্রতিষ্ঠা, গ্রামবাসী যেন নিশ্চিত থাকতে পারেন যে তাঁদের ব্যক্তিগত তথ্য কোনোভাবেই অপব্যবহার বা অপ্রয়োজনীয় হয়রানির কারণ হবে না।
নাগরিক ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক
শুধু ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের সংখ্যা বাড়ানোই যথেষ্ট নয়। প্রকৃত লক্ষ্য হওয়া উচিত নাগরিক প্রকৃতপক্ষে কতটা উপকৃত হচ্ছেন তা নিশ্চিত করা। নাগরিক ও স্থানীয় সরকারের মধ্যে এমন একটি সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে যেখানে উভয় পক্ষই সমানভাবে লাভবান হয়। প্রতিটি বিভাগ যেন একই মানের সেবা প্রদান করে এবং সেবাগ্রহীতা ও সেবাদাতা উভয়েই প্রক্রিয়া সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা রাখেন, এমন একটি সমন্বিত কাঠামো গড়ে তোলাই এখন সময়ের দাবি।
উপসংহার
সিপিডির এই সংলাপ স্থানীয় সরকার পর্যায়ে ই-গভর্নেন্সের বাস্তব চ্যালেঞ্জ এবং সম্ভাবনা, উভয়কেই স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। এর পাশাপাশি এই প্রতিবেদনে তুলে ধরা অতিরিক্ত ঘাটতিগুলো, যেমন ভৌত অবকাঠামোর দুর্বলতা, তথ্য সুরক্ষার প্রশ্ন, মধ্যস্বত্বভোগীদের গঠনমূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজনীয়তা এবং গ্রামভিত্তিক প্রতিনিধি মডেলের সম্ভাবনা, সরকারের নীতিনির্ধারণী আলোচনায় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হওয়া উচিত। এই দিকগুলো সমন্বিতভাবে সমাধান করা গেলে ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজি-১৬ এর লক্ষ্য অনুযায়ী কার্যকর, জবাবদিহিমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা সম্পূর্ণ সম্ভব। এই পথে সরকার, উন্নয়ন অংশীদার এবং নাগরিক সমাজের সমন্বিত উদ্যোগই পারে প্রকৃত অর্থে অন্তর্ভুক্তিমূলক ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তুলতে।
